• চ্যাম্পিয়নস লিগ
  • " />

     

    বার্সাকে জ্বালিয়ে যে রাতে শোধ তুলেছিলেন মরিনহো

    হোসে মরিনহোর জন্য ব্যক্তিগত প্রতিশোধের ব্যাপার ছিল ম্যাচটা। বার্সেলোনা তখন গোটা ফুটবল দুনিয়ার বিস্ময়, ওই দলটা ফুটবল ইতিহাসেরই অন্যতম সেরা। মরিনহো নিজের ক্যারিয়ারে দুইবার চ্যাম্পিয়নস লিগের শিরোপা উঁচিয়ে ধরেছেন। অবশ্য নিজের সবচেয়ে পছন্দের ম্যাচ কোনটি- তাকে সে প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলে ওই দুই ফাইনাল ম্যাচের কথা মরিনহো বলবেন না। মরিনহো আপনাকে বলতে পারেন ন্যু ক্যাম্পে ১-০ গোলে হারা এক ম্যাচের গল্প। যে হারে মরিনহোর গায়ে সেঁটে থাকা স্পেশাল তকমাটা পুরু হয়েছিল আরেক প্রস্থ।

    ফুটবলাররা গোল করেন, এরপর দ্বিগবিদিক ছোটেন, আঙুল উঁচিয়ে আকাশে উড়াল দিতে চান, স্বর্গকেও গোল উৎসর্গ করতে পারেন তারা। একজন কোচ যখন ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজার পর প্রতিপক্ষের মাঠে আঙুল উঁচিয়ে ছোটেন উদযাপন করতে তখন সেটাকে স্রেফ ‘ম্যাডনেস’ ছাড়া আর কিছু বলার সুযোগ থাকে না। পর্তুগিজ লোকটা অবশ্য এমনই, পাগলাটে না হলে শূন্য থেকে চূড়ায় ওঠার স্বপ্নই বা দেখে ক’জন?

    মরিনহো সে রাতে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন ন্যু ক্যাম্পে। তাতে পুড়ে ছাড়খাড় বার্সেলোনার সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনাল খেলার স্বপ্ন। হাতছাড়া টানা দ্বিতীয়বারের মতো চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতার হাতছানিও। মরিনহোর জন্য এর চেয়ে তৃপ্তির আর কিছু হতে পারত না।

    ‘এলিট’ শব্দটা জন্ম থেকেই অপছন্দ মরিনহোর। এই অপছন্দগুলোকে মরিনহো বানিয়ে ফেলেন নিজের শত্রু। নিজেকে প্রমাণ করতে সব করতে পারেন তিনি। বেটার কল সলে জিমি ম্যাকগিল যদি ফিকশনাল ক্যারেক্টার হন, তো তার বাস্তব রূপ হবেন মরিনহো।


    চেলসি থেকে প্রথম দফায় বরখাস্ত হওয়ার পর বার্সেলোনার কোচ হতে পারতেন মরিনহো। সেবার রীতিমত পাওয়ারপয়েন্ট প্রেজেন্টেশনও দিয়েছিলেন ন্যু ক্যাম্পের ডাগ আউটে বসতে। শেষ পর্যন্ত বার্সা অবশ্য বেছে নিয়েছিল 'বি' দলের কোচ পেপ গার্দিওলাকে। তার অধীনে ইতিহাসের সেরা মৌসুম কাটিয়ে বার্সা তখন বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দল। আর মরিনহো সে মৌসুমে যোগ দিয়েছিলেন ইন্টারে। প্রথম মৌসুমে সিরি আ আর কোপা ইতালিয়া জিতে শুরুটা তারও মন্দ হয়নি ইতালিতে।

    কিন্তু মরিনহোর কাছে ইন্টারের মূল প্রত্যাশা ছিল ইউরোপে, চ্যাম্পিয়নস লিগে। মরিনহোর অধীনে প্রথম বছর দ্বিতীয় রাউন্ড থেকেই বাদ পড়েছিল ইন্টার। পরেরবার ধুঁকতে ধুঁকতে গ্রুপপর্ব পেরিয়ে, দ্বিতীয় রাউন্ড, কোয়ার্টার ফাইনাল হয়ে সেমিফাইনালে দেখা হয়ে গেল বার্সেলোনার সঙ্গে। এর চেয়ে কঠিন প্রতিপক্ষ আর হয় না!

    বার্সার বিপক্ষে যা করার সেটা প্রথম লেগে ঘরের মাঠেই করতে হবে- মরিনহো জানতেন। বার্সেলোনা সেবার স্পেন থেকে সান সিরো পর্যন্ত পৌঁছেছিল বাসে চেপে। আইসল্যান্ডে এক আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতে ইউরোপের বেশ কিছু জায়গায় বিমান সংযোগ ছিল বন্ধ। বাধ্য হয়ে ১৫ ঘন্টা বাস জার্নি করে লিওনেল মেসিরা খেলতে গিয়েছিলেন ইন্টারের বিপক্ষে। এসব অবশ্য ম্যাচে কতোখানি প্রভাব ফেলেছিল সেটা তর্কসাপেক্ষ। তবে মরিনহোর ইন্টার সেদিন ৩-১ গোলে বার্সাকে হারিয়ে চোখে আঙুল দিয়ে ‘এলিটিসমের’ মুখে ঝামা ঘষে দিয়েছিল। দ্য কোচেস ভয়েসের এক ভিডিওতে মরিনহো সেই ম্যাচের ট্যাকটিকস জানিয়েছিলেন নিজেই, “আমি জানতাম, যা করার প্রথম লেগেই করতে হবে।”  

    ওই ম্যাচ শেষে গার্দিওলা অবশ্য মরিনহোর প্রশংসাই করেছিলেন। সঙ্গে অবশ্য অভিযোগও ছিল, “দেখুন, আগ্নেয়গিরি নিয়ে আমাদের কিছুই করার ছিল না। এভাবে (৭০০০ কিলোমিটার বাস ভ্রমণের পর) ম্যাচ খেলা হয়ত আদর্শ নয়। আমরা পরের লেগে মাঠে প্রচুর পানি ছেটাব যাতে পাসিং ফুটবলটা খেলতে পারি। এরকম মাঠে আমরা অভ্যস্ত নই।”

    “মরিনহোর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। যদিও ফোন নম্বর অদল-বদল করা হয়নি। আমার মতে সেই সেরা। যা হোক, পরের লেগে তাকে হারানোর চেষ্টা করব।”

    মরিনহোর চোখে বার্সেলোনার ফাইনাল খেলতে চাওয়াটা অবশ্য ছিল ‘অবসেশন’, “বার্সা বার্নাব্যুতে ফাইনাল খেলতে চায়। আমি জানি এই অভিজ্ঞতাটা কেমন। দুইবার বার্নাব্যুতে শিরোপা জিতেছি আমি। সবাই কাতালান পতাকা জড়িয়ে মাঠে আসে। পুরোটাই আসলে 'অ্যান্টি মাদ্রিসিমো'। স্বপ্ন একটা বিশুদ্ধ বস্তু, আর ঘোর- ঘোর কখনই ভালো না। এর ভেতর গর্ব থাকে।”     

    ন্যু ক্যাম্পের দ্বিতীয় লেগের আগে সবরকম মঞ্চ প্রস্তুত ছিল। ওই মঞ্চে কে উঠবেন, কে জয়ী হবেন সেটাই অপেক্ষা।

    স্কোরলাইন ৩-১ হওয়ার পরও দ্বিতীয় লেগের আগেও সেই বার্সেলোনাকেই অনেকে ফেভারিট হিসেবে ধরছিলেন। সেই বার্সেলোনা কতোখানি শক্তিশালী ছিল তার মাপকাঠি আঁচ করা যায় এই এক কথায়। দ্বিতীয় লেগে তাই মরিনহোর ক্লাসিক ‘বাস পার্ক’। বাস পার্ক করা শব্দটাও আসলে সেদিনই ফুটবলে স্থান পেয়েছিল।


    মাইকন, লুসিও, স্যামুয়েল, জানেত্তি- ৪ ডিফেন্ডার তো মরিনহো নামালেনই। হেলমেট পরে একাদশে নেমে গেলেন ক্রিশ্চিয়ান কিভুও। তিনি খেললেন লেফট উইঙ্গার হিসেবে,  স্যামুয়েল ইতো আর ওয়েসলি স্নাইডার তার সঙ্গী মিডফিল্ডে। সামনে শুধু  ডিয়েগো মিলিতোর। ওই ম্যাচে কিভুকে খেলানোর একটাই উদ্দেশ্য ছিল মরিনহোর। রাইট উইং ধরে মেসি-আলভেজের কম্বিনেশন ঠেকানো। জানেত্তি থাকবেন মেসির পাহারায়, মেসি কাট করতে চাইলে থিয়াগো মোত্তা থাকবেন। তিনিও না পারলে কিভু যাতে অন্তত এক উইং আগলে রাখতে পারেন।   

    সমস্যাটা বাধল আসলে ম্যাচের ২৮ মিনিটে। মোত্তার গুঁতোয় সার্জিও বুস্কেটস পড়ে গেলেন। হয়ত লাল কার্ড এমনিতেও দেখতে হত মোত্তাকে। কিন্তু বুস্কেটস মাটিতে শুয়ে মুখে হাত ঢেকে উঁকি মারতে গেলেন। সেটা আবার ধরা পড়ল ক্যামেরায়। প্রতিপক্ষকে এমন একটা ‘ভিলেন’ বানানোর প্রয়োজন ছিল মরিনহোর। আরও একবার ম্যাচটা হয়ে গেল যুদ্ধ, আমরা বনাম তোমরা, খেলা হবে।

    মোত্তার মাঠ ছাড়া ডাগ আউটে আরেকটু তাঁতিয়ে দিয়েছিল মরিনহোকে। ইন্টার খেলোয়াড়কে তাকে ততোদিনে গুরুত আসনে বসিয়ে দিয়েছেন। দেয়ান স্টাঙ্কোভিচ বলেছিলেন, মরিনহো বললে আগুনে ঝাঁপ দিয়তে পারেন তিনি। স্নাইডার নাকি মরিনহোর জন্য মরতেও পারবেন, মারতেও পারবেন। কোচের সঙ্গে খেলোয়াড়দের এমন যখন সম্পর্ক তখন তাকে ডাগআউটে তেঁতে থাকতে দেখলে মাঠের খেলোয়াড়রা এমনিতেই বুঝে যান কী করতে হবে এখন।

    সে ম্যাচে ইন্টারের বল পজেশন ছিল ১৫.৩ শতাংশ। চ্যাম্পিয়নস লিগের নক আউট পর্বের ইতিহাসে সর্বনিম্ন সেটা। আর বার্সেলোনা সারা ম্যাচ বল পায়ে রেখেও সেভাবে ফাঁটলই ধরা পারেনি ইন্টারের রক্ষণে। এক মেসি দারুণ এক শট করেছিলেন, তাও হুলিও সিজার দারুণ এক সেভে ফিরিয়ে দিয়ে নিজের কাজটা করে রেখেছিলেন। ম্যাচের ৬ মিনিট আগে জেরার্ড পিকে এক গোল শোধ করলেও তাই বার্সার আর শেষ পর্যন্ত লাভ হয়নি।

    শেষ বাঁশি বাজার পরই তখন মাঠে ঢুকে গিয়েছিলেন মরিনহো। বার্সা গোলরক্ষক ভিক্টর ভালদেস অবশ্য বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তাতে কোনো লাভ হয়নি। এমন ‘জয়ের’ পর কারও উদযাপনে লাগাম টানার অধিকার নেই কারও। ন্যু ক্যাম্পে ১-০ গোলে হেরে ম্যাচ শেষে মরিনহো বলেছিলেন, এটাই তার ক্যারিয়ারের সেরা অর্জন, “আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অর্জন। আমার খেলোয়াড়রা একেকজন নায়ক। ওরা আজ রক্ত পানি করে দিয়েছে।”

    মরিনহোর ওই জয়ের মাহাত্ম্য ছিল আরও বড়। বার্সাকে বিদায় করে বার্নাবুতে শেষ পর্যন্ত তার ইন্টার মিলানই শিরোপা উঁচিয়ে ধরেছিল। ইতালির একমাত্র ক্লাব হিসেবে সেবার ট্রেবল পূরণ করেছিল ইন্টার। আর বার্নাব্যুতে বায়ার্নের বিপক্ষে ম্যাচটাই হয়ে থেকেছিল মরিনহোর ইন্টার ক্যারিয়ারের শেষ। যে বার্নাব্যুতে শেষ করেছিলেন সেখানেই আবার কোচ হয়ে ফিরে বার্সেলোনার সঙ্গে ‘শত্রুতার’ নতুন গল্প লিখেছিলেন মরিনহো।

    “আমি বোকা নই। আমি জানি বার্সেলোনা সমর্থকেরা আমাকে ভালোবাসবে না। ৪ বচহর কাজ করার সময় বার্সেলোনা আমাকে যা দিয়েছে তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। কিন্তু এর পরের সময়টায় আমি যা দেখেছি এরপর বার্সা নিয়ে পজিটিভ কিছু আমার পক্ষে ভাবা সম্ভব নয়। আমি হয়ত আমার ক্যারিয়ারটা বার্সাকে কোচিং না করিয়েই শেষ করব।”- ন্যু ক্যাম্পেই এই কথাগুলো বলে গিয়েছিলেন মরিনহো। বলা না বলা সব কথা এভাবে মুখের ওপর বলে দেন বলেই হয়ত মরিনহোকে নিয়ে দুই দল। যারা ভালোবাসেন তারা আগুনেও ঝাঁপ দিতে পারেন। আরেকদল আগুনে ঝাঁপ দিলেও মরিনহোর সঙ্গে হাত মেলাবেন না।