• এএফসি কাপ
  • " />
    X
    GO11IPL2020

     

    তাদের নিজেদের মুখে : ভারতে যেদিন উড়েছিল আবাহনীর পতাকা

    এএফসি কাপে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চল থেকে ভারতের দলের নকআউট পর্বে বাছাই করা একটা নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মর্যাদার দিক দিয়ে এএফসি চ্যাম্পিয়নস লিগের পরেই অবস্থান এএফসি কাপের (ইউরোপিয়ান হিসেবে ইউরোপা লিগ)। অথচ বাংলাদেশের লিগ চ্যাম্পিয়নদের সাফল্য এতোদিন বলতে ছিল গ্রুপ পর্বে শুধু অংশ নেওয়া পর্যন্তই। সেই 'রীতি' ২০১৯ সালে পালটে দিয়েছিল আবাহনী। ভারতের চ্যাম্পিয়নদের টপকে দক্ষিণ এশিয়ার চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল মারিও লেমোসের দল। এরপর ইন্টার জোনাল সেমিফাইনালে উত্তর কোরিয়ার এপ্রিল টুয়েন্টি ফাইভের বিপক্ষে ঘরের মাঠে জিতলেও, দ্বিতীয় লেগে হেরে আর আবাহনীর আর ফাইনালে ওঠা হয়নি। তবে ইতিহাস গড়া হয়ে গিয়েছিল আগেই। বাংলাদেশের প্রথম দল হিসেবে নক আউট পর্ব নিশ্চিত করেছিল আকাশি-হলুদরা। 

    গ্রুপ পর্ব উতরে যেতে তার আগে আবাহনীকে দিতে হয়েছে কঠিন পরীক্ষা। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচ ভারতে গিয়ে মিনার্ভা পাঞ্জাবকে হারাতে পারলে সেমিফাইনাল নিশ্চিত হত আবাহনীর। সমীকরণে ছিল ভারতের আরেক দল চেন্নাইন এফসিও। আবাহনী পয়েন্ট হারালে আর  নেপালের ক্লাব মানাং মার্সিয়াংদিকে হারিয়ে দিলে চেন্নাইনই আবাহনীকে হতাশ করে উঠে যেত সেমিফাইনালে। 

    ২৬ জুন, ২০১৯ এর সেই গল্পটাই এক বছর পর খেলোয়াড় আর কোচদের মুখ থেকে...

     



    দ্য বিল্ড আপ

    মাসিহ সাইঘানি, ডিফেন্ডার, আবাহনী (২০১৮-১৯) : ভারতে পৌঁছানোর আগেই আমরা জানতাম এই ম্যাচটা শুধু আবাহনীর নয়। এটা আসলে বাংলাদেশেরও ম্যাচ। মিনার্ভা পাঞ্জাব ভালো দল। আর ভারতের মাঠে জিতে আসার কাজটাও তো কঠিন।

    গৌহাটির ম্যাচটা ক্ল্যাসিক গোলশূন্য ড্র-এর ম্যাচ ছিল। প্রথমার্ধে যদিও আমরাই বেশি গোলের সুযোগ পেয়েছিলাম। তবে দ্বিতীয়ার্ধে মিনার্ভাও চাপে ফেলে দিল আমাদের। সত্যি বলতে, পুরো টুর্নামেন্টে দারুণ ছন্দে ছিলাম আমরা। তবে চাপেই বোধ হয় নার্ভাস হয়ে পড়েছিল দলের অনেকে। তাতে আমাদের স্বাভাবিক ফুটবলটাও খেলতে পারছিলাম না।

    মারিও লেমোস, কোচ, আবাহনী (২০১৯- ) : অনেকটা ফাইনালের মতো ছিল ম্যাচটা। এমন ম্যাচে ওয়েলিংটনকে পেলাম না চোটের কারণে। আর সানডে চিজোবাকে ভিসাই দিল না ভারত। সেরা দল নিয়েও তাই ভারত যাওয়া হয়নি আমাদের। তবে জেদটা আগের মতোই ছিল, আমাদের জিততেই হবে। চেন্নাইনের সঙ্গে ঢাকায় ৩-২ এর জয়, মানাং মার্সিয়াংদিকে ৫-০ গোলে উড়িয়ে দেওয়া- এসব কিছু আত্মবিশ্বাসের জায়গাটা নড়বড়ে হতে দেয়নি।

    কেরভেন্স বেলফোর্ট, ফরোয়ার্ড, আবাহনী (২০১৮- ) : আমরা ভারত ছাড়ার আগে সানডের মন খারাপ। সবাই যাচ্ছে, ও যেতেই পারছে না। আবাহনীতে ততোদিনে ৪ বছর কাটানো হয়ে গেছে ওর। আর যেহেতু আমরা ভালো বন্ধু, ওকে রেখে যেতে খারাপ লাগছিল। আমি যাওয়ার আগে ওকে বলেছিলাম দুশ্চিন্তা না করতে। আমরা জিতেই ফিরব- বাংলাদেশ ছাড়ার আগে ওকে প্রতিজ্ঞা করে গিয়েছিলাম।

    নাবিব নেওয়াজ জীবন, ফরোয়ার্ড, আবাহনী (২০১৬- ) : আবাহনীর হয়ে এর আগেও দুইবার এএফসি কাপ খেলেছি আমি। কিন্তু এবারের মতো আত্মবিশ্বাসী কখনও ছিলাম না। ধারাবাহিকতা ধরে রেখে একের পর জিতেই চলেছিলাম আমরা। সানডে না থাকায় অবশ্য চাপ বেশি ছিল আমার ওপর।
     


    ম্যাচের নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও খেলা ছিল গোলশূন্য। ওদিকে চেন্নাইন ২-০ গোলে এগিয়ে গিয়েছিল মানাংয়ের বিপক্ষে। এরপর ৮ মিনিটের ব্যবধানে দুই গোল হজম করে আবাহনীকে স্বস্তিও দিয়েছিল তারা। কিন্তু সেটা আবার সহজেই কেড়ে নিয়ে তৃতীয় গোল করে বসে চেন্নাইন। শেষ পর্যন্ত ম্যাচটা তারা জিতেছিল ৩-২ ব্যবধানে। আবাহনী তখন জেনে গেছে শুধু ড্র করলে আর কপাল খুলছে না তাদের।


    দ্য গোল

    মাসিহ সাইঘানি : মিনার্ভার রক্ষণে একের পর এক হানা দিয়ে যাচ্ছি, আর হতাশ হচ্ছি। ওদিকে অন্য ম্যাচের খবর রাখতে হচ্ছে। নেপালে চেন্নাইইন আর মানাং মার্সিয়াংদির ম্যাচ ড্র হলে এদিকে গোলশূন্য ড্র করেও উতরে যেতাম আমরা। কিন্তু ম্যাচ যখন শেষ প্রান্তে গিয়ে পৌঁছাল তখন নিশ্চিত হয়ে গেলাম, আমাদের জিততেই হবে।

    সময় ফুরিয়ে আসছে, আর অস্থিরতায় চাপ বাড়ছে পুরো দলের ওপর। আমি বুঝতে পারছিলেন অনেকেই হাল ছেড়ে দিচ্ছে। ম্যাচের ৮৬ মিনিটের দিকে খেলা খানিকক্ষণ বন্ধ ছিল। সাইডলাইনে পানি পান করতে গিয়ে কেরভেন্স বেলফোর্টকে ডাক দিলাম। বললাম, হয় আমি নয় তুমি- আমাদেরই জেতাতে হবে আবাহনীকে। বেলফোর্ট মাথা ঝাকিয়ে সাড়া দিল। জানিনা ওই মুহুর্তে কতোখানি বিশ্বাস ছিল ওর মনে।

    নির্ধারিত ৯০ মিনিটও ফুরিয়ে গেছে। যোগ করা সময়ের দেড় মিনিটও খেলা হয়ে গেছে। আমরা এখন রক্ষণে আরও ঢিল দিলাম। সব শক্তি দিয়ে গোলের চেষ্টা করতে হবে। ড্র করে তো আর লাভ নেই।

    শেষ কর্নারটা যখন পেলাম, তখন এটুকু নিশ্চিত যে এটাই শেষ সুযোগ। হয় এটা কাজে লাগাতে পারব আমরা, নাহয় এতোদূর পাড়ি দিয়ে খালি হাতে ফিরতে হবে। বাংলাদেশে গুটিকয়েক যারা ফুটবলের খবর রাখেন, তারা অন্তপ্রাণ সমর্থক। সবাই দেশ ছাড়ার আগে প্রেরণা দিয়েছিল। সবকিছুই একবার ফ্ল্যাশব্যাক হয়ে গেল ওই মুহুর্তে।

    বক্সের ভেতর দুই বারপোস্টে দুইজন খেলোয়াড় রেখেছে পাঞ্জাব। আমি বাতাসে ভালো এটা ততোদিনে তারাও জেনে গেছে। আমার সঙ্গে বক্সের ভেতর দুইজন মার্কার। জীবন কর্নার কিক নেওয়ার পরপরই অবশ্য প্রচন্ড রাগ হলো। মনে হলো এসব কী! বল তো বাইরে দিয়ে যাবে।

    বলটা বাঁচিয়ে দিল বেলফোর্ট। বাইলাইন পেরুনোর আগেই লাফিয়ে বলটা সিক্স ইয়ার্ড বক্সের মাঝামাঝি ফেলল। ততক্ষণে আমার দুই মার্কার হাওয়া গেছে! ওরাও হয়ত ভেবেছিল বল যাবে বাইরে দিয়ে! এসব খুঁটিনাটি বিষয় আসলে ম্যাচে পার্থক্য গড়ে দেয়। আমাদের সামনে ইতিহাসের হাতছানি, আর পাঞ্জাবের বিদায় আগেই নিশ্চিত। তবুও ঘরের মাঠে বাংলাদেশের একটা দলের কাছ হারতে চাইবে কেন তারা। পুরো ম্যাচে মনোযোগী হলেও ওই মুহুর্তটা প্রমাণ করে দিয়েছে যারা মরিয়া থাকে জেতার জন্য, পরিশ্রম করলে ভাগ্যও হয়ত তার সহায় হয়।

    আমার দিকে বল উড়ে আসতেই আমি করলাম আরেক হেড। গোলরক্ষক, দুই বারপোস্টের দুইজন- মোট ৩ জনকে ফাঁকি দিয়ে গোল করতে হলে নিখুঁত হতে হত। আমার হেডটাও তাই হলো।

    কেরভেন্স বেলফোর্ট : ওই কর্নারে আমার ফার্স্ট পোস্টে থাকার কথা ছিল। কিন্তু কোনো এক অদ্ভুত কারণে মাসিহর সঙ্গে জায়গা অদল-বদল করলাম। জীবন সাধারণত ফার্স্ট পোস্টেই কর্নার কিক নেয়। মাসিহকে ওই জায়গায় থাকতে বলেছিলাম।

    ভাগ্য বোধ হয় এমনই হয়। বল উড়তে উড়তে সেকেন্ড পোস্ট পেরিয়ে, বাইলাইনের কাছাকাছি চলে গেল। ওই মুহুর্তে আপনার কাজ একটাই, বলটা আবার ভেতরে ঢোকানো। হেড করে ভালো জায়গায়ও ফেলতে পারতাম। মাসিহ একদম জায়গা মতো ছিল!

    নাবিব নেওয়াজ জীবন : ম্যাচের সময় ফুরিয়ে আসছিল, আর গ্যালারির দিকে নজর যাচ্ছিল আমার। ওখানে একজন ছিলেন, যিনি আঙুলের ইশারায়, নইলে গলা ফাটিয়ে চেন্নাইনের ম্যাচের আপডেট জানাচ্ছিলেন। জিততে পারব না, এতো কাছে এসেও সেমিফাইনালে যাওয়া হবে না- ম্যাচের আগে আসলে এমন কোনো চিন্তা মাথায়ই আসেনি। কিন্তু একের পর এক গোলের সামনে বিফল হওয়ার পর মাথায় জেঁকে বসেছিল দুশ্চিন্তা। হতাশও লাগছিল কিছুটা।

    মাসিহ হেডে খুব ভালো- এটা আমরা সবাই জানতাম। আরেকটা ব্যাপার আমাদের ওই মৌসুমে শিখিয়েছিলেন কোচ, একটা কর্নার মানে একটা গোলের সুযোগ। যোগ করা সময়ে যখন কর্নার পেলাম তখনও এসবই মনে হচ্ছিল।

    যদিও কর্নারটা শেষ পর্যন্ত ভালো হয়নি। তবে ভাগ্য ভালো বেলফোর্ট বাঁচিয়ে দিয়েছিল। এরপর তো বাকি কাজ মাসিহই করেছে।   

    মারিও লেমোস : আমার স্পষ্ট মনে আছে, ডাগ আউটে আমি তখন দাঁড়িয়ে। হাত ঘড়ির দিকে তাকালাম। দেখি আর মাত্র ৫ মিনিট বাকি আছে ম্যাচের। আমার বিশ্বাসই হচ্ছিল না আমরা সেমিফাইনালে উঠতে পারব না। সাইডবেঞ্চেই অন্য ম্যাচের খবর রাখছিলাম আমরা। তবে মাঠের ভেতর ইন্টারনেট বেশ ঝামেলায় ফেলছিল। চেন্নাইন ৩-২ গোলে এগিয়ে যাওয়ারও আরও কিছুক্ষণ পর জানতে পেরেছিলাম, জিততেই হবে আমাদের। তখন ৯০ মিনিটও প্রায় ফুরিয়ে এসেছে।

    বেলফোর্ট তড়িঘড়ি করে সাইডলাইনের কাছে এসে আমাকে জিজ্ঞেস করল, “বস ওই ম্যাচের কী অবস্থা”। শুকনো মুখে ফল জানালাম। সঙ্গে এটাও বললাম আমাদের ভাগ্য আমাদের হাতেই আছে। এখনও সময় আছে। ম্যাচ বদলাতে একটা মুহুর্তই যথেষ্ট।

    মাসিহ যখন হেড করল, আর বল দেখিনি। আমি শুধু দেখেছি মাসিহ আমাদের দিকে দৌড়ে আসছে। এরপরে গল্পটা তো আর বলা প্রয়োজন নেই।

     


     


    অ্যাডিশনাল টাইমের তৃতীয় মিনিটে গিয়ে কর্নার থেকে গোল পায় আবাহনী। জীবন নিয়েছিলেন কিক, সেটা দূরের পোস্টে বাইলাইন দিয়ে প্রায় বেরিয়ে যাচ্ছিল। বেলফোর্ট হেড করে বল রেখেছিলেন মাঠে। এরপর মাসিহ ছিলেন জায়গামতো।  সেখান থেকেই এএফসি কাপে নিজের তৃতীয় গোল করে আবাহনীকে জয় এনে দেন আফগান ডিফেন্ডার।


    দ্য সেলিব্রেশন

    মাসিহ সাইঘানি : হেডটা করেই বুঝতে পেরেছিলাম কিছু একটা হতে যাচ্ছে। গোলরক্ষকের পাশ কাটিয়ে বল যখন ঢুকছে আমি বুঝে গেছি কাজ হয়ে গেছে। আমি শুধু দৌড় শুরু করলাম। ডাগআউটের দিকে যেতে হবে আমার। পুরো পথ যাওয়াও লাগল না। সবাই এসে পাগলের মতো জড়িয়ে ধরলো আমাকে। ওই মুহুর্তের কথা মনে পড়লে এখনও গায়ে কাঁটা দেয়।

    আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গোল। গোল করতে পারা সবসময়ই দারুণ। সেটা যদি অন্তিম মুহুর্তে ম্যাচ জেতানো গোল হয় তাহলে তো কথাই নেই। তার চেয়ে বড় কথা ওই গোল বাংলাদেশ ফুটবলের অংশ হয়ে গেছে। এটা আমার জন্য গৌরবের।

    কেরভেন্স বেলফোর্ট : সাইঘানির সঙ্গে এখনও কথা হলে ওই ম্যাচের কথা ফিরে আসে। ও আমাকে মনে করিয়ে দেয় ৮৬ মিনিটের ওই কথোপকথনের মুহুর্তটা। আসলেই দারুণ ছিল দিনটা।

    ওই ম্যাচের পর সত্যজিৎ দাস রুপুকে আমরা কাঁদতে দেখেছি। আমার ক্যারিয়ারের সেরা মুহুর্ত জাতীয় দলের হয়ে খেলা। এরপরই এএফসি কাপের এই ম্যাচটা। ওই দিনটা কখনও ভুলতে পারব না।

    নাবিব নেওয়াজ জীবন : ড্রেসিংরুমে এমন উদযাপন আমি দেখিনি। নেচে-গেয়ে ড্রেসিংরুমে কাঁপন তুলে দিয়েছিল আবাহনী সেদিন। হোটেলে ফিরে দেখি আরেক চমক। কে যেন আমাদের জন্য ঢাকের ব্যবস্থা করেছে, মানে ব্যান্ড পার্টি আর কি। আমরা সেই তালে তালে আরও কিছুক্ষণ নেচেছি। ওই রাতের সবকিছুই মনে আছে।  

     

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন