• ওয়েস্ট ইন্ডিজের ইংল্যান্ড সফর ২০২০
  • " />

     

    ব্রড, উদযাপন, ভালবাসা

    স্টুয়ার্ট ব্রড উদযাপন করতে ভালবাসেন। 

    দলে আছেন কি নেই, ক্রিজে আছেন কি নেই তাতে কিছু যায় আসে না। তার প্রথম হ্যাটট্রিকের পর মার্ক নিকোলাস জিজ্ঞাসা করেছিলেন, সেটিই মহাবিশ্বের সবচেয়ে সেরা অনুভূতি কিনা। ব্রড বলেছিলেন, সবচেয়ে সেরা অনুভূতি ম্যাচ জেতা। দ্বিতীয় হ্যাটট্রিকটা তিনি বুঝতেই পারেননি। 

    ব্রড উদযাপন করেন আগেভাগেই। ব্যাটসম্যানকে আম্পায়ার আউট দিয়েছেন কি দেননি, তাতে কিছু যায় আসে না। ব্রড আবেদনের আগেই উদযাপন করেন, সেটির একটা ইংরেজি টার্মও আছে ব্রিটিশ মিডিয়ায়। যার প্রতিশব্দ করতে গেলে দাঁড়ায় খানিকটা এমন-- 'আবেদোদযাপন'।

    অবশ্য এই আগেভাগে উদযাপনের একটা কারণ চাইলে দাঁড় করাতে পারেন আপনি। অনুমিত সময়ের ১২ সপ্তাহ আগে জন্মেছিলেন। ১ কেজিরও কম ওজন ছিল তার। এক মাস যমে-মানুষে টানাটানির পর ছাড়া পেয়েছিলেন। যে ডাক্তার তার চিকিৎসা করেছিলেন- তার নাম ছিল জন। ব্রডের পুরো নাম- স্টুয়ার্ট ক্রিস্টোফার জন ব্রড। 

    আবেগ, উচ্ছ্বাস, বিশ্বাস, অবিশ্বাস, বিস্ময়, এমনকি হতাশা কিংবা ক্ষোভ-- ব্রড লুকোতে পারেন না। একটা ক্ষেত্রে নির্লিপ্ত থাকেন শুধু, আউট হলে। আউট হয়েছেন, সেটাই বিশ্বাস করতে চান না। কিংবা ভাব করেন এমন। তর্ক, বিতর্ক, এর পর কী হবে-- এতকিছু ঠিক ভাবতে যান না তিনি। একটা বৈপরীত্য তৈরি হয়ে যায় তাই আশেপাশের অভিব্যক্তির সঙ্গে। সেসব আপনার কেমন লাগলো, অতিশয়োক্তি মনে হলো কিনা, তাতে বোধহয় তার কিছু যায় আসে না। 

    সেই ব্রড ড্রেসিংরুমে লাফাচ্ছেন, আর চাপড় দিচ্ছেন সামনে থাকা টেবিলে। 

    বেন স্টোকস স্ট্রাইক প্রান্তে দুই হাত তুলে উদ্যত-- “এটা কী হলো? কেন করলি” ধরনের একটা অভিব্যক্তি প্রকাশে। জ্যাক লিচ ভুল করে শুধু ছুটছিলেন রানের জন্য। ভীষণ অসম্ভবে স্টোকস ২০১৯ অ্যাশেজের হেডিংলি টেস্টে ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া, সঙ্গে ক্রিকেটকে নিয়ে গেছেন অবিশ্বাসের কাছাকাছি। ২ রান দরকার, সিঙ্গেল নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেও সঙ্গে সঙ্গেই মত বদলেছেন, কিন্তু উলটো ঘুরে দেখেন লিচ মাঝপথে থেকে নিজের ভুল বুঝে এবার পড়িমড়ি করে ছুটছেন ক্রিজে ফিরতে। অনেক পেরিয়ে শূন্য হাতে ফেরার বিহবল সুর তখন প্রায় বেজে উঠেছে, স্টোকস সেটিরই বহিঃপ্রকাশ করতে প্রস্তুত। প্রস্তুত ইংল্যান্ডের ড্রেসিংরুমও- অবিশ্বাস্য ইনিংস আর ম্যাচের অবিশ্বাস্য হৃদয়ভঙের জন্য। 

    ন্যাথান লায়ন লোপ্পা বলটা ফেলে দিলেন হাত থেকে, স্টোকস বসে পড়লেন। কী হতে ধরেছিল, সেটার ভারী হয়ে আসা অনুভূতিটা হেডিংলির বাতাসে চালান করার চেষ্টা করছেন যেন প্রাণপণ। ড্রেসিংরুমের ভেতরে, সামনের ব্যালকনিতে বসে থাকা ইংল্যান্ড দলের সদস্যরাও সেটিই করছিলেন, পল কলিংউড, ক্রিস সিলভারউড, অ্যানালিস্ট, ব্রডের পাশে থাকা সতীর্থ, হয়তো জো রুটই-- সবারই মাথায় কিংবা মুখে হাত চলে গেল। আরেকদফা অবিশ্বাস। কী হলো, আর কী হতে পারতো-র দোলাচল। 

    কিন্তু ব্রড নিজে নিজে হাততালি দিচ্ছেন, সামনের টেবিলে চাপড় দিচ্ছেন, লাফাচ্ছেন। যেন ঘরবন্দী বাচ্চা ছেলেকে হুট করেই বলা হয়েছে, এখন থেকে যত ইচ্ছা মাঠে খেলতে পারবে সে। 
     

    ড্রেসিংরুমের উদযাপন পেরিয়ে


    অথবা ২০১৯ বিশ্বকাপে। মার্টিন গাপটিলের থ্রো স্টোকসের ব্যাটে লেগে হয়েছে অলৌকিক ছয়, নটিংহ্যামশায়ারের ড্রেসিংরুমে বসে ইনস্টাগ্রাম লাইভে যাওয়া রবিচন্দন আশ্বিনের ক্যামেরায় ধরা পড়লেন ব্রড-- লাফিয়েই যাচ্ছেন। যেন লাফ দিয়েই ইংল্যান্ডকে বিশ্বকাপ জিতিয়ে দেবেন তিনি। 

    উল্টোটাও ঘটে। আর সবাই যখন ছুটছেন, ব্রড তখন উদযাপন করতে গিয়েই হঠাৎ মুখের ওপর মাস্কের মতো করে দুই হাত এনে চোখ বড় করে তাকালেন। যদি তার ক্যারিয়ারের একটি ছবি বেছে নিতে বলা হয়, হয়তো অনেকেই ২০১৫ ট্রেন্টব্রিজ টেস্টের সেই ছবিটা বেছে নেবেন। পঞ্চম স্লিপে নাগালের বাইরে থাকা ক্যাচটা ছোঁ মেরে নিয়েছেন স্টোকস। সে ক্যাচ এমনই, পাশে দাঁড়ানো অ্যাডাম লাইথও প্রায় ডিপে দাঁড়ানো ফিল্ডারকে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে বল সেদিকে যাচ্ছে। শুরুতে উইকেট পেয়েছেন ভেবে সেটা উদযাপনের পরক্ষণেই যেন ব্রড বুঝলেন, কী দেখলেন তিনি! বিস্ময়ের প্রকাশ করলেন সেভাবেই। 

    খানিক বাদে ইংলিশ ক্রিকেটাররা বড় পর্দায় রিপ্লে দেখেও যখন একেকজন একেকভাবে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন, রুট তার ভাই দ্বাদশ ব্যক্তি বিলির সাথে সেটি ভাগ করে নিচ্ছেন, স্টোকস লাইথের সঙ্গে নিচ্ছেন, ব্রড যেন তখনও বুঝে উঠতে পারেননি, একটু আগের বিস্ময়ের রেশটা রয়ে গেছে তার। অস্ট্রেলিয়াকে ৬০ রানে গুঁড়িয়ে দেওয়ার দিন ব্রডের ফিগার ছিল ১৫ রানে ৮ উইকেট। সেই দিনশেষে বলেছিলেন, তার তখনও বিশ্বাস হচ্ছে না। স্কোরকার্ডের দিকে তাকালে মনে হচ্ছে অবাস্তব। 

    সে ম্যাচে জেমস অ্যান্ডারসন ছিলেন না। নতুন বলে তাকে ছাড়া কীভাবে চলবে, ব্রড যেন সেটি ভাবার সময়ই দিলেন না। না অধিনায়ক অ্যালেস্টার কুককে, না ইংল্যান্ডকে, না অস্ট্রেলিয়াকে। অথচ সেই টেস্টে অ্যান্ডারসন ছিলেন না বলে কুককে ব্যাটিং নিতে বলেছিলেন তিনি। কুকের মতে, সে ম্যাচে ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্তের কারণে ব্রডের কাছে একটা পাওনা আছে তার। 

    ট্রেন্টব্রিজ তার ঘরের মাঠ, অস্ট্রেলিয়া তার ‘প্রিয়’ প্রতিপক্ষ। তার চেয়ে বেশি উইকেট এই প্রতিপক্ষের সঙ্গে আছে ইতিহাসে আর মাত্র ৫ জন বোলারের। 

    ট্রেন্টব্রিজে বছর দুই আগের অ্যাশেজে সেই অস্ট্রেলিয়ানদের চির-বৈরিতার খাতায় নাম লিখিয়েছিলেন ব্রড। অ্যাশটন অ্যাগারের বলে এজড হয়েছিলেন, ব্র্যাড হ্যাডিনের পায়ে লেগে বল গিয়েছিল স্লিপে। তবে আম্পায়ার আলিম দার আউট দেননি, অস্ট্রেলিয়া রিভিউ খরচ করে ফেলেছিল, ব্রডও দাঁড়িয়ে ছিলেন যেন কিছুই হয়নি ভাব ধরে। একটু পর ইয়ান বেলের সঙ্গে একটু কথাও বলে এলেন। ব্রড দ্বিতীয় জীবনে করেছিলেন ২৮ রান। অস্ট্রেলিয়া হেরেছিল ১৪ রানে। হেরেছিল অ্যাশেজ।

    এরপর থেকে অস্ট্রেলিয়ায়, কিংবা অস্ট্রেলিয়ানদের কাছ থেকে ব্রড আলাদা টোনের দুয়ো শোনেন। ব্রডের নামে ফেসবুক পেইজ খোলা হয়েছিল, ‘স্টুয়ার্ট ব্রড ইজ এ শিট ব্লোক’। ছাপানো হয়েছিল টি-শার্ট। সেবার অস্ট্রেলিয়ানদের দুয়োধ্বনি এতোই নিয়মিত ছিল, সুর মিলিয়েছিলেন তিনি নিজেও। ব্রডকে সেই ম্যাচের তিন মাস পরও জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ‘ওয়াক’ না করার সিদ্ধান্তে আক্ষেপ করেন কিনা। বলেছিলেন, ‘না। তাহলে আমরা ম্যাচটা জিততাম না।’ 


    দ্য ব্রড-মাস্ক


    অস্ট্রেলিয়ার সাথে ব্রডের যোগসূত্রটা অবশ্য আরও গভীরে। ২০০৪-০৫ মৌসুমে ক্লাব ক্রিকেট খেলতে গিয়েছিলেন সেখানে, ভিক্টোরিয়া টার্ফ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন সিনিয়র ডিভিশনে হপারস ক্রসিংয়ের হয়ে খেলেছিলেন এক মৌসুম। তবে সেখানে গিয়েছিলেন ব্যাটসম্যান হিসেবে, যিনি বোলিং পারেন। ওপেনিং করেছিলেন বেশিরভাগ ম্যাচ। ১৭ বছর বয়স পর্যন্ত বাবা ক্রিস ব্রডের মতো বাঁহাতি ওপেনারই ছিলেন, হুট করে লম্বা হয়ে গেলেন, এরপর সিদ্ধান্ত নিলেন পেসার হবেন। অস্ট্রেলিয়া থেকে ফিরলেন তিনি পেসার হিসেবে, যিনি ব্যাটিং পারেন। 

    অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেই প্রথমবার ম্যাচসেরা হয়েছিলেন ব্রড। ২০০৯ অ্যাশেজে ১-১-এ ড্র থাকা সিরিজের শেষ ম্যাচটা জিততেই হতো ইংল্যান্ডকে ভস্মাধার ফিরে পেতে। আগের ম্যাচে বেশ বাজেভাবে হেরেছিলও তারা। ২ বছর আগে অভিষেক করা ব্রডের ক্যারিয়ার গড় তখন ৩৭-এর ওপরে, সে সিরিজে ৩৬.৩৩। সেদিনও অ্যান্ড্রিউ স্ট্রাউস তাকে এনেছিলেন পঞ্চম বোলার হিসেবে। 

    ব্রড এলেন। ৯ ওভার, ২৬ রান, ৫ উইকেট-- তার বোলিং স্পেল পড়ছিল এক সময় এরকম। অস্ট্রেলিয়া ৭৩ রানে বিনা উইকেট থেকে ১১১ রানে ৭ উইকেট। এক স্পেলেই ম্যাচ ঘুরিয়ে দিলেন ব্রড, ঘুরিয়ে দিলেন সিরিজও। ক্যারিয়ারজুড়েই তার নামের পাশে এই ক্লিশেটা বসে গেছে, তিনি ‘গ্রেট’ বোলার নন, অনেক ‘গ্রেট স্পেল’ করা বোলার। তবে তার জন্য হয়তো যথেষ্ট সেসবই, ক্যারিয়ারে এখন পর্যন্ত তার চেয়ে বেশিবার ম্যাচসেরা হয়েছেন আর মাত্র ৫ জন পেসার। ‘স্পেল’ যদি ম্যাচ জিতিয়ে দেয়, তাহলে স্পেলই সই!

    ওভালের সেই ম্যাচের শেষদিন গ্যালারিতে এসেছিলেন ড্যানিয়েল র‍্যাডক্লিফ-- পর্দার হ্যারি পটার। সেদিন ব্রড শুধু নিয়েছিলেন ১ উইকেট, অ্যান্ড্রিউ ফ্লিনটফের বিদায়ী ম্যাচ অ্যাশেজ উদযাপনের আগে কেড়েছিল সব আলো। ব্রড তখন পার্শ্ব-চরিত্র। 

    তার ডাকনামটাও তেমনই-- হ্যারি নয়, ড্রেকো। ড্রেকো ম্যালফয়। সোনালী চুলের কারণে সতীর্থরা তাকে ডাকতেন এই নামে। অবশ্য ম্যালফয়ের জাদুর শক্তি বা সেসবের প্রয়োগ আপনাকে তার পক্ষ হয়তো নিতে দেবে না সবসময়। ব্রড আবার স্লিদারিন হাউসে বেশ ভালভাবেই ফিট করে যাওয়ার মতো চরিত্রও। সেঞ্চুরির পর আউট হয়ে ব্যাট দিয়ে স্টাম্প ভেঙে আসা, কিংবা আম্পায়ার আউট দিলে তার সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পড়া-- বাবা ক্রিস বিখ্যাত বা কুখ্যাত ছিলেন এসব কারণে। স্টুয়ার্ট ব্রডও সেরকমই। আম্পায়ারের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়েছেন, আবেদনের আগেই উদযাপন করে আলোচনায় এসেছেন বারবার। 

    তিনি উদযাপন করতে ভালবাসেন। ইংল্যান্ডকেও উদযাপনের উপলক্ষ্য এনে দেন। 

    ২০১৩ অ্যাশেজে চেস্টার-লি-স্ট্রিটে ২৯৯ রানের লক্ষ্যে ব্যাটিং করছিল অস্ট্রেলিয়া। সিরিজে ২-০তে এগিয়ে ইংল্যান্ড, তবে ৩ উইকেটে ১৭৩ রানের স্কোর বলছিল, অস্ট্রেলিয়া ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। এলেন ব্রড। ৩ ওভার, ৩ উইকেট। শেষ উইকেট জুটি ম্যাচ ড্রয়ের হুমকি দিচ্ছিল। ব্রড এলেন আরেক স্পেলে, ম্যাচ শেষ। অ্যাশেজ ইংল্যান্ডের। ব্রডের ম্যাচসেরা ফিগার। 

    হয়তো ‘স্টুয়ার্ট ব্রড ইজ এ শিট ব্লোক’ বলার পেছনে অস্ট্রেলিয়ানদের একমাত্র কারণ ওই ট্রেন্টব্রিজের না হাঁটা নয়। স্টিভ ওয়াহ যেমন বলেছিলেন, “আমরা আসলে যেসব ক্রিকেটার অস্ট্রেলিয়ানদের মতো করে খেলে, তাদের পছন্দ করি না। আমার অভিজ্ঞতা বলে, যারা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায়, একগুঁয়ে, যেমন জাভেদ মিঁয়াদাদ, অর্জুনা রানাতুঙ্গা, সৌরভ গাঙ্গুলি, স্টুয়ার্ট ব্রড-- আমরা হয়তো তাদেরকে আমাদের পক্ষে পেলেই খুশি হতাম। এ কারণেই তাদেরকে পছন্দ করি না আমরা।” 
     


    "যারা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায়, একগুঁয়ে, যেমন জাভেদ মিঁয়াদাদ, অর্জুনা রানাতুঙ্গা, সৌরভ গাঙ্গুলি, স্টুয়ার্ট ব্রড-- আমরা হয়তো তাদেরকে আমাদের পক্ষে পেলেই খুশি হতাম। এ কারণেই তাদেরকে পছন্দ করি না আমরা।"


    ক্রিকইনফোর ম্যাগাজিন ক্রিকেট মান্থলিতে ‘হেইট টু লাভ’ সিরিজে ব্রডকে নিয়ে দুটি লেখা আছে। একটা লেখা একজন অস্ট্রেলিয়ানের। আরেকটা এক পাকিস্তানির। 

    আপনি ‘ব্রড’কে ‘হেইট টু লাভ’ কাতারে ফেলবেন কিনা, সেটি আপনার ব্যাপার। 

    বোথামকে নিয়েও দুটি লেখা আছে অমন। তবে বোথামকে উইকেটসংখ্যায় অ্যান্ডারসনের পর ছাড়িয়ে যাবেন ব্রডও, সেটি আদতে খোদ ইংলিশরাই বোধহয় ভাবতে পারেননি। 

    যেদিন ব্রড বোথামকে টপকে গেলেন, কমেন্ট্রিতে নাসের হুসেইন তাকে জিজ্ঞাসা করছিলেন, তাদের খেলার সময় বোথামের সতীর্থ ক্রিসের সঙ্গে ছেলে স্টুয়ার্ট আসতো কিনা, অনুশীলনের সময় কী করত। সেই স্টুয়ার্ট বোথামকে ছাড়িয়ে গেলেন, সেটা ভাবলে তার কী মনে হয়? 

    বোথাম উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আই ফিল ব্লাডি ওল্ড!’ 

    বয়স হয়েছে ব্রডেরও। চৌত্রিশ পার হয়েছেন মাসখানেক আগে। তবে তার এখনও মনে হয়, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তিনি আরও ভাল করছেন। সাউদাম্পটনে প্রথম টেস্টে বাদ পড়ার পর তাই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানাতে দ্বিধা করেননি। পরের টেস্টে ফিরলেন। ব্রড দেখালেন, কেন তার প্রতিক্রিয়া ন্যায্য ছিল। এরপরের টেস্টে তো ইতিহাসই। 

    অবশ্য ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে ব্রড এটাও  ব্যাখ্যা করেছিলেন, কেন তিনি এভাবে ভাবেন। দল থেকে বাদ পড়াটা সহজেই মেনে নেওয়ার অর্থ-- তার ভেতরে সেই ক্ষুধাটা নেই। আর সেটি না থাকা মানে তো খেলার মানেও নেই! দল থেকে বাদ পড়ার পর নিজের ভবিষ্যত নিয়ে জানতে নির্বাচক এড স্মিথকে ফোন করেছিলেন। মাইকেল ভন তার কলামে সমালোচনা করলে তিনি ফোন করেন, কেন বললেন। ব্যাখ্যা শোনার পর অবশ্য শান্ত হন। চলতে থাকে এভাবেই। 

    ক্যারিয়ারজুড়েই লেংথ আর লাইন ব্রডের অস্ত্র। ড্রাইভের ভয়ে ফুললেংথে যেতে চান না, অ্যান্ডারসনের সঙ্গে ব্রডেরও এই ‘বদনাম’ ছিল দীর্ঘদিন। তবে ব্রড তার লেংথটা ঠিকই খুঁজে নেন। ফুললেংথের দিকেই, কিন্তু সেখান থেকে বল তাক করা থাকে অফস্টাম্পের মাথায়। হুট করেই ছোবল মারে সেসব। সঙ্গে থাকে কাটার। ব্রড হুট করেই হাজির হন এমন জাদুকরী স্পেল নিয়ে। যে মন্ত্রে চমকে যায় প্রতিপক্ষ। ম্যালফয় 'পিউর-ব্লাড' হয়েও জাদু পারেন কিনা, সেটা নিয়ে আপনার সংশয় থাকতে পারে। ব্রড যে বোলিংয়ে সেটা পারেন, সে নিয়ে থাকার কথা নয়। 

    লেস্টারশায়ারের হয়ে ২০০৬ টি-টোয়েন্টি ব্লাস্টে ট্রেন্টব্রিজে ব্রড ঝলক দেখিয়েছিলেন ফাইনালস ডে-তে। তার বয়স তখন ২০। সেমিফাইনালে এসেক্স অধিনায়ক রনি ইরানি ব্রডকে তাতিয়ে দিতে চেয়েছিলেন, ‘বাবার মতই গাধা’ বলে (হ্যারি পটারে অবশ্য হ্যারি নিজেই এমন শুনতেন)। ইরানি ৭ বল খেলে আউট হয়েছিলেন শূন্যতে। এর ১৬ দিন পর ইংল্যান্ডের হয়ে অভিষেক হয়েছিল ব্রডের। এর বছরখানেকের মাথায় নিজের প্রথম বৈশ্বিক ট্রফিতে যুবরাজ সিংয়ের কাছে ছয় ছয় খেয়েছিলেন তিনি। ব্রডের সেই চ্যাম্পিয়ন লেস্টারশায়ারের অধিনায়ক, এখনকার স্পোর্টিং মনোবিদ জেরেমি স্নেইপের মতে, ৫০ শতাংশ ক্রিকেটারের ক্যারিয়ার সেখানেই শেষ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ৪৫ শতাংশ ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়। ৫ শতাংশ আরও দৃঢ়ভাবে ফিরে আসে। 

    ব্রড সেই ৫ শতাংশের মধ্যে পড়েন। 

    লেস্টারশায়ার থেকে নটিংহ্যামশায়ার যাওয়ার পর, আন্তর্জাতিক অভিষেকের ১৪ বছর পর, বছর চারেক আগে সীমিত ওভারের ক্যারিয়ারে অদৃশ্য দাঁড়ি পড়ে যাওয়ার পর, সেই ছয় ছয়ের পর সে ফরম্যাটে ইংল্যান্ডকে বিশ্বকাপে নেতৃত্ব দিয়ে বা তার আগে সে ফরম্যাটে বিশ্বকাপ জেতার পর, সাউদাম্পটনে এই কয়েকদিন আগে বাদ পরার পরও ব্রডের ক্ষুধাটা তাই শুধুই বেড়েছে যেন। 

    আগের টেস্টেও অলরাউন্ডার স্টোকস ছাপিয়ে গিয়েছিলেন সবাইকে। পরের টেস্টের সময় যেন মনে হলো, স্টোকস দূরের কথা, ব্রড ছাড়া আর কেউ খেলছেনই না! এমনকি দ্বিতীয় ইনিংসে ৫ উইকেট নেওয়া, দেশের মাটিতে এখন অ্যান্ডারসন-ব্রডের চেয়েও ভাল গড় থাকা ক্রিস ওকসও না। ব্রডকে ঘিরে উপলক্ষ্য, তার অলরাউন্ড পারফরম্যান্স ছিল এমনই। প্যাভিলিয়নে চারদিনের ম্যাচরিপোর্টের থাম্বনেইলেই তাই ব্রডের সরব উপস্থিতি। 


    ৫ শতাংশের মধ্যে পড়ে ৫০০।


    ব্রড উদযাপন করতে ভালবাসেন। ওল্ড ট্রাফোর্ডে প্রথম ইনিংসে রসটন চেজের উইকেটেও করলেন। তবে তিনি যতক্ষণে উদযাপন শেষ করে ফেলেছেন, আম্পায়ার রিচার্ড কেটেলবোরো তখনও এলবিডব্লিউর সিদ্ধান্ত দেননি। ব্রড ছাড়া সবাই ব্যস্ত ছিলেন আবেদনে। অবশ্য এমসিসির নিয়ম বলে, একজন ফিল্ডার একবার আবেদন করলেই চলবে। ব্রড হয়তো সেটিই অনুসরণ করেন।  

    পরের ইনিংসে ক্রেইগ ব্রাথওয়েটের উইকেট পেয়ে অবশ্য হাত তুলে যেন উদযাপন করতে গিয়েও থেমে গেলেন। আবেদন করলেন ঘুরে। মাইকেল গফ আউট দিলেন, ব্রাথওয়েট রিভিউয়ের কথা চিন্তা করলেন না। তার ৩০০তম, ৪০০তম উইকেটের সময় গ্যালারিভর্তি দর্শক ছিল। ৫০০তম উইকেটে কেউ নেই। তবে তার ও অ্যান্ডারসনের ৫০০তম উইকেট একই ব্যাটসম্যান। অ্যান্ডারসনের ‘ছায়াসঙ্গী’ হয়ে থাকা তিনি এখানেও একই সুতোয় গাঁথা অ্যান্ডারসনের সঙ্গেই। সেই মাঠে, যেখানে অ্যান্ডারসনের নামে একটা প্রান্তের নাম। ভাগ্য? হবে হয়তো। 

    তবে ব্রড সেই সৌভাগ্যবানদের একজন, যার পরিবারের কেউ এই ‘বায়ো-সিকিউর’ বলয়ের মাঝেও আছেন তার কীর্তির সাক্ষী হতে। 

    সেদিক তাক করে বলটা দেখালেন ব্রড। ম্যাচ রেফারি, তার বাবা ক্রিস হাত তুললেন হাসিমুখ নিয়ে। আম্পায়ারের সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হওয়া, আউট হয়ে স্টাম্প ভেঙে ফেলা ক্রিস ব্রড এখন ম্যাচ রেফারি। বলা হয়, ‘এককালে যা সংহার করেছেন, কিন্তু এখন সেটির সংস্কার করেছেন’- এমন কিছুর আদর্শ উদাহরণ তিনি। 
     


    বাবা-ছেলে : তখন ও এখন


    অবশ্য ছেলে এখন তার কথা শোনে না। ব্যাটিং নিয়ে কিছু বলতে চান, কিন্তু ‘বোলার’ ব্রড তাকে পাত্তা দেন না। অবশ্য টেস্ট ক্যারিয়ারে বাবার চেয়ে দ্বিগুণ রান আছে ছেলের। তিনি যখন নটিংহ্যামশায়ার থেকে গ্লস্টারশায়ারে খেলতে গেলেন, তার সতীর্থ ছিলেন কোর্টনি ওয়ালশ। বাবার সঙ্গে যেতেন স্টুয়ার্ট ও তার বোন, জেমা। ওয়ালশ ব্রডকে বোলিং করতেন, জেমা থাকতেন ফিল্ডার হিসেবে। দুই ভাই-বোন এখনও ওয়ালশকে আলাদা করে শ্রদ্ধা করেন। সেই ওয়ালশকে ছাড়িয়ে যেতে ব্রডের প্রয়োজন আর ১৯ উইকেট। আপাতত তাই ছেলেকে নিয়ে গর্ব করেন তার বাবা। 

    ক্যারিয়ার-শেষে ব্রড কী করবেন, সেটি নিশ্চিত নয়। তবে অনেকেরই ধারণা, তার যেমন বিশ্লেষণী ক্ষমতা, তাতে ক্রিকেট ছাড়ার পর টেলিভিশনে কাজ করা ব্রডের সময়ের ব্যাপার মাত্র। আপাতত স্টিফেন ফ্রাইয়ের সঙ্গে একটা পডকাস্ট আছে তার। কুকের মতে, ব্রড গলফে ভালই। তবে 'চিপ' করতে পারেন না। সেখানে উন্নতি করতে ফিল মিকেলসনের একটা বই কিনে দিয়েছিলেন, সেটি কতোদূর পড়েছেন তা অবশ্য নিশ্চিত নয়। মার্ক উড বলেন, ব্রড র‍্যাপ করতে ভালবাসেন, তা তার কন্ঠ যেমনই হোক না কেন। নটিংহ্যাম ফরেস্টের পাঁড় ভক্ত, তার সামনে কেউ ‘নটস ফরেস্ট’ বললে খেপে যান তিনি। 

    যুবরাজ সিংয়ের অবসরের পর ইন্সটাগ্রামে পোস্ট করেছিলেন ব্রড, “অবসর উপভোগ করো, কিংবদন্তী”। ব্রডের ক্যারিয়ারশেষেও নিশ্চয়ই অনেকেই বলবেন এমন। তবে আপাতত তিনি উপভোগ করছেন খেলা। 

    “সবার সমর্থনে বিমোহিত। অনেক অনেক ধন্যবাদ। সিরিজ নির্ধারণী টেস্ট ম্যাচে ৫০০তম উইকেট পাওয়াটা বিশেষ একটা অনুভূতি। ক্রিকেটকে ভালবাসি।” ওল্ড ট্রাফোর্ড টেস্টের পর ব্রডের পোস্ট এমন।তিনি জিততে ভালবাসেন। সেটা অ্যান্ডারসনের সঙ্গে ডার্টস হোক, বাবার সঙ্গে গলফ হোক, অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে অ্যাশেজ হোক বা ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে টেস্ট হোক।

    আর উদযাপন করতে ভালবাসেন ব্রড। তবে ব্রডের মতো আগেভাগে সেটি করে না ফেললেও হয়তো এখন তার ক্যারিয়ার, মাইলফলক উদযাপনের সময় বাকি সবার। 

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন