• চ্যাম্পিয়নস লিগ
  • " />

     

    হানসি ফ্লিক : কালো মলাটের নোটবুক এবং দশ মাসে ট্রেবলজয়ের গল্প

    এক বছর আগে মাদ্রিদে ইউর্গেন ক্লপ যখন চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা উঁচিয়ে ধরেছেন তখন মাঠের ফুটবল থেকে অনেক দূরে হানসি ফ্লিক। আসলে ক্যারিয়ারে কখনই শীর্ষ পর্যায়ের কোনো দলের কোচ হওয়া হয়নি তার। বায়োডাটা অবশ্য মন্দ ছিল না। ২০০৬ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত জোয়াকিম লোর জার্মানির সহকারি কোচ ছিলেন ফ্লিক। ২০১৪ বিশ্বকাপ জয়ে অবদান আছে তার। বায়ার্ন মিউনিখ ওই বায়োডাটা দেখেই নিকো কোভাচের সহকারি করে ২০১৯ এর জুলাইয়ে দলে এনেছিল ফ্লিককে।

    কোভাচের মতো ফ্লিকও বায়ার্নের জার্সিতে খেলেছেন। চারবার বুন্দেসলিগাও জিতেছেন। তবে জাতীয় দলে কখনও সুযোগ পাননি। ১৯৮৭ এর ইউরোপিয়ান কাপে পোর্তোর কাছে হারার অভিজ্ঞতাও আছে তার। চোট খেলোয়াড়ি ক্যারিয়ার খাটো করে দিয়েছিল বহু আগেই। ৫৫ বছর বয়সে কোনো দলের হেড কোচ হওয়ার সম্ভাবনা কমই ছিল ফ্লিকের।

    কোভাচ বায়ার্নে খুব একটা ভালো করছিলেন না। বুন্দেসলিগা তো বায়ার্নের ধরা-বাধা শিরোপা। ওতে মন ভরে না বাভারিয়ানদের। প্রথম মৌসুমে দুই শিরোপা জিতলেও খেলোয়াড় থেকে বোর্ড সবার অসন্তোষ ছিল কোভাচের কোচিং স্টাইল নিয়ে। নভেম্বরে আইনট্রাখট ফ্রাঙ্কফুর্টের কাছে ৫-১ গোলে হারের পর কোভাচের বিদায় ছিল অনুমিত। ঝড় সামাল দিতে সেই ফ্লিককে অন্তবর্তীকালীন কোচ করে কোভাচকে বিদায় করে দিয়েছিল বায়ার্ন।


    ফ্লিককে স্থায়ী কোচ করার কোনো পরিকল্পনা বায়ার্নের ছিল না। শুরুটা খুব ভালো না হলেও ডিসেম্বর নাগাদ দল নিয়ে গুছিয়ে উঠছিলেন ফ্লিক। একে একে জানুয়ারি পার করে ফেব্রুয়ারিতেও অপরাজিত বায়ার্ন। কিন্তু ফ্লিককে কোচ হিসেবে চায় না বায়ার্ন। প্রায়ই সময় গুঞ্জন ভাসে। জার্মান সংবাদ মাধ্যম খবরের কাটতি পড়লে অলিভার কানদের কাছে নতুন কোচ সম্পর্কে জানতে চায়। কেউ থমাস তুখলের কথা বলে, কেউ বলে মাউরিসিও পচেত্তিনোদের কথা। খবর ভাসে, খবর ছাপে। ফ্লিক বায়ার্নকে নিয়ে জিততে থাকেন। পয়েন্ট টেবিলের চারে পাওয়া বিধ্বস্ত এক দলকে মৌসুমের মাঝপথে পেয়ে কয়েক মাসেই আবার জায়গামতো বসিয়ে দেন ফ্লিক। শীর্ষস্থানে। বায়ার্নও আর নামে না।

    ****

    চ্যাম্পিয়নস লিগের দ্বিতীয় রাউন্ডে চেলসির সঙ্গে অ্যাওয়েতে প্রথম লেগ জেতার পর কিছুটা ভরসা পান ফ্লিক। একের পর এক জয়, গোলের পসরা- এসব বড় নয়। বায়ার্নের কাছে শিরোপাও বড় নয়। জার্মানির বাকি সব ক্লাবের চেয়ে বাজেটে কয়েকগুণ এগিয়ে থাকে বায়ার্ন। এই দলের জন্য শিরোপা শেষ কথা না। এমন ফুটবল খেলতে হবে যেটা দৃষ্টিনন্দন, চোখ আর মনের জন্য তৃপ্তিদায়ক আর প্রতিপক্ষের জন্য দুঃস্বপ্ন। পেপ গার্দিওলা, কার্লো আনচেলোত্তি, দ্বিতীয় দফায় ইউপ হাইঙ্কেসরা সেটা পেরেছিলেন। গার্দিওলা অবশ্য ইউরোপে পারেননি, আনচেলোত্তিও যা পেরেছিলেন তা স্থায়ী হয়নি। হাইঙ্কেসের কাজ ছিল আনচেলোত্তি যাওয়ার পর দল সামাল দেওয়া, অবসর কাটিয়ে কয়েক মাসে তিনি সেটা পেরেছিলেন, এরপর ফিরে গেছেন আবার। নিকো কোভাচ এসব কিছুই পারেননি।

    বায়ার্নের সঙ্গে খেলোয়াড়ি সম্পর্ক থাকায় ফ্লিকও এসব জানতেন। এসব কোনকিছুই ফ্লিকের পক্ষে ছিল না। আদতে তিনি আনকোরা। পর্দার পেছনের লোক। হেড কোচের অনেক দায়িত্ব থাকে। ফ্লিক মূলত টেকনিক্যাল দিকগুলোর মাস্টার। সহকারি কোচরা কখনও হেড কোচ হয়ে যান, আবার অনেক সহকারি আজীবন সহকারিই থেকে যান। ফ্লিকও পর্দার আড়ালেই থাকতেই চেয়েছিলেন। বায়ার্নের অস্থায়ী কোচ হওয়ার পরও গল্পটা বদলায়নি।

    গল্প বদলেছে এই এপ্রিলে এসে। দুনিয়া যখন লকডাউন তখন বায়ার্ন স্থায়ী কোচ হিসেবে ফ্লিকের সঙ্গে চুক্তি করেছে। ততোদিনে বুন্দেসলিগা শিরোপা দেখছে বায়ার্ন। গোটা দুনিয়া না জানলেও জার্মানরা ততদিনে বুঝে গেছে ফ্লিক কী জাদু যেন করেছেন এই দলের ওপর!

    লকডাউনের পর সবার আগে শুরু হল বুন্দেসলিগা। দুনিয়ার কোথাও ফুটবল না থাকায় সব আকর্ষণ তখন জার্মানিতে। ম্যাচের পর ম্যাচ যায়, বায়ার্ন আর হারে না। ড্র-ও করে না। প্রতিপক্ষের গলা চেপে ধরে তাদের অর্ধে গিয়ে। হাই অকটেন প্রেসিং, ছোট পাস, পেছন থেকে খেলা , বিল্ড আপের মুন্সিয়ানা, কার্যকরী বল পজেশন, আর বিদ্যুৎগতি ট্রানজিশন- ম্যাচ ঘরেই হোক আর বাইরেই হোক, বায়ার্ন মিউনিখ একই তালে খেলে যায়।   

    অথচ গেল মৌসুমের শুরুতে এই দল থেকে আরিয়েন রোবেন আর ফ্রাঙ্ক রিবেরির মতো দুই স্তম্ভ বিদায় নিয়েছেন। দলের ডিফেন্ডারদের অর্ধেক পুরো মৌসুমের জন্য চোটে পড়েছেন। ফিলিপ কৌতিনহো আসায় থমাস মুলার দলেই জায়গা পাচ্ছিলেন না। তার ক্লাব ছাড়ার গুঞ্জন চলছিল তখন। এসব গত নভেম্বর-ডিসেম্বরের ঘটনা। মে গড়াতে গড়াতে সেই দল এমন ব্রান্ডের ফুটবল খেলছে যা আগে কেউ দেখেনি। হাই ডিফেন্সিভ লাইন নিয়ে গত কয়দিনে বহু কথা হয়েছে। এই হাইলাইন খোদ গার্দিওলাও কোনোদিন সাহস করেননি। এই হাইলাইন সম্ভবত ফুটবল ইতিহাসে সবচেয়ে উঁচু হাইলাইন। আপনার ফিফা গেমও আপনাকে এতো প্রেস করার ক্ষমতা দেয় না। জুন আসতে আসতে বায়ার্নের বুন্দেসলিগা আর ডিএফবি পোকাল জেতা হয়ে যায়। বাকি থাকে চ্যাম্পিয়নস লিগ। ফ্লিক তখনও আলো কাড়েননা।

    ফ্লিক আলো কাড়েন চেলসিকে আরেকবার হারিয়ে, লিসবনে বার্সেলোনাকে অপদস্ত করে। এক গোল, দুই গোল, তিন গোল…. সাত গোল, আট গোল- বায়ার্নের একের পর এক গোল দেয়, ফ্লিকের চেহারাও বদলায় না। যা আপনার কাছে নতুন সেটা ফ্লিকের জন্য নতুন নয়। এসব তিনি আগে দেখে এসেছেন। ফ্লিকের চেহারা তাই বদলায় না।

    ****

    ফ্লিকের কোচিং হাতেখড়ি বহু আগে। খেলোয়াড়ি জীবন থেকে। ১৮ বছর বয়সে ফুটবল খেলার পাশাপাশি ব্যাংকের ক্লার্কের চাকরির জন্য এক কোর্স করেছিলেন ফ্লিক। তখন ডাক পেয়েছিলেন স্টুটগার্টে খেলার। কিন্তু ফুটবল আদৌ তার পেটে ভাত জোটাবে কি না তাই নিয়ে সংশয় ছিল ফ্লিকের। তাই স্টুটগার্টে না গিয়ে কোর্স শেষ করেছিলেন। পরে ১৯৮৫-তে বায়ার্নেই যোগ দিলেন। নিয়মিত ছিলেন না তেমন, ভয়ঙ্কর চোট বায়ার্ন ছাড়তে বাধ্য করলো '৯০-এ গিয়ে। কোলোনে গিয়েও থিতু হতে পারেননি। কোচিংয়ে তাই আগেভাগেই মন দিয়েছিলেন ফ্লিক। কোচিংয়ে তার ভবিষ্যত আছে তার প্রমাণ ফ্লিক পেয়েছিলেন ২০০৩ সালে। জার্মান কোচিং লাইসেন্স পরীক্ষায় দ্বিতীয় হয়েছিলেন, লাইসেন্সও জুটেছিল। তখন হফেনহাইমের কোচ ফ্লিক। চার বছর ধরে হফেনহাইমকে দ্বিতীয় স্তরে প্রমোশন পাইয়ে দিতে না পেরে পরে ওই চাকরি চলে গিয়েছিল তার।

    পরের বছর ২০০৬ বিশ্বকাপের পর লো-এর সহকারি হয়ে এলেন ফ্লিক। জার্মানির ইতিহাসে ওই প্রথম হেড কোচ, সহকারি কোচ- দুইজনের কেউই কোনোদিন জার্মানির জার্সি গায়ে দেননি। অভিজ্ঞতার অভাব বড় প্রশ্ন ছিল। ‘অনভিজ্ঞ’ গালটা তখনই শুনেছেন ফ্লিক। ২০০৮ ইউরো, ২০১০ বিশ্বকাপ, ২০১২ ইউরো গেল- জার্মানি তখন ধাপে ধাপে উন্নতি করছে। তবে নিয়ম করে কাছাকাছি গিয়েও শিরোপা হারিয়ে আসে জার্মানি। ২০১৪ বিশ্বকাপ না জিতলে হয়ত লো নিজেও চাকরি হারাতেন। কোচ গেলে সহকারি চলে যাবেন। সে তো একরকম রীতি।

    লো পর্দার সামনের লোক। পেছনের কাজটা সামলেছেন ফ্লিক। ব্রাজিল বিশ্বকাপের বেশ কয়েক মাস আগে একটা কালো ডায়রিতে নোট নেওয়া শুরু ফ্লিকের। দলকে ব্রাজিলের কোথায় রাখতে চান, কেমন অনুশীলন হবে, কী কী দরকার তার জন্য সেসব যত্ন করে হাতে লিখে রাখেন ডায়রির পাতায়। বিশ্বকাপ শুরু হতে হতে এক ডায়রি শেষ। আরেক ডায়রিতে লেখা শুরু করেন ফ্লিক। থমাস মুলাররা অনুশীলনে সেই ডায়রি পড়তে চান। ফ্লিক তাদের দেখাতে নারাজ। মুলাররা হাসি-ঠাট্টা করেন। ফ্লিকও তাতে মজা পান।


    ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বস্তুও ফ্লিকের চোখ এড়ায় না। ফ্লিক সব টুকে রাখেন ডায়রির পাতায়। আর লো সে অনুযায়ী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন। ট্যাকটিকসে ফ্লিকের আস্থা আছে, কিন্তু ফ্লিক বিশ্বাস করেন খেলোয়াড়দের সঙ্গে আত্মার সম্পর্ক তৈরি করা আরও জরুরী। বিশ্বকাপের কোন ম্যাচে কে একাদশে থাকবে আর কে থাকবে না- এসব নিয়েও পার মার্তেসাকারদের সঙ্গে আলোচনা করেন লো আর ফ্লিক। কোচের দর্শন আর খেলোয়াড়ের ইগো যেন কোনোভাবেই মুখোমুখি দাঁড়িয়ে না যায় সেটাই চান তারা। সিনিয়রদের ডেকে নিজেদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত সম্পর্কে মতও জানতে চান ফ্লিক। কে কী বলল, সেসবও আবার মাঝেমধ্যে লিখে রাখেন তিনি।

    ফ্লিক আর লো যা করতে চেয়েছিলেন সেটা পেরেছিলেন বলেই ২০১৪ বিশ্বকাপ জিতেছিল জার্মানি। এরপর দুই ডায়রি সবাইকে দেখিয়েছেন ফ্লিক। ডায়রিগুলো এখন অবশ্য সবাই দেখতে পারে। জার্মানির ফুটবলে জাদুঘরে রাখা আছে এখন সেসব। এই গল্পও পর্দার পেছনের। ফুটবল ইতিহাসের অংশ এসব, জার্মানদের গৌরবের অংশ- কিন্তু ফ্লিক নেপথ্য নায়ক নন।

    ২০১৪ বিশ্বকাপের পর সহকারি কোচের পদ ছাড়েন ফ্লিক। ট্র্যাকসুট ছেড়ে স্যুট পরে হয়ে যান জার্মান ফুটবলের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর। কোভাচের সহকারি হওয়ার পর্যন্ত ওই কাজই করছিলেন তিনি।

    নভেম্বরে ফ্লিক বায়ার্নের অস্থায়ী কোচ হওয়ার পর সবার আগে কথা বলেছিলেন লো। তখনই তিনি ভবিষ্যদ্বাণী দিয়ে রেখেছিলেন। ফ্লিক নাকি বায়ার্নকে ফিরিয়ে আনবেন। তাঁর মতে ফ্লিকই সঠিক লোক এই কাজের জন্য। সাবেক কলিগকে তাঁর চেয়ে ভালো তো আর কেউ চেনে না!

    ****

    ২০১৯ অক্টোবর। হফেনহাইমের সঙ্গে বায়ার্নের ম্যাচ।  হাভি মার্টিনেজ কোভাচের দলে জায়গা হারিয়ে ফেলেছেন। মার্টিনেজ আসলে নিজের সেরা সময় ফেলে এসেছেন। তিনি এখন অনেকটাই ব্রাত্য। শারিরিক সক্ষমতা, মানসিক দৃঢ়তা -- ফুটবলারদের একটা ইমেজ তৈরি করে দিয়েছে সাধারণের কাছে। যে কোনো পরিস্থিতিতে শক্ত থাকতে পারেন তারা! মার্টিনেজ পারলেন না। হফেনহাইমের সঙ্গে ম্যাচেও নিজেকে দলে না দেখে সাইডবেঞ্চে বিষণ্ণতায় কেঁদেই ফেলেছিলেন। বায়ার্ন তখন ম্যাচের আগে ওয়ার্ম আপে ব্যস্ত। মার্টিনেজের কাছে সবার আগে এগিয়ে গিয়েছিলেন ফ্লিক। কাঁধে হাত রেখে, মাথা নিচু করে বিড়বিড় করে মার্টিনেজকে ফ্লিক কী বলেছিলেন তা বোঝার উপায় নেই। কিন্তু ঘটনা তো স্পষ্ট।

    ম্যাচের পর ফ্লিককে যথারীরি ঘিরে ধরেছিলেন সংবাদকর্মীরা। কিন্তু ফ্লিক স্বীকারই করলেন না মার্টিনেজ কাঁদছিলেন। ঠিক কী ঘটেছে সেটাও বললেন না। বললেন “একটা বিশেষ পরিস্থিতি চলছে মার্টিনেজের, ওর জন্য সময়টা কঠিন।“ মার্টিনেজের সঙ্গে কী কথা হয়েছিল সেসব বললে ফ্লিক হয়ত আলো কাড়তে পারতেন। কিন্তু তাতে বন্ধুত্ব নষ্ট হতে পারত মার্টিনেজের সঙ্গে। কখনও কখনও বোধ হয় দিনের আলোর মতো সত্যি কথাগুলোও এড়িয়ে যেতে হয়।


    ফ্লিক দলের দায়িত্ব পাওয়ার পরও মার্টিনেজের ভাগ্য ফেরেনি। এই মৌসুম শেষে তার দল ছাড়াও প্রায় নিশ্চিত। কিন্তু চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপার পাশে মার্টিনেজের ছবিগুলো দেখুন। তার উদযাপন কারও চেয়ে কম না। ফ্লিকের বায়ার্ন মাঠের খেলায় উদাহরণ সৃষ্টি করেছে ঠিকই, কিন্তু তার পেছনের গল্পগুলো সব কম বেশি এমনই। যে মুলার ক্লাব ছাড়বেন বলে গোঁ ধরেছিলেন, তিনি শেষ পর্যন্ত ২১ অ্যাসিস্ট করে মৌসুমে রেকর্ড করেছেন বুন্দেসলিগা। বায়ার্নের চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ে মুলারের অবদান রবার্ট লেভানডফস্কির চেয়ে কম নয়। এই মুলার সেই মুলার। যাকে আপনি চেনেন। যার কারণে আপনি রমডয়টার শব্দের সঙ্গে পরিচিত। জেরোম বোয়াটেং, ম্যানুয়েল নয়্যার, মুলারদের মতো ওল্ড গার্ডরা ফিরে এসেছেন, আলফোন্সো ডেভিসদের মতো তরুণরা যোগ হয়েছেন- এই বায়ার্ন তার পুরোনো চেহারা ফিরে পেয়েছে।

    “মিয়া সান মিয়া”- ফিরে এসেছে বায়ার্নে। তাও মাত্র দশ মাসের মাথায়। ফ্লিক প্রাক মৌসুম পাননি, দল নিয়ে আলাদা কোনো অনুশীলনও করতে পারেননি। দলবদলেও আহামরি কাউকে জোটাতে পারেননি। পারবেন কী করে, অস্থায়ী খোলস ছাড়াতেই তো ৫ মাস সময় লেগেছে তার। পেপ গার্দিওলা, লুইস এনরিকেরা প্রথম মৌসুমে ট্রেবল জিতেছিলেন ঠিক। কিন্তু তাদের সঙ্গে এই ফ্লিকের তাই বিস্তর ফারাক আছে। এটাও ঠিক বায়ার্ন দল হিসেবেও শক্তিশালী ছিল। কিন্তু কাগজে-কলমের শক্তিশালী দলটাই কোন জাতের ফুটবল খেলেছে সেটা দেখতে পারেন মৌসুম শুরুর দিকে বায়ার্নের খেলা দেখলে। একটা সাদাকালো ছবি, আরেকটা রঙিন- অথচ দুই ছবির সময়ের ব্যবধান মাত্র কয়েক মাসের। বায়ার্নের এখনকার সাফল্যের কথা ভাবলে ওই সময়টা এখন মনে হয় দূর অতীত। পথ হারানো দলের দায়িত্ব মৌসুমের মাঝপথে নিয়ে ট্রেবল জেতেনি কেউ।

    বায়ার্ন আগেও ট্রেবল জিতেছে। কিন্তু ফ্লিক যা অর্জন করেছেন তা আগে দেখেনি বায়ার্ন। এমন ভয়ঙ্কর সুন্দর ফুটবল খুব কম দলই খেলেছে। রেকর্ড পায়ে লুটিয়েছে একের পর এক। চ্যাম্পিয়নস লিগে কোনো ম্যাচ না হেরে শিরোপা জেতা, ১১ ম্যাচের হিসেবে সবচেয়ে বেশি গোল, ২০২০ সালে কোনো ম্যাচ না হারা, সবশেষ ২০ ম্যাচে একটানা জয়, ৩০ ম্যাচে ২৯ জয়...ফ্লিকের বায়ার্নের রেকর্ড দিয়েই শুধু আরেকটি হাজার দেড়েক শব্দের আর্টিকেল লিখে ফেলা যায়। এসব অর্জন আবার নিজের ওই ফুটবলের দর্শনে ভিত্তি করে। এমন নয় প্রতিপক্ষে দেখে ঘাবড়ে গিয়ে খোলসে ম্যাচ খেলেছে বায়ার্ন। রক্ষণাত্মক ফুটবল মন্দ কিছু - এমন হাস্যকর দাবি করা বোকামি, তবে ফুটবল পূজারীরা সাহসীদেরকেই মনে রাখে আলাদা করে।

    তুখলের পিএসজির বিপক্ষে ফাইনালের আগে সংবাদ সম্মেলনে ফ্লিককে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল তার হাইলাইন নিয়ে। ফ্লিক তখন জবাব দিয়েছিলেন, "আমরা নিজেদের স্টাইল অন্যের ওপর চাপিয়ে দিয়ে খেলা নিয়ন্ত্রণ করি। এই হাইলাইনই আমাদের সাফল্য দিয়েছে। ফাইনালে এটা নিয়ে কাটাছেঁড়া করা হবে না।"

    বার্সেলোনার সঙ্গে ম্যাচের আগে লিওনেল মেসিকে নিয়ে অবধারিত প্রশ্ন ফ্লিকের কাছে। প্রথম প্রশ্ন ছিল কে সেরা। ফ্লিকের জবাব তার মতে মেসি বাকিদের চেয়ে কয়েক ধাপ এগিয়ে আছেন। পরের প্রশ্ন, মেসিকে কীভাবে আটকাবে তার দল। ফ্লিকের জবাব, "মেসিকে আটাকানোর একটা উপায় আমার জানা আছে। উপায়টা বলেই দেই, মেসিকে আটকাতে হবে সবাই মিলে।" ফ্লিকের গোপন রহস্যই হলো তার কোনো রহস্য নেই।

    ফ্লিক দেখিয়েছেন অভিজ্ঞতা সবসময় জরুরী কিছু নয়। বরং পর্দার আড়ালে থাকার সময়টাতে যে যাত্রা আপনার সঙ্গী হয় তা থেকে সঞ্চয় করা যায় অভিজ্ঞতা। সেগুলো পরে সঞ্চার করতে পারলে হয়ত সব পরিস্থিতিই ফ্লিক করে সামাল দেওয়া যায়।  

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন