• অ্যাশেজ
  • " />

     

    স্বর্ণ-কেশের স্বপ্নসারথী

    ঘরে তিনটা পোস্টার ছিল মোট। একপাশে মাইকেল স্ল্যাটার, অন্যপাশে ব্রায়ান লারা। আর মাঝে একটা কালো রঙের ফেরারি।

     

    গ্রীষ্মে ক্রিকেট, শীতে রাগবী। বাড়ির পেছনের দিকে সুইমিং পুল, সামনে ক্রিকেট খেলার পরিসর। খেলাধুলা আর পরিবার। ছেলেটার জগৎজুড়ে ছিল। খুব ছোট তখন। সাত কি আট বছর বয়স। বাবা একটা ব্যাট বানিয়ে দিয়েছিলেন, ‘ফ্লবোর্ড’ দিয়ে। গোলাপী রঙ করে বলেছিলেন, একদিন তাঁর ছেলে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে খেলবে। ব্যাগি গ্রিন মাথায় চড়াবে। স্বপ্ন দেখতো ছেলেটাও। তাতেও বোধহয় মিশে ছিল অনেক অনেক রঙ। লিভারপুলের রাস্তায়, ইনডোরে, মাঠে।

     

    স্বপ্নটা পূরণ হয়েছিল।


    মাইকেল ক্লার্কের শুরুটাও হয়েছিল স্বপ্নের মতোই। টেস্ট অভিষেকেই সেঞ্চুরি, ওই সিরিজেই এক ইনিংসে ৯ রানে ৬ উইকেট। 

     


     

    সেই স্বপ্নের পরিধিটা বিস্তৃত হয়েছে। সেই স্বর্ণ-কেশী, ট্যাটু আঁকা ‘স্টাইলিশ’ ক্রিকেটারটাই একসময় অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক হয়েছেন। তবে ঠিক ‘টিপিক্যাল’ নয়।

     

    ক্লার্কের দলটা ‘ইনভিন্সিবল’ ছিল না। বোর্ডারের মতো বিশ্বজয়ী ছিল না। ওয়াহ বা পন্টিংয়ের মতো টানা জয়ে অপরাজেয় ছিল না। তিনি অধিনায়কত্ব পেয়েছিলেন পন্টিংয়ের ফর্মহীনতায়। অধিনায়ক হিসবে ব্যর্থতায়। টানা দ্বিতীয় অ্যাশেজ, বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল হেরে অধিনায়ক পন্টিংয়ের বিদায় হয়েছিল। সহকারি অধিনায়ক ছিলেন ক্লার্ক, তাঁকেই করা হয়েছিল অধিনায়ক। অধিনায়ক হয়েও তিনি দুয়ো শুনেছিলেন। নিজ দেশের দর্শকদেরই কাছে! তিনি যে গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি করতে সিরিজের মাঝপথেই ফিরে এসেছিলেন নিউজিল্যান্ড থেকে। দামী গাড়িতে চড়তেন যে তিনি। এটা-ওটা-সেটা যে ঠিক পছন্দ হতো না অস্ট্রেলিয়ানদের!

     

    ‘স্টাইলিশ’ ক্লার্ককে তাই সবসময় ‘অধিনায়ক’ হিসেবে গ্রহণ করেনি অস্ট্রেলিয়া। তবে এক বছরে যখন ১৫৯৫ রান করলেন (২০১২), প্রশংসা ঝড়লো চারপাশে।

     

    যে ভারতকে গুঁড়িয়ে দিয়ে মহাকাব্যিক ৩২৯ করেছিলেন, তাদের কাছেই আবার হেরে এলেন ৪-০তে। যদিও চোটের কারণে শেষ টেস্টটা খেলেননি। ‘হোমওয়ার্কগেট’ ‘কেলেঙ্কারি’ নিয়ে তখন সরব সবাই! কোচ মিকি আর্থার বরখাস্ত হলেন। এলেন ড্যারেন লেম্যান। তবে ইংল্যান্ডে অ্যাশেজ জেতা হলো না ক্লার্কের। হেরে এলেন ৩-০তে।

     

    তারপর ইংল্যান্ড অস্ট্রেলিয়ায় এলো। মিচেল জনসন ফিরে এলেন। স্বপ্নের মতো করে।

     

    মাইকেল ক্লার্কের অস্ট্রেলিয়া ইংল্যান্ডকে গুঁড়িয়ে দিল। জনসন-হ্যাডিন-হ্যারিসদের ওপর ভর করে।

     

    তবে ক্লার্ক ‘অধিনায়ক’ হয়ে উঠলেন, নিজেকে অনন্য এক উচ্চতায় নিয়ে গেলেন আসলে মাঠের বাইরের এক ঘটনায়। একটা মৃত্যু বদলে দিল অনেক কিছু।

     

    ফিলিপ হিউজ চলে গেলেন। বোর্ডার গাভাস্কার ট্রফির প্রথম টেস্ট পিছিয়ে গেল। অ্যাডিলেডে প্রথম টেস্টে অধিনায়ক ক্লার্কই নামলেন, তবে তার আগের কয়েকদিনও মাঠের বাইরে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি! সংবাদ সম্মেলনে হিউজের মৃত্যু-সংবাদ দেওয়ার সময় তাঁর কান্নার দৃশ্য সহজেই ভুলবেন না অনেকেই। তখন ভেংগে পড়লেও তিনি শক্ত ছিলেন। হিউজের জন্য, ছোটভাইতুল্য সতীর্থের জন্য কিছু একটা করার  তাড়না তাঁকে চোট ভুলিয়ে মাঠে এনেছিল। রিটায়ার্ড হার্ট হয়েও তাই ফিরে এসেছিলেন। করেছিলেন সেঞ্চুরি। শারীরিক ‘দুর্বলতা’ সেদিন হার মেনেছিল, ‘মানসিক’ শক্তি আর আবেগের কাছে! তবে সেই টেস্ট থেকেই মাঠের বাইরে চলে গেলেন।

     

     

    বিশ্বকাপে ফেরা নিয়েও চললো অনেক জল্পনা কল্পনা। ফিরলেন। ঘরের মাটির ফাইনালে ‘আগ্রাসী’ নিউজিল্যান্ডকে প্রায় উড়িয়ে দিল অস্ট্রেলিয়া। ওয়ানডের সর্বোচ্চ সম্মানের ট্রফিটা অধিনায়ক হিসেবে জিতলেন তিনি। ফাইনালের আগেই ঘোষনা দিয়েছিলেন, এমসিজিতেই শেষ। ট্রফি উঁচিয়েই সীমিত ওভার থেকে বিদায় নিলেন, স্বপ্নের মতো করেই।

     

    আবার এল অ্যাশেজ। স্টিভেন স্মিথ দুর্দান্ত ফর্মে। আগের অ্যাশেজেই আগুন ঝড়িয়েছেন মিচেল জনসন। আছেন ওয়ার্নার, ওয়াটসন, হ্যাডিন। আর ক্লার্ক নিজে। ইংল্যান্ড হোয়াইটওয়াশ হতে চলেছে আবার, অনেকে তো এমনও বললেন!

     

    তবে যা হলো বা হচ্ছে, ক্লার্ক কি তা ভেবেছিলেন!

     

    সিরিজ শুরুর আগেই অবসর নিলেন হ্যারিস, প্রথম টেস্টের পরই বাদ দিতে হলো ওয়াটসন-হ্যাডিনকে! লর্ডসের দাপুটে জয়ও বিস্মৃত হয়ে গেল এজবাস্টন-ট্রেন্টব্রিজে! ৬০ রানেই অল-আউট হতে হলো, পরপর দুই টেস্টে দুইদিনেই হার চোখ রাঙ্গালো! আর ক্লার্ক যেন ভুলতে বসলেন ব্যাটিং! ইংল্যান্ডের মাটিতে অ্যাশেজ জেতা হলো না তাঁর!

     

    মাইকেল জন ক্লার্ক তাই বিদায় বলে দিলেন। ওভালই শেষ। অধিনায়ক ক্লার্কের অধ্যায় শেষ। ব্যাগি গ্রিন নম্বর ৩৮৯ এর  অধ্যায় শেষ। ওভালে কোনো সেঞ্চুরি না পেলে তাই বাঁহাত ছুঁড়ে সেঞ্চুরি উদযাপনও শেষ!

     

    ঠিক যেভাবে বিদায়ের স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেভাবে হলো না।

     

    ট্রেন্টব্রিজে মাইক আথারটনকে অবসরের কথা বলতে গিয়ে ভেঙ্গে পড়েছিলেন। সামলে নিলেন। হয়তো রাতে মোবাইল ফোনের ওয়ালপেপারের দিকে তাকিয়ে একটু আক্ষেপ ঝড়বে। হয়তো হিউজিকে কথা দিয়েছিলেন, অ্যাশেজটাও জিতবেন! আর তখনোই তাঁর কাঁধে কোনো এক অদৃশ্য হাত রেখে কেউ ফিসফিস করে বলবেন, ‘ইউ হ্যাভ ট্রাইড, মেট। দ্যাট উইল ডু’!

     

    ক্লার্ক চেষ্টা করেছেন। স্বপ্নকে সত্যি করতে। করেছেন অনেক। আবার করতে পারেননি।

     

    তবে ক্লার্কও হয়তো ভবিষ্যত কোনো ব্যাগি গ্রিনের গর্বিত অধিকারির ঘরে পোস্টার হয়ে ঝুলছেন। স্বপ্নের মতো করে বিদায় না হলেও, আজীবন স্বপ্নের পেছনে ছোটা ‘পাপ’কে সহজেই ভোলা যাবে না।

     

    সময়ের অন্যতম ‘স্টাইলিশ’ ব্যাটসম্যানকে ভুলতে চানই বা কজন!

     

     

     

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন