• ক্রিকেট

কুড়ি-কুড়ির কুঁড়ি হয়ে ওঠার ওই ম্যাচ!

পোস্টটি ৩৪৫৩ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

একটা ফিকশন নির্ভর নন-ফিকশন শোনাই।

জোহানেসবার্গের নিউ ওয়ান্ডারার্স। ২৪ সেপ্টেম্বর,  ২০০৭, প্রথম ওয়ার্ল্ড টি-টোয়েন্টির ফাইনাল। শেষ ৪ বলে পাকিস্তানের দরকার ৬ রান। মিসবাহ্‌-উল-হক জোগিন্দর শর্মার বলকে স্কুপ করতে গিয়ে শ্রীশান্তের হাতে ক্যাচ দিলেন শর্ট ফাইন লেগে।

আরেকটু পিছনে ফিরে যান, ২০০৩ সালের ১৩ জুনে, যখন প্রথম স্বীকৃত টি-টোয়েন্টি ম্যাচটা খেলেছিল ইংলিশ কাউন্টি দল হ্যাম্পশায়ার হকস এবং সাসেক্স শার্কস। তখনো কি ইংল্যান্ড জানত, তাদের সেই সোনার ডিম পাড়া হাঁস তাদের থাকবে না, উড়াল দেবে অন্য গৃহস্থের ঘরে! 

আন্তর্জাতিক প্রথম টি-টোয়েন্টি ম্যাচটা হয়েছিল এরও দু’বছর পর, ২০০৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারী। সেদিন অস্ট্রেলীয় আর কিউইরা নেমেছিলেন ‘ওল্ড-ফ্যাশন' নিয়ে, পরচুলা, নকল গোঁফ পড়ে। আন্তর্জাতিক, পেশাদার ম্যাচ, কিন্তু সবকিছুর পরও তো সেটা ছিল নিতান্তই 'ফানি গেম', কিংবা অর্জুনা রানাতুঙ্গার ভাষায়, '৫ মিনিটের ম্যাগি নুডলস’!

ম্যাগি নুডলস ততক্ষণে হটকেকে পরিণত হয়েছে। ২০০৭ সালে আইসিসি প্রথম ওয়ার্ল্ড টি-টোয়েন্টি আয়োজনও করে ফেলে। অথচ শুরুতে ভারতের খুব একটা আগ্রহ ছিল না তাতে! দলের মোটামুটি সিনিয়র ক্রিকেটাররা প্রত্যাহার করে নিলেন নিজেদের, বিসিসিআই যেন পাঠাতে হয় বলেই একটা দল পাঠালো এমএস ধোনিকে অধিনায়ক করে। তারপর গিয়ে ঠেকলো সেই ২৪ সেপ্টেম্বরে, মিসবাহ্‌র সেই শটে! সেই 'বাপ-দাদার' আমলে ১৯৮৩-তে ভারত ‘বিশ্বকাপ’ জিতছিল, তারপর আবার ২০০৭-এ, হোক না টি-টোয়েন্টি, বিশ্বকাপ তো! তাদের আর পায় কে?

এরপর সেই টি-টোয়েন্টিই হয়ে গেল ভারতের পাখির চোখ! বিসিসিআই এর ব্রডকাস্টিং স্বত্ব না পেয়ে জি নেটওয়ার্কের মালিক ক্যারি প্যাকার হতে চাইলেন, চালু করলেন আইসিএল। ভারত শুরু করে দিলো বিশ্ব-ক্রিকেটে আধিপত্য বিস্তার। 'আইসিএলে খেললে নিষিদ্ধ করতে হবে', সব বোর্ডের কাছে অলিখিত নির্দেশনাও চলে গেল। আইসিসিও যথারীতি বিরত থাকল একে স্বীকৃতি দিতে! আমরা হারালাম আমাদের আফতাবকে! আর বিসিসিআই পেয়ে গেল সেই সোনার ডিম পাড়া হাঁসের সন্ধান। আইপিএল, টি-টোয়েন্টি!

ক্রিকেটের মাঠে নেমে এল বলিউড, এক দেশের ঘরোয়া ক্রিকেট চলল আরেক দেশে, আইসিসি আলাদা একটা ‘উইন্ডো’ দিল ক্যালেন্ডারে! পাল্লা দিয়ে ‘জুয়ো’টাও যে কম চলেনি তা তো এখন ‘খুল্লামখুল্লা’ হয়েই গেছে প্রায়। আইসিসিতে ভারতের প্রভাব খুব কম দিনের নয়, ক্রিকেট নামক পণ্যের বিশাল বাজারটাই যে তাদের দখলে। সাথে আমরা অভাগারা, ভুলে যাবেন না, 'ভারতীয়' ক্রিকেটের একটা বড় বাজার আছে এখানেও! যখন আমাদের একটা খেলার চ্যানেল নেই, তখন সকাল বিকাল খেলা দেখতে বসলে, 'জিন্দা হ্যায় ইয়াকিন’, 'এ কাপ হাম্রে হঙ্গা', শুনতে হতো কিংবা হয় এখনও!

তবে কাপ ভারত যে হারেই জিতুক, 'আধিপত্য-বিস্তার' চলছেই। ২০০৭ এর পর ওয়ার্ল্ড টি-টোয়েন্টি এর সেমিফাইনালেই খেলেছে দুইবার ! অথচ আইপিএল এখন কত খেলোয়াড়দের স্বপ্ন, বিসিসিআই কর্মকর্তার চোখে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ একসময় ছিল আইপিএলেরর আগে ভাল একটা প্রস্তুতি! আর ক্রিকেট রাজত্বে একচ্ছত্র অধিপতি বনে যাওয়া ভারতের অনেক 'ধরা জ্ঞান সরা করা' শক্তির মধ্যে আইপিএলও তো এক 'অনন্য' নাম! টুর্নামেন্ট প্রধান পরিবর্তন হন দুর্নীতির ‘দায়ে’, বোর্ড সভাপতি ‘রিহ্যাব’ এ যান নিজ দলের কেলেঙ্কারী নিয়ে, কোনো কোনো দলের ফ্র্যাঞ্চাইজি বাতিল হয়ে যায়, কিন্তু আইপিএল নামক ‘সোনার হাঁসটা’ থেকে যায়। তা ঘরের মাটিতে হোক, আর পরের মাটিতে!

আর সেইরকমই এক হাঁসের স্বপ্নে বিভোর এদেশীয় কর্তারা আমদানী করেন বিপিএল। টাকা ওড়ে, কিন্তু আমরা ঘরোয়া ক্রিকেটে তার খরচ দেখি না, টাকা খরচ হবে বলে রিভিউ সিস্টেম আনতে পারি না! কিন্তু ফিক্সিং বিষ-বাষ্পে আমরা ঠিকই হারাই আমাদের ‘আশরাফুল’কে!

কেরি প্যাকার এর ওয়ার্ল্ড সিরিজ ক্রিকেটকে প্রথম অনেক টাকা দেখিয়েছিল, সাথে সাথে ফ্লাড লাইট দিয়েছিল, ড্রপ-ইন-পিচ দিয়েছিল, রঙ্গীন পোশাক দিয়েছিল, আইসিসিকে বাধ্য করেছিল সীমিত ওভারের বিশ্ব আয়োজনকে নতুন করে সাজাতে! টি-টোয়েন্টিও দিয়েছে- 'প্লেয়ার নিলাম', এলইডি নির্ভর স্ট্যাম্প, মাঠের ভিতর থেকে শেন ওয়ার্নের কমেন্ট্রি, আর দিয়েছে ‘ফ্রি-ল্যান্সিং’ ক্রিকেটার!

টি-টোয়েন্টির সবই বোধহয় ‘বেশ তো,ভাল তো’ টাইপের,  শুধু খারাপের মধ্যে খারাপ ‘আশরাফুল, আফতাব’দেরকে হারানো!

অথচ সেইদিন মিসবাহর সেই ক্যাচটা যদি শ্রীশান্ত ড্রপ করতেন, কিংবা মিসবাহর শটটা তাকে ফাঁকি দিয়ে ফাইন লেগ দিয়ে বাউন্ডারী হত!

গল্পটা কিন্তু ভিন্ন হতে পারত!*

*পূর্বের লেখা। তখনকার প্রেক্ষাপটের সাপেক্ষে কিঞ্চিৎ পরিমার্জিত।