• ফুটবল

পর্দার আড়ালে থাকা নায়ক

পোস্টটি ৭১০৫ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

নব্বই দশকের কথা। প্রিমিয়ার লিগে তখন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সাম্রাজ্য চলছে। নতুন নামে প্রিমিয়ার লিগ শুরুর প্রথম দুই মৌসুমেই শিরোপা উঠেছিল ওল্ড ট্র্যাফোর্ডের শোকেসে। সেসময় জনপ্রিয় ফুটবল ম্যাগাজিন ‘ফোর-ফোর-টু’ তে আর্টিকেল ছাপানো হলো, ‘কীভাবে অ্যালেক্স ফার্গুসনের দলকে থামানো যায়?’ অসংখ্য পাঠকের মধ্যে একজন পরামর্শ দিয়েছিলেন রেড ডেভিলদের প্রতিপক্ষ দলকে, ‘কেবল এরিক ক্যান্টোনাকে দলে ভেড়ালেই শিরোপা জেতা সম্ভব’! সেই পাঠকের অমন পরামর্শের কারণটাও ছিল যুক্তিযুক্ত; ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের আগে সর্বশেষ ইংলিশ লিগের শিরোপাজয়ী দলটিও ছিল কিং এরিকের লিডস ইউনাইটেড (১৯৯২)!

 

ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসে এরিক ক্যান্টোনাই ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি ভিন্ন দু’টো ক্লাবের হয়ে টানা দুই মৌসুমে শিরোপা হাতে নিয়েছিলেন। তবে ২০১৫/১৬ মৌসুমেই সেই রেকর্ডে ভাগ বসিয়েছেন লেস্টার গোলরক্ষক মার্ক শোয়ার্জার। সর্বশেষ দুই মৌসুমে চ্যাম্পিয়ন চেলসি ও লেস্টারের দলে থাকলেও প্রিমিয়ার লিগের কোনো ম্যাচই খেলা হয়নি এই অজি ফুটবলারের। আর তাই কিং এরিকের রেকর্ডের পাশে শোয়ার্জারের নাম নিয়ে একটা বিতর্ক থেকেই যায়। কিন্তু, তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে এই রেকর্ডে যিনি নাম লিখিয়েছেন, তাকে নিয়ে কোনো বিতর্কের সুযোগ নেই। ২০১৫/১৬ মৌসুমে লেস্টারের ‘সিন্ডারেলা স্টোরি’ শেষ করে পরের মৌসুমেই চেলসির প্রত্যাবর্তনে এন’গলো কান্তের অবদানটা ক্যান্টোনার চেয়ে কোনো অংশেই যে কম নয়!

 

ফুটবল মাঠে কান্তের পজিশন ডিফেন্সিভ মিড। প্রতিপক্ষের কাছ থেকে বল কেড়ে নিয়ে সেটা ফরোয়ার্ডদের কাছে পৌছে দেয়াই তাঁর কাজ। নামের পাশে তাই খুব বেশি গোল বা অ্যাসিস্ট নেই। তবে পর্দার আড়াল থেকে তিনি ঠিকই দলকে এনে দিচ্ছেন একের পর এক উৎসবের মুহুর্ত। লেস্টার সিটি কিংবা চেলসির সাফল্যগাঁথা বইটার ‘মলাট’ যেন বাঁধাই করেছেন এন’গলো কান্তেই। চেলসির ডিফেন্সের সামনে ‘হেমডাল’ এর মত দ্বার রক্ষার কাজটা দক্ষ হাতেই করছেন তিনি। তাই তো ইতিমধ্যেই অসংখ্য চেলসি ভক্তদের মাঝে উঠেছেন নতুন ‘ম্যাকেলেলে’!

 

কয়েক বছর আগেও কান্তে ফুটবল খেলতেন ফ্রান্সের দ্বিতীয় বিভাগে । বিখ্যাত স্কাউট স্টিভ ওয়ালশের হাত ধরেই মাত্র আট মিলিয়ন ইউরোর চুক্তিতে এসেছিলেন লেস্টার সিটিতে। প্রিমিয়ার লিগে এসে প্রথম মৌসুমেই ভার্ডি-মাহারেজদের সাথে বুনেছেন রূপকথার এক অনন্য গল্প। লেস্টার সাফল্যের আড়ালে থাকা এন’গলো কান্তে ঠিকই চোখে পড়েছেন চেলসির নতুন কোচের। এই ফরাসি মিডফিল্ডারকে স্ট্যামফোর্ড ব্রিজে আনতে খরচ হয়েছে ৩২ মিলিয়ন ইউরো। বলা চলে, ২০১৬/১৭ মৌসুমের প্রিমিয়ার লিগের শিরোপার ‘সওদা’ অনেকটা ঐ ৩২ মিলিয়নেই সেরে নিয়েছিল দ্য ব্লুজরা।

 

ইতিমধ্যেই কোচ এন্তনিও কন্তের ডিফেন্সিভ ট্যাকটিকসের মধ্যমণি হয়ে উঠেছেন কান্তে। ২০১৫/১৬ মৌসুমে ভেঙেপড়া ডিফেন্সের সামনে এন’গলো কান্তে দাঁড়ানোর পর গত মৌসুমে সেই ডিফেন্সই ধরে রেখেছিল একের পর এক ক্লিনশিট। দ্য ব্লুজদের টানা ১৩ ম্যাচের জয়রথে তাঁর অবদানটা ছিল অসামান্য। ২০১৫ সালের ১৮ ডিসেম্বরে পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে ছিল লেস্টার সিটি আর চেলসির পজিশন তখন ১৪। ঠিক এক বছর পর ঘটলো তার উল্টো; শীর্ষে থাকা চেলসি যখন শিরোপা জয়ের ছক আঁকছিল, তখন ১৪ নম্বরে থাকা ‘ফক্স’রা লড়েছে রেলিগেশন এড়ানোর জন্য। দু’দলের এমন পারফর্মেন্সের মধ্যে পার্থক্য শুধু এন’গলো কান্তে-ই !

 

https://twitter.com/Sporf/status/810406989880823808/photo/1?ref_src=twsrc%5Etfw

 

২০১৫/১৬ মৌসুমে লেস্টার রূপকথার অন্যতম দুই নায়ক বলা হয় জেমি ভার্ডি ও রিয়াদ মাহারেজকে। তবে আগেরবারের মত পরের মৌসুমে পায়ের ভেলকি দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন দু’জনই। ইতিমধ্যেই মুদ্রার ওপিঠটাও দেখা হয়ে গেছে এই ‘ফক্স’ জুটির। কান্তে দলের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন, এই মৌসুমের হতশ্রী লেস্টারকে দেখেই সেটার কিছুটা প্রমাণ মিলছে। কান্তেবিহীন চেলসি ও লেস্টার সিটি মোট ৫৬ ম্যাচে পয়েন্ট পেয়েছে কেবল ৬৭, অন্যদিকে কান্তেকে নিয়ে সমান সংখ্যক ম্যাচে দ্য ফক্স ও ব্লুজদের পয়েন্ট সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি !

 

তাছাড়া প্রিমিয়ার লিগে দুই মৌসুমে পঞ্চাশোর্ধ ম্যাচ খেলেছেন কান্তে। প্রায় সবগুলো ম্যাচেই পুরো নব্বই মিনিট খেলতে হয়েছে এই ফরাসি মিডফিল্ডারকে। এন্তোনিও কন্তে, কিংবা ক্লডিও রানিয়েরি; বিখ্যাত এই কোচেরাও ম্যাচের মাঝে নিতান্তই বাধ্য না হয়ে তাঁকে উঠিয়ে নেয়ার সাহস দেখান নি। ম্যাচের পুরোটা সময়ই এই ফরাসি ফুটবলার বিরামহীন ছুটে বেড়াতে থাকেন সারা মাঠে। সাবেক কোচ রানিয়েরি ঠাট্টা করেই বলেছিলেন, “হয়ত তাঁর দু’পায়ে কোনো ব্যাটারী লুকানো আছে।” ক্ষিপ্র গতি, বুদ্ধি আর পরিশ্রম দিয়ে ইতিমধ্যেই প্রিমিয়ার লিগের স্ট্রাইকারদের জন্য আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছেন কান্তে। তা তিনি হবেনই বা না কেনো, গত মৌসুমের সর্বোচ্চ ট্যাকেল (১৭৫) ও ইন্টারসেপশন (১৫৬) ছিল তাঁর দখলেই। গত মৌসুমে সর্বমোট ১৪৪৯টি পাস পূর্ণ করেছেন কান্তে; অ্যাসিস্টের সংখ্যা ৪টি। তাছাড়া ট্যাকেলে তাঁর সাফল্যের হার ৭১% !

 

প্রতিপক্ষের কাছ থেকে বল দখলে নেয়াটা যেন কান্তের শখই বটে। জেমি ভার্ডি তাঁর আত্মজীবনীতে এই সম্পর্কে লিখেন, “ট্রেনিংয়ের সময় আমরা এগারজন গোলাকার হয়ে বল দখলে রাখার অনুশীলন করতাম। দুইজন মাঝখানে বল ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করতো। কেন যেন মনে হত, কান্তে ইচ্ছে করেই বল ছেড়ে দিতো। কারণ, বল ছিনিয়ে আনতেই তার বেশি ভালো লাগত।” এন’গলো কান্তের এভাবে বলের পিছনে অনবরত ছুটে যাওয়ার নেশা দেখে ইতিমধ্যে তাঁর ভক্ত হয়ে গেছেন স্বয়ং চেলসি কোচ এন্তোনিও কন্তেও।

 

দুই বছর আগেও কান্তের নাম জানতেন না তাঁর কোচ এন্তোনিও কন্তে। এই মৌসুমের শুরুতেই চেলসিতে যোগ দেয়া কান্তে নতুন মাত্রাই যোগ করেছেন কোচ কন্তের ৩-৪-৩ ফরমেশনে। তাছাড়া দ্য ব্লুজদের কাউন্টার অ্যাটাকেও তিনি যোগ করেছেন  গতি। আর তাই তো পিরলো কিংবা পগবার মত বিচিত্রধর্মী মিডফিল্ডারদের কোচিং করানো এই ইতালিয়ান মজেছেন কান্তের প্রশংসায়, “কান্তে কেবল ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার নয়, সে পুরোদস্তুর একজন মিডফিল্ডার।”

কান্তের গল্পটা যদি এক বাক্যে সারাংশ করতে হতো, তবে স্টিভ ওয়ালশের কথাটাই যথেষ্ট,

 

“একজন ফুটবলার বল পায়ে কি করতে পারে সেটার চেয়ে তাঁর কাছে বল না থাকা অবস্থায় সে কি করে সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ!”