• ফুটবল

আনিসুর রহমান: 'দ্য ওয়াল'

পোস্টটি ২৩৯১ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

স্বাধীনতা কাপ, ২০১৮। সেমিফাইনাল ম্যাচ। ঢাকা আবাহনী লিমিটেডের মুখোমুখি প্রথমবারের মত এই টুর্নামেন্টে খেলা বসুন্ধরা কিংস। ম্যাচের নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ের খেলা শেষ হয় ১-১ গোলের অমীমাংসিত ফলাফলে। ফলে খেলা গড়ায় ট্রাইব্রেকারে। সেখানেও প্রথম পাঁচ শটের ফলাফল থামে ৪-৪ সমতায়। আর তাই শেষমেশ খেলার রেজাল্ট পেতেও শুরু হয় সাডেন ডেথ শ্যুটআউটের। এবার দুই দলের কেউ ভুল করলেই সব শেষ।

 

আবাহনীর পক্ষে ট্রাইব্রেকারের অষ্টম শট নিতে আসেন ইমতিয়াজ সুলতান জিতু। আর বসুন্ধরা কিংসের হয়ে গোলপোস্টের নিচে গ্লাভস হাতে দাঁড়িয়ে আনিসুর রহমান জিকো। কোয়ার্টার ফাইনালেও ট্রাইব্রেকারে কিংসকে ম্যাচ জিতিয়েছিলেন তিনি, থামিয়েছিলেন রহমতগঞ্জের তিনটি শট। আর সেমিফাইনালের পুরো ম্যাচেই তো দুর্দান্ত গোলকিপিং করেছেন এই গোলরক্ষক। তবে সেদিনের সেরা ‘সেইভ’টা বোধহয় জিকো জমিয়ে রেখেছিলেন এই আট নম্বর শটটির জন্যেই। শটের ঠিক আগ মুহূর্তে দুই বাহু উঠিয়ে চিলের মতই উড়াল দেয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন জিকো। বলের দিকে তীক্ষ্ণ নজর রেখে ফ্লাইট বুঝেই হালকা বামে ঝাপিয়ে আবাহনীর জিতুর নেয়া শটটা সেইভ করে নেন কিংসের এই গোলকিপার। তাতেই গ্যালারীর হাজার হাজার কিংস সমর্থকরা গগণবিদারী চিৎকার শুরু করে দেয়। তবে তখনো আনিসুর রহমান জিকোর চমক দেখানো বাকি। বসুন্ধরা কিংসের হয়ে পরবর্তী শট নিতে এগিয়ে আসছিলেন ইমন মাহমুদ বাবু। কিন্তু, জিকো নিজে থেকেই ইশারা দিয়ে থামালেন তাঁকে। কারণ, পরবর্তী শটটা নিতে চান তিনি নিজেই।

 

আনিসুর রহমান জিকোর তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে অবাক ছিল অনেকেই। কিংসের পরবর্তী শট কে নিচ্ছে তা বুঝে উঠতে পারেননি ম্যাচ রেফারী জালাল উদ্দিন। আর তাই বল হাতে পেনাল্টি স্পটের দিকে যাওয়ার মুহূর্তে জিকোকে বল রেখে নিজের জায়গায় যাওয়ার জন্য বলেন তিনি। রেফারীর মতই কিছুটা অবাক হয়েছিলেন আবাহনী গোলরক্ষক শহিদুল ইসলামও। তবে সাগরতীরে বেড়ে উঠা ভয়ডরহীন জিকো মোটেও নার্ভাস ছিলেন না। পেনাল্টি স্পটে বল বসিয়ে কয়েক কদম পিছিয়ে গিয়ে এগিয়ে এসে শট নিলেন গোলপোস্টের ডানদিকের পোস্ট ঘেষে। আবাহনীর গোলরক্ষক লাফ দিয়েও নাগাল পেলেন না সেই বল। ব্যস, একক নৈপূণ্যেই কিংসকে ফাইনালে তুলে ‘হিরো’ হয়ে গেলেন কক্সবাজারের ছেলে আনিসুর রহমান জিকো। তাঁকেই ঘিরেই চললো কিংসের বিজয়োল্লাস!

 

jgsxjr1onukwwwjdixjf

 

স্বাধীনতা কাপের কোয়ার্টার ও সেমিফানালে টানা দুইটি ট্রাইব্রেকার জিতিয়ে হিরো হয়ে উঠা জিকো অবশ্য ক’দিন আগেও ছিলেন স্পটলাইটের বাইরে। ২০১৮ সালের মৌসুম শুরু সময়েও বসুন্ধরা কিংসের তিন নম্বর গোলকিপার ছিলেন জিকো। কিন্তু, কিংসের মূল গোলকিপার ইনজুরিতে পড়ায় কয়েকটি ম্যাচে তাঁকে সুযোগ দিয়েছিলেন দলটির স্প্যানিশ কোচ অস্কার ব্রুজন। এই সুযোগ লুফে নিয়ে নিজেকে প্রমাণ করতে ভুল করেননি আনিসুর রহমান জিকো। আর তারপরের গল্পটা ঠিক স্বপ্নের মতই। স্বাধীনতা কাপের শিরোপা জয়ের পাশাপাশি বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগেও অসাধারণ পারফর্ম করে কিংসের সাফল্যের অন্যতম একজন নায়ক হয়ে উঠেছেন তিনি। তাছাড়া এখনো অভিষেক না হলেও বাংলাদেশ জাতীয় দলের স্কোয়াডে নিয়মিত আছেন আনিসুর রহমান জিকো।

 

জিকোর ফুটবলের সাথে সখ্যতা গড়ে উঠে কক্সবাজারের ডুলহাজারা বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয় মাঠে। এলাকার খেলায় গোলকিপার খুজে না পেলে জোর করেই ছোটদের কাউকে দাড় করিয়ে দেয়া হতো গোলপোস্টের সামনে। বড় ভাইদের সাথে খেলতে গিয়ে এভাবেই গোলকিপিংয়ের শুরু আনিসুর রহমান জিকোর। এলাকার মাঠে নিজের গোলকিপিং দিয়েই নজর কাড়েন শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাবের স্ট্রাইকার নূরুল আবসারের। তাঁর অনুপ্রেরণাতেই নিয়মিত অনুশীলন শুরু করেন জিকো। কখনো স্কুল পালিয়ে, কখনো আবার বাবার চোখ ফাঁকি দিয়ে ফুটবল খেলতে ছুটতেন আনিসুর রহমান জিকো। ছেলে ফুটবল খেলুক সে ব্যাপারে সমর্থন ছিল না বাবার। কক্সবাজারে কোচ গোলাম রাব্বানী ছোটনের অধীনে অনূর্ধ্ব-১৬ একটি ক্যাম্পে সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও শুরুতে যেতে দিতে রাজি হননি জিকোর বাবা। অবশেষে বাড়ির পাশের একজন রেফারি বাবাকে বুঝিয়ে বলার পর ক্যাম্পে যাওয়ার অনুমতি পায় জিকো। শুরুতে ফুটবল খেলার প্রতি সমর্থন না থাকলেও এখন ছেলেকে দেশের হিরো হতে দেখে আর না করেন না বাবা।

 

আনিসুর রহমান জিকোর পেশাদার ফুটবল খেলার শুরুটা ২০১৩ সালে। তখন কেবল ক্লাস সেভেনে পড়েন তিনি। মিজান নামের এলাকার এক বড় ভাইয়ের সাহায্যে চট্টগ্রাম লিগের দ্বিতীয় বিভাগের দল কল্লোল সংঘে যোগ দেন তিনি। সেই মৌসুমের শেষ ম্যাচে তিনটি ট্রাইব্রেকার থামিয়ে এবং পেনাল্টিতে নিজে গোল করে তাঁর দলকে প্রথম বিভাগে তুলেছিলেন জিকো। ২০১৪ সালে চট্টগ্রাম লিগে ফুটবল খেলেন জিকো। তখনো তাঁর বাবার সমর্থন মিলে নি। তা সমর্থন মিলবেই বা কিভাবে? সবে মাত্র জেএসসি পরীক্ষা দেয়ার সময় হয়েছিল তাঁর ছেলের। এখনই পড়ালেখা ছেড়ে ফুটবল নিয়ে পড়ে থাকা তাই মানতে পারেন নি জিকোর বাবা। তবে গ্লাভস হাতে জিকোর স্বপ্নযাত্রা চলতেই থাকে...

 

২০১৫ সালে ঢাকায় বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশিপে খেলা ফরাশগঞ্জ ক্লাবে নাম লেখান আনিসুর রহমান জিকো। মৌসুমের শুরুর দিকে ক্লাস নাইনের পরীক্ষার জন্য নিয়মিত ঢাকা থেকে কক্সবাজার আসা যাওয়ার মধ্যেই ছিলেন জিকো। এরপর মৌসুমের মাঝামাঝি থেকে বেশকিছু ম্যাচ খেলার সুযোগ পান তিনি। ফরাশগঞ্জের জার্সি গায়ে গোলকিপিংয়ে নজর কাড়েন প্রিমিয়ার লিগের ক্লাবগুলোর। ২০১৬ মৌসুমে মুক্তিযোদ্ধা সংসদে যোগ দেন তিনি। তারপরের মৌসুমে চুক্তিবদ্ধ হন সাইফ স্পোর্টিং ক্লাবের সাথে। সাইফের জার্সি গায়ে ১০টি ম্যাচ খেলেছেন জিকো। তারপর ২০১৮ সালে যোগ দেন নবাগত ক্লাব বসুন্ধরা কিংসে। বাংলাদেশ জাতীয় দলের সাথে দক্ষিণ কোরিয়ায় থাকা অবস্থায় হুট করেই নাম লেখান বসুন্ধরা কিংসে। কিংসে এর আগেই নাম লেখানো দুই অভিজ্ঞ গোলকিপারকে ছাপিয়ে মূল দলে সুযোগ পাওয়াটা ছিল বিশাল চ্যালেঞ্জ। তবে ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিল জিকোর। মৌসুমের শুরুতেই গোলরক্ষক মুস্তাকের ইনজুরি এবং মিতুলের অফফর্মে গ্লাভস হাতে কিংসের হয়ে মাঠে নামার সুযোগ পান তিনি। আর সেই সুযোগটাকে কাজে লাগিয়ে কিংসের ২২ নম্বর জার্সিটাকে আলাদাভাবেই চিনিয়েছেন আনিসুর রহমান জিকো!

 

50684687_2318022708431938_1496354734636793856_n

 

বেশকিছু দিন ধরেই জাতীয় দলের সাথে আছেন জিকো। তবে জাতীয় দলের হয়ে আন্তর্জাতিক ম্যাচে এখনো লাল-সবুজ পতাকার প্রতিনিধিত্ব করা হয়নি। বেশ কিছু ফ্রেন্ডলি ম্যাচে অবশ্য খেলেছেন কক্সবাজারের এই গোলরক্ষক। তাছাড়া বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ এবং অনূর্ধ্ব-২৩ দলের নিয়মিত মুখ ছিলেন জিকো। এখন কেবল জাতীয় দলে অভিষেকের অপেক্ষা। অপেক্ষা প্রিয় গোলকিপিং কোচ জেসন ব্রাউনের প্রত্যাশা পূরনের। জিকোর গোলকিপিংয়ে উন্নতির সবচেয়ে বড় অবদান এই জেসন ব্রাউনের। জাতীয় দলের সাবেক কোচ এন্ড্রু অর্ডের সাথে গোলরক্ষক কোচ হিসেবে এসেছিলেন জেসন। আর্সেনাল একাডেমিতে কাজ করার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই কোচের দিকনির্দেশনায় নিজের বিশাল উন্নতি হয়েছে বলেই মানেন জিকো। ফিটনেস, খাওয়াদাওয়া, ট্রেনিং থেকে শুরু করে টেকনিক্যাল ডেভেলপমেন্ট সবকিছুতেই জিকোর জন্য জাদুর পরশ দিয়ে গিয়েছিলেন জেসন ব্রাউন। তাছাড়া তাঁর কাছ থেকে বিভিন্ন পজিশনে বলের গ্রিপ নিয়েও বিস্তর জ্ঞান পেয়েছিলেন দেশের অন্যতম সেরা এই গোলকিপার।

 

বাংলাদেশ জাতীয় দলের কোচ হিসেবে এন্ড্রু অর্ডের সময়কাল বেশিদিন কাটেনি। ফলে অর্ডের সাথে চলে গিয়েছিলেন জেসন ব্রাউন। তবে যাওয়ার আগে প্রিয় শিষ্যকে খুব জলদি জাতীয় দলের জার্সি গায়ে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে দেখার প্রত্যাশার কথা জানিয়ে গিয়েছিলেন জেসন। প্রিয় কোচের প্রত্যাশাটাই তো স্বপ্ন তাঁর। আর তাই সেই স্বপ্ন পূরণ করতে প্রতিদিন পরিশ্রম করে যাচ্ছেন, প্রতিটি ম্যাচে নিজেকে প্রমাণ করে যাচ্ছেন বারবার। বসুন্ধরা কিংসের হয়ে এএফসি কাপে অভিষেক ম্যাচেই তিনটা পেনাল্টি ঠেকিয়ে ইতিমধ্যেই রেকর্ডবুকে জায়গা করে নিয়েছেন জিকো। তাঁর এমন পার্ফরম্যান্সে এএফসি’র ওয়েবসাইটে তাঁকে সম্বোধন করা হয়েছে ‘দ্য ওয়াল’ বলে! সেদিন হয়ত বেশি দূরে নয় যখন বাংলাদেশের গোলপোস্টের নিচে দেয়াল হয়ে দাঁড়াবেন এবং অতন্দ্র প্রহরী হয়ে উঠবেন তিনি। অপেক্ষা এখন শুধু স্বপ্নগুলো লাল-সবুজে রাঙানোর!