• ক্রিকেট

লেগস্পিনের সহজপাঠ

পোস্টটি ১২২৬৬ বার পঠিত হয়েছে

বলা হয়ে থাকে লেগস্পিন একটা শিল্প এবং লেগস্পিনাররা শিল্পী। ক্রিকেটের শুরু থেকেই লেগস্পিনাররা দুর্লভ প্রজাতি ছিলেন।মাঝখানের অনেক বছরে লেগস্পিনারের দেখাই পায় নি ক্রিকেট।বর্তমান সময়ে বেশ কয়েকজন কোয়ালিটি লেগস্পিনার বিশ্বক্রিকেট মাতিয়ে বেড়াচ্ছেন।এই লেখায় মূলত কোন বোলার নয় বরং লেগস্পিনের বিভিন্ন ভেরিয়েশন নিয়ে আলোচনা করব।বলে রাখা ভালো এই লেখা বোদ্ধা ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্য নয়।যাদের কাছে লেগস্পিনটা ঘোলাটে লাগে শুধু তাদের জন্যই।

লেগস্পিন ব্যাপারটা অনেকের কাছেই বেশ জটিল লাগে।সাধারণ দর্শকদের অনেকেই লেগস্পিনের টেকনিক্যাল ক্যাটাগরি ভালো করে বুঝতে পারেন না।ধারাভাষ্যকাররা এবং সাংবাদিকরা তাদের কথায় প্রায়ই লেগস্পিনের বিভিন্ন বলের বর্ণনা দেন যেমন গুগলি,ফ্লিপার,লেগব্রেক,কুইকার ও চায়নাম্যান।অনেক ক্রিকেটপ্রেমীই এগুলো সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখেন না। তাদের জন্যই এই লেখা,’লেগস্পিনের সহজপাঠ’।

প্রথমেই আসি ডানহাতি লেগস্পিনারদের ভেরিয়েশনগুলো নিয়ে।এদের বলা হয় ডানহাতি লেগব্রেক বোলার। ডানহাতি লেগস্পিনারদের স্টক বল হলো অর্থোডক্স লেগব্রেক।ডানহাতি ব্যাটসম্যানদের ক্ষেত্রে এই বল পিচ করার পর অর্থাৎ পিচে পড়ার পর টার্ন করে অফস্টাম্পের দিকে।সহজ কথায় অর্থোডক্স লেগব্রেক ডানহাতি ব্যাটসম্যানদের ক্ষেত্রে লেগস্টাম্পের দিক থেকে টার্ন নিয়ে অফস্টাম্পের বাইরের দিকে বেরিয়ে যায়।এই ডেলিভারি টপ স্পিন এবং সাইড স্পিনের মিশেল। এক্ষেত্রে বোলার বল ডেলিভারি করেন একটু ঊঁচু থেকে,একটু ফ্লাইট দেন অর্থাৎ বল পিচে পড়ার আগে বাতাসে থাকে বেশিক্ষণ।চলতি ভাষায় বলে ঝুলিয়ে বল করা।ব্যাটসম্যানের কাছে মনে হয় বল যেন কিছুক্ষণ বাতাসে ঝুলে থাকল।ফ্লাইট বেশি দিলে বল কোথায় পিচ করবে তা নিয়ে ব্যাটিসম্যানরা প্রায়ই ধোঁকা খান।এই ডেলিভারির সময় গ্রিপে বোলারের বুড়ো আঙ্গুল থাকে মুক্ত, বলের সুতা মানে সিমের ওপর নয়।হাতের তালু আর বলের মধ্যে কোনো ফাঁক থাকে না।তর্জনী এবং মধ্যমা আঙ্গুল বল বড় করে টার্ন করাতে সাহায্য করে।লেগব্রেকের রাজা হলেন শেন ওয়ার্ন।তিনি ভয়াবহ ডেডলি সব লেগব্রেক করেছেন ।কিন্তু অবাক করা ব্যাপার হলো তিনি গুগলি বলতে গেলে একদমই করতেন না।বর্তমানে রশিদ খান,আদিল রশিদ,যুজবেন্দ্র চাহাল ও ইয়াসির শাহ লেগব্রেক খুবই ভালো করেন।

এরপর আসি ফ্লিপার নিয়ে।এই ফ্লিপার ছিল কিংবদন্তি লেগস্পিনার আবদুল কাদিরের দুঃখ।কেন দুঃখ সেটা একটু পরে বলছি,আগে ফ্লিপার কি সেটা আমরা জেনে নিই।ফ্লিপার অনেকটাই লেগব্রেকের মত।তবে কিছুটা ভিন্নটা আছে।এই বল ডেলিভারি করা হয় লেগব্রেকের চেয়ে একটু নিচে থেকে।বলের গ্রিপিং এ বল একদম হাতের তালুর সাথে লাগানো থাকে না,একটু ফাঁক থাকে।বুড়ো আঙ্গুল বলের সিম স্পর্শ করে থাকে।বাকি চার আঙ্গুলের মধ্যে অনামিকা এবং মধ্যমাই আসল কাজটা করে,এরা বলের সিমের ওপর থাকে।বল পিচ করার পর লেগব্রেকের মত অতটা টার্ন করে না,মাঝে মাঝে কোন প্রকার টার্নই করে না!পিচে পড়ে একটু বেশি গতিতে ব্যাটসম্যানের দিকে ছুটে যায়।ব্যাটসম্যান যদি নরমাল লেগব্রেকের মত বাইরের দিকে টার্ন করবে ভেবে খেলেন তাহলেই বাজিমাত! ফ্লিপারে বোলাররা প্রায়ই এলবিডব্লিউ এর মাধ্যমে উইকেট পান।ইয়র্কার লেংথে করা ফ্লিপার খুবই বিপজ্জনক বল।

আবদুল কাদির খুব ভালো ফ্লিপার করতেন।ব্যাটসম্যানরা লেগব্রেক ভেবে খেলতে গিয়ে বোকা বনে যেতেন,প্যাডে বল লাগত।কিন্তু আম্পায়াররা আউট দিতেন না!কারণ আবদুল কাদিরের আগে ক্রিকেট বিশ্ব দীর্ঘসময় কোনো লেগস্পিনারের দেখা পায় নি। আম্পায়াররা লেগব্রেক আর ফ্লিপারের তফাতটাই ভুলে গিয়েছিলেন! এমনও হয়েছে যে কাদির আম্পায়ারকে বলেছেন যে পরের বলটা লেগব্রেক নয় ফ্লিপার করছি,একটু দেখো।কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই কোনো লাভ হয়নি।

এবার গুগলি নিয়ে কথা বলি।গুগলি হচ্ছে সব লেগস্পিনারের ম্যাজিক বল।আচমকা ব্যাটসম্যানকে চমকে দিতে গুগলির কোন জুড়ি নেই।ডানহাতি লেগস্পিনার যখন ডানহাতি ব্যাটসম্যানকে লেগব্রেক বা ফ্লিপার করে তখন বল সবসময়ই বাইরের দিকে টার্ন নেয়।কিন্তু গুগলির ক্ষেত্রে বল পিচ করার পর ভেতরের দিকে টার্ন করে!সাধারণ লেগব্রেকের সাথে গুগলির গ্রিপ বা ডেলিভারির জায়গার বিশেষ কোন তফাত নেই কিন্তু পিচে পড়ার ব্যাটসম্যানের পিলে চমকে দিয়ে বল ভেতরের দিকে ঘুরে বসে!ব্যাটসম্যানরা প্রায়ই গুগলিতে ধোঁকা খেয়ে লেগব্রেক বা ফ্লিপারের মত খেলতে গিয়ে উইকেট দিয়ে আসেন।

গুগলির গ্রিপ প্রায় লেগব্রেকের মতোই।শুধু বুড়ো আঙ্গুলের পজিশন এবং বল রিলিজ পয়েন্টের কিছুটা তফাত আছে।এক্ষেত্রে বুড়ো আঙ্গুল থাকে বলের সিমের ওপর,বাকিগুলো লেগব্রেকের মতোই।বল রিলিজের সময় বুড়ো আঙ্গুল থাকে ফাইন লেগের দিকে মুখ করে।হাতের পিঠ সোজা ব্যাটসম্যানের দিকে থাকে।পিচ করার পর আচমকাই বল ভেতরের দিকে টার্ন করে।গুগলি রপ্ত করা অনেক বেশি সাধনার ব্যাপার। বর্তমান সময়ে আদিল রশিদ,রশিদ খান,আমাদের জুবায়ের হোসেন লিখন এবং আফ্রিদি ভালো গুগলি করেন।এরমধ্যে আফ্রিদির গুগলির আরেকটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে।তিনি দুইরকম গুগলি করে থাকেন।এক প্রকার গুগলি সাধারণ গতিরই হয়,অন্যটা অনেক বেশি গতির কুইকার গুগলি যা বেশিরভাগ সময় ১২৫কিমি প্রতি ঘন্টারও বেশি।

এবার বলি চায়নাম্যান বোলারদের কথা।চায়নাম্যান শব্দটার সাথে চীনের কোনো সম্পর্ক নেই।বাঁ-হাতি আন-অর্থোডক্স বোলারদেরই চায়নাম্যান নামে ডাকা হয়।সহজ কথায় বাঁ-হাতি লেগস্পিনারদেরই চায়নাম্যান বলা হয়।তাদের ক্ষেত্রে সব কিছুই উলটো ।তাদের গুগলি ডানহাতি ব্যাটসম্যানদের ক্ষেত্রে বাইরের দিকে যায় আবার লেগব্রেক ভেতরের দিকে ঢোকে।গ্রিপিং একইরকম। সাবেকদের মধ্যে ব্র্যাড হগ ও পল এডামস ছিলেন পরিচিত চায়নাম্যান বোলার।বর্তমান সময়ে ভারতের কুলদীপ যাদব,শ্রীলঙ্কার লক্ষণ সান্দাকান ও সাউথ আফ্রিকার তাবারিজ শামসি ভালো করছেন।

আজ এপর্যন্তই থাক।সামনে এরকম আরো কিছু টেকনিক্যাল ব্যাপার নিয়ে লেখার ইচ্ছে আছে।আশা করি এই লেখা পড়ার পর লেগস্পিন উপভোগ করতে আপনাদের আরো ভালো লাগবে।

'প্যাভিলিয়ন ব্লগ’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। প্যাভিলিয়ন ব্লগে প্রকাশিত লেখা, মন্তব্য, ছবি এবং ভিডিওর সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক এবং মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।