• ক্রিকেট

মুলতানের সুলতান

পোস্টটি ১১৪২১ বার পঠিত হয়েছে

ক্রিকেটে 'ক্যারিয়ার অন দ্যা লাইন' বলতে কোন টার্ম নেই। হেরে গেলেই যেখানে যবনিকা ঘটে যাবে ক্যারিয়ারের। যদি থাকতো তাহলে ১৫ বছর আগে মুলতান টেস্টটি অনায়াসে পরিণত হতে পারতো তেমনি এক মঞ্চ। ২০০৩ বিশ্বকাপ ব্যর্থতা, দলীয় কোন্দল, সিনিয়রদের আসা যাওয়ার মিছিল এবং দলের পড়তি ফর্ম, সবমিলিয়ে বাংলাদেশের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজটি পাকিস্তানের জন্য ছিল রীতিমত অগ্নিপরীক্ষা। প্রথম দুই টেস্ট বাংলাদেশ সমানে সমানে লড়াই করে হারলেও মরণকামড় বসানোর জন্য বেছে নিয়েছিল তৃতীয় টেস্ট। যা আবার ছিল মুলতানেরই এক ঘরের ছেলের জন্য এসিড টেস্ট। ব্যর্থ হলেই চলে যাবেন বাতিলের খাতায়। টিকে থাকার একমাত্র সহায় শুধুই সাফল্য।

টেস্টের চতুর্থ দিন শেষেও ম্যাচের লাগাম ছিল বাংলাদেশের হাতেই। অন্যদিকে পাকিস্তানের আশার বাতি হয়ে ব্যাট করছিলেন তিনিই, যিনি কিনা খেলছিলেন সেই ক্যারিয়ার অন দ্যা লাইন ইনিংস! পঞ্চম দিনের বেলা গড়ানোর সাথে সাথে তার ব্যাট যেন আরো চওড়া হতে লাগলো। প্রতিটি চার-ছয়ের মাঝে ছিল নিজের ক্যারিয়ারের ডুবন্ত নৌকাটি বাঁচিয়ে তোলার তাগিদ। দ্রুতই হাঁকালেন শতক, পরবর্তীতে ১৩৮ রানের অপরাজিত ইনিংসে পাকিস্তানকে এনে দিলেন ১ উইকেটের মহাকাব্যিক এক জয়। মাঠেই বরণ করে নেয়া হল গোলাপের তোড়া দিয়ে। এ যেন যুদ্ধজয়ী এক বীর সৈনিকের প্রত্যাবর্তন।

2492351

আজ তার জন্মদিন, তবে যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশীদের কাছে ইনজামাম-উল-হক নামটি শুনলেই স্মৃতিতে প্রথমে ভেসে উঠবে মুলতান টেস্ট। যেখানে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়ের স্বপ্নে কেবল তিনি বাঁধাই হয়ে দাঁড়াননি, স্বপ্নটাকে পরিণত করেছিলেন দুঃস্বপ্নেও।

***

ওয়ানডে বিশ্বকাপ ইতিহসের অন্যতম সেরা ইনিংস হিসেবে গননা করা হয় ইনিংসটিকে। ১৯৯২ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ইনজামামের ৩৭ বলে ৬০ রানের ইনিংসটি ক্রিকেটবিশ্বকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল এক তরুণের সাথে। যিনি ভবিষ্যতে ব্যাট হাতে পাকিস্তানকে উপহার দিতে যাচ্ছিলেন অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্তের। ক্রিজে যখন ইনজামামের আগমন, জয়ের জন্য ১৫ ওভারে পাকিস্তানের প্রয়োজন ১২৩ রান।

120120

এই ধুদ্ধুমার টি-টোয়েন্টি যুগেও যা বেশ দুরুহ ব্যাপার। ১৯৯২ সালে সেটি তাই প্রায় অসম্ভবের কাতারেই পড়ে যায়। বহু নাটকীয়তয় ভরা বিশ্বকাপ অভিযান শেষের শুরুটা হয়ত দেখে ফেলেছিলেন ইমরান খান এন্ড কোং। তবে অনিশ্চয়তায় ভরা পাকিস্তান ক্রিকেটে তখন আরেকটি কাব্য লেখার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন এক তরুণ তুর্কি। জুটি বেঁধেছিলেন জাভেদ মিয়াদাদের সাথে। তবে অপর প্রান্তে তাকে দর্শক বানিয়ে বেধড়ক পিটিয়ে রান বলের ব্যবধানটা দৃষ্টিসীমার মাঝে নিয়ে আসলেন ইনজামামই। ৩৭ বলে ৬০ রান করে ইনজামাম আউট হয়ে গেলেও পাকিস্তানের জয় পেতে আর খুব বেশি সমস্যা হয়নি।

***

২০০২ সালে করাচীতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ইনজামামের ৩২৯ রানের ইনিংসটি এখনো পাকিস্তানের টেস্ট ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ইনিংস। টেস্টের প্রথম দিন থেকেই ইনজামামের ব্যাটের সামনে ব্ল্যাক ক্যাপদের ছিলোনা কোন জবাব। করাচীর তপ্ত গরমে নাভিশ্বাস উঠে যাওয়া কন্ডিশনে উইকেটে ছিলেন প্রায় দশ ঘণ্টা।

Inzy

৩৮টি চারের সাথে ছিল ৯টি ছয়ের মার। ৪৩৬ বলে ইনজামামের ৩২৯ রানের সুবাদে প্রথম ইনিংসে পাকিস্তান দাঁড় করায় ৬৪৩ রানের বিশাল সংগ্রহ। সেই চাপেই কিনা, নিউজিল্যান্ড প্রথম ইনিংসে গুটিয়ে গেল মাত্র ৭৩ রানেই। ফলো-অনে পড়ে তৃতীয় দিনে দ্বিতীয় ইনিংসে ২৪৬ রানে অলআউট হয়ে কিউইরা পরাজিত হয় ইনিংস এবং ৩২৪ রানে। স্বাভাবিকভাবেই ম্যাচ সেরার  নির্বাচিত হন ইনজামাম।

***

২০০৪ সালে ঘরের মাটিতে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের বিপক্ষে সিরিজটি ছিল অধিনায়ক ইনজামামের জন্য দুস্বপ্নময়। টেস্ট, ওয়ানডে উভয় সিরিজেই পরাজয়ে চারিদিক থেকে ধেয়ে আসছিলো সমালোচনা। তবে ব্যাটসম্যান ইনজামামের জন্য সময়টা খুব একটা খারাপ যায়নি। টেস্ট সিরিজে একটি শতকের পাশাপাশি ওয়ানডে সিরিজেও ছিল দুটি শতক। যার শুরুটা ছিল দুর্দান্ত একটি ইনিংস দিয়ে যা পাকিস্তানকে প্রায় এনে দিয়েছিল অবিশ্বাস্য এক জয়। ভারতের দেয়া ৩৪৯ রানের পাহাড় টপকানোর জন্য পাকিস্তানের শুরুটা ছিলোনা আশা জাগানিয়া। কিন্তু ইনজামাম উইকেটে আসার পর থেকেই বদলে যেতে থাকে চিত্র। মাত্র ১০২ বলে খেললেন ১২২ রানের অসাধারণ এক ইনিংস, দলকে রেখেছিলেন জয়ের পথেই। কিন্তু তার বিদায়ের পর পরবর্তী ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতায় শেষ ওভারে ভারত তুলে নেয় ৫ রানের নাটকীয় জয়। দল হারলেও, প্রচণ্ড চাপের মুখে সেই ইনিংসটি স্মরণীয় হয়ে আছে ওয়ানডেতে ইনজামামের খেলা অন্যতম সেরা একটি ইনিংস হিসেবে।

inzy5-1402484420

ক্যারিয়ার জুড়েই স্থুলতা, রানিং বিটুইন দ্যা উইকেটে দুর্বলতার জন্য শুনতে হয়েছে নানারকম কটুক্তি। সর্বাধিক রানআউটের লজ্জাজনক রেকর্ডেও রয়েছে তার নাম। তবে ইনজামাম সেসব সীমাবদ্ধতাকে কাটিয়ে উঠেছিলেন তার মুগ্ধকর ব্যাটিং প্রতিভা দিয়েই। আক্রমণ, রক্ষন কিংবা লোয়ার অর্ডার ব্যাটসম্যানদের নিয়ে লড়াকু সব ইনিংস, ‘ইনজি’ সিদ্ধহস্ত ছিলেন সবখানেই। বিশেষ করে ফাস্ট বোলারদের বিপক্ষে ইনজামাম যে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ব্যাট করতেন, সচরাচর তা দেখা যায়না। "ফাস্ট বোলারদের বিপক্ষে ইনজামামের মত সময় নিয়ে আমি আর কাউকেই ব্যাট করতে দেখিনি। ফাস্ট বোলিংয়ের বিপক্ষে আমার চোখে সেরা ব্যাটসম্যান ইনজামামই।" পাকিস্তানের ১৯৯২ বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক ইমরান খানের এমন স্তুতিতেই প্রকাশ পায় কতটা উঁচুমানের ব্যাটসম্যান ছিলেন ইনজামাম।

তার অধিনায়কত্বে ২০০৭ বিশ্বকাপে পাকিস্তানের ভরাডুবির পরই ওয়ানডে থেকে নিয়েছিলেন অবসর। আইসিএলে অংশগ্রহণ করে আজীবন নিষিদ্ধ হয়েছিলেন পাকিস্তান ক্রিকেটেও। সে বছরই নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে ফিরে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ায়ের ইতি টেনেছিলেন দক্ষিন আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে। মাত্র ১৯ রান করলেই সুযোগ ছিল জাভেদ মিয়াদাঁদকে ছাড়িয়ে টেস্টে পাকিস্তানের হয়ে সর্বোচ্চ রানের মালিক হওয়ার। দ্বিতীয় ইনিংসে ক্রিস হ্যারিসের বলে ছক্কা মেরেই হয়ত চেয়েছিলেন রেকর্ডটা নিজের করে নিতে। পারেননি ইনজি, স্টামড হয়ে রেকর্ড থেকে ২ রান দূরে থাকতেই সমাপ্তি ঘটেছিল ইনজামামের ঝলমলে খেলোয়াড়ি জীবনের।

832855818

আফগানিস্তানের ব্যাটিং কোচ হিসেবে কিছুদিন কাজ করার পর ২০১৬ তে প্রস্তাব পান পাকিস্তানের প্রধান নির্বাচক হওয়ার। এখন পর্যন্ত আছেন  সে দায়িত্বেই। চ্যাম্পিয়নস ট্রফি জয় থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তান ক্রিকেটের যে সাফল্যের ধারা চলছে, তাতে বড় অবদান রয়েছে নির্বাচক ইনজামামের বেশ কিছু বিচক্ষণ এবং সাহসী সিদ্ধান্তের।

যদিও রেকর্ডের পাতায় খুব বেশি জায়গায় নেই তার নাম, তবে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে ২০ হাজারের বেশি রান করা ইনজামাম পাকিস্তান ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম উজ্জ্বল এক নক্ষত্র। সেখানে ইনজামাম মানেই ১৯৯২ বিশ্বকাপে ৩৭ বলে ৬০ রানের ঝড়ো ইনিংস খেলা এক তরুন, সেখানে ইনজামাম মানেই মুলতানে দাঁতে দাঁত চেপে ১৩৮ রানের ইনিংস খেলা হার না মানা এক যোদ্ধা। ইনজামাম মানে সেখানে কেবলই মুগ্ধতা।

'প্যাভিলিয়ন ব্লগ’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। প্যাভিলিয়ন ব্লগে প্রকাশিত লেখা, মন্তব্য, ছবি এবং ভিডিওর সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক এবং মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।