• ফুটবল

পেলেঃ একটি নাম, একটি ব্র্যান্ড...

পোস্টটি ২৪৪৮ বার পঠিত হয়েছে

১৯৪০ সালের ২৩ অক্টোবর ব্রাজিলের ত্রেস কোরাক্লায়েস শহরের এক বস্তিতে জন্মেছিলেন তিনি। খেলার জন্য ছিলো না বল, তাতে কি? কখনোও খড়ের বল বানিয়ে আবার কখনোও মোজা' কে বল বানিয়ে ফুটবল খেলতেন। দারিদ্র্য ছিলো জীবনে, কিন্তু দেহে-মনে ছিলো ফুটবল আর ফুটবলীয় শক্তি!

তিনি ফুটবলের স্রষ্টা, ফুটবলের রাজা, ফুটবলের সবচেয়ে বড় একটা অংশ- " এডসন ওরান্তেস ডো নাসিমেন্তে পেলে"।

জন্মের পর থেকেই ফুটবলের সঙ্গে সখ্য। ব্রাজিলের ট্রেস কোরাক্লাসের রাস্তায় ফুটবল খেলে কেটেছে পেলের ফুটবলের ছেলেবেলা। ব্রাজিলের এক খ্যাতিমান ফুটবল তারকা বিট্রো পেলেকে আবিষ্কার করেন। বিট্রোর সহায়তায় মাত্র ১৫ বছর বয়সে ব্রাজিলের প্রথম সারির দল স্যান্টোসে খেলার সুযোগ পান। তাকে দেয়া হয় ১০ নং জার্সি। তিনি সে জার্সির মর্যাদা সম্মানের সঙ্গে রেখেছেন সবসময়। অভিষেক ম্যাচে গোল করেন পেলে। তার দল জেতে ৭-১ গোলে। তিনি একটানা ১৮ বছর স্যান্টোসের হয়ে খেলেন।

আজ আমরা যাকে পেলে নামে চিনি জন্মের পর তার বাবা-মা তার নাম রাখেন বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসনের সঙ্গে মিল রেখে। পর্তুগিজ উচ্চারণে এডিসনকে তাঁরা বলতেন এডসন। এডসন ওরান্তেস ডো নাসিমেন্তো " নামটা যে কী করে পেলে হয়ে গেল, পেলে নিজেও সেটা বলতে পারেন না। বস্তির বন্ধুরা পেলেকে চিনতো ‘ডিকো’ নামে।

দরিদ্র কৃষ্ণাঙ্গ পরিবারের প্রথম সন্তান হিসেবে পরিবারের অভাব অনটন মেটানোর জন্য ছেলেবেলাতেই পেলেকে চায়ের দোকানে কাজ করতে হয়েছিল। এছাড়া রেলস্টেশন ঝাড়ু দেওয়ার পাশাপাশি কিছুদিন জুতা পরিষ্কারের কাজও করেছিলেন।ছোটবেলা থেকেই ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন ছিল পেলের। একদিন সেই স্বপ্ন সত্যি হলো। ফুটবল খেলে বিশ্বজয় করল ছেলেটি। কিন্তু তার পেছনে রয়েছে আরও অনেক ইতিহাস।

পেলে। নামটা শুনলেই ফুটবল প্রেমীরা রোমাঞ্চিত হয়ে ওঠেন । ফুটবলের ভক্ত নন, এ খেলার খবরও সেভাবে রাখেন না এমন প্রবীণ নবীন সকলেই ফুটবলার হিসেবে পেলের নামটা জানেন। তাঁকে বলা হয় সর্বকালের সেরা ফুটবলার। এক কথায়- পেলে ছাড়া ফুটবল কিছুই না।
যেমন ছিলেন টগবগে, তরতাজা তেমনি শক্ত ট্যাকেলেও বজ্রকঠিন। বল নিয়ে শিল্প সৃষ্টি করেছেন। উঁচু ক্রস এলে তা ছোঁ মেরে হেড করায় বিশ্ব দেখেছে তাঁর মুনশিয়ানা। সতীর্থদের কাছে বল পাঠাতেন গোলের ঠিকানা লিখে। সামান্যতম সুযোগেও কাজে লাগিয়ে গোল করার ক্ষেত্রে তার জুড়ি মেলা ভার।

১৯৫৮ সালে সুইডেন বিশ্বকাপে পেলের অভিষেক হয়। বয়স তখন ১৭ বছর ৮ মাস। সে বছর গোটেনবার্গে ১৫ই জুন সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে ব্রাজিলের হয়ে বিশ্বকাপে খেলতে নামেন পেলে এবং ফুটবলের আরেক জাদুগর গ্যারিনচা। কোয়ার্টার ফাইনালে ওয়েলসের বিরুদ্ধে ৭৩ মিনিটে একক প্রচেষ্টায় পেলের দেওয়া গোলে ব্রাজিল জেতে ১-০-তে। সেমি ফাইনালে ফ্রান্স হারে ৫-২ গোলে ব্রাজিলের মনোমুগ্ধকর জাদুকরী ফুটবলের কাছে। ওই ম্যাচে পেলে হ্যাটট্রিক করেছিলেন ৩টি গোলের সুবাদে। কি দলই না ছিল সে সময়ের ব্রাজিলের। গ্যারিনচা, দিদি, পেলে, মাজুলো, জাগালো — বহু রত্নের সমাহার।

১৯৫৮ বিশ্বকাপে মাত্র ১৭ বছর বয়সে পাঁচ গোল করে ব্রাজিলকে প্রথম বিশ্বকাপ এনে দেয়া পেলেকে দলে পেতে মরিয়া হয়ে লেগেছিল রিয়াল মাদ্রিদ, জুভেন্টাস ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড । কিন্তু ইউরোপে গেলে এ অমুল্য রত্নটি হারিয়ে যেতে পারে ভেবে পেলের ব্রাজিলের বাইরে খেলার প্রতি নিষেধাঙ্গা জারি করে ব্রাজিল সরকার এবং তাঁকে রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি হিসেবে ঘোষনা দেয়া হয় ।

পরবর্তিতে জাতীয় দল থেকে অবসরের পর ১৯৭৫-৭৭ পর্যন্ত সময়টুকু তিনি নিউয়র্ক কসমসের হয়ে খেলার অনুমতি পেয়েছেন । আর কোনো ফুটবলারের প্রতি দেশের এমন উদ্যেগ আমি দেখিনি।

কোপা লিবার্তোদোরেস জেতার সুবাধে পেলের সান্তোস সুযোগ পায় ১৯৬২ ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপে খেলার সুযোগ । ফাইনালে পেলের হ্যাট্টিকের সুবাধে তত্কালীন ইউরোপ চ্যাম্পিয়ন বেনফিকাকে ৫-২ এ বিধ্বস্ত করে সান্তোস । বেনফিকার গোল কিপার পেরেরা বলেন-

"আমি ভেবেছিলাম স্পেশাল একজন ফুটবলারের মুখোমুখি হতে যাচ্ছি যাকে থামানো দারুন ব্যাপার হবে । কিন্তু অন্য গ্রহ থেকে আসা করো বিপক্ষে খেলা কঠিন"!

১৯৬৯ সালের ১৯ নভেম্বর পেলে তাঁর এক ১০০০তম গোলটি করেন পেনাল্টি থেকে গোলের পর শত শত সমর্থক মাঠে ঢুকে পেলেকে ঘিরে ফেলেছিল । খেলা আবার শুরু হতে অন্তত ৩০ মিনিট সময় লাগে। এই দিনটিকে সাও পাওলোবাসী পালন করে "পেলে ডে" হিসেবে । এই হাজারতম গোলটি পেলে উৎসর্গ করেন ব্রাজিলের দারিদ্র্যপীড়িত অসহায় শিশুদের উদ্দ্যেশ্যে ।

ফুটবল থেকে অবসর নেয়ার আরো প্রায় দু বছর পর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক কসমস পেলেকে যুক্তরাষ্ট্রে খেলার জন্যে অনরোধ করে।কসমসের কোচ ক্লাইভ টয়ের একটি কথা পেলেকে আবার ফুটবলে ফিরিয়ে আনে ।তিনি তাঁকে বলেছিলেন-

"ইতালি স্পেন বা ইংল্যান্ডে গেলে হয়তো আপনি একটি চ্যাম্পিয়নশীপ জিতবেন কিন্তু আমেরিকায় আসলে আপনি পুরো একটি দেশকে জয় করার সুযোগ পাবেন।
এই একটি কথায় মন গলে যায় পেলের । যোগ দেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউয়র্ক কসমসে। পেলের আমেরিকায় আগমনের পর মাঠে দর্শক উপস্থিতি সংখ্যা প্রায় ৮০ শতাংশ বেড়ে যায় । প্রতিপক্ষ প্লেয়াররাও সব সময় পেলের একটু সংস্পর্শে আসতে চাইতো । কসমসের তৎকালীন কোচদের একজন গর্ডন ব্র্যাডলি বলেন -

"পেলে এতটাই জনপ্রিয় ছিলেন যে যেখানেই আমরা খেলতে যেতাম শুধু প্রতিপক্ষের প্লেয়ার- স্টাফদের জন্যেই ২০ থেক ২৫টা নাম্বার টেন জার্সি নিয়ে যেতে হতো, নয়তো ওরা আমাদের মাঠ থেকে বেরুতেই দিতো না।"

পেলে চারটি বিশ্বকাপে ব্রাজিলের হয়ে খেলেছেন। ১৯৫৮-১৯৭০। এরমধ্যে তিনবার বিশ্বকাপ জিতেছে ব্রাজিল। বার বছরের ব্যবধানে দু’টি বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলেছেন এমন ফুটবলার আর কোথায়! ব্রাজিলের হয়ে পেলে ৯১টি ম্যাচ খেলে গোল করেছেন ৭৭টি। সব ধরনের ফুটবলে তিনি খেলেছেন ১৩২৪টি ম্যাচ। গোল পেয়েছেন ১২৮১। ভাবা যায়! এরমধ্যে ৩ গোল ৮৯ বার ৪ গোল ২৯ বার। ৫ গোল ৬ বার। ৮ গোল একবার।

ফুটবল ইতিহাসে সর্বকালের সেরা ফুটবলার হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন পেলে। বর্ণিল ক্যারিয়ারে পেলে নিজেকে এমন এক রেকর্ডে পৌঁছে দিয়েছেন যেটি এখনো পর্যন্ত আর কেউ ভাঙ্গতে পারেনি। একই সঙ্গে তিনি ফুটবলকেও পৌঁছে দেন অনন্য এক উচ্চতায়। ফুটবল ক্যারিয়ারে তার ১২৮১ গোলের রেকর্ডটি ফিফার অফিসিয়াল রেকডের্র শীর্ষস্থান দখল করে রয়েছে। আর তিনিই হলেন ফুটবল ইতিহাসে একমাত্র খেলোয়াড় যিনি তিনটি বিশ্বকাপ জয়ের মেডেল লাভ করেছেন। তন্মধ্যে দু’টি বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ে প্রধান ভূমিকা রেখেছেন পেলে নিজে।কৈশোর বয়সে বিশ্ব ফুটবল অঙ্গনে পা রাখা এই ফুটবলার ১৯৭০ সালে নিজেকে বসিয়ে দেন ফুটবলের রাজার আসনে। ক্লাব পর্যায়ে তিনি ৪০টির ও বেশি শিরোপা লাভ করেছেন। যার বেশির ভাগই এসেছে স্যান্টোস ক্লাবের হয়ে। তার অবস্থানের সময় ওই ক্লাবটিই ছিল বিশ্বের সবচেয়ে মোহনীয় ক্লাব।

ফুটবল বিশ্বকাপে প্লেয়ার হিসেবে সবচেয়ে বেশিবার চ্যাম্পিয়ন, পেলে (৩ বার) ১৯৫৮, ১৯৬২ এবং ১৯৭০। ফাইনাল খেলা সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড়, পেলে, ১৭ বছর ২৪৯ দিন।প্রতিপক্ষ সুইডেন ১৯৫৮ বিশ্বকাপ। সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা, পেলে, ১৭ বছর ২৩৯ দিন (ওয়েলসের বিপক্ষে ১৯৫৮ বিশ্বকাপে)। সর্বকনিষ্ঠ হ্যাটট্রিককারী, পেলে, ১৭ বছর ২৪৪ দিন, (ফ্রান্সের বিপক্ষে, ১৯৫৮)।ফাইনালে গোল করা সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড়,পেলে, ১৭ বছর ২৪৯ দিন, সুইডেনের বিপক্ষে ১৯৫৮। সবচেয়ে বেশি টুর্নামেন্টে গোল করা, পেলে, চারটি (১৯৫৮-১৯৭০) । এবং কিং পেলে ই এই সব রেকর্ডের মালিক।

১৯৬৪ সালে বোটাফেগোর বিপক্ষে পেলে একাই করেন ৮ গোল। ১৭ বছর বয়সে ১৯৫৮ সালে কনিষ্ঠতম খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপে অভিষেক হয়। তার জাদুকরি খেলায় সেবার ব্রাজিল প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পায়। এরপর ’৬২ ও ’৭০ সালেও ব্রাজিলের কাপ জয়ের নেপথ্যে পেলের অনেক বড় অবদান ছিল। বিশ্বকাপ ফুটবলের অনেক রেকর্ডের সঙ্গে পেলের নাম জড়িয়ে আছে।

বিশ্বকাপে তিনি একাধিক ফাইনালে গোল করেছেন। পেলে তার পাশে সতীর্থদের মধ্যে গ্যারিঞ্চা, ভাভা, জাগালো, ডিডির মতো খ্যাতিমানদের পেয়েছিলেন বলে পেলে হতে পেরেছিলেন। পেলে ১৯৫৮, ’৬২, ’৬৬ ও ’৭০ এই ৪টি বিশ্বকাপ খেলে বিশ্বকাপে গোল করেন ১২টি। পেলের একটা বড় গুণ ছিল, তিনি সব পজিশনেই খেলতে পারতেন।

১৯৭৭ সালের ১ অক্টোবর চিরদিনের জন্যে মাঠের ফুটবল থেকে বিদায় নেন ফুটবল সম্রাট পেলে । প্রিয় বন্ধুকে বিদায় জানাতে মাঠে হাজির হোন ববি মুর ,মোহাম্মদ আলীর মতো কিংবদন্তিরা। বিদায়ী ম্যাচটিতে মুখোমুখি হয় তাঁর দুই ক্লাব সান্তোস আর কসমস ।ম্যাচের প্রথমার্ধে কসমস ও দ্বিতীয়ার্ধে সান্তোসের হয়ে খেলেন পেলে । প্রথমার্ধে ডাইরেক্ট ফ্রি কিক থেকে জীবনের শেষ গোলটি করে কসমসকে লিড এনে দেন ।শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি কসমস ২-১ এ জেতে । ম্যাচশেষে কসমসের প্লেয়াররা তাঁকে কাধেঁ তুলে নিয়ে পুরো মাঠ প্রদক্ষিন করে । এসময় এক হাতে ব্রাজিল আর অন্য হাতে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা বহন করছিলেন কিং।ভক্তরা শেষবারের মতো দাড়িয়ে সম্মান জানায় সম্রাটকে ।

ফুটবলের কিংবদন্তি, বিশ্বকাপের মহানায়ক, ব্রাজিলের ‘কালো মানিক’, ফুটবলের রাজা পেলের তুলনা পেলে নিজে। রাজা আসে রাজা যায় কিন্তু পেলেকে কখনোও  সিংহাসনচ্যুত হতে হয়নি।

©আহমদ আতিকুজ্জামান।

'প্যাভিলিয়ন ব্লগ’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। প্যাভিলিয়ন ব্লগে প্রকাশিত লেখা, মন্তব্য, ছবি এবং ভিডিওর সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক এবং মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।