• ফুটবল

কয়েকটি মৃত্যু অতঃপর শোক এবং বহু বছরের কান্না!

পোস্টটি ১২৭৮ বার পঠিত হয়েছে

 

বুনোহাঁসের ফিচার: কয়েকটি মৃত্যু অতঃপর শোক এবং বহু বছরের কান্না! 

     মৃত্যু অমোঘ সত্য, কিন্তু কিছু মৃত্যু ছুঁয়ে যায় সবাইকে। খেলতে গিয়ে যাত্রাপথে এমন মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার মতো না। তবুও আকাশ সমান স্বপ্ন নিয়ে পথ পাড়ি দেন খেলোয়াড়েরা, অন্তরে থাকে জেতার অধরা স্বপ্ন। এই তো কিছুদিন আগেও সবাইকে চমকে রেখে একের পর এক নৈপুণ্যতা দেখিয়েও স্রষ্টার নশ্বর পৃথিবী থেকে বিমান দুর্ঘটনায় প্রাণ গিয়েছে সময়ের সেরা প্রতিভাবান আর্জেন্টাইন ফুটবল তারকা সালা। বিশ্ববাসী কেঁদেছে এক তালে.... শুধু ফুটবল নয়, ক্রীড়া জগতের সকল জায়গায় হানা দিয়েছে চিরন্তন সত্য মৃত্যু; আজকের লেখাটি কেবল বিংশ এবং একবিংশ শতকে ফুটবল খেলতে যাওয়ার পথে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো খেলোয়ারদের নিয়ে। 

 

★ আলিয়ানজা  লিমা দুর্ঘটনা(১৯৮৯)

  কিছু স্বপ্ন অধরা-ই রয়ে যায়! পেরুভিয়ান লিগের ম্যাচ খেলে নিজেদের এলাকায় ফিরছিলেন আলিয়ানজা লিমা ক্লাবের খেলোয়াড়েরা। বিমানবন্দরের কাছাকাছি এসে পাইলট টের পান যান্ত্রিক গোলযোগের। কন্ট্রোল টাওয়ারের কাছ থেকে পাওয়া ভুল নির্দেশনায় বিমান রানওয়েতে নামার বদলে ভূপাতিত হলো প্রশান্ত মহাসাগরে। খেলোয়াড়-কর্মকর্তা সহ তেতাল্লিশ জনের সলিলসমাধিও হয় সেখানেই!

 

★ শাপেকোয়েন্স ট্র্যাজেডি(২০১৬)

   কোপা সুদামেরিকানার ফাইনাল খেলতে যাচ্ছিল ব্রাজিলিয়ান দল শাপেকোয়েন্স। কলম্বিয়ান দল অ্যাটলেটিকো ন্যাসিওনালেএ মাঠে খেলতে কলম্বিয়ার বিমান ধরেছিল তারা। কিন্তু সেই বিমান শেষ পর্যন্ত মাঠে পৌঁছায়নি! পথে যান্ত্রিক গোলযোগ এবং তেল ফুরিয়ে যাওয়ায় একাশি জন যাত্রীর মধ্যে পঁচাত্তর জনই তৎক্ষণাৎ প্রাণ হারান। সবশেষে মাত্র তিন জন খেলোয়াড়কে ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়।

 

★ ড্যানিশ ফুটবল দুর্ঘটনা(১৯৬০)

রোম অলিম্পিকে ডেনমার্ক দলের ট্রায়াল দেওয়ার জন্য কোপেনহেগেন থেকে হার্নিস যাচ্ছিলেন আট ড্যানিশ ফুটবলার। বৈরী আবহাওয়ার কারণে চার্টার্ড বিমান নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সুইডেন-ডেনমার্কে বিধ্বস্ত হয়। আট ফুটবলার সেখানেই প্রাণ হারান। তবে এক পা হারিয়ে প্রাণে বেঁচেছিলেন পাইলট! সে বিমানেই যাওয়ার কথা ছিল এরিক ডয়েরবর্গের। কাপড়ের বাক্স রাখার জায়গা করে দিতে সে বিমানে জায়গা হয়নি তাঁর; হয়তো স্বয়ং বিধাতাই চাননি সে এত তাড়াতাড়ি চলে যাক! শেষ পর্যন্ত তাকে নিয়ে রোম অলিম্পিক ফুটবলে রূপা জিতেছিল ডেনমার্ক ফুটবল দল। 

 

★ পাখতার তাসকেন্ত ট্র্যাজেডি(১৯৭৯)

     সোভিয়েত ইউনিয়নের ডায়নামো মিনস্কের বিপক্ষে খেলতে যাচ্ছিল উজবেক দল পাখতার তাসকেন্ত। আকাশে থাকা অবস্তাতেই মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটে একই রুটে আসা আরেকটি বিমানের সঙ্গে। রেডিও সিগন্যালের গোলযোগে এয়ার ট্রাফিকের নির্দেশ বুঝতে ভুল করেছিলেন দুই পাইলট। এক ভুলে দুই বিমানের সর্বমোট একশো আটাত্তর জনের মৃত্যু হয় মধ্য আকাশেই! 

 

★ বাসবি বেইবস(১৯৫৮)

    রেডস্টার বেলগ্রেডের বিপক্ষে ইউরোপিয়ান কাপ যেটা এখন চ্যাম্পিয়নস লিগ নামে পরিচিত। ম্যাচ খেলে দেশে ফিরছিল বৃটিশ ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড-এর পুরো টিম। জ্বালানি নেওয়ার জন্য মিউনিখে যাত্রাবিরতি নেয় বিমানটি। বরফে ঢাকা মিউনিখ থেকে পাইলট কোনোভাবেই টেক-অফ করতে পারছিলেন না। দুইবার চেষ্টার পরও যখন পাইলট টেক-অফ করতে পারছিলেন না, তখন সিদ্ধান্ত হলো বিমান বাদে অন্য কিছুতে করে ইংল্যান্ড ফেরার। কিন্তু পরেরদিন ম্যাচ থাকায় খেলোয়াড়েরা দেরি করতে চাননি। তাতেই শাপেবর হয়েছিল! পাইলটের কাছে অনুরোধ করা হলো আরও একবার টেক-অফের চেষ্টা করতে। জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল সিদ্ধান্তটি নিলেন ক্যাপ্টেন। তৃতীয়বার চেষ্টা করতেই রানওয়ে থেকে ছিটকে পাশে থাকা একটি বাড়িতে বিধ্বস্ত হয় বিমানটি। বাড়ির লোকজনের ভাগ্য ভালো হলেও ভালো ছিল না ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের খেলোয়ারদের। আটজন ফুটবলার সহ বিশ জন সঙ্গে সঙ্গেই মারা গেলেন।সেই দুর্ঘটনা থেকে ভাগ্যক্রমে বেঁচে গিয়েছিলেন ইউনাইটেডের কিংবদন্তী কোচ ম্যাট বাসবি ও ববি চার্লটন, যাঁদের হাত ধরেই পরবর্তী সময় ঘুরে দাঁড়িয়েছিল ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। খেলোয়ারদের স্মরণে এখনো ওল্ড ট্রাফোর্ডে একটি ঘড়ি থেমে আছে বেলা তিনটা চার মিনিটে! যার নিচে লেখা Feb 6th 1958 The Flowers of Manchester. 

 

★ কালারফুল ইলেভেন ট্র্যাজেডি(১৯৮৯)

দক্ষিণ আমেরিকার ছোট্ট দেশ সুরিনাম। সে দেশের কয়েকজন ফুটবলার মিলে গড়ে তুলেছিলেন 'কালারফুল ইলেভেন' দল। সেই দলের হয়ে প্রীতি ম্যাচ খেলতে আমস্টারডাম থেকে সুরিনামের প্যারামারিবোর পথ ধরেন সুরিনাম বংশোদ্ভূত চৌদ্দ জন ডাচ ফুটবলার। বয়স্ক পাইলট ও খুবই নিচ দিয়ে বিমান চালনার কারণেই ঘটেছিল এ দুর্ঘটনা। যাতে শেষ হয়ে গিয়েছিল সুরিনাম জাতীয় ফুটবল দলের আকাশচুম্বী স্বপ্ন! 

 

★ সুপারগা দুর্ঘটনা(১৯৪৯)

    পর্তুগীজ ক্লাব বেনফিকার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ খেলে ফিরছিল তুরিনো ফুটবল ক্লাব। বিমানবন্দরের পাশে সুপারগা পাহাড়ের কাছে এসে বাজে আবহাওয়ার মুখোমুখি হয় বিমানটি। দ্রুত অবতরণ করতে গিয়ে পাহাড়ের পাদদেশে ব্যাসিলিলা চার্চের দেয়ালে ধাক্কা খায়। নষ্ট রেডিওর জন্য যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি  আঠারো জন ফুটবলারসহ একত্রিশ জনই মৃত্যুবরণ করেন সেই দুর্ঘটনার। ইতালিয়ান লিগে তখন তুরিনোর ছিল জয়জয়কার। টানা চারবারের লিগ চ্যাম্পিয়ন দিল, এমনকি আঠারো জন ফুটবলারের মধ্যে দশ জন ছিলেন ইটালির জাতীয় দলে নিয়মিত সদস্য! পরের বছর বিশ্বকাপে ইতালি গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিয়েছিল। 

 

★ জাম্বিয়া দুর্ঘটনা(১৯৯৩)

বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব খেলতে জাম্বিয়া থেকে সেনেগাল যাচ্ছিল ফুটবল দল। জাম্বিয়ান সেনাবাহিনী তাদের পাঁচ মাস অচল থাকা বিমান উপহার দেয় জাম্বিয়া ফুটবল দলকে। সেই বিমান গ্যাবনের রাজধানী লিব্রেভিলেতে যাত্রাবিরতি শেষে উড়াল দিতেই বিমানের ইঞ্জিনে আগুন ধরে যায়! তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে পাইলট ভুল করে সচল ডান ইঞ্জিনটিও বন্ধ করে দেন। ফলে ত্রিশ আরোহী নিয়ে উপকূলের মাত্র পাঁচশো মিটার দূরে আটলান্টিক মহাসাগরে বিধ্বস্ত হয় জাম্বিয়ার সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ফুটবল দলবাহী বিমানটি। সেইদিন হল্যান্ড থেকে সরাসরি সেনেগাল যেতে চাওয়ায় ভাগ্যক্রমে বেঁচে গিয়েছিলেন জাতীয় দলের অধিনায়ক কালুশা বোয়ালিয়া। 

 

এমন জানা-অজানা বহু দুর্ঘটনা ঘটেছে। কিছু বিশ্ববাসী জেনেছে আবার কিছু হারিয়ে গিয়েছে অতীতের অতল গহ্বরে! 

 

তথ্যসূত্র: 

১. উইকিপিডিয়া

২. গুগল

৩. নিউ ইয়র্ক টাইমস

এবং স্পোর্টস জার্নাল।

 

written by: Arafat Tonmoy(বুনোহাঁস)

বাকিহাটি, বক্সগঞ্জ, নাঙ্গলকোট, কুমিল্লা

'প্যাভিলিয়ন ব্লগ’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। প্যাভিলিয়ন ব্লগে প্রকাশিত লেখা, মন্তব্য, ছবি এবং ভিডিওর সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক এবং মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।