• ফুটবল

একজন অপরিচিতের গল্প

পোস্টটি ৬৮৪ বার পঠিত হয়েছে

বল নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন একজন মিডফিল্ডার। তাকে বাধা দিতে আসা খেলোয়াড় কে পাশ কাটিয়ে বল দিলেন ডি বক্সের বাইরে দাঁড়ানো একজন স্ট্রাইকার কে। তিনি তার সামনের ডিফেন্ডার কে একটু পাশ কাটিয়েই ডি বক্সের একদম কোণা থেকে নিলেন একটি বাঁকানো শট। বুলেট গতির সেই শট বাঁচানোর ক্ষমতা গোলকিপার এর নেই। গোলপোস্টের কোণা দিয়ে বল ঢুকে গেলো জালে। পুরো গ্যালারি তে ছড়িয়ে গেল তার আভা।
হয়তো ভাবছেন, আমি ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর কথা বলছি। অথবা থিয়েরি অঁরি, বা হালের লেভানডফস্কি। নাহ, তাদের কেউ না। তবে থিয়েরির স্বজাতি, যিনি এখনো মাঠ মাতিয়ে যাচ্ছেন। নাহ, তিনি বেনজেমা বা এমবাপ্পে নন। তার অবস্থান একটু অন্ধকারে। তার পুরো নাম আঁদ্রে-পিয়েরে ক্রিশ্চিয়ান জিনিয়্যাক। বন্ধু বান্ধবদের কাছে যিনি দ্যেদে নামেই বেশি পরিচিত।
প্রথমে যে ঘটনার কথা বললাম, এটা আমাদের মার্সেই ফ্যান দের কাছে খুব পরিচিত এক দৃশ্য। এখনো চোখ বন্ধ করলে দেখতে পাই তার সেই চোখ ধাঁধানো অগ্নি শট।
তার জন্ম ১৯৮৫ সালের ৫ ডিসেম্বর ফ্রান্সের এক ছোট্ট শহর মার্তিগে তে। খাঁটি ফরাসি তিনি নন। রোমান বংশদ্ভূত। ছোটবেলাতেই ফুটবলে হাতে খড়ি। চার বছর বয়সে নিজের এলাকার ক্লাব ফো তে নাম লেখান। ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত সেখানে কাটানোর পর জয়েন করেন শহরের ক্লাব মার্তিগে তে। ২০০২ পর্যন্ত মার্তিগে তে চলে তার প্রশিক্ষণ। ততদিনে তিনি কিছুটা দক্ষ হয়ে উঠেছেন। এরপর আরো উন্নতির জন্য বাড়ি থেকে ১০০০ কিলোমিটার দূরে বড় ক্লাব লরিয়ে তে যোগ দেন। লরিয়ের ইয়ুথ টিমে রেগুলার পারফর্ম করতে থাকেন।
এরপর ২০০৪-০৫ মৌসুমে কোচ ক্রিশ্চিয়ান গুরকাফের হাত ধরে লিগ টু তে শ্যাতেরোর বিপক্ষে ৭৮ মিনিটে বদলি হিসেবে তার অভিষেক হয়। খেলার পরিস্থিতি তখন ১-১ গোলে সমতা। মাঠে নামার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তিনি গোল করেন এবং দলকে জয় এনে দেন। সেই মৌসুম শেষে লরিয়ে লিগ ওয়ানে প্রমোশন পায়। কিন্তু জিনিয়্যাক দলের সাথে থাকতে পারেননি। লোনে তিনি জয়েন করেন পাউ তে।
পাউ তে তিনি ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো প্রথম এলেভেনে স্থান করে নেন। সেখানে ভালো একটি মৌসুম কাটে৷ সেই সিজনে ২০ ম্যাচ খেলে ৮ গোল করেন। এর মধ্যে তুলোনের বিপক্ষে জোড়া ও শ্যাতেলেরোর বিপক্ষে হ্যাট্রিক ছিলো প্রশংসনীয়।
২০০৬-০৭ মৌসুমে আবারো তিনি লরিয়ে তে ফেরত আসেন। এবার তিনি প্রতি ম্যাচেই শুরুর একাদশে জায়গা পান। প্রতিদ্বন্দ্বী নঁতের বিপক্ষে ২৭ মিনিটে হ্যাট্রিক করেন। সে মৌসুমে লিগে ৩৭ ম্যাচ খেলে ৯ গোল করেন, যা ক্লাব রেকর্ড।
পরের মৌসুমে তার লিলে জয়েন করা নিয়ে অনেক জল্পনা কল্পনার পর অবশেষে ২৫ জুন, ২০০৭ এ চার বছরের চুক্তিতে তিনি জয়েন করেন তৎকালীন লিগ ওয়ানের অন্যতম ক্লাব তুলুসে। লিভারপুলের বিপক্ষে চ্যাম্পিয়নস লিগ কোয়ালিফাইং ম্যাচে তার তুলুসের হয়ে অভিষেক ঘটে, যে ম্যাচে তার দল ১-০ গোলে পরাজিত হয়। সেই সিজন ছিলো তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বাজে সিজন। ওই সিজনে তিনি ২৮ ম্যাচ খেলে মাত্র দুই গোল করেন এবং দল কোনোরকমে রেলিগেশন থেকে বেঁচে যায়।
২০০৮-০৯ মৌসুম খুব ভালো কাটে। সে মৌসুমে তিনি সেপ্টেম্বর ও মার্চ মাসে দুইবার ইউএনএফপি প্লেয়ার অব দ্য মান্থ অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হন। লিগ ওয়ান প্লেয়ার অব দ্য ইয়ারের জন্যও মনোনীত হন, যেটা সেবার ইয়ান গুরকাফের হাতে যায়। লিগের বর্ষসেরা টিমের জন্যও নির্বাচিত হন। সেবার লিগের টপ স্কোরারের অ্যাওয়ার্ডও তার হাতে ওঠে। পরের সিজনও তার ভালোই কাটে। সেবারও তিনি তুলুসের হয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন।
তার অসাধারণ পারফর্মেন্স এর মাধ্যমে তিনি ফ্রান্স জাতীয় দলে ডাক পান। ২০০৯ সালের এপ্রিলে লিথুয়ানিয়ার বিপক্ষে জাতীয় দলে অভিষেক ঘটে৷ তার পাঁচ মাস পর ফারো আইল্যান্ডের বিপক্ষে ফ্রান্সের হয়ে প্রথম গোল করেন। ২০১০ বিশ্বকাপ স্কোয়াডেও তিনি জায়গা পান এবং দলের হয়ে তিন টি ম্যাচের সবগুলিতেই অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু সেবার দলের পারফর্মেন্স একদমই ভালো ছিলোনা। আগের বিশ্বকাপের রানার্সআপ ফ্রান্স সেবার গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয়।
অতঃপর ২০ আগস্ট, ২০১০ এ তিনি জয়েন করেন লিগ ওয়ানের ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন অলিম্পিক ডি মার্সেই এ। দুই মাস পর সেইন্ট এতিয়েনের বিপক্ষে তিনি মার্সেই এর হয়ে প্রথম গোল পান। কুপ ডি লা লিগের সেমি ফাইনাল ম্যাচে তিনি অক্সারের বিপক্ষে গোল করেন। ২০১১ সালের ২৩ এপ্রিল ফাইনালে তিনি পুরো সময় মাঠে থাকেন এবং তার দল মঁপেলিয়ের বিপক্ষে ১-০ গোলে জয় পায়। এবং প্রথমবারের মতো তিনি বড় কোনো ট্রফি জয়ের স্বাদ পান।
পরের মৌসুম টা তার ভালো কাটেনি। বাজে পারফরম্যান্স এর ফলে তাকে মূল টিম থেকে রিজার্ভ টিমে নামিয়ে দেওয়া হয়। ২০১২ সালের ৭ই অক্টোবর লা ক্লাসিকে প্যারিস সেইন্ট জার্মেই এর বিপক্ষে প্রথমার্ধে দুই গোল করেন, যা দল কে ড্র এনে দেয়। সেবার তার করা ১৩ গোল মার্সেই কে লিগে দ্বিতীয় হতে সাহায্য করে। পরের মৌসুমেও তিনি তার ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন। ২০১৩-১৪ মৌসুমে তিনি লিগে ১৬ গোল করেব এবং ইব্রাহিমোভিচের পর যৌথভাবে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকেন। ২০১৪-১৫ তে করেন ২১ গোল এবং এবারও তিনি দ্বিতীয় হন।
মার্সেই এর হয়ে তিনি মোট ১৫৪ ম্যাচ খেলে গোল করেন ৫৯ টা।
পাঁচ বছরের চুক্তি শেষ করে ১৮ জুন, ২০১৫ তে তিনি ইউরোপীয় বিভিন্ন ক্লাবের আগ্রহ উপেক্ষা করে মেক্সিকান ক্লাব ইউএএনএল টাইগ্রিসে জয়েন করেন। সেখানেও তিনি তার পারফর্মেন্স ধরে রাখেন। তিনি তার দল কে কোপা লিবার্তাদোরেসের ফাইনালে নিয়ে যান, সেখানে তার দল পরাজিত হয় আর্জেন্টাইন ক্লাব রিভারপ্লেটের কাছে। সেখানকার ক্লাউসুরায় তিনি ২০১৬ সালের টপ স্কোরার হন। ২০১৫-১৬ কনক্যাকাফ চ্যাম্পিয়নস লিগেও তিনি তার দলকে ফাইনালে তোলেন, কিন্তু এবারও তার সঙ্গী হয় পরাজয়। আমেরিকার বিপক্ষে এগ্রিগেটে দল পরাজিত হয় ৪-১ গোলে।
২০১৬ সালের নিজ দেশে অনুষ্ঠিত ইউরোতে ফ্রান্স দলে ডাক পান। দলের হয়ে সাতটি ম্যাচের মধ্যে ছয়টি তেই খেলেন। তার মধ্যে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে তিনি ছিলেন শুরু থেকেই। ফাইনালে ৭৮ মিনিটে তিনি অলিভিয়ের জিরুর বদলি হয়ে মাঠে নামেন, যে ম্যাচে অতিরিক্ত সময়ে জয় পায় পর্তুগাল, ফ্রান্স হয় রানার্সআপ।
২০১৮ সালের ১৫ই জুলাই  ক্যাম্পেয়ন ডি ক্যাম্পেয়নস (চ্যাম্পিয়ন অব চ্যাম্পিয়নস) ম্যাচে সান্তোস লাগুনার বিপক্ষে ৪-০ গোলে জয় পায় তার দল টাইগ্রিস। তার পরের সপ্তাহে লিয়নের বিপক্ষে গোল করার মাধ্যমে তিনি ক্লাবের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৮১ গোলের মালিক হন। এ মৌসুমেও তিনি লিগে সর্বোচ্চ গোলস্কোরার হন। এখন পর্যন্ত টাইগ্রিসের হয়ে ১৪৮ ম্যাচে ৮৯ গোল করেছেন।
গল্পটা এপর্যন্তই। আর কিছু বলার নেই। গল্পটা ছিলো একজন প্লেয়ারের, যাকে ভালোবাসে মার্সেই, যাকে ভালোবাসে টাইগ্রিস। জাতীয় দলে অনেক ম্যাচ খেললেও কখনো থিতু হতে পারেননি। তিনি মেক্সিকোর নাগরিকত্ব পেয়েছেন, জাতীয় দলের হয়ে খেলার আমন্ত্রণও পেয়েছেন। হয়তো তিনি খেলতে পারতেন, কিন্তু ফ্রান্স ছাড়া অন্য কোনো জাতীয় দলে তিনি খেলতে চান না।
হয়তো আমাদের দেশে তিনি একদমই অজনপ্রিয়। কিন্তু তার আমার মতো কিছু ফ্যান আছে, যারা তাকে আজীবন মনে রাখবে। তার সেই শট গুলো কখনো ভুলবেনা।
যেখানে যে অবস্থাতেই থাকো, ভালো থেকো। সবসময়ের জন্য শুভকামনা।

'প্যাভিলিয়ন ব্লগ’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। প্যাভিলিয়ন ব্লগে প্রকাশিত লেখা, মন্তব্য, ছবি এবং ভিডিওর সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক এবং মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।