• ফুটবল

ফুটবলার হওয়া সহজ, 'মানে' হওয়া কঠিন!

পোস্টটি ২০৮৬ বার পঠিত হয়েছে

দক্ষিণ সেনেগালের পশ্চাদপদ একটি গ্রাম; নাম বাম্বালি। দরিদ্রতা, নিরক্ষরতা আর জীবনমানের অবক্ষয়- হাজার চব্বিশেক মানুষকে করেছে পর্যুদস্ত। এই পরিবেশে বেড়ে উঠছে শতশত শিশু কিশোর; প্রখর রৌদ্র উপেক্ষা করে সোনালী সূর্য অস্তমিত হওয়া পর্যন্ত যারা মত্ত থাকে ফুটবল খেলায়। হোক জরাজীর্ণ রাস্তা, কিংবা এক টুকরো পরিত্যক্ত জমি- ফুটবল খেলতে পারার আনন্দে পরিতুষ্ট ছেলেগুলো!

বিকেল হলেই রাস্তায় ফুটবল খেলতে নেমে পড়া দলের এক সদস্য, ডাকনাম তার সায়িদ। অন্য দশ- বারোটা ছেলের মতোই গড়ন, বিশেষত্বহীন চেহারা, নির্জীব নিষ্ক্রিয় চোখ! ব্যতিক্রম কেবল মনোবলে। সে তার কৈশোরের অস্তিত্ব খুঁজে পায় কেবল ফুটবলে।

সে বড় হচ্ছিলো তার চাচা'দের সাথে। যেহেতু তার অনেকগুলো আপন ভাই- বোন ছিলো, অস্বচ্ছলতার পারিবারে তাই এতোগুলো মানুষের ভরণপোষণ যেন তীরের কাটার মতো বিঁধছিলো সায়িদের বাবার সংসারে। বাম্বালিতে বড় হলেও সায়িদের জন্ম ১৯৯২ সালের ১০ ই এপ্রিলে দক্ষিণাঞ্চলের এলাকা সেধিউ'তে। শিশু সায়িদের পরিচয় আজ অন্যভাবে দেয়া যাক।

সে বর্তমানে আফ্রিকার সবচেয়ে দামি ফুটবলার! ২৭ বছর বয়সী সায়িদ নামের ছেলেটা ফুটবলের মাধ্যমে আজ সারাবিশ্বে নিজের দেশকে প্রতিনিধিত্ব করছে। ইতিমধ্যেই ক্লাবের হয়ে জয় করে নিয়েছে ইউরোপ! আচ্ছা, সায়িদ নাম শুনে কি বিস্মিত হচ্ছেন? তবে ব্যাপারটা ক্লিয়ার করা যাক সেনেগালের পশ্চাদপদ গ্রাম বাম্বালির রাস্তাঘাটে ফুটবল খেলে বেড়ে উঠা সায়িদ নামের ছেলেটিই হচ্ছে বর্তমানের 'সাদিও মানে'!

ফুটবলের হাতেখড়ি এবং প্রারম্ভিক জীবনঃ

বর্তমানে 'ইউয়েফা চ্যাম্পিয়ন লীগ' জয়ী ফুটবলারের ক্যারিয়ারের শুরুটা মোটেও সুখকর ছিলোনা। বিভিন্ন বাধা- বিপত্তি এবং প্রতিবন্ধকতা তার বালক বয়সকে স্তিমিত করে দিয়েছিলো। দূর্বিষহ সেই দিনগুলোর কথা আজকের সুপারস্টার সাদিও মানে ভুলে যান নি। স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে মানে বলেন,

'আমাকে স্কুলে পাঠানোর সক্ষমতা বাবা- মায়ের কখনোও ছিলোনা! প্রতিদিন ভোরে এবং বিকেলে আমি আমার বন্ধুদের সাথে রাস্তায় ফুটবল খেলতে যেতাম। আমি যখন কিশোর, কেবল প্রিমিয়ার লীগের চিন্তা করতাম যা আমি টিভিতে দেখতে পেতাম। শুধুমাত্র প্রিমিয়ারলীগ। এটা আমার কাছে স্বপ্নের মতো ছিলো।'

'২০০২ সালের বিশ্বকাপ পরবর্তী কথা। আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে গ্রামে একটি ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজন করলাম। প্রচন্ড একাগ্রতা নিয়ে আমি খেলতে শুরু করলাম। আমি আমার সেরাটা উপহার দিতে থাকলাম এবং প্রত্যেক ম্যাচেই জিততে থাকলাম। গ্রামের সবাই আমাকে সেরা মনে করতো। কিন্তু আমার পরিবার আমাকে যথাযথ সমর্থন দিচ্ছিলোনা। তারা বরং ধার্মিক ব্যাপারগুলোতে বেশি গুরুত্ব দিতো। তারা যখন বুঝতে পারলো আমার মস্তিষ্ক এবং হৃদয়ে ফুটবল ছাড়া কিছু নেই, আমি তাদেরকে- বিশেষ করে আমার চাচাকে বুঝাতে সক্ষম হলাম। আমি তাকে বললাম, রাজধানী ডাকার সিটিতে যাওয়ার আগে আমাকে অন্যত্র কোথাও যেতে হবে, আমার অনেক কিছুই এখনো শেখার বাকি!'

শুরুতে তারা কিছুতেই মানের এই প্রস্তাবে রাজী ছিলোনা। কিন্তু যখন তারা দেখলো খেলার ব্যাপারে মানে কতটা আগ্রহী, উৎসাহী এবং এটা ছাড়া তাকে দেয়ার মতো তাদের কিছুই নেই, তারা তাকে সাহায্য করলো। মানের বাবা-মা এবং আশ্রয়দাতা চাচা তাদের সকল শস্যপণ্য বিক্রি করে দিলো। মানের প্রতিভা এবং জনপ্রিয়তা এতোটাই ছিলো যে, যারা তাকে চিনেও না, তারাও এগিয়ে আসলো মানে'কে সাহায্য করতে। সবাই চাইছিলো মানে যেন তার একমাত্র লক্ষ্য পৌঁছাতে পারে।

ভাগ্য পাল্টাতে রাজধানীতে মানেঃ

গ্রাম্যজীবনে ফুটবল খেলে অভ্যস্ত সাদিও মানে সুযোগ খুঁজছিলো বাড়তি কিছুর জন্য। গ্রামের রাস্তাঘাটে ফুটবল খেলে বিশেষ কিছু হবেনা এই ভেবে বালক বয়সেই তাকে ছুটতে হয়েছে বেশ দূরের পথ ডাকারের উদ্দেশ্য। ডাকার, সেনেগালের রাজধানী। ভাগ্যের সন্ধানে ডাকার যাওয়ার ঘটনা এখনো স্মৃতিতে ভাসে সাদিও মানের। এক সাক্ষাৎকারে মানে বলেন-

'আমার চাচা ছিলেন আমার সর্বোচ্চ সাহায্যকারী। কিন্তু তিনিই একমাত্র ব্যক্তি ছিলেন না। গ্রামের প্রায় প্রতিটা মানুষ আমাকে অর্থ দিয়ে সাহায্য করেছিলো। আমি যখন রাজধানী ডাকারের পার্শ্ববর্তী একটি এলাকায় বসবাস করতে গেলাম, এমন একটি পরিবারের সাথে আমার পরিচয় হলো যাদের সাথে আমার কোনো পরিচয় ছিলোনা। তাদেরকে আমি কিছু অর্থ অফার করলাম এবং ব্যাখ্যা করলাম কেন আমি এখানে এসেছি। তারা আমাকে ফিরিয়ে দিলোনা।'

সাদিও মানে তার নতুন শহরের সবচেয়ে জনপ্রিয় একাডেমিগুলোর খোঁজ করা শুরু করলো। ডাকার শহরের পার্শ্ববর্তী এলাকায় তখন সবচেয়ে জনপ্রিয় ফুটবল ক্লাবটির সন্ধান পেলো। সে সিদ্ধান্ত নিলো পরেরদিন-ই সেখানে ভেড়াতে যাবে। যেই ভাবা সেই কাজ, পরেরদিন সে সেখানে ঘুরতে গেলো সে। সেখানে তার সাথে কি হয়েছিলো তা শুনুন তার নিজের জবানবন্দিতেঃ

'আমি যখন পরেরদিন সেখানে পৌঁছালাম, আমি দেখলাম দলে ঢুকার জন্য প্রচুর ছেলে সেখানে পরীক্ষা দিচ্ছে। আমি এটা কখনোই ভুলতে পারবোনা, এবং এটা এখন হাস্যকর বটে, আমি যখন সেখানে ঢুকলাম একজন বয়স্ক মানুষ আমার দিকে এমনভাবে তাকালেন যেন আমি ভুল জায়গায় চলে আসছি। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ

- আপনি কি এখানে ট্রায়াল দিতে আসছেন? 
আমি বললাম জ্বি, আমি ট্রায়াল দিতে আসছি। তিনি তাচ্ছিল্যভরে আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন- 
'এই বুট পরে?' তিনি রাগত্ব দৃষ্টিতে জুতা জোড়ার দিকে তাকালেন। আবার জিজ্ঞেস করলেন, 'এই জুতা পরে কিভাবে খেলবে?'

জুতার অবস্থা খুব খারাপ ছিলো। জীর্ণশীর্ণ ধরনের, সেলাই করা এবং পুরাতন৷ বয়স্ক লোকটি আবার জিজ্ঞেস করলেনঃ

- এবং এই শর্ট পরে খেলতে এসেছো? তুমার কি একটা ফুটবল খেলার শর্টও নেই?

আমি উনাকে বললাম, আমি আমার সেরাটা নিয়েই এখানে এসেছি, এবং আমি শুধুমাত্র খেলতে এসেছি, আমাকে চেনাতে এসেছি। তিনি আমাকে সুযোগ দিলেন। খানিক পরেই তার চোখেমুখে আমি খুশির ছাপ দেখতে পেলাম। তিনি আমার কাছে আসলেন এবং বললেন, "আমি তোমাকে সরাসরি দলে নিয়ে নিচ্ছি। ট্রায়াল শেষ হলে আমি তার দলে যোগ দিলাম।

লোকাল ক্লাবের খেলার সুযোগ পেয়ে সাদিও মানে সত্যিকার অর্থেই তার জাত চেনালেন। সেখানে ২ সিজন খেলে মোট ৯০ ম্যাচে ১৩১ গোল করেছিলো সে!

মিরাকল ঘটিয়ে বালক বয়সে ইউরোপ যাত্রাঃ

একজন বালক হিসেবে সেনেগালের টপ লেভেলের তারকা ফুটবলারদের কাছে পৌঁছানোটা খুব কঠিন কাজ ছিলো। কিন্তু তবুও সে যথেষ্টই ভাগ্যবান ছিলো। কারণ অনেকটা মিরাকলের মতোই তখন তার জীবনে ঘটে গেলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ফ্রান্সের একটি স্কাউট দল তখন এসেছিলো সেনেগালের রাজধানী ডাকারে, যেখানে মানে বসবাস করে। তাদের লক্ষ্যে এবং উদ্দেশ্যে ছিলো পিছিয়ে পড়া সেনেগালের সবচেয়ে গরীব এবং ঈশ্বর প্রদত্ত প্রতিভাবান কিশোর ফুটবলারদের বাছাই করা৷ পাশাপাশি, দরিদ্রতার কবল থেকে কিভাবে তাদের মুক্তির পথ দেখিয়ে দেয়া। বাছাইকৃত প্রতিভাবান কিশোর ফুটবলারদের তারা ফ্রেঞ্চ লীগের জন্য প্রস্তুত করছিলো।

সাদিও মানে'র ফুটবল স্কিল দেখে তারা প্রচন্ডভাবে আকৃষ্ট হয়েছিলো। ব্যক্তিগতভাবে তারা মানে'কে আলাদাভাবে যত্ন নিতো। ফ্রেঞ্চ স্কাউট দলের রিপোর্ট বলছিলো, সাদিও মানে হচ্ছে তাদের টিমের সবচেয়ে দরিদ্র এবং ঈশ্বর প্রদত্ত সবচেয়ে প্রতিভাবান ফুটবলার। তাই তারা ফুটবলকে ব্যবহার করলো মানে এবং তার পরিবারকে দরিদ্রতার ভয়ংকর থাবা থেকে রক্ষা করার জন্য। এবং সাদিও মানে দিনদিন নিজেকে চেনাতে শুরু করলো; ফলস্বরূপ তাকে ওই ফ্রেঞ্চ স্কাউটদের সেনেগালীয় একাডেমি 'জেনারেশন ফুট' এ ২ মৌসুম খেলার জন্য বলা হলো।

ইউরোপে মানের সাফল্যেগাঁথাঃ

'জেনারেশন ফুট' তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিলো। এখানের ঈর্ষনীয় সাফল্যে দিনদিন তাকে অপ্রতিরোধ্য করে তুলছিলো। ফলস্বরূপ, মাত্র ১৯ বছর বয়সে তাকে সাইন করায় ফ্রেঞ্চ ক্লাব 'মেটজ'। লীগ-২ এর বাস্তিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের ৭৫ মিনিটে 'ক্যাভিন দিয়াজের' পরিবর্তে মাঠে নামেন সাদিও মানে৷ সে ম্যাচে অবশ্য ১-০ গোলে হেরে যায় তার দল। সেই মৌসুমে ক্লাবের হয়ে মোট ১৯ ম্যাচ খেলেন মানে৷ ওই সিজনে লীগ-২ থেকে 'চ্যাম্পিওনেট ন্যাশনালে' রেলিগেডেট হয়ে যায় তার ক্লাব।

২০১২ সালের ৩১ আগস্ট, মেটজ ক্লাবের ইতিহাসের ৩য় সর্বোচ্চ ট্রান্সফার ফি'র বিনিময়ে অস্ট্রিয়ান বুন্দেসলীগার ক্লাব 'রেডবুল সালসবার্গ' ক্লাবে যোগ দেন সাদিও মানে। প্রথম সিজনেই ক্লাবের হয়ে ৩ টা গুরুত্বপূর্ণ হ্যাট্টিক করেন মানে এবং ক্লাবকে ডমেস্টিক ডাবল শিরোপা জয়ে সাহায্য করেন। ২০১৪ সালের আগস্টের শেষের দিকে তাকে জোরপূর্বক ক্লাব থেকে ট্রান্সফার করে দেয়া হয়! কারণ, ক্লাবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ট্রেইনিং করতে আসেন নি মানে; ম্যাচটি ছিলো চ্যাম্পিয়নস লীগের জন্য কোয়ালিফাইং ম্যাচ!

পরের মাসেই ১১.৮ মিলিয়ন ডলার ট্রান্সফার ফি'র বিনিময়ে চার বছরের চুক্তিতে নাম লেখান ইংলিশ প্রিমিয়ারলীগের ক্লাব সাউদ্যাম্পটনে। অভিষেক হয় দারুণভাবে, আর্সেনালের বিপক্ষে ২-১ গোলের জয়ের ম্যাচে। প্রথম গোল করেন সান্ডারল্যান্ড ৮-০ গোলের জয়ের ম্যাচে! তারপর থেকে নিয়মিতই বিপক্ষের জালে বল জড়াতে থাকেন মানে। মাত্র ২ মিনিট ৫৬ সেকেন্ডে হ্যাট্টিক করে প্রিমিয়ারলীগের দ্রুততম হ্যাট্টিকের মালিক হয়ে যান মানে। পূর্বের রেকর্ডটি ছিলো রবি ফাওলারের, ৪ মিনিট ৩৩ সেকেন্ডের। ২০১৪-১৫ মৌসুমে মোট ৩২ ম্যাচে ১০ গোল করেন সাদিও মানে।

মানের ২০১৫-১৬ মৌসুম শুরু হয় ইউয়েফা ইউরোপা লীগের ম্যাচে ডাবল এসিস্টের মাধ্যমে। লিভারপুলের বিপক্ষে মাত্র ৩৯ সেকেন্ডে লিড এনে দেন ক্লাবে সাফল্যে পাওয়ার পরও খামখেয়ালি আর উশৃংখল মনোভাব তাকে বিপদগামী করছিলো। জানুয়ারিতে নরউইচিয়ের বিপক্ষে ম্যাচ পূর্ববর্তী মিটিংয়ে না আসায়  কোচ রোনাল্ড কোম্যান থাকে দল থেকে বের করে দেন। মার্চে স্টোকসিটির বিপক্ষে স্ট্রেইট লাল কার্ড দেখতে হয় তাকে!

পরবর্তী ৪ মাস কোনো গোল করতে ব্যর্থ হোন মানে! অত:পর ২০ মার্চ লিভারপুলের বিপক্ষে ৩-২ গোলের জয়ের ম্যাচে একাই ২ গোল করেন মানে। পরবর্তী টানা পাঁচ ম্যাচে একটি হ্যাট্টিকসহ ৫ গোল করেন মানে৷ ১৫ গোল নিয়ে মৌসুম শেষে সাউদ্যাম্পটনের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন তিনি।

লিভারপুলে সুপার মানে এবং ইতিহাস সৃষ্টিঃ

২০১৬ সালের ২৮ জুন ৩৪ মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে ৫ বছরের চুক্তিতে অলরেডদের জার্সি গায়ে জড়ান সাদিও মানে। এই ট্রান্সফারটি-ই কোনো আফ্রিকান প্লেয়ারের জন্য ইতিহাসের সর্বোচ্চ ছিলো! আর্সেনালের বিপক্ষে গোল এবং জয় দিয়ে শুরু হয় লিভারপুলে মানের যাত্রা। ১১ ফেব্রুয়ারি টটেনহ্যামের বিপক্ষে ২ মিনিটে ২ টি গোল করে নিজের জাত চেনান আরেকবার। ২০১৭ সালের ২০ এপ্রিল প্রকাশিত 'পিএএফ প্লেয়ার অফ দ্যা ইয়ার' এর সংক্ষিপ্ত তালিকায় নাম উঠে সাদিও মানের। অভিষেক মৌসুমেই অসাধারণ পার্ফমেন্স দেখিয়ে ১৩ গোল করে লিভারপুলের 'প্লেয়ার অফ দ্যা ইয়ার' সম্মাননা লাভ করেন মানে৷

২০১৭-১৮ মৌসুমের প্রথম ম্যাচেই গোল করেন মানে। আগস্ট মাসের তিন ম্যাচের তিনটিতেই গোল করে, সে মাসের প্রিমিয়ারলীগ 'প্লেয়ার অফ দ্যা মান্থ' সম্মাননা লাভ করেন সাদিও মানে। সেপ্টেম্বরে ম্যানসিটির গোলকিপার এডারসনকে আঘাত করায় সরাসরি লাল কার্ড দেখতে হয় তাকে। লিভারপুলের এট্যাকিং লাইন তখন পরিচিতি পায় এক শব্দে, 'ফ্যাভ ফোর'। অর্থাৎ, সালাহ- মানে, ফিরমিনো- কৌটিনিয়ো।

চ্যাম্পিয়নস লীগ ফাইনালের পূর্বে দারুণ এক খবরের শিরোনাম হন অলরেড সুপারস্টার। তার জন্মস্থান সেনেগালের সেধিউ এবং বেড়ে ঊঠার জায়গা বাম্বালির প্রত্যেকটা শিশু কিশোরকে 'সাদিও মানে ১৮' জার্সি উপহার দেন মানে৷ সেখানকার প্রত্যেকটা ছেলে পরিচিতি পায় সাদিও মানে নামে।

২২ নভেম্বর ২০১৮ সালে লিভারপুলের সাথে আবারোও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় চুক্তিবদ্ধ হন সাদিও মানে। মার্চে বার্নলির বিপক্ষে ২ গোল দেয়ার মাধ্যমে অলরেডদের হয়ে ৫০ তম গোলের মাইলফলক স্পর্শ করেন মানে। এরপর অলরেডদের জার্সি গায়ে নিয়মিত গোল করতে থাকেন মানে। ২০ এপ্রিলে 'পিএফএ প্লেয়ার্স প্লেয়ার অব দ্যা ইয়ার' এর ৬ জনের সংক্ষিপ্ত তালিকায় টিমমেট ভ্যান ডাইকের পাশাপাশি নাম উঠে আসে সাদিও মানেরও! পাশাপাশি লিভারপুল টিমমেট আলেক্সান্ডার আরনোল্ড, এন্ড্রু রবার্টসন এবং ভ্যান ডাইকের সাথে 'পিএফএ প্লেয়ার অব দ্যা ইয়ার' এর জন্য মনোনিত হন সাদিও মানে। মৌসুমের শেষ ম্যাচে উলভসের বিপক্ষে ২ গোল করে সর্বমোট ২২ গোল নিয়ে মৌসুম শেষ করেন মানে। এবং সালাহ এবং পিয়েরে আবেমায়েং এর সাথে প্রিমিয়ারলীগের গোল্ডেন বুট  শেয়ার করেন সাদিও মানে।

পুরো মৌসুমে অসাধারণ পার্ফমেন্স করেন সেনেগালীয় এই ফুটবলার৷ লিভারপুলকে চ্যাম্পিয়নস লীগ ফাইনালে উঠতে তার সাহায্য অনস্বীকার্য৷ টানা ২য় বারের মতো চ্যাম্পিয়স লীগ ফাইনালে উঠে জার্গেইন ক্লপের শিষ্যরা। টট্যানহ্যামের বিপক্ষে মাত্র ৩৯ সেকেন্ডেই গোল পেয়ে যায় লিভারপুল, সেখানেও মানের অবদান রয়েছে। তার বাড়িয়ে দেয়া বল সিসিকোর হাত লাগায় পেনাল্টি পায় লিভারপুল এবং গোল করেন মোহাম্মদ সালাহ। অবশেষে ইস্তাম্বুলের সেই স্বপ্নের রাতের পর দীর্ঘদিন পর আবারো চ্যাম্পিয়নস লীগ জয়ের স্বাদ পায় লিভারপুল। ইউরোপ জয়ের ট্রফি উচিয়ে ধরেন সেনেগালী সুপারস্টার সাদিও মানে।

সর্বশেষ ১৪ আগস্ট ইউয়েফা সুপার কাপের ফাইনালে চেলসির বিপক্ষে ২ গোল করেন মানে। ম্যাচটি ২-২ গোলে ড্র থাকায় পেনাল্টিতে গড়ায়। এবং পেনাল্টিশ্যুটআউটে ৫-৪ গোলের জয় পায় অলরেড রা৷ ম্যাচের ম্যান অব দ্যা ম্যাচ নির্বাচিত হন সাদিও মানে।

লাখো আফ্রিকানদের আইডল মানেঃ

একজন সেনেগালীয় প্লেয়ার হওয়া স্বত্ত্বেও বিশ্ব ফুটবলে সাদিও মানে এখন এক অবিস্মরণীয় নাম। লাখো বঞ্চিত আফ্রিকান শিশু কিশোর, যুবকের আইডল সে। চ্যাম্পিয়নস লীগ জয় করে সে কোনো লাক্সারিয়াস ম্যানশন বুক করে হলিডে কাটাতে পারতো। অথচ, সে কিনা চলে যায় তার গ্রামবাসীর কাছে। যেই গ্রামবাসীর কাছে আকাশস্পর্শী মানুষ সে!

লিভারপুল ফুটবল ক্লাবের হয়ে সপ্তাহে $১৬৭ হাজার ডলার আয় করা সাদিও মানে ব্যাক্তি জীবনে দয়ালু। ধার্মীক এবং অত্যন্ত সজ্জন। অঢেল অর্থ আয় করলেও দরিদ্র গ্রামবাসীর কথা সে কখনোই ভুলে যায়নি। তাইতো, ২০১৮ সালে তাদের জন্য $৩০০ হাজার ডলার খরচ করে একটি স্টেডিয়াম বানিয়ে দিয়েছেন সাদিও মানে। পাশাপাশি একটি স্কুল, একটি মসজিদ এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য গ্রামবাসীকে একটি হাসপাতাল নির্মান করে দিয়েছেন!

গ্রামের যে সকল মানুষ তাকে আজ এই পজিশনে নিয়ে আসতে সাহায্যে করেছেন, তাদেরকে কখনোই ভুলে যান নি মানে। উদাহরণ স্বরুপ বলা যায়- লিভারপুলে জয়েন করার পরেই তার গ্রামের প্রত্যেকটা মানুষকে ৫০,০০০ সিএফএ ফ্রাঙ্কস বা ৮৫ ডলার করে উপহার দেন সাদিও মানে।

লিভারপুলে যোগ দেয়ার পর মানে জানিয়েছিলেন ড্রেসিংরুমে তার আলাদা একটা স্পেস লাগবে। কারণ তিনি সালাত আদাত করতে চান। লিভারপুল টিম ম্যানেজমেন্ট তার জন্য ড্রেসিংরুমের সাথে একটা ছোটখাটো মসজিদ বানিয়ে দিয়েছে!

সাদিও মানের মতো প্লেয়ারদের নিয়ে লিখতে বসলে পরিসংখ্যানের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে ইচ্ছে করেনা। এরা গোল মিশিন নয়; তবে ফুটবল বিশ্ব কাঁপিয়ে দেয়ার মতো প্লেয়ার তো বটেই। ফুটবলীয় পরিবার থেকে উঠে আসা কিশোর- তরুণদের জন্য ফুটবলার হওয়া সহজ ব্যাপার, তবে 'মানে' হওয়া কিন্তু যথেষ্ট কঠিন ব্যাপার।

© আহমদ আতিকুজ্জামান।

'প্যাভিলিয়ন ব্লগ’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। প্যাভিলিয়ন ব্লগে প্রকাশিত লেখা, মন্তব্য, ছবি এবং ভিডিওর সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক এবং মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।