• ফুটবল

নেইমারের "১০০"

পোস্টটি ২৭৬৮ বার পঠিত হয়েছে

মিডিয়ায় নেইমারের নাম আলোচনায় আসে অনেক ছোটবেলাতেই, একাডেমি'র মাঠে পিচ্চি এক ছেলের স্কিল গতি আর ফুটবল সেন্স দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন অনেকেই; সেই সময় থেকেই নেইমার'কে ব্রাজিলের ভবিষ্যৎ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন অনেকেই!

১৭ বছর বয়সে সান্তোসের সিনিয়র টিমে অভিষেক হওয়ার সাথেই ডাক পেয়েছিলেন হলুদ জার্সির অ-১৭ দলে, এরপরে খেলেছেন অ-২০ দলে।

হলুদ জার্সিতে আর সান্তোসের সিনিয়র দলে নেইমারের পারফরম্যান্সে মুগ্ধ ছিলো ব্রাজিলবাসী; গ্লোবো এক নিউজে জানিয়েছিলো তৎকালীন ব্রাজিল কোচ কার্লোস দুঙ্গা'র কাছে প্রায় ১০ হাজার চিঠি এসেছিলো নেইমার'কে '১০ বিশ্বকাপের দলে অন্তর্ভুক্ত করার জন্যে। দুঙ্গা তা কানে না নিলেও, এটি অনুমেয়ই ছিলো যে '১০ পরবর্তী সময়ে নেইমার'ই হবেন ব্রাজিলের কান্ডারী! তবে জাতীয় দলের ডাক যে এত দ্রুতই পাবেন তা হয়তো স্বয়ং নেইমার'ও ভাবতে পারেননি! '০৬ বিশ্বকাপের পরে ব্রাজিলের প্লেয়িং স্টাইল পাল্টিয়ে দুঙ্গা যে ঐতিহাসিক ভুল করেছিলেন, সম্ভবত তার স্বীকৃতি মিলে ২০১০ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের হতাশাজনক পারফরম্যান্সে!

ব্রাজিলের স্বর্ণালি যুগ পরবর্তী প্রথম দলের এমন হতশ্রী পারফরম্যান্স হতবাক করেছিলো পুরো ব্রাজিলবাসী কিংবা বিশ্বব্যাপী ব্রাজিল ভক্তদের! খেলায় ছন্দ নেই, ঐতিহাসিক সাম্বা নেই, দুঙ্গা'র "সৌন্দর্য নয়, জয়'ই মুল" ফিলোসোফি তখন পুরোপুরি ব্যার্থই নয় কেবল, বরং সমালোচনা আর আফসোসের চরম পর্যায়ে!

ব্রাজিল'কে ঘুড়ে দাঁড়ানোর প্রত্যয় নিয়ে দায়িত্ব দেওয়া হয় মানো মেনেজেস কে; যিনি প্রথম এসাইনমেন্টেই বিশ্বকাপ দলের ২০ জনকে বাদ দিয়ে গড়েন তারুণ্য নির্ভর এক দল; যেই দলের সকল আশা প্রত্যাশা পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে একজন - মাত্র ১৮ বছর বয়সী সান্তোসের নেইমার জুনিয়র!

২০১০-২০১৯, খেলে ফেলেছেন ৯৯ টি ম্যাচ; ১৮ বছরের সেই নেইমার জুনিয়র এখন ম্যাজিকাল ফিগার ১০০ তম ম্যাচ খেলার দ্বারপ্রান্তে!

১০০ তম ম্যাচ খেলার দ্বারপ্রান্তে এসে, ব্রাজিলের প্রতি নেইমারের ডেডিকেশন, দলের প্রতি নেইমারের ভালোবাসা আইকনিক। ১০০ তম ম্যাচ খেলার বন্ধুর পথে দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন নেইমার। ১০০ তম ম্যাচ খেলার দ্বারপ্রান্তে এসে, নেইমার'কে নিয়ে ব্রাজিল ভক্তদের উচ্ছাসের জায়গার চাইতে আফসোসের জায়গাই সম্ভবত অনেক বেশি! কিন্তু এটাও সত্য সমালোচক'দের কাছে গত ১০ বছরে ব্রাজিলে নেইমারের বিকল্প একজন'ও আসেনি!

হলুদ জার্সিতে নেইমার যেনো অপ্রতিরোধ্য, অনন্য অসাধারণ! ৫ তারকা খঁচিত এই জার্সি গায়ে দিলেই নেইমার যেনো পালটে যায় অগ্নিমূর্তি রুপে! নেইমার এখন ব্রাজিলের ৩য় সর্বোচ্চ গোলদাতা, আর ১ ম্যাচ খেললেই বনে যাবেন ব্রাজিলের হয়ে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলার তালিকায় ৬ষ্ঠ, করে ফেলবেন সবচেয়ে কম বয়সে ব্রাজিলের হয়ে ১০০ ম্যাচ খেলার রেকর্ড (২৭ বছর ২৪৮ দিন), ব্রাজিলের হয়ে সবচেয়ে কম সময়ে ১০০ ম্যাচ খেলার রেকর্ড (৯ বছর ৬১ দিন)!

এই স্ট্যাট গুলো হয়তো কখনোই একজন নেইমার'কে সঙ্গায়িত করতে পারবেনা! হলুদ জার্সির নেইমার কে সঙ্গায়িত করতে আপনাকে উপলব্ধি করতে হবে, গত ১০ বছরে কি পরিমাণ সমালোচনা, মিডিয়া আর দেশবাসীর চাপ, ইঞ্জুরির মাঝে দিয়ে নিজের ক্যারিয়ারকে এগিয়ে নিয়ে আজ ১০০ ম্যাচ খেলার দ্বারপ্রান্তে নেইমার!

২০১৩ কনফেডারেশন্স কাপ এখন পর্যন্ত নেইমারের সবচেয়ে সফলতম টুর্নামেন্ট; খেলেছিলেন দুর্দান্ত প্রতাপে, নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে! একইসাথে দেখিয়েছিলেন ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন! কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, ব্রাজিল বিশ্বকাপ নেইমার কে উপহার দিলো ইঞ্জুরি নামক বিভিষীকা!  চিকিৎসক বলেছিলেন, জুনিগা'র সেই আঘাত আরেকটু নিচে লাগলেই চিরদিনের জন্যে পঙ্গুত্ব বরণ করতেন নেইমার!

১৮ বিশ্বকাপের আগ মুহুর্ত, নতুন করে আবারো স্বপ্ন দেখাচ্ছিলেন নেইমার! বিশ্বকাপের আগ মুহুর্তে এসে ইঞ্জুরিতে পড়েন নেইমার! প্যারিসের অনিচ্ছা সত্ত্বেও পুরোপুরি সেরে উঠার জন্যে অপারেশন করান; ক্যারিয়ার রিস্ক আছে, জেনেও কেবলমাত্র দেশের হয়ে বিশ্বকাপ খেলবেন বলে নেইমারের বিশ্বকাপের আগের ৩ মাসের ইঞ্জুরি থেকে রিকভার করার জন্যে যে প্রচেষ্টা আর পরিশ্রম দেখিয়েছিলেন তা নেইমারের ডেডিকেশনের অনন্য দৃষ্টান্ত! চিকিৎসকের ভাষায়, নেইমারের স্বদিচ্ছা ছিলো বলেই এত দ্রুত রিকভার করা সম্ভব ছিলো! ইঞ্জুরি থেকে সদ্য মাঠে ফিরা নেইমার এবারও পারলেন না!

২০১৯ ঘরের মাঠে কোপা আমেরিকা খেলবেন বলে প্রস্তুত হচ্ছিলেন; ইঞ্জুরির কষাঘাতে আবারো স্বপ্নভঙ্গ নেইমারের!

দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ না থাকার অভিযোগ উঠেছে, ট্যাক্স ফাঁকির মামলা পেয়েছে, মিথ্যা রেইপ কেসে ফাঁসতে হয়েছে, বোন কে জড়ায়ে অশালীন সংবাদ বেড়িয়েছে! গত ইঞ্জুরি থেকে উঠার পর ডাক্তার বলেন, নেইমারের মেটাটারসেল নাকি ভবিষ্যতেও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে। এরপরেও নেইমার দমে যাননি! এখনো ব্রাজিলবাসীর স্বপ্নদ্রষ্টা হয়ে ব্রাজিলকে প্রতিনিধিত্ব করছেন পাঁচ তারকা খচিত জার্সি গায়ে! নেইমার বারেবারে ফিরে এসেছেন, বারেবারে নতুন করে স্বপ্ন দেখিয়েছেন, সমালোচনার জবাব দিয়েছেন, পারফর্ম করেছেন!

নেইমার নামক আশা প্রত্যাশার সাথে প্রাপ্তি'র সমীকরণ মিলানো হয়তো কঠিন; কিন্তু নেইমার নামক একজন ব্রাজিলিয়ান যোদ্ধার প্রতি ভালোবাসা সম্মান আর চাওয়ার কোন শেষ হয়না, যিনি গত ১০ বছর ধরে ব্রাজিলের জার্সিতে ব্রাজিল'কে তার সর্বোচ্চটুকু দিয়ে যাচ্ছেন, ভক্তদের উচ্ছাসে মাতাচ্ছেন, প্রিয় দল ব্রাজিল'কে এগিয়ে নিচ্ছেন! ব্রাজিলবাসীর পরম আরাধ্য অলিম্পিক জিতিয়েছিলেন কড়া সমালোচনা আর দুয়ো উপেক্ষা করে, কিংবা সেলেসাওদের হয়ে ১০ বছর যাবৎ ধারাবাহিক পারফরম্যান্স হয়তো এই মুহুর্তে নেইমার কে ব্রাজিলের সর্বকালের সেরাদের তালিকায় রাখা নিয়ে দ্বন্দ হতে পারে; কিন্তু নেইমার ব্রাজিলের ইতিহাসের অন্যতম সেরা পারফর্মার, এ নিয়ে বোধ করি কারোই সন্দেহ থাকার কথা না!

নেইমারের ১০০ তম ম্যাচ খেলার দ্বারপ্রান্তে এসে, কেবল প্রার্থনা করি, সৃষ্টিকর্তা যেনো মানুষ'টার প্রতি একটু সন্তুষ্ট হয়, তাকে সুস্থ রাখে! স্বপ্ন দেখি তাহলেই হয়তো, নেইমার নামক আশা প্রত্যাশার সাথে প্রাপ্তির খাতাটা পুরোপুরি মিলবে; একদিন হয়তো নেইমার কে ব্রাজিলের ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় বলায় আর কোন দ্বন্দ্ব থাকবেনা; ব্রাজিলবাসী তথা নেইমারের বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন পুরণ হবে, কিংবা ব্রাজিলের ট্রফি খাতায় আরো প্রাপ্তি যোগ হবে!

নেইমারের ১০০ তম ম্যাচ খেলার দ্বারপ্রান্তে এসে, কেবলই শুভকামনা! আর আশা, মানুষ'টা সফলতার সহিত হলুদ জার্সিতে আরো ৫০-৬০ টি ম্যাচ খেলবেন, নিজের ক্যারিয়ার সমৃদ্ধ করবেন!

শেষ করব নেইমারের একটা উক্তি দিয়ে - ”I dedicate myself to be with the national team, & i did my maximum to help.. Everytime I come back to the national its different. Its hard to describe the happiness to wear this shirt..” ❤

#NeymarJr.100

 

 

'প্যাভিলিয়ন ব্লগ’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। প্যাভিলিয়ন ব্লগে প্রকাশিত লেখা, মন্তব্য, ছবি এবং ভিডিওর সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক এবং মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।