• ফুটবল

পরম্পরায় নতুনের স্বপ্ন বুনছে নরওয়ে

পোস্টটি ২৪৭২ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

স্কটিশ ব্যান্ড Wet wet wet টানা ১৫ সপ্তাহ Uk single chart এর শীর্ষে, অস্কার প্রতিযোগিতায় ফরেস্ট গাম্পের মোট ৬ টি বিভাগে শ্রেষ্ঠত্ব লাভ, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের ঐতিহাসিক অস্ত্র বিক্রি বন্ধের আইন; ১৯৯৪ সাল'টা নানাবিধ কারণেই ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয়!

ফুটবলের মাঠ'ও কম যায়না; ব্রাজিলের ৪র্থ বিশ্বকাপ জয়, রোমারিও বেবেতোদের অসাধারণ পারফরম্যান্স, একই বছরে বার্সেলোনার বুলগেরিয়ান ফুটবলার রিস্টো স্টইচকভে'র ব্যালন ডি অর জয়, '৯৪ ক্যালেন্ডারে ফুটবলের উল্লেখযোগ্য ঘটনা!

কিন্তু ফুটবলের অন্য একটি গল্প হয়তো এখানে সবার নজর এড়িয়ে যায়; নরওয়ে, মাত্র ৪.৩ মিলিয়ন জনসংখ্যার একটি দেশ প্রথমবারের মতো ফিফা ওয়ার্ল্ড র‍্যাংকিংয়ের ৪ এ উঠে যায়, এই সাফল্যকে আপনি কোনভাবেই অপ্রত্যাশিত বলে আখ্যায়িত করতে পারেন না।

এগিল ওলসেন, এই নরওয়েজিয়ান প্রথমে নরওয়ে জাতীয় ফুটবল দলের ভিডিও এনালাইসিসের দায়িত্ব পালন করলেও পরবর্তীতে বনে যান নরওয়ের ফুটবলকে বদলে দেওয়ার কারিগর!

ওলসেন; যিনি কোচিং স্টাফে এসেই নিজের দর্শন দিয়ে বদলে দেন সবকিছু। তিনি মনে করেছিলেন- তার দলের খেলোয়াড়দের উপরের সাড়ির দলগুলোকে হারানোর সামর্থ্য নেই, সুতরাং ভালোকিছু করতে হলে অন্য পদ্ধতিতে এগুতে হবে, মাঠের খেলায় কিংবা মাঠের বাইরের খেলায় স্মার্টনেসের পরিচয় দিতে হবে! ওলেসেনের 'স্মার্টনেস' নামক দর্শনের কয়েকটি নীতির মাঝে মুল কথাটি ছিলো ‘å være best uten ball’, যাকে ইংরেজিতে অনুবাদ করলে অর্থ দাড়ায় 'to be the best without the ball’! অর্থাৎ, বল পায়ে নানান কৌশলে অন্যদের চাইতে এগিয়ে থাকার বদলে দৌড়ের দ্রুতগামীতায়, শূণ্যে লাফানোর ক্ষিপ্রতায় অন্যদের চাইতে অনেক বেশি এগিয়ে থাকার কৌশলকেই বেঁছে নিয়েছিলেন ওলেসেন! মাঠের খেলা কিংবা খেলোয়াড় নির্বাচন, সবখানেই ওলেসেনের এই দর্শন সফলতার মুখ দেখে।

জোস্টেইন ফ্লো'র কথাই বলা যায়, ৬ ফুট ৪ ইঞ্চির এই খেলোয়াড়কে একজন ওয়াইড উইঙ্গার হিসেবে খেলাতেন ওলসেন, নিজেদের হাফে বল থাকলে একটু নিচে নামা, বল রিসিভ করেই দ্রুতগতিতে কাউন্টার এটাক! এমন নানান কৌশলে সফলতার মুখ দেখা ওলসেন দ্রুতই পেয়ে যান 'দা প্রফেসর' খেতাব!

রেংকিং এ ব্যাপক উন্নতি, ৫৬ বছর পর বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই, পরের বিশ্বকাপেই নিজেদের সর্বোচ্চ সাফল্য বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠা কিংবা প্রথমবারের মতো ইউরো তে কোয়ালিফাই; ৯০'র দশকে একজন একরোখা কিন্তু অতুলনীয় আর অপ্রতিম ওলসেনের হাত ধরে একটা অনন্য জেনারেশন তৈরি হয়! ঠিক যেনো অপ্রস্তুত এক ফুলের বাগানে হঠাৎ করেই অসংখ্য ফুলের প্রস্ফুটন, আর তার সুবাসে কেবলই মুগ্ধতা চারিদিক!

নরওয়েজিয়ানরা ফুটবলে যেনো স্বর্ণালি এক অধ্যায় পাড়ি দিচ্ছিলো! সেই সময় ইউনাইটেড, লিভারপুল কিংবা টটেনহামের মত ক্লাবের বাড়তি আকর্ষণ তৈরি হয়েছিলো নরওয়ের খেলোয়াড়দের প্রতি। নরওয়ে ফুটবলের সোনালী যুগে ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগ আর নরওয়ের মাঝে নিবিড় এক সম্পর্ক তৈরি হয়!

জলপথে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যেমন অতর্কিত এবং সফল সব হামলা চালিয়ে অপ্রতিরোধ্য, শারীরিকভাবে প্রচন্ড শক্তিশালী, দীর্ঘকায় ও কষ্ট সহিষ্ণু স্ক্যান্ডানেভিয়া তথা নরওয়ের ভাইকিং'রা যেমন নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলো, ৯০’র নরওয়েজিয়ান'রাও যেনো ঠিক তেমনই ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগে জায়গা কাড়তে শুরু করে আর নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করতে থাকে!

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে ওলে গানার সলশেয়ার ও রুনি জনসেন, লিভারপুলে ইঞ্জে বিজনবিয়ে ও আইভিন্ড লিওনহার্ডসেন, লিডস ইউনাইটেডে আলফি হলান্ড ও গানার হলে, শেফিল্ড ইউনাইটেডে জোস্টিন ফ্লো, টটেনহাম হটস্পার্সে ফ্রোয়েড গ্রোডেস, স্টিফেন এভারসেন ও এরিক থারস্টভেড, চেলসি তে আরলেন্ড জনসেন ও তোরে আন্দ্রে ফ্লো, সাউদ্যাম্পটনে এগিল ওস্টেনস্টাড পারফরম্যান্সের সুবাতাস ছড়াচ্ছিলেন নিয়মিত!

অথচ দশকের শেষে একদিকে সাম্প্রতিক সময়ের তারকারা অবসরে যেতে শুরু করে, আর অন্যদিকে নরওয়ে ফুটবলের আকাশের আলো'ও যেনো ধীরে ধীরে নিভিয়ে যেতে শুরু করে!

'৯০ এর দশকে প্রথমবারের মত বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া, ইউরো তে অংশ নেওয়া কিংবা বেশ কয়জন খেলোয়াড়ের চ্যাম্পিয়নস লীগ জয়ের মত সোনালি সময় পার করা নরওয়ে যেনো নতুন শতকের শুরুতে একদম মুদ্রোর উল্টোপিঠ দেখতে শুরু করে! ২০১০'র শেষের দিকে ফিফা রেংকিংয়ে ৩২ তম অবস্থানে পৌছায় নরওয়ে, যা একটা সময়ে ৮৫ তে অবনমন হয়! ব্রাজিল কিংবা জার্মানির সাথে রেংকিং এ টক্কর দেওয়া নরওয়ের সহাবস্থান দাড়ায় জ্যামাইকা, সৌদি আরব কিংবা পানামা'র মতো স্বল্প শক্তির ফুটবল দেশের সাথে!২০০০ ইউরো'র পরে নরওয়ে আর কোন মেজর টুর্নামেন্টে কোয়ালিফাই করতে পারেনি!

প্রায় দেড় যুগ পর নরওয়ে ঘুড়ে দাড়ানোর স্বপ্নে বিভোর, ফুটবলে আবারো সেই সোনালী সময়কে ফিরিয়ে আনতে প্রত্যয়ী! ফুটবল বিশ্বে এমন ঘটনা বিরল নয় যেখানে, বইয়ের পাতায় পিতার রেখে যাওয়া পুর্ণ কিংবা অপুর্ণ অধ্যায় থেকেই শুরু করে তাদের সন্তানেরা, লিখেন নিজের গল্প! সিজার - পাওলো মালদিনি, জোয়ান - জর্দে ক্রুইফ সহ অসংখ্য নাম উল্লেখ করা সম্ভব! নরওয়েজিয়ান'রাও তাদের ৯০ এর দশকের সোনালী অতীত ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন বুনছে ৯০'র তারকাদের বংশধরদের কাছে! কারো সন্তান, কারো বা ভাগ্নে, '৯০ এর তারকাদের বংশধরদের কেউ নরওয়ে ফুটবলে এখন পরিচিত নাম কেউবা উঠতি তারকা হিসেবে রয়েছেন সকলের নজরে! তাইতো কেবল '৯০ কে ফিরিয়ে আনার স্বপ্নই নয়, বরং '২০ এর প্রজন্মের মাঝে '৯০ কে ছাপিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন'ও বুনতে পারেন নরওয়েজিয়ানরা!

সাবেক নটিংহ্যাম তারকা ডিফেন্ডার লার্সের ছেলে এমিল বোহিনেন, সাবেক স্পার্স গোলকিপার এরিকের ছেলে ক্রিস্টিয়ান থ্রোসভেড, সাবেক উইম্বলডন মিডফিল্ডার স্টেলের ছেলে মার্কোস সোলবাকেন, রেনেস মিডফিল্ডার কেটিলের ভাগ্নে থমাস রেকডাল গত ৪/৫ বছর ধরে নরওয়ের বয়সভিত্তিক দলগুলোতে একসাথে নিয়মিত খেলে যাচ্ছেন! এছাড়াও নরওয়ের লীগে নজরকাড়া পারফরম্যান্স করে যাচ্ছেন নিয়মিতভাবেই!

সবার মাঝে একজনের নাম বিশেষভাবে নিতে হয়, যিনি সাবেক লিডস ও ম্যানচেস্টার সিটি ডিফেন্ডার আলফি হলান্ডের ছেলে আর্লিং ব্রাউট হলান্ড! অ-২০ বিশ্বকাপের এক ম্যাচে হন্ডুরাসের বিপক্ষে ম্যাচে একাই ৯ গোল করে সবার নজর কেড়েছিলেন যিনি, চ্যাম্পিয়নস লীগ অভিষেকেই হ্যাট্রিক, বুন্দেসলীগা অভিষেকেই হ্যাট্রিক; অনবদ্য পারফরম্যান্সে হলান্ড এখন বিশ্ব ফুটবলের হটকেক!

কেবল '৯০র বংশধরেরাই নয়, মার্টিন ওডেগার্ড, সেন্ডার বার্গ, মার্টিন থর্সবি, মলার ডাহলি'দের সক্ষমতা কিংবা সামর্থ্য লক্ষনীয়! ফুটবল স্কাউটদের কাছে পরিচিত নাম এই নরওয়েজিয়ান'রা! যার ফলস্বরূপ সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপের বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্টেও আশাব্যঞ্জক ফলাফলের ছোঁয়া পেয়েছে নরওয়ে!

স্পেন কিংবা ইতালির মতো প্রতিভাবান উইংগার কিংবা মিডফিল্ডার হয়তো প্রডিউস হচ্ছেনা, তবে দৈহিক গড়নে শক্ত সামর্থ্য কিংবা দীর্ঘকায় গড়নের একটা প্রজন্ম তৈরি করছে নরওয়ে, যাদের নিয়ে স্বপ্ন দেখা যায়! ৬ ফুটের উপরে উচ্চতার হলান্ড কিংবা থ্রোসভেট কিংবা অন্যান্যরা তারই বার্তা দেয়; যেনো '৯০র ওলসেনের দর্শনের রূপকায়ন!

ঐতিহাসিক ভাবে ছোট অথচ সম্পদশালী দেশগুলো বৃহৎ জনসংখ্যার ব্রাজিল কিংবা আর্জেন্টিনার মতো ওয়ার্ল্ড ক্লাস ফুটবলার তৈরি করতে পারেনি! এরপরেও নরওয়ের মতো ছোট দেশে কিভাবে এতগুলো ট্যালেন্টের খোঁজ মিলছে, প্রশ্নটা যখন উঠে আসে তখন উত্তর মিলে সেই '৯০র প্রজন্মের মাঝেই! এই দশকের সফলতার পর, হুট করেই ব্যাপক অবনতি, নরওয়ে ফুটবল কর্তৃপক্ষের বোধদয় হয় যে বৃহৎ পরিকল্পনা ছাড়া কিছুতেই ফুটবলে স্থায়ী উন্নয়ন সম্ভব নয়! উন্নত কোচিং স্টাফ কিংবা অধিকতর সুযোগ সুবিধা আর '৯০র প্রেরণাই নরওয়ের পাইপলাইনকে করেছে সমৃদ্ধশালী; সাহস যুগিয়েছে নতুন করে স্বপ্ন দেখার, নতুন সফলতাকে ছুঁয়ে দেখার ইচ্ছা পোষণ করার!

এই মুহুর্তে ২০২০ ইউরো টুর্নামেন্টে কোয়ালিফাই করার এক ধাপ দুরে নরওয়ে; প্লে অফে সার্বিয়া বাঁধা দুর করলেই মিলবে টিকেট! হলান্ড, স্যান্ডার বার্গ, জোনাস সেভেন্সন, ক্রিস্টোফার, ওলে সেলনায়েস দের নিয়ে গড়া স্কোয়াড নিয়ে নরওয়েবাসী ইউরো খেলার স্বপ্ন দেখতেই পারে! নরওয়ে যেভাবে এগুচ্ছে হয়তো ২০২২ কাতার বিশ্বকাপেও নিজেদের পতাকা উড়াতে পারে নতুন প্রজন্মের এই খেলোয়াড়েরা!

এই মুহুর্তে স্ক্যান্ডিনেভিয়া অঞ্চলের ছোট্ট দেশ নরওয়ে যেনো গ্রীক দার্শনিক প্লেটো'র একটি উক্তিকেই ধারণ করছে - There is no harm in repeating a good thing!

নরওয়ের ফুটবল এগিয়ে যাক; নতুন প্রজন্মের হাত ধরে '৯০র সফলতাকেও ছাঁপিয়ে যাক, ফুটবল বিশ্বে নতুন এক অধ্যায় রচিত হোক; একজন ফুটবল অনুরাগী হিসেবে এইটুকুই প্রত্যাশা!