• ক্রিকেট

চা বিরতি;ব্যাট ও বলের দৃষ্টিতে ক্রিকেটের তিন ফর্মেট

পোস্টটি ১৪০৫ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

টেস্ট ম্যাচ চলছে। চা বিরতির আগে আর তিন বল বাকি।এর মধ্যে ওভারের চতুর্থ বলটা শর্ট পিচ হওয়াতে ব্যাটসম্যান হুক খেলতে চেয়েছিল;প্রত্যাশার চাইতে বল জোরে আসায় হেলমেটের গ্রিলের ভেতর দিয়ে তার মুখে আঘাত করে। তাকে হাসপাতালে যেতে হয়েছে, কিন্তু পিচের উপর আহত হয়ে পড়ে থাকা অবস্থায় যে রক্তক্ষরণ হয়েছিল সেটুকুর কোন সদগত হয়নি। রক্ত ঝড়াতে পেরে বলটি নিদারুণ খুশি। হেলমেটকে উপহাস করে সে বলল,"কি! পারলে নাতো ব্যাটসম্যানকে রক্ষা করতে।আমাকে যখন ব্যাট দিয়ে আঘাত করে আমারও এতোটাই কষ্ট হয়, পার্থক্য ব্যাটসম্যানের রক্ত দেখা যায় আমার রক্ত না থাকায় চোখে পড়ে না।" "একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে না। ৪০ বছর ধরে ব্যাটসম্যানরা আমাকে নিয়মিত ব্যবহার করছে, দীর্ঘ পরিক্রমায় তুমি কতবার আমাকে ধোঁকা দিয়ে ব্যাটসম্যানকে আঘাত করতে পেরেছ?" হেলমেট একনাগাড়ে বলতে থাকে। "তোমার চিন্তা ভাবনায় সমস্যা আছে। দেখো তোমার কর্তব্য হচ্ছে ব্যাটসম্যানের ব্যাটের সাথে লড়াই করা। ব্যাটসম্যান যদি তোমার প্রতি দরদ দেখাতে শুরু করে এবং প্রতি বলে ডিফেন্স করে, তাহলেতো খেলাটার মৌলিক জায়গাটায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মাছ খাওয়ার কারণে মাছেরা অভিশাপ দিচ্ছে এটা ভেবে মানুষ যদি মাছ খাওয়া ছেড়ে দেয় তবে ভেবে দেখো মাছকেও তখন জলজ উদ্ভিদকণা খাওয়া বন্ধ করে দিতে হবে একই যুক্তিতে। ফলে সমস্ত প্রাণী জগৎ ৩-৪ দিনের মধ্যে খাদ্যাভাবে বিলুপ্ত হয়ে যাবে।" নতুন ব্যাটসম্যান এসে টানা দুটি চার মারলো; ব্যাটের আঘাত গায়ে লাগবার পূর্বমুহূর্তে বলটি হেলমেট কে বলে গেল, "এত জোরে আমাকে আঘাত করায় দর্শকেরা কত খুশি, এই নিষ্ঠুরতার জবাব আমি সুযোগ পাওয়া মাত্রই দিব।" হেলমেট থাকে সীমানার রাস্তা দেখিয়ে বলে,"আগে বাউন্ডারি থেকে ঘুরে আসো; জবাব-টবাব পরে দেখা যাবে।" বল চলে গেলে ব্যাট যোগ দিল হেলমেটের সঙ্গে, "ব্যাটসম্যানটা কাজের না, একটু জোরে চালালে কিন্তু আমি বলটাকে গ্যালারির মধ্যে পাঠিয়ে দিতে পারতাম; শক্তিশালী কাউকে দরকার।" হেলমেট তাকে থামিয়ে দিল,"অত কথা বলো নাতো। যত্তসব মূর্খ।"

2514

এই বলটির পরেই আম্পায়ার চা বিরতির ঘোষণা দিল। এই বিরতির সময় ব্যাট সাহেব বলকে ডেকে পাঠাল।বল আসা মাত্র ব্যাট বলল,"দেখ,ক্রিকেটের হাতেখড়িই হয়েছে আমার আর তোমার হাত ধরে।এই হেলমেট এসেছে বহু বছর পড়ে।সুতরাং, এই শত্রুতা আমাদের মাঝে মানায় না।আমাদের একে অপরের পাশে থাকা উচিত।দেখেছো অল্পকদিনের এই পুঁচকে হেলমেট আমাদের সাথে কেমন ব্যাবহার করছে?" "হুম,ঠিকই বলেছ। আজ থেকে আমরা মিলেমিশে থাকব। তোমার দুঃখ গুলোও জানা দরকার।তোমার সাথে গল্প করা হয়না কখনো।চল,এই চা বিরতিতে আমরাও একটু চা খেয়ে আসে,সাথে আড্ডাও হল।কি বল?",একনাগাড়ে বলে গেল বল। ব্যাট সম্মতি জানি বলল,"হুম,চল।একটা কথা,দুজনের জন্মই যেহেতু একই সময়ে;সুতরাং আমরা সমবয়সী।আজ থেকে আমরা বন্ধু।তুমি নয়,তুই করে বললে কি রাগ করবে?" "আরে না,এটাই ত বন্ধুত্বসুলভ শব্দ।",চায়ের অর্ডার দিতে দিতে বলল বল।

4b90cb92-02ad-437c-a70a-6341014c6242.width-800

ব্যাট:আচ্ছা,ক্রিকেটের কোন ফর্মেটটাতে তোর বেশি কষ্ট হয়?

বল:টি-২০ ভাই।একটা মুহুর্তেও আমাকে ডিফেন্স করে না।একনাগাড়ে মারতেই থাকে।আমার ভেতরে কি যে কষ্ট হয় সেটা কেও বুঝে না।

ব্যাট:তোর কথাই ভাবলি শুধু।আমারও এই ফর্মেটে খুব কষ্ট হয়।তুই যখন অনেক জোড়ে তেড়ে আসিস,তখন তোকে আঘাত করতে আমার সারা শরীর কেপে উঠে।আর এই ফর্মেটে প্রতিটি বল এভাবেই আঘাত করতে হয়।ভয়ে থাকি,কখন দুটুকরো হয়ে আমার মৃত্যু হয়।

বল:টি-২০ তে কাকে বেশি ভয় পাস?

ব্যাট:ঐযে ক্যারিবিয়ান দানব একটা আছেনা আন্দ্রে রাসেল;তাকে।তুই আসিস ১৪০ কিঃমিঃ বেগে, আর এই দানব আমাকেই ঘুরাতে থাকে তার চেয়েও দ্রুত গতিতে।শরীরটা পুরাই থ্যাতলে দেয়।ভাবি কোন সময় তার হাত ফসকে আমিই ছয় হয়ে যায়।

বল:নামটা ঠিকই বলেছিস।তোকে দিয়ে আমাকে এত জোরে আঘাত করে,ভেতরে রক্ত যা থাকে তাও আমার জমাট বেধে যায়। ভয়ে রক্তশুন্যতাই ভোগতে থাকি।

27de-villiers1

ব্যাট:ওডিআই ফর্মেটটা কেমন লাগে তোর?

বল:ভালই।আমাকে সময়ে সময়ে ডিফেন্স করে,অবহেলা করলে আঘাত করে।একটা ব্যালেন্স থাকে।কিন্তু এই ফর্মেটে একজন ব্যাটসম্যান আমার মানসম্মান কিছুই বাকি রাখে নি।আমি পিচের যেখানেই পড়িনা কেন এই এবি ডিভিলিয়ার্স ছেলেটা শুয়ে,বসে যেভাবেই হোক আমাকে সীমানা ছাড়া করবেই,কি দ্রুত ৫০,১০০,১৫০ করে ফেলছে। দর্শকদের আনন্দ দেখলে তখন আমার গা জ্বলে।

ব্যাট:হা হা হা।বন্ধু,সত্যি বলতে ছেলেটাকে তোর খারাপ লাগলে কি হবে,আমার কিন্তু তাকে খুব পছন্দ।কষ্ট দেয়না আমাকে।কি সুন্দর করে ব্যাবহার করে।তুই যত জোড়েই আসিসনা কেন,সে শুধু আলতো করে আমাকে দিয়ে ছুঁয়ে দেয়।তুই সীমানার বাইরে চলে যাস।যাদু আছে হয়ত ছেলেটার হাতে।শুন,তার ব্যাপারে তোর হয়ত পড়াশোনার অভাব।আজ রাতে তাকে নিয়ে পড়বি,আমি হেল্প করব।তোর অপমান মানেই ত আমার অপমান।

zCZVHQTo_400x400

বল:বন্ধু,আমার প্রিয় ও ক্রিকেটের রাজকীয় ফর্মেট টেস্টের কথায় আস।এখানে ব্যাটসম্যান আমাকে ভয় পায় খুব। সবসময় সচেতন থাকতে হয় থাকে,আর একটু বাউন্সার হয়ে আসলে রীতিমত শুয়ে পড়ে।

ব্যাট:ভাইরে,এই ফর্মেটে আমাকে সবসময় মনোযোগী থাকতে হয়।একটু অমনোযোগী হলে ব্যাটসম্যান বোল্ড বা এইডজ লেগে ক্যাচ আউট হতে পারে।দোষ হয় আমার,অথচ যার হাতে থাকি তার কোন ভ্রুক্ষেপ নেই।সে একটু ভেবেচিন্তে ব্যাবহার করলেই ত হয়।তাই সারাদিন শরীরের উপর খুব দখল যায়।তবে রাহুল দ্রাবিড় এই ফর্মেটে আমাকে কি সুন্দর ব্যাবহার করে।তুই যত জোড়েই এসে আউট করতে চাস,সে আলতো করে ডিফেন্স করে তোর পরিকল্পনা পন্ড করে দেয়।সবচেয়ে বেশি সময় ঠিকে থাকা,১ রানও না নিয়ে সব চেয়ে বেশি বল খেলার রেকর্ড সেই তো করল না।

বল:হুম,ভালই লাগে আমার থাকে।খুবই প্রতিভাবান। শ্রদ্ধা করি লারা কেও।কি রেকর্ড টাই না করল।তবে দিন দিন ক্রিকেটটা বাণিজ্য হয়ে যাচ্ছে,আমাদের কথা কেও ভাবছেনা।টি-১০,একশ বলের খেলায় আমাদের কোন মর্যাদা থাকে বল?

ব্যাট:আক্ষেপের গল্প করে আজ কষ্ট না বাড়ায়।মিষ্টি স্মৃতি নিয়ে আজ ত দারুন গল্প হল।ঐ দেখ আম্পায়ার আসছে,খেলা শুরু হবে,তোর প্রিয় টেস্ট,আমার কথাও একটু ভাবিস।চল উঠি,চায়ের দাম আজ আমিই দিয়ে দিলাম।

বল:ভাবব।শুন,আজ ত সময় কম পেলাম।কাল যখন মধ্যাহ্নভোজনের বিরতি দেবে,আমরা বিরানি খেতে যাব।না করবি না,গল্প হবে আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে।চল যাই এখন।

দুই বন্ধু কাধে কাধ মিলিয়ে মাঠে পৌছাল।ব্যাটসম্যান প্রস্তুত,বোলার প্রস্তুত, শুরু হবে দুই বন্ধুর মুখোমুখি দ্বৈরথ।গ্যালারিতে বসে আছি,কি করা যায়,এই চা ওয়ালা,এক কাপ চা দাও।চা খেতে খেতে একটু ক্রিকেট বিশ্লেষণ করা যাক।