X
GO11IPL2020
  • ফুটবল

বিশ্ব ফুটবলে আফ্রিকান সৌরভ

পোস্টটি ১৩৩৫ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

প্রতি চার বছর অন্তর অন্তর আসর বসে "দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ" ফিফা বিশ্বকাপের। আর প্রতি আসরেই আফ্রিকা থেকে খেলতে আসে বেশ কিছু দল ও এক ঝাঁক ফুটবলার।

আচ্ছা, আফ্রিকান দল গুলো কি শুধু বিশ্বকাপের ৩২ টা দল পূরণ করার জন্যই আসে, নাকি তারাও ওই সুন্দর ট্রফিটা ছুঁয়ে দেখার আকাঙ্ক্ষা নিয়েই আসে?

বিশ্বকাপে আফ্রিকান দলগুলোর সাফল্য খুব বেশি নয়। চ্যাম্পিয়ন হওয়া দূরের কথা, কখনো কোনো আফ্রিকান দল শেষ চারেই যেতে পারেনি। তাদের নিয়ে বিশ্বে তাই উন্মাদনাও দেখা যায়না তেমন। প্রতি বিশ্বকাপেই হাটে বাজারে, পথে ঘাটে উড়তে দেখা যায় রংবেরঙ এর পতাকা। আকাশের দিকে তাকালেই ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, ইংল্যান্ড সহ বহু দেশের পতাকাই উড়তে দেখা যায়, তার মধ্যে চোখে পড়েনা আফ্রিকান কোনো দলের নিশান।

কিন্তু আপনি জানেন কি, আফ্রিকানদের মধ্যে ফুটবল নিয়ে আবেগ উন্মাদনা ইউরোপীয়দের চেয়ে বেশি, এমনকি ল্যাটিন আমেরিকানদের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়? মূল বিশ্বকাপে সাফল্য না পেলে কি হবে, যুব বিশ্বকাপ গুলোর ট্রফি কিন্তু বহুবার গেছে মালি, আইভরিকোস্ট, নাইজেরিয়া সহ বহু আফ্রিকান দেশে। যুব বিশ্বকাপে আফ্রিকানরাই সবচেয়ে সফল।

image_search_1588679833795

যাই হোক, বিশ্বকাপ নিয়ে কথা বলছিলাম, সেখানেই ফিরে আসি। বিশ্বকাপে সার্বিক সাফল্য না পেলে কি হবে, বহুবার অনেক জায়ান্টদের হারিয়ে দিয়েছে তারা। তাদের অঘটনের শিকার হয়েছে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স, স্পেন সহ অনেক বাঘা বাঘা দল। রেখে গেছে অসংখ্য স্মৃতি, অসংখ্য আবেগঘন মুহূর্ত, যেসব স্মৃতি রোমন্থন করলে ফুটবল বিশ্বকাপের সার্থকতা উপলব্ধি করা যায়।

বিশ্বকাপে আফ্রিকানদের যাত্রা শুরু হয় ১৯৩৪ সালে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় বিশ্বকাপ থেকেই, যেখানে তাদের প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নেয় পিরামিড ও নীল নদের দেশ মিশর। তবে সাফল্য পায়নি, প্রথম রাউন্ডেই বাদ পড়ে যায় তারা। এরপর বহু বছর আর পৌঁছাতে পারেনি সে মঞ্চে।

অবশেষে ১৯৯০ সালে আবার সুযোগ পায় মিশর, কিন্তু সাফল্য আসেনি এবারও। তারপর আবার শুরু হয় অপেক্ষার পালা। সবশেষ গত বিশ্বকাপে বিশ্বকাঁপানো খেলোয়াড় মোহামেদ সালাহর কাঁধে ভর করে আরো একবার অংশ নেয়। কিন্তু সবকটি ম্যাচ হেরে আবারও প্রথম রাউন্ডের তাদের যাত্রার অবসান ঘটে।

image_search_1588678394842

তুলনামূলক ভাবে আফ্রিকার সফলতম দল ক্যামেরুন। এই সেই ক্যামেরুন, যারা ফুটবল বিশ্বকে উপহার দিয়েছে স্যামুয়েল ইতো, রজার মিলার মতো কিছু অলটাইম গ্রেট। এখন পর্যন্ত বিশ্ব আসরে সাতবার অংশ নিতে পেরেছে তারা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চমকের জন্ম দিয়েছিলো ১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপে।

প্রথম ম্যাচেই ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে শুরু করে যাত্রা, তারপর রোমানিয়া কে হারিয়ে উঠে যায় দ্বিতীয় রাউন্ডে। এখানেও থেমে থাকেনি তারা, কলম্বিয়া কে হারিয়ে শেষ আটেও উঠে যায়। কিন্তু সেখানে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে গ্যারি লিনেকারের পেনাল্টিতে ৩-২ গোলে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হয় আফ্রিকান সিংহদের।

৩৮ বছর বয়সী রজার মিলা সে বিশ্বকাপে করেন চার গোল। আর তার গোল উদযাপন তো এখনো বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা মুহূর্ত হয়ে আছে। তবে এরপর আর কখনোই প্রথম রাউন্ড পার হতে পারেনি তারা।

image_search_1588678494245

ক্যামেরুনের পর আরেক অন্যতম সফল দল নাইজেরিয়া। তারা বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বে প্রথম জায়গা করে নেয় ১৯৯৪ সালে। এরপর ২০০৬ ছাড়া বাকি পাঁচটি বিশ্বকাপেও ধারাবাহিক ভাবে অংশ নেয়। এর মধ্যে তিনবার দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠতে পেরেছে তারা।

১৯৯৪ এ অভিষেকেই দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠে। কিন্তু ইতালির কাছে হেরে সেবার ফিরে আসতে হয়। এরপরের বিশ্বকাপে আবারও গ্রুপ পর্বে স্পেন কে হারিয়ে অঘটন ঘটায় "সুপার ঈগল"রা। কিন্তু দ্বিতীয় রাউন্ডে ডেনমার্কের কাছে হেরে বিদায় নেয়। শেষবার দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠেছিলো ২০১৪ বিশ্বকাপে। কিন্তু সেবারও তাদের সেখান থেকেই বাড়ি ফিরতে হয় বেনজেমা-রিবেরি-ভালবুয়েনা দের ফ্রান্সের কাছে হেরে।

১৯৮২ সালে আলজেরিয়ানরা আলোচনায় আসে তাদের অনিন্দ্য সুন্দর ফুটবল দিয়ে। সেবার পরের রাউন্ড প্রায় নিশ্চিতই হয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু তাদের ফিরে আসতে হয় পশ্চিম জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার সুপরিকল্পিত ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম ন্যক্কারজনক এক ম্যাচের জন্য। গ্রুপ পর্বের শেষ এ ম্যাচের সমীকরণ ছিলো পশ্চিম জার্মানি যদি এক গোলে জয় লাভ করে, তাহলে তারা এবং অস্ট্রিয়া উভয়দলই কোয়ালিফাই করবে, বাদ পড়বে আলজেরিয়া। তাই নিজেরা তারা হীন এক ষড়যন্ত্র করে, যার ফলস্বরূপ বাদ পড়ে যায় আলজেরিয়া।

এরপর তারা খেলেছে আরো তিনটি বিশ্বকাপে। এর মধ্যে ২০১৪ বিশ্বকাপে পেয়েছিলো সর্বোচ্চ সাফল্য, পেরুতে পেরেছিলো গ্রুপ পর্ব। শেষ ষোলর ম্যাচে জার্মানিকেও প্রায় পরাস্থ করেই ফেলেছিলো। কিন্তু ম্যানুয়েল নয়্যারের অতিমানবীয় পারফর্মেন্সে সে যাত্রায় রক্ষা পায় জার্মানি, সেখান থেকে ফিরে আসতে হয় "এল খাদরা"দের।

image_search_1588678590811

ঘানার নাম শুনলে হয়তো সবার মনে একটি ম্যাচের ছবিই ভেসে ওঠে। ২০১০ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উরুগুয়ের বিপক্ষে সেই অসাধারণ ম্যাচ। ৯০ মিনিট ১-১ সমতায় শেষ হওয়ার পর ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। অতিরিক্ত সময়ের একদম শেষ মুহূর্তে ঘানার একটি ন্যায্য গোল হাত দিয়ে আটকে দেয় উরুগুইয়ান ফরওয়ার্ড লুইস সুয়ারেজ। পেনাল্টি পায় ঘানা। কিন্তু পেনাল্টিতে গোল করতে ব্যর্থ হন আসামোয়াহ জিয়ান। ট্রাইবেকারে গড়ায় ম্যাচ। সেখানে অভিজ্ঞ উরুগুয়ের সাথে আর টক্কর দিতে পারেনি ঘানা। চোখের জলে বিদায় নেয় ব্ল্যাক স্টাররা।

দিদিয়ের দ্রগবা, ইয়া ইয়া তোরের মতো বড় বড় তারকা ফুটবলারদের দেশ আইভরি কোস্ট, যাকে বলা হয় হাতির দাঁতের দেশ। এসব তারকাদের কাঁধে ভর করেই ২০০৬ থেকে শুরু করে টানা তিনটি বিশ্বকাপ খেলে আইভরি কোস্ট। দ্রগবা-তোরে ছাড়াও ছিলেন সলোমন কালু, উইলফ্রেড বনি, উইলফ্রেড জাহা, কোলো তোরে, সার্হে অরিয়ের, জার্ভিনহোর মতো বহু প্রতিভাবান খেলোয়াড়।

কিন্তু গ্রুপিং ভাগ্য বরাবরই তাদের জন্য হয়েছে নির্দয়। ২০০৬ সালে গ্রুপসঙ্গী হয় আর্জেন্টিনা ও নেদারল্যান্ডস, ২০১০ এ গ্রুপে তারা পায় ব্রাজিল ও পর্তুগাল কে। তাই তাদের গোল্ডেন জেনারশন মাঠে চমৎকার ফুটবল উপহার দিলেও গ্রুপ পর্ব আর পেরোনো হয়নি কখনোই।

তবে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অঘটনের জন্ম দিয়েছে যে দল, তাদের নাম সেনেগাল। ২০০২ বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো অংশ নিয়েই হারিয়ে দেয় তৎকালীন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে। দ্বিতীয় রাউন্ডেও থেমে থাকেনি, গোল্ডেন গোলে হারায় সুইডেন কে। অতঃপর কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হয় সে বিশ্বকাপের আরেক চমক তুরস্কের। কিন্তু এবার গোল্ডেন গোলেই পরাজিত হয় তারা। ১-০ গোলে হেরে বিদায় নিতে হয় বুবা দিওপদের।

image_search_1588679862888

বিশ্বকাপে চমক দেখানো আরও একটি আফ্রিকান দল মরক্কো। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে তারা ড্র করে ইংল্যান্ডের সাথে। অতঃপর পর্তুগাল কে হারিয়ে দেয়, উঠে যায় দ্বিতীয় রাউন্ডে। কিন্তু সেখানে পশ্চিম জার্মানির কাছে হেরে গিয়ে বিদায় নিতে হয় উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকার মুরদের।

তিউনিসিয়াও এ পর্যন্ত পাঁচবার বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নিয়েছে, কিন্তু প্রথম রাউন্ড উতরাতে পারেনি কোনোবারই। প্রতিবারই বিদায় নিতে হয়েছে গ্রুপ পর্ব থেকেই।

এছাড়াও ১৯৯৮ ও ২০০২ বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছিলো দক্ষিণ আফ্রিকা। ২০১০ বিশ্বকাপে তো আয়োজক দেশ হিসেবেই খেলেছিলো। কিন্তু কোনোবারই ওঠা হয়নি দ্বিতীয় রাউন্ডে।

এছাড়াও ১৯৭৪ সালে জায়ারে এবং ২০০৬ সালে অ্যাঙ্গোলা ও টোগো জায়গা করে নিয়েছিলো বিশ্বকাপের মূল পর্বে। কিন্তু তাদের প্রত্যেকেরই স্বপ্নের সমাপ্তি ঘটেছে গ্রুপ পর্বেই।

image_search_1588679206404

আফ্রিকা বরাবরই বিশ্বকে উপহার দিয়ে আসছে অসংখ্য ফুটবল গ্রেট। স্যামুয়েল ইতো, দিদিয়ের দ্রগবা, জর্জ উইয়াহ, ইয়া ইয়া তোরে, রজার মিলা সহ অসংখ্য কিংবদন্তী আফ্রিকা থেকে এসে বিশ্ব ফুটবলে একের পর এক কীর্তি গড়েছে, নিজেদের বসিয়েছে কিংবদন্তীর আসনে।

যুব বিশ্বকাপে বরাবর চমৎকার পারফর্ম করলেও বিশ্বকাপের চূড়ান্ত মঞ্চে কখনোই নিজেদের মেলে ধরতে পারেনা আফ্রিকান দলগুলো। তেমন কোনো সাফল্যও আসেনা। এর কারণ অন্যকিছু নয়, শুধু প্রশিক্ষণের অভাব। তবে যেখানে দুবেলা দুমুঠো খাদ্য জোটেনা, সেখানে উন্নত মানের প্রশিক্ষণ আশা করাটা অরণ্যে রোদন ছাড়া কিছু নয়।

এখনো আফ্রিকায় ছড়িয়ে আছে অসংখ্য প্রতিভা। মিসরে মোহামেদ সালাহ, সেনেগালে সাদিও মানে, আলজেরিয়ায় রিয়াদ মাহরেজ, গ্যাবনে পিয়েরে এমেরিক অবামেয়াং, মরোক্কোয় হাকিম জিয়েচ সহ অসংখ্য প্রতিভা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তাদের নিজ নিজ দেশের ফুটবলকে।

image_search_1588678988304

দুবছর পর বসছে ফিফা বিশ্বকাপের আরও একটি আসর। আবারও দেখা যাবে একঝাঁক আফ্রিকান কে তাদের নিজ নিজ দেশের জার্সি গায়ে। তাদের হাত ধরে আবারও হয়তো জন্ম নেবে আরও কিছু অঘটন। আরও কিছু স্মরণীয় মুহূর্ত, বৈচিত্র্য ও অভিজ্ঞতা উপহার দেবে তারা।

এগিয়ে যাক আফ্রিকান ফুটবল। বিশ্ব ফুটবলে ছড়িয়ে যাক আফ্রিকান সৌরভ, সে সৌরভে মাতোয়ারা হোক সারা বিশ্ব।