X
GO11IPL2020
  • ফুটবল

দ্য স্টোরি অব দ্য পাইরেট শিপ

পোস্টটি ৫৪১ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

নিষ্ঠুর পিতা ক্রোনাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামলেন দেবরাজ জিউস। দশ বছরের সে প্রলয়ঙ্করী যুদ্ধে ধ্বংস হয়ে গেল পূর্বে সৃষ্ট সব কিছু। অবশেষে জয়লাভ করলেন জিউস, ভাই বোন দের নিয়ে বসবাস শুরু করলেন অলিম্পাস পর্বতে। গ্রীসের সেই অলিম্পাস, যাকে বলা হতো আকাশের সর্বোচ্চ স্থান। সেটি হয়ে গেল দেবতাদের আবাসস্থল।

গ্রীস। নামটি শুনলেই মনে পড়ে অসংখ্য নাম, চোখে ভেসে ওঠে অসংখ্য ছবি। এই সেই গ্রীস, মাইথোলজি যেখানে ছড়িয়ে আছে রন্ধ্রে রন্ধ্রে। এখানে বসেই হোমার রচনা করেছিলেন ইলিয়াড ও ওডিসি, গ্রীক ও ট্রয়ের যুদ্ধের সেই মহা উপাখ্যান। এখানেই হেমলক দিয়ে হত্যা করা হয়েছিলো আদি জ্ঞানী সক্রেটিস কে। এখানেই জন্মেছিলেন প্লেটো, মহাজ্ঞানী এরিস্টটল। এখান থেকেই বিশ্বজয় করেছিলেন সম্রাট আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট।

বিশ্বসভ্যতার ইতিহাস ঘাঁটলে এতটা সমৃদ্ধি কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবেনা, যতটা ছিলো গ্রীসে। রোমান সভ্যতার সূচনালগ্ন পর্যন্ত সমস্ত বিজ্ঞান, দর্শনসহ সব ধরনের জ্ঞান চর্চায় কেন্দ্রবিন্দু ছিলো গ্রীস। পুরো ইউরোপের সমস্তকিছুর নিয়ন্ত্রণ ছিলো গ্রীসের হাতে।

তবে রোমান সভ্যতা শুরুর পর থেকে যত সময় এগিয়েছে, আস্তে আস্তে ইউরোপের অন্যান্য শক্তিদের থেকে পিছিয়ে পড়েছে গ্রীস। উনিশ শতকে এসে তাই দেখা যায় অন্যান্য ইউরোপীয় দেশ ফ্রান্স, ব্রিটেন, জার্মানি প্রভৃতির চেয়ে অনেকটাই পিছিয়ে গেছে গ্রীস। একই ব্যাপার লক্ষ্য করা যায় ফুটবলেও।

ইউরোপ থেকে ইতালি, জার্মানি, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, স্পেন, নেদারল্যান্ডস যখন ফুটবলে সুপার পাওয়ার হয়ে উঠেছে, ফুটবল দিয়ে জয় করে চলেছে বিশ্ব, তখন গ্রীস যেন একদমই মলিন। ফুটবল ইতিহাসে ইউরোপের অন্যতম ব্যর্থ দলের খেতাব টাও জুটে গেছে। কিন্তু মাঝে মাঝে এমন কিছু ঘটে, যা কল্পনা কেও হার মানায়।

image_search_1595678481819

সময়টা ২০০৪। এই সময়টাকে ফুটবল ইতিহাসেরই সবচেয়ে সোনালি সময় বলা যায়। তখন যেমন একাধারে ছিলো অসংখ্য বিশ্বসেরা দল, তেমনি অসংখ্য বিশ্বমানের খেলোয়াড়। ব্রাজিল, ফ্রান্স, ইতালি, ইংল্যান্ড, জার্মানি, আর্জেন্টিনা, স্পেন প্রত্যেকেই দলেরই তখন সুসময় যাচ্ছে। বিশ্বসেরা হওয়ার প্রতিযোগিতায় মেতেছে তারা। খেলোয়াড়দেরও একই প্রতিযোগিতা। জিদান, রোনালদো, রোনালদিনহো, পিরলো, বেকহাম, ল্যাম্পার্ড, অঁরি, মালদিনি, ক্যানাভারো প্রত্যেকেই নিজ নিজ দলকে প্রতিনিয়ত এনে দিচ্ছেন একের পর এক জয়, সাফল্য।

তার মাঝে পুঁচকে গ্রীস। তাদের না আছে কোনো ভালো মানের খেলোয়াড়, না আছে কোনো সমৃদ্ধ ইতিহাস। কোনো প্রতিযোগিতায় জয় নয়, অংশগ্রহণ করাটাই ছিলো তাদের জন্য বিরাট সাফল্য। বড় সব জায়ান্টদের ভীড়ে তাদের দিকে নজর দেওয়াটা আসলে সম্ভবও ছিলোনা।

 

ইউরো ২০০৪। সেবারের আসরটা বসেছিলো পর্তুগালে। গ্রীস তাদের কাঙ্ক্ষিত সাফল্য ততদিনে পেয়ে গেছে বলা যায়। ১৯৯৪ সালে শেষবারের মতো বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করার দশ বছর পর প্রথমবার কোনো বড় টুর্নামেন্টে খেলতে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে সে বিশ্বকাপ থেকেও বিদায় নিতে হয়েছিলো গ্রুপ পর্বের সব কটি ম্যাচ হেরে ও কোনো গোল না করে।

আসরের উদ্বোধনী ম্যাচটাই ছিলো গ্যালানোলেফকিদের। প্রতিপক্ষ স্বাগতিক পর্তুগাল। পর্তুগালেরও তখন শক্তিশালী এক দল মাঠ কাঁপাচ্ছে। অলরেডি কিংবদন্তী বনে যাওয়া লুইস ফিগো, ডেকোদের সাথে তরুণ ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। এ ম্যাচে যে গ্রীসের যে কোনোরকম সুযোগ থাকতে পারে, সেটাই ছিলো অবিশ্বাস্য। কিন্তু ৭ মিনিটের মাথায় সবাকে চমকে দিলো গ্রীস। পাউলো ফেরেরার ভুলে বল আসে জোর্গোস কারগাউনিসের পায়ে। ড্রিবল করে জোরালো এক শটে বল ঢুকিয়ে দেন জালে। এগিয়ে যায় গ্রীস। পরে রোনালদোর ফাউলে পেনাল্টি পায় গ্রীস, তাতে এনজেলিও বাসিনাসের গোলে ২-০ তে এগিয়ে যায় গ্রীস। অতিরিক্ত সময়ে সিআর সেভেনের গোলে ব্যবধান কমায় স্বাগতিকরা, কিন্তু হার আর এড়াতে পারেনি। প্রথম ম্যাচেই অঘটন ঘটিয়ে স্বাগতিকদের ২-১ গোলে হারিয়ে দেওয়ায় সংবাদমাধ্যমগুলো গ্রীস দলের নাম দেয় "দ্য পাইরেট শিপ"।

দ্বিতীয় ম্যাচে গ্যালানোলেফকিরা মুখোমুখি হয় রাউল গঞ্জালেজ, কার্লোস পুয়োলদের শক্তিশালী স্পেনের। আগের ম্যাচে অসাধারণ জয়ে আত্মবিশ্বাস তাদের তুঙ্গে। ম্যাচের শুরুতেই ২৭ মিনিটে মরিয়েন্তাসের গোলে এগিয়ে যায় স্পেন। ৬৫ মিনিটে ডিফেন্স থেকে পাঠানো লম্বা বলে চমৎকারভাবে কাউন্টার এটাকে চলে যায় গ্রীস। হঠাৎ এ আক্রমণে স্প্যানিশ ডিফেন্স কিছু বুঝে ওঠার আগেই ক্যাসিয়াস কে পরাস্ত করে বল জালে ঢুকিয়ে দেন চেরিস্তেস। অবশেষে ম্যাচ শেষ হয় ১-১ সমতাতেই। এক জয় ও এক ড্র নিয়ে তখন যৌথ ভাবে গ্রুপের শীর্ষে অবস্থান করছে গ্রীস।

image_search_1595678608097

শেষ ম্যাচে গ্রীস মুখোমুখি হয় আগের দুই ম্যাচেই হারা রাশিয়ার বিপক্ষে। আগের দুই ম্যাচে কোনো গোল না পাওয়া রাশিয়া দ্বিতীয় মিনিটেই গোল পেয়ে যায় গ্যালানোলেফকিদের বিপক্ষে। সেটি ছিলো সে আসরেরই সবচেয়ে দ্রুততম গোল। কিছুক্ষণ পর আরও এক গোল। রাশিয়া এগিয়ে যায় ২-০ তে। আগের দুই ম্যাচে চমক দেখানো দলটির বিপক্ষে এবার চমক দেখাতে শুরু করে রাশিয়া। পর্তুগালের সাথে স্পেনের ম্যাচে তখন বিরাজ করছে সমতা। পরিস্থিতি এমন থাকলে বাদ পড়ে যাবে গ্রীস ও রাশিয়া উভয়ই। বিরতির ঠিক দুই মিনিট আগে ব্যবধান কমান জিসিস ভ্রিজাস। বিরতির পর অন্য ম্যাচে ৫৭ মিনিটের মাথায় পর্তুগালের হয়ে গোল করেন নুন গোমেজ। বাকি সময় আর গোল হয়নি। এক গোলের ব্যবধানে পরাজিত হয় গ্রীস ও স্পেন উভয়ই। টেবিলে তখন পয়েন্ট ও গোল ব্যবধান, দুইটিতেই সমানে সমান স্পেন ও গ্রীস। কিন্তু একটি গোল বেশি করেছিলো গ্রীস, তাই স্পেনকে পেছনে ফেলে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে যায় তারা।

কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হয় ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সের। ফ্রান্স দলে তখন বলতে গেলে গ্রেটদের ছড়াছড়ি। জিদান, অঁরি, ভিয়েরাদের ফ্রান্স তখন পার করছে সেরা সময়। তারা একের পর এক আক্রমণ চালিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু শক্তহাতে ডিফেন্স সামলাচ্ছিলেন গ্রীসের ডেলাস-কাপসিস জুটি। ৬৫ মিনিটে হঠাৎ কাউন্টার এটাকে যায় গ্রীস, চমৎকার হেডে জালে বল ঢুকান চেরিস্তেস। বাকি সময়ে একের পর এক চেষ্টা করেও আর গোলের দেখা পায়নি ব্লুজরা। টুর্নামেন্টের অন্যতম ফেভারিটদের হারিয়ে সেমি ফাইনালে চলে যায় গ্যালানোলেফকিরা।

সেমিতে তাদের মুখোমুখি হয় টুর্নামেন্টের অন্যতম ডার্ক হর্স চেক রিপাবলিক। গ্রুপ পর্বে তারা হারিয়ে এসেছিলো শক্তিশালী জার্মানি নেদারল্যান্ডস কে, কোয়ার্টার ফাইনালে ছিটকে দিয়েছে ডেনমার্ক। সবাই ধরেই নিয়েছিলো পাইরেট শিপের যাত্রা এবার শেষ হচ্ছে।

ম্যাচের শুরু থেকেই মুহুর্মুহু আক্রমণ শুরু করে চেক রিপাবলিক। কিন্তু হঠাৎ ঘটে অঘটন। বিরতির একটু আগে সতীর্থদের সাথে সংঘর্ষে আঘাত পেয়ে মাঠ ছাড়েন চেকদের তুরুপের তাশ পাভেল নেদভেদ। তারপর থেকেই আস্তে আস্তে দুর্বল হতে থাকে চেকরা। কিন্তু তবুও তাদের ডিফেন্স ভাঙতে পারেনি গ্রীস। ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। অবশেষে ১১০ মিনিটের মাথায় কর্ণার পায় গ্রীস। আর তাতেই বাজিমাৎ। ভ্যাসিলোস সারতাসের নেয়া কর্ণার থেকে ডেলাসের হেডে ইতিহাসের একমাত্র সিলভার গোলে গ্রীস পৌঁছে যায় ফাইনালের মঞ্চে।

চরম কাকতালীয় ব্যাপার। টুর্নামেন্ট শুরু হয়েছিলো যে ম্যাচ দিয়ে, শেষও হবে সেই ম্যাচ দিয়েই। ফাইনালে মুখোমুখি সেই উদ্বোধনী ম্যাচের দুই দল, স্বাগতিক পর্তুগাল ও গ্রীস।

image_search_1595678546030

প্রথম ম্যাচে হারের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য একদম মুখিয়ে ছিলো পর্তুগাল। তার জন্য এর চেয়ে বড় সুযোগ আর হয়না। ম্যাচের শুরু থেকেই তাই রোনালদো ডেকো পাউলেতা ফিগোকে নিয়ে গড়া আক্রমণভাগ একের পর এক আক্রমণ করেই যাচ্ছিলো। কিন্তু ডেলাসের নেতৃত্বে গ্রীসের ইস্পাত কঠিন ডিফেন্স ভেদ করা মুখের কথা না। যত আক্রমণ আসছিলো, সব সামলে নিচ্ছিলো তারা। অবশেষে নির্ধারিত সময়ের প্রায় আধাঘণ্টা আগে চমৎকার এক কাউন্টার এটাক থেকে কর্ণার পেয়ে যায় গ্রীস। স্টেলিয়োস জিয়ানোকোপুলোসের কর্ণার থেকে আবার সেই চেরিস্তেসের হেড। বল চলে যায় পর্তুগালের জালে, ১-০ তে এগিয়ে যায় গ্রীস।

পর্তুগাল ম্যাচে ফেরার জন্য উঠে পড়ে লাগে। মাঠে নামায় নুনু গোমেজ ও রুই কস্তা কে। কিন্তু গ্রীসের সেই ডিফেন্সের সামনে শত আক্রমণ সব ব্যর্থ। ফলাফল, ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম অঘটনের সাক্ষী হয় বিশ্ববাসী, আর শিকার হয় পর্তুগাল। ইউরোপসেরার মুকুট মাথায় পড়ে দেবরাজ জিউসের দেশ।

ম্যাচ শেষে টুর্নামেন্ট সেরা খেলোয়াড় থিও জাগোরাকিস বলেন, "আমরা আবারও প্রমাণ করেছি গ্রীক আত্মা সবসময় আমাদের শক্তি হয়ে থাকবে। এটি ঈশ্বরের দেওয়া আমাদের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার। আমরা গ্রীসবাসীকে আনন্দের চেয়ে বেশি কিছু দিয়েছি। এটি চিরকাল আমাদের গর্ব হয়ে থাকবে।"

অবশ্য এই দলের এ সাফল্যের পেছনে মূল কারিগর ছিলেন জার্মাব কোচ অটো রিগাল। তার সম্পর্কে গ্রীক সাংবাদিক ভ্যাসিলাস সাম্ব্রাকোস বলেন, "রিগাল একটি টিম স্পিরিট সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি খেলোয়াড়দের খুব বেশি ট্যাকটিক্স শেখাননি। তার মূল মন্ত্র ছিলো দৃঢ়ভাবে ডিফেন্স সামলানো ও কাউন্টার এটাক বা সেটপিস থেকে গোলের সুযোগ খোঁজা। তিনি খেলোয়াড়দের মধ্যে শুধু টিম স্পিরিটই জাগাননি, তাদেরকে একটু পূর্ণাঙ্গ দল হিসেবে গড়ে তোলেন, যেখানে একজন আরেকজনের জন্য জীবন বাজি রাখতেও প্রস্তুত।"

image_search_1595678566597

গ্রীসের রূপকথার মূলত এখানেই সমাপ্তি। পুরোটাই ছিলো একটা চমক। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই গ্রীস ফিরে যায় তাদের সেই আগের অবস্থানে। ২০০৬ বিশ্বকাপেই আর কোয়ালিফাই করতে পারেনি। পরের ইউরো তে কোনোরকমে জায়গা করে নিয়েছিলো, কিন্তু টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিতে হয় সবগুলো ম্যাচ হেরে। ২০১২ ইউরো তে কোয়ার্টার ফাইনাল ও ২০১৪ বিশ্বকাপে রাউন্ড অব সিক্সটিনে পৌঁছেছিল। কিন্তু ২০০৪ ইউরোর সেই গ্রীস তো হারিয়ে গেছে একদমই, এখন শুধু তাকে ইতিহাসের পাতাতেই খুঁজে পাওয়া যাবে।