• ফুটবল

নেপলসের ঈশ্বর; বিদায়...

পোস্টটি ৪৯১ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

'ও মা এখনো দাঁড়িয়ে আছিস!'

এর পরও ডিয়াগো ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো। জানালা বন্ধ করার জন্য অনেকক্ষণ থেকে তার ডান হাত জানালার বাঁদিকের পাল্লায় রাখা, আরেকটা হাত জানালার শিকে। দুটো হাতই ভিজে যাচ্ছে, পানির ঝাপ্টা এসে পড়ছে চোখে ও মুখে। সামনের রাস্তা, রাস্তার পাশের ল্যাম্পপোস্ট ও তার পাশে ঝাঁপ- ফেলা নিবুনিবু আলোর সারাইখানা এবং গলির নালা ও পানির মিলিত গন্ধ এই কড়া, এই হালকা। 

 

এই মনোরম মনোটোনাস শহরে অনেকদিন পর আজ সুন্দর বৃষ্টি হলো। তবু বৃষ্টিকে ভারি অন্যরকম মনে হলো ডিয়াগোর; যেন বৃষ্টি একজন অচিন দীর্ঘশ্বাস! ঠান্ডা বাতাসের ঝাপ্টা পাশ ফেলে মা বুঝে ফেললেন, ডিয়াগোর মন আজ ভারি খারাপ। ছেলে'টা যা জেদি হয়েছে। এই মুহুর্তে তার একজোড়া জুতা নাকি লাগবেই; পাড়ার ছেলেরা ভালোভালো সব জুতা পরে খেলতে আসে বৈকি! একবার সেকি বায়না তার; মাঠিতে গড়িয়ে লুটেপুটে কান্না- বল তার চাই-ই চাই! গোটা আষ্টেক সন্তানের পিতা তবু মন রক্ষা করলেন ডিয়াগোর। জন্মদিনে নিয়ে এলেন বাহারি এক ফুটবল বল। সেকি আনন্দ ডিয়াগোর চোখ- মুখজুড়ে! সেদিন পুরো গলিতে বল খেলে বুনো উল্লাস করে বেড়ালো ছোট্ট ডিয়াগো। টানা ৬ মাস ঘুমানোর সময় বলটা বুকের কাছে রেখে ঘুমাতো- যদি কিনা চুরি হয় যায় এই ভয়ে। বল নিয়ে মনের আনন্দে খেলা করা ডিয়াগোর কুঁকড়ানো কালো চুলগুলো ভাসতে ভাসতে কি যেন বলছিলো বাতাসে বাতাসে। 



বছরকয়েক পর নাপোলির অলিতে গলিতে বর্ণিল সব দেয়ালচিত্র, শহরের সব দেয়াল যেন ছেয়ে গেছে কুঁকড়ানো চুলের সুবিস্তৃত হাসিমুখের এক মানুষের। মানুষ বলা'টা বেখাপ্পা- বেমানান লাগছে। রক্তমাংসে গড়া সে মানুষ'টাকে নাপোলির মানুষেরা ততোদিনে যে ভগবাণের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন; সরল সমীকরণ ভক্তিতে! তিনি-ই ডিয়াগো, আমাদের গল্পের শুরুর জানালার শিক ধরে দাঁড়িয়ে বৃষ্টির ঝাপ্টা বাতাস গায়ে মাখানো ডিয়াগো। বিশ্ববাসী যাকে চিনেছে 'ডিয়াগো ম্যারাডোনা' নামে।

 

ছত্রিশ বছর পূর্বে ডিয়াগো যখন বার্সা থেকে রেকর্ড পরিমাণ ফি'তে নেপলসে পা রেখেছিলেন; সে শহরের উন্মাদ হাওয়ায় তাকে অচেনা মনে হলো। শহরের প্রত্যেকটা মানুষের বিস্মিত চোখ ঠোঁটেঠোঁটে জিজ্ঞাসার রহস্যে মেতে উঠেছিলো, হায়, ম্যারাডোনা এখানে কি করছেন? প্রশ্নটা অতিরঞ্জিত কিছু না; ম্যারাডোনা'র মতো উঁচুমানের প্লেয়ার নাপোলির মতো অখ্যাত ক্লাবে খেলতে আসবেন, অন্তত তখনকার স্রোত তা বলছিলো না। 

 

ম্যারাডোনা শান্তি আর সম্মান চাইছিলেন, যা তিনি স্পেনে পান নি। আর নাপোলি চাইছিলো   সাফল্যে, যা তাদের ছিলোনা। পরবর্তী সাত বছরে বাজিমাত করলো নীল- সাদা'রা। ইতালিয়ান টাইটেলের পাশাপাশি এলো ইউরোপিয়ান শিরোপা সাফল্য। তখনকার নেপলস ছিলো গরীব, ডিয়াগোর ক্লাবও। '৮৪'র এক ঝকঝকে তকতকে হাস্যোজ্জ্বল দুপুরে যখন নেপলসে ডিয়াগোর পা পড়লো; পঁচাত্তর হাজার মানুষের লোকারণ্য সেখানে! বুয়েন্স আইরেসের বস্তিতে জন্ম নেয়া এ যুবক জানতেন না এই গোটা শহরটাকে বলা হয় 'ইতালির সুয়ারেজ'! কষ্ট করেছেন ছোটবেলায়; খাবার জন্য ছিলো না বিশুদ্ধ পানি। পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ছিলো যাচ্ছেতাই। গরীব শহরের গরীব ক্লাব ডিয়াগোর আবদার মেটানোর সব চেষ্টাই করলো। তবু ভারি সমালোচকের ভঙ্গিতে অনেকদিন পর ম্যারাডোনা অভিযোগ করেছিলেন, 'ফেরারি চাইলে পেয়েছি ফিয়েট আর বাড়ি চাইলে ফ্ল্যাট! এদের আমি বলবো 'ইতালির অফ্রিকা।' 

 

 

গাড়ি- বাড়িতে মুগ্ধ করতে না পারুক; সে শহরের প্রত্যেকটা মানুষ ভালোবাসা উজাড় করে দিয়েছিলো ডিয়াগোর প্রতি। '৮৬ বিশ্বকাপ জয়ের পর ডিয়াগো যখন কিংবদন্তিদের কাতারে নাম লেখাচ্ছেন একটু একটু করে; সে সময়ে নাপোলির যেন স্বর্ণযুগ চলছিলো। স্কুডেট্রো এলো, সাথে মহাতারকার হাতে সোনায় মোড়া বিশ্বকাপ! তবে সেসব ছাপিয়ে শহরের প্রতিটা অলিগলি জেনে গিয়েছিলো তাদের শহরে ঈশ্বর দু'জন; বাতাসের ঠান্ডা গন্ধ খুঁজে বেড়িয়েছে হাজার হাজার মানুষের অস্তিত্বের সন্ধান; যারা একচিত্তে বিশ্বাস করে নিয়েছে- তাদের শহরে আজ ঈশ্বর ম্যারাডোনা আছেন। 

 

'নেপলস ছিলো এক পাগলাটে শহর, ঠিক ততোটাই পাগলাটে যতটা আমি, আমার ফুটবল ক্যারিয়ার যতটা।' কিং সাইজের সিগার মুখে পুরে ধোঁয়া বের করতে করতে ডিয়াগো স্মৃতি রোমান্থন করেন, 'নেপলসের অনেক জিনিস আমার ছোটবেলাকে মনে করিয়ে দেয়। শহরময় এখানে- সেখানে অনশন- ধর্মঘট হচ্ছে খাবারের দাবিতে। 

আবার তারাই সানপাওলো স্টেডিয়ামে দল বেঁধে খেলা দেখতে আসছে আমার! আমি কিভাবে তাদেরকে হতাশ করতে পারি?' 

ডিয়াগোর নামের মধ্যাংশ যে 'আর্মান্দো'- তার মানে হচ্ছে 'ম্যান ইন দ্যা আর্মি', আর গ্রীক ভাষায় ম্যারাডোনা নামের অর্থ দাঁড়ায় 'যে অন্যের জায়গা দখল করে।' ম্যারাডোনা আসলেই তা করেছেন। সর্বকালের সেরাদের তালিকা করা হলে দেখা যায়, অনেক গ্রেটদের তিনি অনায়াসে পিছনে ফেলেন। তিন বিশ্বকাপ জেতা পেলে'র চেয়েও বেশি জনপ্রিয়তা, মাঠ ও মাঠের বাইরের হাইপ তৈরি করতে পেরেছিলেন তিনি। আলোচনা- সমালোনার মাঝামাঝি নৌকায় ভ্রমন করেছে পুরো জীবন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যদি বলি, সাদাকালো টিভির যুগ শুরু থেকে এদেশের মানুষের মুখে মুখে যে ম্যারাডোনা নামটা স্থান করে নিলো, তা আজও বহাল আছে। কোনো বৃদ্ধাকে, চাচা সর্বকালের সেরা ফুটবলার কে?- জিজ্ঞেস করলে হয়তো কোনোকিছু না ভেবেই ফিক করে হেসে দাঁত বের করে বলে দিবেন, 'মেরাডোনা যে আছিলো বাবা, হেই সর্বকালের সেরা…' 

 

এইযে এতো এতো জনপ্রিয়তা, '৮৬ বিশ্বকাপ পেরিয়ে আজ কেটে গেছে দীর্ঘ চৌত্রিশ বছর, ম্যারাডোনার নাম কিন্তু মুছে যায়নি। রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প 'খ্যাতির বিড়ম্বনা' যারা পড়েছেন, তারা নিশ্চয়ই ব্যাপারটা ধরতে পারবেন; ম্যারাডোনার পুরো জীবনটাই যেন ছোটগল্পের মতো!  

 

maradona_0

 

ম্যারাডোনা'কে নিয়ে লিখবো- কখনো ভাবিনি। কি লিখবো সেটাও জানিনা। তবু এতটুক আচঁ করতে যেকেউ দুইবার ভাববে না- ম্যারাডোনা সাধারণ কোনো ফুটবলার ছিলেন না- তিনি এমন কিছু করে দেখিয়েছিলেন যা তাকে জীবন্ত কিংবদন্তি বানিয়ে ফেলেছিলো। তাকে নিয়ে লেখালেখি মারাত্মক রিস্কি ব্যাপার। কোন ব্যাপার নিয়ে আপনি লিখবেন? তার সাফল্যে গাঁথা? সেসব বলে শেষ করা যাবে? নাকি তার ব্যর্থতার গল্প? সেগুলোও কম না। নাকি তার অবাধ্য উশৃঙ্খল বেপরোয়া জীবন? 

 

নাপোলিতে খেলার সময় 'খ্যাতির বিড়ম্বনা' ম্যারাডোনার জীবনে মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। যদিও তিনি কোকেইন নেয়া শুরু করেছিলেন '৮০ সালের পর থেকেই। নেপলসের মানুষ তাকে ঈশ্বর ভাবতো। আর তিনি ড্রাগ সম্রাট, মাফিয়াদের সান্নিধ্য থাকতে পছন্দ করছেন। অবাধ যৌনাচার, মদ- নারী; কোকেইন আর অনিয়ন্ত্রিত ভয়ংকর জীবনযাপন ম্যারাডোনাকে তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছিলো। একটা সময়ে শহরের সবচেয়ে ঘৃণিত মানুষটার নাম হয়ে উঠলো 'ডিয়াগো আর্মান্দো ম্যারাডোনা', আমাদের শুরুর গল্পের সেই ছোট্ট ডিয়াগো- যে কিনা নতুন বুটজুতা না পেয়ে জানালার শিক ধরে বৃষ্টিতে ভিজছে। 

 

নাপোলি ভক্তদের কথা তবু ডিয়াগো বলেন, 'আমি জানতাম তারা কতো সমস্যায় জর্জরিত, কিন্তু টিকেট কিনে খেলা দেখতে তাদের কার্পণ্য ছিলোনা। তারা সবসময়, সবসময় সমর্থনে ছিলো। তারা আমাকে বিশ্বাস করেছিলো, সবকিছু দিয়েছিলো উজাড় করে- আমাকে না চিনেই! এটা ভুলা সম্ভব না। বিশ্বকাপজয়ী ইতালিয়ান কাপ্তান ফ্যাভিও ক্যানেভারো যেন বলছিলেন সে কথাই;  

'ম্যারাডোনা হচ্ছেন নেপলসের ঈশ্বর। ম্যারাডোনা ইতিহাস বদলে ফেলেছেন।' 

 

তিনি সত্যিই ইতিহাস বদলে ফেলেছিলেন। 

মাঠের ডিয়াগো যেন অপ্রতিরোধ্য এক হিংস্র বাঘ ছিলো; আর মাঠের বাইরে বেপরোয়া এক জোয়ান। কখনো সাংবাদিক পেটাচ্ছে, তো কখনো ক্লাব কর্মকর্তাদের সাথে ঝামেলায় জড়াচ্ছে। কখনো মাঠেই মারামারিতে লিপ্ত হচ্ছে আবার কখনো বাকি সব প্লেয়াররা অবাক চোখে তাকিয়ে দেখছে তার পায়ের নৈপুণ্য! কি চমৎকার তার পায়ের শৈলী, কি মুগ্ধকর তার ড্রিবলিং স্কিল! 

 

সেদিনের কথা আরেকবার শুনা যাক না;

'৮৬ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষের সে ম্যাচ। ম্যারাডোনাকে মানুষ চিরকাল যদি মনে রাখে, তাহলে হয়তো এই দিন'টার কিছু অবদান থাকবে। পায়ের খেলায় সবার চোখকে বোকা বানিয়ে হাত দিয়ে গোল করে কি বিতর্কেরই না জন্ম দিলেন সেদিন। ইংল্যান্ডের প্লেয়াররা বারবার আবেদন জানালেও তাতে সাড়া দেন নি রেফারি; হয়তো তিনি ম্যারাডোনার ন্যচারাল সেলিব্রেশন আর বুনো উল্লাস দেখে বিভ্রান্ত হয়ে গিয়েছিলেন! কিন্তু মিনিট চারেক পর এই সমান মানুষটাই যা করলেন, এসব নিষিদ্ধ হওয়া উচিৎ ফুটবলে। নাকানিচোবানি খাওয়ানোর একটা সীমা থাকা দরকার, ম্যারাডোনা যেনো সেদিন কোনোকিছুর তোয়াক্কা করলেন না। কি অদ্ভুত এক মানুষ, না পারমানবিক বোমা- না ভয়ংকর আগ্নেয়াস্ত্র; কোনটির-ই দখল ছিলোনা তার। শুধুমাত্র পায়ের জাদুতে সেদিন বশ করে ফেললেন পুরো দুনিয়া। 

 

ডিয়াগো ম্যারাডোনা কবে প্রফেশনাল ক্যারিয়ার শুরু করেছেন, কোন দলের হয়ে কত গোল করেছেন, কবে কোথায় কার বিপক্ষে অভিষেক হলো- এইসব গল্প নাহয় তোলা থাক অন্যবেলায় বলার জন্য। বছর ষোলো'র ঘর পেরুবার আগেই যে ছেলে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন স্থানীয় স্কাউটদের; তাকে নিয়ে একদিন গল্প লেখা হবে তা অনুমেয় ছিলো। তার বয়স যখন নয় বছর, গ্রামের যে দলটার হয়ে ডিয়াগো খেলতো, তাদের নাম ছিলো 'লিটল অনিয়ন'। তাদের হয়ে টানা ১৩৯ ম্যাচ জিতেছিলেন বালক বয়সেই! এক্সিলেন্ট ড্রিবলিং স্কিল, ইম্প্রেসিভ ফুটওয়ার্ক, একুরেট পাস, পাওয়ারফুল এসিস্ট- সবার থেকে তাকে ব্যতিক্রমী বানিয়েছিলো তার গুন। স্থানীয় অডিয়েন্সের মাধ্যমে তার যথেষ্ট সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিলো চারিদিকে। একদল স্কাউট নিবিড়ভাবে তাকে পর্যবেক্ষণ করে গেলেন খেলা দেখে। আরেকদল সাংবাদিক তাকে নিয়ে একটা রিপোর্ট প্রকাশ করলো সংবাদপত্রে, 'There's a kid with the attitude and talent of a star' শিরোনামে! তবে তারা ভুলে ম্যারাডোনার জায়গায় লিখে ফেলেছিলো 'ক্যারাডোনা' |  'Caradona!' 

 

মুদ্রার এপিঠ- ওপিঠের মতোই ডিয়াগো ম্যারাডোনার পুরো ফুটবল ক্যারিয়ার কিংবা পরবর্তী জীবন কেটেছে আলোচনা- সমালোচনায়। পায়ের জাদুকর যেমন মাঠের খেলায় দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধ করতে পারতেন, তেমনি এই গুনের কারণে স্বীকার হয়েছেন প্রচুর ফাউলের। '৮৬র বিশ্বকাপে ৫৩ বার ফাউল করা হয়েছিলো তাকে। ৮২'তে ইতালির বিপক্ষে ম্যাচে একাই ২৩টি ফাউলের স্বীকার হয়েছেন। মাঠের এসব স্কিল যদি হয় মুদ্রার এপিঠ- তবে মাঠের বাইরের জগৎ হবে মুদ্রার ওপিঠ। ইতালিতে কোকেইন সাম্রাজ্যে তার অবাধ বিচরনের কারণে নিয়মিত মিস করতে লাগলেন নাপোলির ম্যাচ ও প্রেক্টিস! একবার তাকে ৳৭০,০০০ ডলার জরিমানা করা হলো। আরেকবার ডোপ টেস্টে পজিটিভ হওয়ায় দুই বছরের বেশি সময় থাকতে হলো মাঠের বাইরে। ইতালিতে পুত্র সন্তানের বাবা পরিচয় দিতে অস্বীকৃতি জানালে মামলা গড়ায় কোর্ট পর্যন্ত! আরেকবার এক টিভি প্রোগ্রামে এসে বললেন, তার সন্তান হচ্ছে ২ টা; ডালমা আর জিয়ান্নিয়া। বাকি সব তার মিস্টেক আর টাকা প্রোডাক্ট! 

 

রিভেলিনো আর জর্জ বেস্টকে আইডল মানা ডিয়াগো ম্যারাডোনাকে ঈশ্বর মানতেন নেপলসের মানুষ। আর আর্জেন্টাইনরা? তারা তো 'ম্যারাডোনা চার্চ' বানিয়ে রীতিমত সবাইকে তাক করে দিয়েছিলেন! প্রায় ১ লক্ষ ২০ হাজার মানুষ সে চার্চের অনুসারী ছিলো! সে চার্চের সদস্যেরা ১০ টা নীতিমালাও প্রণয়ন করলেন; দুয়েকটা বলার লোভ সামলাতে পারছিনা-

 

১) 'ম্যারাডোনা চার্চ' এর আদলে সবার বাড়িতে ছোট একটা চার্চ থাকবে।

২) সবার উপরে ফুটবলকে ও ম্যারাডোনাকে ভালোবাসতে হবে। 

৩) ম্যারাডোনার মিরাকলের ব্যাপারে সর্বত্র সংবাদ ছড়িয়ে দিতে হবে।

৪) ম্যারাডোনাকে কোনো নির্দিষ্ট দলের প্লেয়ার হিসেবে পরিচয় দেয়া যাবেনা। 

৫) নিজের নামের মাঝখানে ডিয়াগো লাগাতে হবে।

৬) প্রথম পুত্রের নাম ডিয়াগো রাখতে হবে…

 

“He was sent from above; so we created Iglesia Maradoniana”

 

একবার ভেবে দেখুন, এই মানুষটা জীবন্ত অবস্থায় কোনো কিছুর কমতি পেয়েছেন? কিন্তু হায়! তিনি তাদের সম্মান রাখতে পারলেন না। বিশৃঙ্খল মনোভাব আর অগোছালো জীবনযাপন তাকে মানুষদের থেকে ক্রমেই বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছিলো। বরাবরই সমালোচনাকে সঙ্গী করে নিয়েছেন। মানুষ তাকে শর্তহীন ভালোবেসেছে, তিনি সেসব তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছেন।

 

আবার, সমালোচিত কার্যকলাপ আর লাগামহীন কথাবার্তা তার পিছু ছাড়েনি আমৃত্যু। পেলের সাথে তার কথার বিরোধ চলতো প্রকাশ্যে। 'হ্যান্ড অব গড' ঘটনার ২৯ বছর পর ঘটা করে তিউনিসিয়া গিয়েছিলেন ডিয়াগো। উদ্দেশ্য আলী বিন নাসেরের সাথে দেখা করা; ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালের ম্যাচ যিনি রেফারির দায়িত্ব পালন করেছিলেন! একদিন দেখা করলেন মার্কসবাদী আর্জেন্টাইন বিপ্লবী চে গুয়েভারার সাথে; ডিয়াগোর হাতের বাহুতে তখন চে'র ট্যাটু! কিউবার বিপ্লবী ফিদেল ক্যাষ্ট্রোর ট্যাটু ছিলো ডিয়াগোর পায়ে। তার সাথে দেখা হওয়ার অনুভূতি প্রকাশ করে বলেছিলেন, 'আমার মনে হচ্ছে আমি হাতে চাঁদের টুকরো পেয়ে গেছি'...

 

ম্যারাডোনাকে একবার জেনারেল গাদ্দাফির ৩য় সন্তানের কনসালটেন্ট বানানো হয়েছিলো। উনি তখন ইতালিয়ান সিরিএতে খেলতেন। একজন গ্রেট ফুটবলার ডিয়াগো ম্যারাডোনা সাংগঠনিক কাজে সবসময় ছিলেন দূর্বল। সম্ভবত তার জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা দুটি, ১) '৯০ এর বিশ্বকাপে ফাইনালে গিয়েও জিততে না পারা। ২) আর্জেন্টিনার দায়িত্ব নিয়ে ব্যর্থতার পরিচয় দেয়া। কিংবা হয়তো মানুষটাকে আরোও খানিকটা সময় দেয়া যেতে পারতো.. 

 

ডিয়াগো ম্যারাডোনা কে ছিলেন, তার লাইফের এচিভমেন্ট কি ছিলো; ক্লাবকে কতটা দিয়েছেন আর জাতীয় দলকে কতখানি দিতে পেরেছেন- সেসব হিসেব- নিকেশ থাক। ম্যারাডোনা, তার নামেই তার পরিচয়। যারা ম্যারাডোনার খেলা দেখেন নি, তার খেলার সম্পর্কে যাদের একটুও ধারণা নেই; তাদের কাছে ডিয়াগো ম্যারাডোনা কেবলই একটি নাম।

 

ডিয়াগো ম্যারাডোনার প্রতি শ্রদ্ধা রইলো। ইতালির স্রোতস্বিনী ভার্সাই নদীর বহমান নদীর মতোই ম্যারাডোনা নামটা চিরকাল বহমান রয়ে যাবে ফুটবল ইতিহাসের সমুদ্রে… 

 

© আহমদ আতিকুজ্জামান।