• অন্যান্য

মিলানের সম্রাটের গল্প

পোস্টটি ৬১০ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।
সম্রাট।
 
রুপকথায় পড়েছি, আগেকার দিনে সম্রাটরা পক্ষীরাজ ঘোড়ায় চেপে যুদ্ধে যেত। তাদের শরীরে থাকতো ঝলমলে রাজকীয় পোশাক, হাতে থাকতো ঝকঝকে এক তরোয়াল। আর তারা বীরদর্পে লড়াই করতো শত্রুদের সাথে, রক্ষা করতো দেশ।
 
সেইসব সম্রাটদের এখন শুধু গল্পেই দেখা মেলে। কিন্তু আজ আমি যে সম্রাটের গল্প বলতে চলেছি, সে এ যুগের সম্রাট। কিন্তু সেইসব সম্রাজ্য, সেইসব যুদ্ধক্ষেত্র তো এখন আর নেই। তাই আমাদের এই সম্রাটের দেখা মিলতো ফুটবল মাঠে।
 
হ্যাঁ, ফুটবলে এক সত্যিকারের সম্রাট। যার হাতে থাকতো অধিনায়কের আর্মব্যান্ড, শরীরে থাকতো লাল-কালো এক রাজকীয় পোশাক। বিপক্ষে দলের সব ফরওয়ার্ড মিডফিল্ডাররা এসে পরাজিত হতো তার পায়ের জাদুর কাছে। অতন্দ্র প্রহরীর মতো রক্ষা করতো দলকে।
 
তিনি আর কেউ নন, 'এল কাপিতানো' পাওলো মালদিনি।
 
image_search_1608833015378
 
জন্ম ও ফুটবল ক্যারিয়ার শুরু 
 
১৯৬৮ সালের ২৬ জুন ইতালির মিলান শহরে তার জন্ম। ফুটবলটা তার রক্তেই ছিলো। বাবা সিজার মালদিনি ছিলেন ইতালি ও এসি মিলানের সাবেক খেলোয়াড়। তার তাঁর হাত ধরেই পাওলোর ফুটবলে হাতেখড়ি। ক্যারিয়ারটাও শুরু বাবার ক্লাব এসি মিলানেই।
 
১৯৭৮ সালে মাত্র ১০ বছর বয়স থেকেই মিলানের যুব দলে খেলা শুরু করে পাওলো। যুব দলে তার অসাধারণ পারফর্মেন্সে আকৃষ্ট হয়ে পড়ে মিলানের তৎকালীন কোচ নিলস লেইডহোম। খুব দ্রুতই পাওলোকে মূল দলে টেনে নিন তিনি। সার্জিও বাস্তিনির ইঞ্জুরির কারণে মাত্র ১৬ বছর বয়সেই মিলানের জার্সিতে তার অভিষেকটাও হয়ে যায়। পরের সিজনেই হয়ে উঠেন মিলানের শুরুর একাদশের নিয়মিত সদস্য। কোচের পরামর্শে রাইট ব্যাক ছেড়ে চলে আসেন লেফট ব্যাকে।
 
 
সিনিয়র ক্যারিয়ার 
 
১৯৮৮ সাল। মিলানের তখন বেশ সুসময় যাচ্ছে। আরিগো সাচ্চির অধীনে সিরি আ ঘরে তুলেছে রোজোনেরিরা।
 
মিলানের দলটাও স্বয়ংসম্পূর্ণ। ফরওয়ার্ডে ছিলেন ডাচ ট্রায়ো ফ্রাঙ্ক রাইকার্ড, রুড গুলিত ও মার্কো ফন বাস্তেন। মিডে ছিলেন কার্লো আনচেলোত্তি ও রবার্তো ডোনাডনি। আর রক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন পাওলো মালদিনি। মিলানের এ দলটিই ফুটবল ইতিহাসে 'দ্য ইমমোর্টালস' বলে খ্যাত।
 
সেবার পুরো সিজনে মাত্র ১৪ টি গোল কন্সিড করে মিলান। বারেসের ইঞ্জুরিতে রক্ষণে মালদিনির সঙ্গী হয় আলেসান্দ্রো নেস্তা। সেই এক্সসাথে গঠিত হয় মালদিনি আর নেস্তার ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রক্ষণ ডিও। 
 
মিলানে একের পর এক সাফল্য এসে ধরা দিতে থাকে। টানা দুইবার ইউরোপিয়ান কাপ জয় করে তারা। এর মূল কারিগর ছিলো মালদিনি ও নেস্তার ডিফেন্স জুটি।
 
image_search_1608833941178
 
কিছুদিন পর সাচ্চির স্থলাভিষিক্ত হয়ে আসেন ফ্যাবিও ক্যাপেলো। তার আন্ডারেও মিলান রাজত্ব করে যায় সমানতালে। ১৯৯১-৯২ সিজনে টানা ৫৮ ম্যাচ অপরাজিত ছিলো মিলান। এতে দলটিকে সবাই 'দ্য ইনভিন্সিবল' বলে ডাকা শুরু করে। ১৯৯৩-১৪ এও পুরো সিজনে মাত্র ১৫ গোল হজম করে মালদিনিরা।
 
সেবার চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে মিলানের প্রতিপক্ষ ছিলো ক্রুইফের বার্সেলোনা। কিন্তু মালদিনিদের মিলানের সামনে ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায় তারা, হেরে যায় ৪-০ তে। ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে ইতালি কে ফাইনালে তুলতেও সবচেয়ে বড় অবদান ছিলো মালদিনির। একজন ডিফেন্ডার হয়েও তিনি সে বছর ওয়ার্ল্ড সকার ম্যাগাজিনের বর্ষসেরা ফুটবলার নির্বাচিত হন।
 
পরের বছরেও ইউরোপে সমান আধিপত্য ধরে রাখে রোজোনেরিরা। চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে আয়াক্সকে ১-০ হারিয়ে আবারও নিজেদের সেরা প্রমাণ করে।
 
১৯৯৬-৯৭ সালে বিদায় নেয় কোচ ফ্যাবিও ক্যাপেলো, সেই সাথে অবসর নেয় কিছু গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলার। এতে বেশ বিপাকে পড়ে যায় তারা। এমনকি চ্যাম্পিয়নস লিগেও অংশ নিতে পারেনি সেবার। 
 
 
'এল কাপিতানো' : সময় এবার নেতৃত্বের
 
অবশেষে মিলানের অধিনায়কের আর্মব্যান্ড হাতে তুলে নেয় পাওলো মালদিনি। তার নেতৃত্বে আবার নতুন করে জেগে ওঠে লাল-কালোরা। ১৯৯৮-৯৯ মৌসুমে আবার সিরি আ জয় করে তারা।
 
২০০১ সালে মিলানের কোচ হয়ে আসেন তাদেরই সাবেক তারকা কার্লো আনচেলোত্তি। অবশেষে মিলান ফিরে পেতে থাকে তার হারানো গৌরব। ২০০৩-০৪ মৌসুমে চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে ট্রাইব্রেকারে জুভেন্টাসকে হারিয়ে আবারও স্বপ্নের সেই রুপোলী ট্রফি টা ঘরে তোলে তারা। ফাইনাল ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন পাওলো মালদিনি।
 
image_search_1608832702605
 
এটি ছিলো ক্যাপ্টেন হিসেবে তার প্রথম চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়। খেলোয়াড় হিসেবে এটি ছিলো চতুর্থ। আর অদ্ভুত ব্যাপার, এর ঠিক চল্লিশ বছর আগে তার বাবা সিজার মালদিনিও মিলানের ক্যাপ্টেন হিসেবে জিতেছিলেন ইউরোপিয়ান কাপ!
 
২০০৩ সালে মিলানের হয়ে অর্ধসহস্র ম্যাচ পূর্ণ করেন পাওলো মালদিনি। সে বছরটাও অসাধারণ কেটেছিলো তার। প্রায় একক নৈপুণ্যে প্রথমবারের মতো কোপা ইতালিয়া ট্রফি জয় করেন। সেই সাথে ব্যালন ডি'অর রেসে হন তৃতীয়।
 
তবে সেবারের চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে এক অবিশ্বাস্য কামব্যাকের শিকার হয় মিলান। লিভারপুলের সাথে সে ম্যাচে শুরুতেই ৩-০ গোলে এগিয়ে যায় রোজোনেরিরা। কিন্তু সবাইকে অবাক করে তিনটি গোলই শোধ করে দেয় লিভারপুল। অতঃপর ট্রাইব্রেকারে পরাজিত হয় মিলান। এক ইন্টারভিউয়ে মালদিনি বলেন, “এই ম্যাচটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে খারাপ ম্যাচ, এগিয়ে গিয়েও আমরা জিততে পারিনি”।
 
২০০৭ সালে মালদিনির নেতৃত্বে আবারও ইউসিএল ফাইনালে ওঠে মিলান। আবারও সেই একই প্রতিপক্ষ, লিভারপুল। তবে এবার আর তাদের হতাশ হতে হয়নি। 'রিভেঞ্জ অব অ্যাথেনা' নামে পরিচিত সে ম্যাচে অলরেডদের ২-১ গোলে হারিয়ে ৩৮ বছর বয়সে আরও একবার ইউসিএল শিরোপ হাতে তোলেন মালদিনি। আর এর মাধ্যমে ৮ বার চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনাল খেলার এক বিরল কীর্তি গড়েন মালদিনি। 
 
২৪ মে, ২০০৯। মিলানের জন্য দিনটি ছিলো এক মহা শোকের দিন। দীর্ঘ ২৫ বছরের ক্যারিয়ার শেষ করে সেদিন ফুটবলকে বিদায় জানান মিলানের 'এল কাপিতানো'। এই ২৫ বছরে তিনি মিলানকে যা দিয়েছেন, তা অতুলনীয়।
 
আর মিলান ছিলো তার রক্তে। জীবনে কখনো মিলান ছাড়ার কথা কল্পনাও করেননি। স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন তাকে দলে নেওয়ার জন্য বিড করলে তিনি জবাব দেন,
"আমার বাবা ছিলেন মিলান, আমিও মিলান এবং আমার পরবর্তী প্রজন্মও হবে মিলান"
image_search_1608832514885
 
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার 
 
ক্লাব ফুটবলে ক্যারিয়ার উজ্জ্বল হলেও জাতীয় দলে মালদিনির ক্যারিয়ার ছিলো প্রায় পুরোটাই আক্ষেপময়। 
 
১৯৯০ সালে প্রথম ইতালির হয়ে বিশ্বকাপে যোগ দেন মালদিনি। সেবার ডিফেন্সে মূল ভরসাই ছিলেন তিনি। এবং দায়িত্বও পালন করেন পরিপূর্ণভাবেই। সেবারের আসরে প্রথম পাঁচ ম্যাচের সবকটিতে ক্লিনশিট রাখে ইতালি। আর এর প্রধান কারিগর ছিলেন মালদিনি।
 
১৯৯৪ সালে প্রায় একক নৈপুণ্যে দলকে বিশ্বকাপ ফাইনালে নিয়ে যান। ফাইনালেও ১২০ মিনিট পর্যন্ত দৃঢ়ভাবে রক্ষা করেন ইতালিকে। কিন্তু টাইব্রেকারে ব্রাজিলের কাছে হেরে আর শিরোপাটা উঁচিয়ে ধরার সৌভাগ্য হয়নি।
 
১৯৯৮ বিশ্বকাপে বারেসির বিদায়ে মালদিনির হাতে ওঠে ক্যাপ্টেনের আর্মব্যান্ড। সেবার শক্তিশালী ডিফেন্স নিয়ে ভালোভাবেই রাউন্ড অব সিক্সটিন পার করে ইতালি। কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালে বিদায় নিতে হয় স্বাগতিক ফ্রান্সের কাছে হেরে।
 
২০০২ বিশ্বকাপেও মালদিনির হাতেই থাকে ইতালির আর্মব্যান্ড। এবারো গ্রুপ পর্ব দারুন ভাবে পার হলেও দ্বিতীয় রাউন্ডে স্বাগতিক দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে অবিশ্বাস্য ভাবে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয় ইতালি।
 
শত অপেক্ষার প্রহর ঘুচিয়ে ২০০৬ সালে বিশ্বকাপ জিতে নেয় ইতালি। কিন্তু হায়! ততদিনে যে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায়ই বলে দিয়েছেন 'এল কাপিতানো'।
 
image_search_1608832614986
 
ফুটবল ইতিহাসে মালদিনি এক ঐতিহাসিক নাম। তিনি ছিলেন এমন একজন ডিফেন্ডার, যাকে পাশ কাটিয়ে গোল করা ছিলো প্রায় অসাধ্য। 
 
তার ব্যাপারে সুইডিশ কিংবদন্তি ইব্রাহিমোভিচ বলেন,
"মালদিনি একজন সেরা ডিফেন্ডার ছিলেন। আমি যাদের মুখোমুখি হয়েছি, মালদিনি তাদের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর"
ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি রোনালদিনহো বলেন,
"চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ইতিহাসে সেরা ডিফেন্ডার। যখন তার পায়ে বল থাকে তখন মনে হয় না সে একজন ডিফেন্ডার, তখন মনে হয় সে একজন মিডফিল্ডারের মত খেলছে"
ফুটবলের ইতিহাসের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার রোনালদো নাজারিও বলেন,
"আমার জীবনে মুখোমুখি হওয়া সেরা ডিফেন্ডার ছিলেন মালদিনি। তবে তিনি একটি বিশ্বকাপ অবশ্যই ডিজার্ভ করতেন"
image_search_1608832679444
 
পৃথিবীতে অসংখ্য খ্যাতিমান ফুটবলার এসেছে, গেছে। অনেকে নিজেদের নিয়ে গেছে আকাশসম উচ্চতায়। নিজেই ছাড়িয়ে গেছে নিজেকে। আর এই অসাধারণদের মধ্যে ডিফেন্ডারদের সংখ্যা বেশ কমই। কিন্তু তার মধ্যেও মালদিনি এমন এক নাম, যা সবসময় সূর্যের মতো দীপ্তি ছড়ায়। এক জ্বলন্ত নক্ষত্র, রক্ষণভাগের এক দুর্ভেদ্য দেয়াল, এক অদম্য সেনাপতি। মিলান সম্রাজ্যের সত্যিকারের সম্রাট, ভালোবাসার 'এল কাপিতানো'।
 
পৃথিবীর যেখানেই ফুটবলের ডিফেন্স নিয়ে কথা উঠুক না কেন, একটি নাম অজান্তেই সবার মনে চলে আসে.....পাওলো মালদিনি।