• ফুটবল

প্রতিপক্ষের মাঠে 'স্ট্যান্ডিং ওভেশন' পেয়েছেন যারা

পোস্টটি ২০০১ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়; আবেগ, অনুভূতির নামও। ফুটবলে মাঝেমধ্যে নিজের দল নিয়ে সমর্থন কিংবা গর্ব ছাপিয়ে প্রতিপক্ষের শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিতে হয়। মাঠে এমন দারুণ মুহূর্ত কিন্তু বারবার আসে না। কিন্তু যখনই আসে, তখনই জন্ম নেয় রোমাঞ্চকর অধ্যায়ের।

 

ইতিহাসের এমন অংশ হওয়ার সৌভাগ্য খুব কম ফুটবলারেরই হয়। নিজেদের পারফরম্যান্সে যারা প্রতিপক্ষ দলের সমর্থকদের মন জয় করতে পারেন, তাঁরা ম্যাচের ফল ছাপিয়ে হয়ে ওঠেন সত্যিকারের বিজয়ী।

 

১. রোনালদো নাজারিও ডি লিমা: (ওল্ড ট্রাফোর্ড, রিয়াল মাদ্রিদ বনাম ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, ২০০৩ সাল)

যে কয়জন স্ট্রাইকার শুধু গোল করার ক্ষমতা দিয়ে ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে রয়েছেন, রোনালদো নাজারিও ডি লিমা তাঁদের একজন। চিনলেন না? ইনি হোসে মরিনহোর ‘আসল রোনালদো’—মানে, ব্রাজিলের বিশ্বকাপজয়ী রোনালদো। ‘দ্য ফেনোমেনন’ খ্যাত এই স্ট্রাইকার ২০০৩ সালে চ্যাম্পিয়নস লিগ কোয়ার্টার ফাইনাল ফিরতি লেগ খেলতে গিয়েছিলেন ওল্ড ট্রাফোর্ডে। দুর্দান্ত হ্যাটট্রিকে জায়গা করে নিয়েছিলেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড-সমর্থকদের মনে।

 

চ্যাম্পিয়নস লিগে ‘অন্যতম সেরা’ খ্যাত এই ম্যাচ ৪-৩ গোলে জিতেছিল ইউনাইটেড। কিন্তু রোনালদোর শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিয়ে ওল্ড ট্রাফোর্ডের আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন (স্ট্যান্ডিং ওভেশন) স্বাগতিক সমর্থকেরা। ব্রাজিলিয়ান স্ট্রাইকারটি মাঠ ছাড়ার সময় পুরো গ্যালারি ‘রোনালদো’, ‘রোনালদো’ ধ্বনিতে মুখর, দাঁড়িয়ে করতালিও দিয়েছিলেন রেড ডেভিল সমর্থকেরা।

 

২. রোনালদিনহো: (সান্তিয়াগো বার্নাব্যু, রিয়াল মাদ্রিদ বনাম বার্সেলোনা, ২০০৫ সাল)

মাঠে বল নিয়ে রোনালদিনহোর কারিকুরি এখন অনেকেরই গল্পের খোরাক। ২০০৫ সালে লা লিগায় রিয়াল মাদ্রিদের ঘরে তাঁর অতিমানবীয় পারফরম্যান্স এখনো অনেক ফুটবলপ্রেমীর কাছে হিরণ্ময় স্মৃতি। সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে ‘এল ক্লাসিকো’য় রোনালদিনহোর একক নৈপুণ্যে রিয়ালকে ৩-০ গোলে হারিয়েছিল বার্সেলোনা। জোড়া গোল করেছিলেন রোনালদিনহো। রিয়ালের রক্ষণভাগকে নাকানি-চুবানি খাইয়ে গোল দুটো যেভাবে করেছিলেন তাতে স্বাগতিক সমর্থকেরা চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দলের খেলোয়াড়টিকে উঠে দাঁড়িয়ে সম্মান দেখিয়েছিল। নিঃসন্দেহে, ম্যাচটি বার্সা-সমর্থকদের কাছে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে আজীবন।

 

৩. আলেসান্দ্রো দেল পিয়েরো: (সান্তিয়াগো বার্নাব্যু, রিয়াল মাদ্রিদ বনাম জুভেন্টাস, ২০০৮ সাল)

২০০৮ সালে বার্নাব্যুর স্বাগতিক সমর্থকদের আরেকবার উঠে দাঁড়িয়ে সম্মান জানাতে হয়েছিল প্রতিপক্ষ দলের খেলোয়াড়কে। চ্যাম্পিয়নস লিগ গ্রুপ পর্বের সেই ম্যাচে জুভেন্টাস ফরোয়ার্ড আলেসান্দ্রো দেল পিয়েরোর কাছেই হেরেছিল রিয়াল। তাঁর জোড়া গোলে রিয়ালকে ২-০ ব্যবধানে হারিয়েছিল জুভেন্টাস। দেল পিয়েরোর দুটি গোলই ছিল দূরপাল্লার বুলেট গতির শটে। মাঠ ছাড়ার সময় পুরো বার্নাব্যুর গ্যালারি উঠে দাঁড়িয়ে দেল পিয়েরোর নামে জয়ধ্বনি দিয়েছে যেন সে তাদেরই একজন! ফুটবলপ্রেমীদের জন্য আরেকটি স্মরণীয় মুহূর্ত।

 

৪. ডেনিস বার্গক্যাম্প: (মেইন রোড, ম্যানচেস্টার সিটি বনাম আর্সেনাল, ২০০৩ সাল) 

ডেনিস বার্গক্যাম্প হল্যান্ডের ইতিহাসে অন্যতম সেরা ‘বল প্লেয়ার’দের একজন। আর্সেনালের হয়ে চার শর বেশি ম্যাচ খেলা বার্গক্যাম্প গানারদের ‘স্বর্ণযুগ’-এর সারথি। ২০০৩ সালে ম্যানচেস্টার সিটির বিপক্ষে খেলেছিলেন ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা ম্যাচ। ডাচ্‌ কিংবদন্তি হ্যাটট্রিক করে একাই ‘সিটিজেন’দের হারিয়ে দেন। এই বিধ্বংসী পারফরম্যান্সের জন্য সিটি-সমর্থকেরা তাঁকে আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে সম্মান দেখিয়েছিলেন। স্বীকার করে নিয়েছিল তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব।

 

৫. আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা: (সান্তিয়াগো বার্নাব্যু, রিয়াল মাদ্রিদ বনাম বার্সেলোনা, ২০১৫ সাল) 

সেদিনও চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দলের খেলোয়াড়কে সম্মান জানাতে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর স্বাগতিক সমর্থকদের আবারও উঠে দাঁড়াতে হয়েছিল। বুঝতেই পারছেন প্রতিপক্ষ দলটা বার্সেলোনা, তবে খেলোয়াড়টি রোনালদিনহো নন, আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা। ২০১৫ সালে বার্সেলোনাকে নিয়ে রিয়ালের ঘরে ঢুকে জিতে এসেছিলেন ৪-০ ব্যবধানে। গোটা মাঝমাঠ শাসন করেছিলেন ইনিয়েস্তা।

 

৬. লিওনেল মেসি: (সান্তিয়াগো বার্নাব্যু, রিয়াল বনাম বার্সা, ২০০৯)

২০০৯ সাল। তিনি আজকের মতো এতটা মহা তারকা নন। একজন উঠতি তারকার কাছে রিয়াল এভাবে বিধ্বস্ত হবে, কে ভেবেছিল? সেদিন মেসি পুরো সান্তিয়াগো বার্নাব্যু স্তব্ধ করে দিয়েছিলেন। মাদ্রিদ ডিফেন্ডারদের জন্য দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। জোড়া গোল করেছিলেন। দুটি গোল করিয়েছেনও। সেই ম্যাচটা রিয়াল হেরেছিল ৬-২ গোলে! নিজেদের হতাশায় সাদা রুমাল উড়িয়েছিল রিয়াল। তবে মেসিকে প্রাপ্য সম্মান দিতে ভোলেনি। প্রথমবারের মতো মাদ্রিদ সমর্থকেরা মেসির নামে গর্জন করেছিলেন। মেনে নিয়েছিলেন মেসির শ্রেষ্ঠত্ব।

 

৭. ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো: (অ্যানফিল্ড, লিভারপুল বনাম রিয়াল মাদ্রিদ, ২০১৪ সাল) 

২০১৪ সালে ব্রেন্ডন রজার্সের লিভারপুলকে নিয়ে ছেলেখেলা করেছিল কার্লো আনচেলত্তির রিয়াল মাদ্রিদ। অ্যানফিল্ডে ঘরের মাঠে রিয়ালের কাছে ৩-০ গোলে হেরেছিল লিভারপুল। স্প্যানিশ দলটির দুর্দান্ত এই জয়ের নেপথ্যে ছিলেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। চমৎকার হেডে গোল করার পাশাপাশি গোটা ম্যাচেই স্বমহিমায় উজ্জ্বল ছিলেন রিয়াল ফরোয়ার্ড। তাতে মোহিত হয়েছিলেন লিভারপুল-সমর্থকেরাও। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে তাই উঠে দাঁড়িয়ে সম্মান জানিয়েছিলেন তাঁরা।

 

৮. স্টিভেন জেরার্ড: (স্টামফোর্ড ব্রিজ, চেলসি বনাম লিভারপুল, ২০১৪)

স্টিভেন জেরার্ড এবং চেলসির পুরোনো ইতিহাস একটু তেতো। লিভারপুলের সাবেক এ অধিনায়ককে ২০০৫ সালে চেলসি দলে ভেড়াতে চেয়েছিল। কিন্তু জেরার্ড তাঁর শৈশবের ক্লাব ছাড়েননি। সে কারণে হয়তো কখনো ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগও জিততে পারেননি। ২০১৪ সালে অ্যানফিল্ডে শিরোপার খুব কাছে গিয়েও সামান্য ভুলের কারণে চেলসির কাছে শিরোপা হারাতে হয়েছিল লিভারপুলকে। এটা ছিল লিভারপুলের হয়ে বিদায়ী মৌসুমে চেলসির বিপক্ষে জেরার্ডের শেষ ম্যাচ। তাঁর সমতাসূচক গোলের পর চেলসি-সমর্থকেরা অতীত তিক্ততা ভুলে লিভারপুল কিংবদন্তিকে উঠে দাঁড়িয়ে সম্মান দেখিয়েছিল।

 

৯. থিয়েরি অঁরি: (স্টেডিয়াম অব লাইট, সান্ডারল্যান্ড বনাম আর্সেনাল, ২০০৩ সাল)

সান্ডারল্যান্ডের মাঠ স্টেডিয়াম অব লাইটে ভালো খেলা প্রতিপক্ষ দলের খেলোয়াড়দের জন্য বেশ কঠিন। কিন্তু থিয়েরি অঁরি তো জাত স্ট্রাইকার। ২০০৩ সালে সান্ডারল্যান্ডের এই ঘরের মাঠেই প্রতিপক্ষ দর্শকদের কাছে সম্মান আদায় করে নিয়েছিলেন আর্সেনাল কিংবদন্তি। সে ম্যাচে সুইডিশ ফরোয়ার্ড ফ্রেডি ইয়েনবার্গ হ্যাটট্রিক করলেও অঁরির খেলায় মুগ্ধ হয়েছিলেন সকলে। ইয়েনবার্গকে তিন গোলেই ‘অ্যাসিস্ট’ করার সঙ্গে একটি গোলও করেছিলেন ফ্রান্সের সাবেক এ ফরোয়ার্ড। এমন পারফরম্যান্সের পর অঁরিকে উঠে দাঁড়িয়ে সম্মান দেখাতে কুণ্ঠাবোধ করেনি সান্ডারল্যান্ড-সমর্থকেরা।

 

১০. ডিয়েগো ম্যারাডোনা: (সান্তিয়াগো বার্নাব্যু, বার্সেলোনা বনাম রিয়াল মাদ্রিদ, ১৯৮৩) 

আর্জেন্টিনার মানুষের কাছে তাঁর স্থান সবার ওপরে। ফুটবলপ্রেমীদের কাছে তিনি সর্বকালের অন্যতম সেরা। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে প্রায় একাই শিরোপা জেতানো ম্যারাডোনা একক নৈপুণ্যে লিগ জিতিয়েছেন ইতালিয়ান ক্লাব নাপোলিকেও। নাপোলিতে যোগ দেওয়ার আগে বার্সেলোনায় খেলেছেন ম্যারাডোনা। ১৯৮৩ সালে ‘এল ক্লাসিকো’য় রিয়াল মাদ্রিদ-সমর্থকেরা তাঁকে ঘরের মাঠে উঠে দাঁড়িয়ে সম্মান দেখিয়েছিলেন। রিয়াল-সমর্থকদের কাছ থেকে ‘স্ট্যান্ডিং ওভেশন’ পাওয়া প্রথম খেলোয়াড়ও ম্যারাডোনা।

 

খেলার মাঠে আজীবন টিকে থাকুক এমন সম্মান জানানোর প্রথা।