• ক্রিকেট

শিরোপা, তুমি কবে হবে আমাদের?

পোস্টটি ৬৮১ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

হে শিরোপা, তোমাকে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হবে আর কতকাল? তেরোটি মৌসুম শেষে তুমি এখনো একটিবারের মতোও আমাদের হলে না! তুমি বুঝি মুম্বাই-চেন্নাইয়ের ব্যক্তিগত সম্পত্তি! ব্যাঙ্গালুরু, দিল্লি, পাঞ্জাব- আমরা কি দোষ করলাম? রাজস্থানও তো আমাদের দলেই পড়ে, সেই প্রথমবার শেষে ওদের দিকেও তো তুমি মুখ ফিরিয়ে তাকাও নি! এই আমরা চারজনই শুধু তোমার হতে পারি না, নাকি তুমিই আমাদের হতে চাও না, ঠিক বুঝি না!

 

জানি বলবে- তোমার চাওয়াতে কী-ই বা আসে যায়! যার ঘরেই যাবে, থাকবে সযত্নে। তোমাকে তো আর এমনি এমনি পাওয়া যায় না! তুমি যে বহু কষ্টে অর্জিত! জানি বলবে- চাহিদাবহুল কিছু পেতে হলে সেটার যোগ্য হতে হয়, যোগ্যরাই তাকে পায়। জানি জানাবে- আমাদের ভুল ছিল, সেজন্য আমরা পারিনি। এবার তাই পুর্বপরিকল্পনায় সর্বোচ্চ শুদ্ধ থাকার চেষ্টা করেছি, বাকিটুকু তো সপে দিতে হয় রণকৌশল প্রণয়নকারী ও লড়াকুদের হাতেই। সে লড়াইয়ের আগে আমরা শিরোপার যোগ্য কিনা, বলে দিও তুমিই।

 

**** 

 

ব্যাঙ্গালোর বলছি। ২০১৬ সালের পর তিন মৌসুম বাদে গেলবার উঠেছিলাম প্লেঅফে। চিরায়ত বোলিং সমস্যা ছিল সেবারও। আসলে শুধু বোলিং বললে চাহাল আর সুন্দর আবার আপত্তি জানিয়ে বসবে! চাহাল উইকেট তুলে নেওয়ার দক্ষতায় পরিচিত, তবে সেবার ১৫ ম্যাচে ২১ উইকেটের পাশাপাশি তার ইকোনমিও তো ছিল মাত্র ৭। পাওয়ারপ্লে এবং মিডল ওভার, দুটোতেই সমান কার্যকরী ওয়াশিংটন সুন্দর মাত্রই ৫.৯৬ ইকোনমিতে নিয়েছিলেন ৮ উইকেট। তাঁর চেয়ে কম ইকোনমি শুধু ছিল রশিদ খান ও মোহাম্মদ নাবির, তবে নাবি খেলেছিলেন মাত্র ১ ম্যাচই!

 

প্রথম ১০ ম্যাচে ৭ জয়ে দ্বিতীয় স্থানে থেকে গেলবার পরের চার ম্যাচে টানা হেরে হারিয়েছি প্লেঅফে দ্বিতীয় সুযোগ। ইলিমিনিটের সহ শেষ পাঁচ ম্যাচেই ব্যাটসম্যানদের দায়িত্ব ছিল বোলারদের জন্য ডিফেন্ডসমর্থ স্কোর গড়ে দেয়া। সেখানে তারা সর্বোচ্চ করতে পেরেছিল ১৬৪, বাকি চারটিতেই রান ছিল ১৫২ এর নিচে। পাঁচ ম্যাচেই বোলাররা তা ডিফেন্ড করতে ব্যর্থ হয়। সে ম্যাচগুলিতে প্রায় ৪২ ও ৪৫ গড়ে টুর্নামেন্টে রান করা কোহলি ও ডি ভিলিয়ার্সের গড় ছিল প্রায় ২৪ ও ২৮। তাতে আমাদের কোহলি ও ডি ভিলিয়ার্স নির্ভরতাও ফুটে উঠে।

 

পেস বোলিংয়ে ছিল সমস্যা, নির্দিষ্ট করে বললে ডেথ বোলিংয়ে। সাথে ছিল মিডল-লেট অর্ডারে পারফর্মারের সাথে বিধ্বংসী ইনিংসের অভাব। সে কাজের জন্য জেনে যাওয়া ক্রিস মরিস-শিবাম দুবেরা জ্বলে উঠতে পারেননি। ইনজুরি প্রবণ ক্রিস মরিস সেবারও খেলতে পারেননি ছয়টি ম্যাচ। বোলিংয়ে স্টেইন-উদানাদের দিকে ঝুকা খুব ভালো সিদ্ধান্ত ছিল না মনে হচ্ছে এখন। ২০২১ সালের ‘মিনি অকশনে’ তাই ফোকাসে রেখেছি এসবই। 

 

কিউই পেস অলরাউন্ডার কাইল জেমিয়েসনকে নিতে ১৫ কোটি রুপি পর্যন্তও যেতে ধার ধারিনি। বোলিংয়ের পাশাপাশি ব্যাটিংয়েও বিধ্বংসী হতে পারেন- এমন দক্ষতাসম্পন্ন ডেন ক্রিশ্চিয়ানকে কিনেছি, দিল্লির থেকে ট্রেড করে এনেছি ডেনিয়েল স্যামস ও হারশাল প্যাটেলকে। মিডল অর্ডার শক্তিশালী করতে ও কোহলি-ভিলিয়ার্স নির্ভরতা কমানোর প্রচেষ্টায় গ্লেন ম্যাক্সওয়েলকে কিনলাম ১৪ কোটি ২৫ লাখ রুপিতে। সাথে মোহাম্মদ আজহারউদ্দিন-সাচিন বেবি-শ্রিকার ভারতরাও ভালো সংযোজন হবেন আশা করি। ১৪ ম্যাচে প্রায় ১৮২ স্ট্রাইক রেটে ৫৩৭ রান বলে, জসুয়া ফিলিপির বদলে ফিন অ্যালেনও হতে পারেন গুরুত্বপুর্ণ সংযোজন। 

 

শিরোপা বলে

দল দেখে ভারসাম্যপুর্ণই মনে হচ্ছে। জিততে হলে ম্যাক্সওয়েলকে জ্বলে উঠতে হবে। তাঁর না জ্বলার পরিণতি্তে পাঞ্জাবের পরিণতি তো দেখতেই পেলে গেলবার। ক্রিশিয়ান-স্যামসদেরও চুপ থাকলে চলবে না। ম্যাক্সওয়েলের অন্তর্ভুক্তিতে আমি খুশি। কোহলি ও ডি ভিলিয়ার্স, শিরোপা পেতে মরিয়া এ দুজনের কাধে আর কত চাপাবে শিরোপার বোঝা! জেমিসনের গত কিছুদিনের ফর্মটা বেশ ভালো যাচ্ছে না, সেটাতে বদলের দরকার। কোহলির ওপেন করার সিদ্ধান্তে নানা কম্বিনেশন খুলে যাবে বলে সেটা ভালো সিদ্ধান্ত। গেলবার উদীয়মান ক্রিকেটার হওয়া দেবদুত পাড়িক্কাল পাওয়ারপ্লেতে ভালো করে, তবে পরে মিডল ওভারেও তাকে দ্রুতগতিতে রান তুলতে হবে। তোমাদের ডেথ বোলিং এখনও ভুগাবে বলে মনে হচ্ছে, তবে কোহলি-ভিলিয়ার্স-ম্যাক্সওয়েল ত্রয়ীর বিধ্বংসী রুপ সেটা ছাপিয়ে গেলে তোমরা আসতে পারো আমার সন্নিকটে অনেকখানিই।

 

****

 

দিল্লি বলছি। ডেয়ারডেভিলস না, ক্যাপিটালস! ডেয়ারডেভিলস দুঃস্বপ্ন ভুলে নতুন শুরু দুবছর আগে, নাম পরিবর্তনে পুনের মতো তাতেই ভাগ্যেরও পরিবর্তন হয়েছে বলতে হয়। পরিবর্তনের পুর্বে টানা ছয় মৌসুমে প্লেঅফে যেতে পারিনি, পরিবর্তন উত্তর দুই মৌসুমেই তা পেরেছি। গেল মৌসুমে তো তুমি হাতের নাগালে থেকে দূরে চলে গেলে ওই মুম্বাইয়ের হাতে, শিরোপা!

 

প্রথমবারের মতো ফাইনালে যাওয়া এই আমরা এবার খেলাম শুরুতেই ধাক্কা। অধিনায়ককে ঘিরে সব পরিকল্পনা, অধিনায়কেরও কত পরিকল্পনা আমাদের ঘিরে! কিন্ত হায়! সবই গেল ভেস্তে। আইপিএলের আগের সিরিজেই ফিল্ডিংয়ে কাধে চোট পেয়ে আয়ার গেলেন পুরো আইপিএল থেকেই ছিটকে। আমরা পড়লাম চতুর্মুখী দ্বন্দে। সহ অধিনায়ক ঋষভ পন্ত, স্টিভেন স্মিথ, আজিঙ্কা রাহানে, রবি অশ্বিন- কাকে দেয়া যায় অধিনায়কত্ব? তারুণ্যেই জোর দেয়া দিল্লির অধিনায়কত্বের ভার পড়ল ঋষভ পন্তেরই কাধে। প্লেঅফ, রানার্সআপ, এবার কি তবে ‘ইয়ে হ্যায় নায়ি দিল্লি’র নতুন অধিনায়কের হাতে প্রথম শিরোপা? 

 

করোনাকালীন গেলবারের আইপিএলে পৃথ্বি শ ছিলেন নিজ সামর্থ্যের ডজন ডজন দূরে। ঋষভ পন্ত রান পেলেও তারঁ স্ট্রাইক রেট ছিল না তারঁ মতো। আমাদের স্বস্তি- এবার এই দুজনেরই আইপিএল মঞ্চে আগমন রানের ফোয়ারা ছুটিয়ে। পৃথ্বি শ বিজয় হাজারে ট্রফিতে একশের বেশি গড় ও স্ট্রাইক রেটে আটশের বেশি রানে গড়েছেন ইতিহাস। ঋষভ পন্ত তো এলেন জাতীয় দলে স্বপ্নীল সময় পার করেই৷ 

 

শিরোপা বলে

মুম্বাইয়ের পরে তোমরাই এবারও আমার দাবিদার। তা মুম্বাইয়ের আগে নয় কেন? মুম্বাই অন্য সব দলের চেয়ে এগিয়ে থাকে কোথায়? তাদের স্লগ ওভার হিটিংয়ে কিংবা ফিনিশিংয়ে- পান্ডিয়া ব্রাদার্স ও পোলার্ডের সৌজন্যে। দিল্লি, সেখানে তোমাদেরও বিগ হিটারদের মধ্যে আছে স্টোইনিস। স্টোইনিস না পারলে কে পারবে? তোমাদের মিডল ওভারের বিগ হিটারদেরই তাই তা পারতে হবে। আক্সারকেও তাই দেখাতে হবে বিধ্বংসী রুপ। পন্ত খোলস ছেড়ে বেরিয়ে খেলবেন নিজের মতো, গতবারের পান্তের বিপরীতে। হিটমায়ার খেললে হিটমায়ারকে ঝড় তুলতে পারতে হবে। ওয়ান ডাউনে স্মিথ কিংবা রাহানে ইনিংস সামলাবেন। নতুন সংযুক্তি স্যাম বিলিংসও ফিনিশিয়ের রোল পালন করতে পারেন। তোমাদের কাছে অপশন আছে, সেগুলো ভালোভাবে কাজে লাগাতে হবে। সেজন্য ভরসা- রিকি পন্টিংয়ের মতো একজন আছেন তোমাদের সাথে। 

 

****

 

পাঞ্জাব বলছি। নাম বদলে ভাগ্য বদলের উদাহরণে অনুপ্রাণিত হয়ে দিনবদলের আশায় আমরাও বদল এনেছি আমাদের নামে। দিনবদলের আশায় কত পরিবর্তনই তো করলাম, নামটাই শুধু বাকি ছিল! তা এবারও পরিবর্তনে অগ্রজ হয়ে নিলামে নামার আগে সবচে মুল্যবান পার্স নিয়ে নেমেছিলাম আমরাই। সমস্যার যে সমাধান করতে হবে!

 

সমস্যা কোথায় ছিল? ক্রমশই ব্যাটসম্যানদের খেলায় ধাবমান ক্রিকেটে বোলিংয়েই থাকে যা সমস্যা। তাইতো বোলিংয়ে এগিয়ে থাকারাই থাকে দৌড়ে এগিয়ে। বিশেষ করে ব্যাটসম্যানদের শাষক রুপে রুপ নেয়ার ওই বোলারদের 'মরণ' ওভারের সময়ে! আমাদেরও তো প্রধান সমস্যা নিহিত ওখানেই৷ 

 

সে সমস্যা দুরীকরণে আইপিএলের অভিজ্ঞতাহীন অজি দুই পেসার জাই রিচার্ডসন ও রাইলি মেরেডিথের পেছনে পাঞ্জাব কিংস খরচ করেছে ২২ কোটি রুপি। রাহুল-আগারওয়াল-গেইল-পুরানের হেভি টপ অর্ডারে যোগ দিয়েছেন টি-টোয়েন্টির সেরা ব্যাটসম্যান ডেভিড মালানও। মিডল অর্ডারে ও ফিনিশিংয়ে শক্তি বাড়াতে হেনরিকিউস ও শাহরুখ খানকে কিনেছে ৯ কোটি ৪৫ লাখ রুপিতে। এ শাহরুখ খানকে দেখলে অনিল কুম্বলের 'কাল হো না হও' কিংবা 'কুচ কুচ হোতা হ্যায়' মনে পড়ে না, নেটে তাকে দেখলে কুম্বলের মনে পড়ে কিয়েরন পোলার্ডকে। 

 

শিরোপা বলে

ডেথ বোলিংয়ে দিনকে দিন উন্নতি করছেন জাই রিচার্ডসন। এর আগে কোনওদিন না খেলা আইপিএলে সেটা করতে পারলেই হলো তোমাদের। সাথে তো মোহাম্মদ শামি আছেনই, আর্শদিপও ভালো সমর্থন দিতে পারে। আচ্ছা এই পাঞ্জাব, তোমরা কিভাবে পারবে ডেভিড মালানের মতো একজনকে বসিয়ে রাখতে? এমন একজনকে কোনওভাবে খেলানো গেলে তো তোমাদেরই লাভ। তোমরা তোমাদের সঠিক কম্বিনেশন খুজে পেলেই হলো, দল দেখে তোমাদেরকেও কম শক্তিশালী মনে হচ্ছে না। 

 

****

 

রাজস্থান বলছি। টপ অর্ডারে আমাদের দুশ্চিন্তার বিষয় দুর্বলতার বদলে ছিল শক্তিই। আসলে অতি শক্তিটাই হয়ে দাড়িয়েছিলো দুর্বলতা। টপ অর্ডারে সৃষ্ট হ-য-ব-র-ল অবস্থার পরিমাণ এবার কিছুটা হলেও কমেছে উথাপ্পা-স্মিথের বিয়োজনে। তবে বাটলারের সঙ্গে কে ওপেন করবেন, সে ধোয়াশা এখনও রয়ে গেছে বহাল তবিয়তেই।

 

জফরা আর্চার বাদে বাকি সব বোলারই গেলবার ছিলেন বীবর্ণ। এবার শুরুর কয়েক ম্যাচে আর্চারকেও পাচ্ছি না। তবে ক্রিস মরিস ও আর্চারের উপস্থিতি আমাদের বোলিং দুশ্চিন্তা দূর করবে আশা। মিডল অর্ডারে অভিজ্ঞতার অভাব ছিল গেলবার। তরুণ রিয়ান পারাগ ও অনুজ রাওয়াতরা কিছু করে দেখাতে পারেননি, এবার আশা তারা করে দেখাবেন। শিভাম দুবে,  রাহুল তেওয়াতিয়া, ক্রিস মরিস- বিধ্বংসী এ ত্রয়ীর ঝড় ফিনিশিং দুশ্চিন্তা উড়িয়ে দিবে আশা। 

 

আহ, আশা। সেই প্রথমবার শেষে কত আশা নিয়েই তো শুরু করি তোমারে পাওয়ার খেলা। নিরাশ হয়ে ফিরেছি প্রতিবার। এই আশার আলোয় পরিবর্তনের মিছিলে অন্ধকারে পড়েছি কতবার। সাঞ্জু স্যামসনের অধীনে সেই আশা এবার পুরণ হবে, বসে আছি এ আশায়। 

 

শিরোপা বলে

রাজস্থান, তোমাদের তো আমি শিরোপার নেওয়ার দৌড়ে মুম্বাই ও দিল্লির পরেই রাখব। কিন্ত আর্চার ও মরিস বোলিং দুশ্চিন্তা উড়িয়ে দিলেও তা ঘুরেফিরে আসবে তোমাদের ভারতীয় পেস আক্রমণের কারণেই। তবু তোমরা নিঃসন্দেহে আগেরবারের চেয়ে শক্তিশালী দল করেছ। তোমাদের পুর্ব পরিকল্পনাও নিখুত লেগেছে এবার।