• ফুটবল

রিভালদো – একজন স্বপ্নের ফেরিওয়ালা

পোস্টটি ৪৩২ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

ব্রাজিলের যেকোনো খেলোয়াড়'কে নিয়ে লিখতে নিলে শুরুতেই একটা কথা লিখতেই হয় - দরিদ্রতা, শূন্যতা, অভাব, ক্ষুধা আর সংগ্রাম, পরিবারের অভাব অনটন মেটানোর জন্য ছেলেবেলাতেই রোজগারের পিছনে ছোঁটা, তবুও সেই বাঁধা বিপত্তি কিংবা অভাব দুর্দশা পাশ কাটিয়েই কেবল সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত প্রতিভা নয় বরং নিরঙ্কুশ পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে ফুটবলের ময়দানে নিজের নাম চিনিয়ে ফেলা; প্রত্যেক ব্রাজিলিয়ান ফুটবলারের বেড়ে ওঠার গল্পগুলো প্রায় এক রকমই! 

 

রিভালদো'র ক্ষেত্রেও এর ব্যাতিক্রম নয়। রিভালদোর বেড়ে ওঠা ব্রাজিলের উত্তর-পুর্বের শহর রেসিফের বস্তিতে। দারিদ্র্যের কষাঘাতে সমুদ্র সৈকতে বিক্রি করতেন পানীয়,  অপুষ্টিতে চোয়াল এমনই ভাঙতে থাকে যে, দুটি দাঁত পর্যন্ত নস্ট হয়ে যায়। এরই মাঝে মাত্র ১৫ বছর বয়সে বাবাকে হারিয়ে ঘোর অন্ধকার সাগরে ডুবে যেতে থাকেন। 

 

কিন্তু ঐ যে, ফুটবল তো ব্রাজিলিয়ানদের রক্তে; এই দুঃখ দুর্দশা কিংবা জীবনের কঠিনতম পরিস্থিতিতেও ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা দমাতে পারেনা কিছুতেই! 

 

বাবাকে হারানোর পর রিভালদো ফেরিওয়ালার কাজ শুরু করেন। রোগা, হালকা, পাতলা, শীর্ণ, অস্থিচর্মসার রিভালদো ফেরিওয়ালার কাজের ফাঁকেই দিনে ১০-১২ মাইল হেঁটে ট্রেনিং করতেন, ফুটবল নিয়ে মাঠে দৌড়াতেন, স্বপ্ন দেখতেন! 

 

লিকলিকে একটা তরুণের ফুটবল নিয়ে ছোটাছুটি, মাঠে নানা কারিকুরি তে বিষ্ময় প্রকাশ করতেন অনেকেই; একটা সময় যা নজর কাড়ে সান্তা ক্রুজ নামের একটি ছোট ক্লাবের। যদিও ক্লাবের ডাক্তার বা অনেক কর্মকর্তাই তাকে নেওয়ার পক্ষে ছিলেন না, এমন কঙ্কালসার, হাড়ডিগডিগে, দন্তহীন ভগ্নচোয়ালের শারীরিক সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করবে যে কেউই। তবুও কেবল অসাধারণ ফুটবলীয় প্রতিভাই হয়তো এ সবকিছুকে ছাপিয়ে রিভালদোর প্রথম পেশাদার চুক্তি স্বাক্ষর করায়, ১৯৯১ সালে।  

 

পেশাদার ফুটবলের শুরুটা মোটেই সুখকর ছিলোনা রিভালদোর, যার মুল কারণই ছিলো ভগ্ন শরীর, যার দরুন কোচ কিংবা স্টাফরা ঠিকঠাক ভরসা করতে পারতেন না কোনোমতেই! সান্তা ক্রুজে রিভালদো ছিলেন মাত্র ১ সিজন, এরপরে খেলেন মগি মিরিমে। মগি মিরিমে থাকাকালীন করিন্থিয়ান্সের এক স্টাফের নজরে আসেন তিনি, সুযোগ বুঝে ক্লাব করিন্থিয়ান্স তাকে ধারে নিয়ে নেয় ১৯৯৩ সালে। সেখানে পর্যাপ্ত সুযোগ পাননি রিভালদো, এরপরে তাকে কিনে নেয় আরেক ক্লাব পালমেইরাস। পালমেইরাসেই মুলত রিভালদো পারফরম্যান্সের সুবাতাস ছড়াতে থাকেন। প্রথম সিজনেই লীগ জিতাতে করেন সহায়তা, পরের সিজনে জিতেন পাউলিস্তা। উক্ত দুই সিজনেই ব্রাজিলের এক বিখ্যাত স্পোর্টস ম্যাগাজিনের Bola de Ouro পুরস্কার জিতেন রিভালদো, যা মুলত নির্দিষ্ট পজিশনে লীগের সেরা খেলোয়াড়ের খেতাব। পারফরম্যান্সের সুবাতাস পৌঁছে যায় স্পেনে, ফলস্বরূপ ১৯৯৬ সালে স্প্যানিশ ক্লাব দেপোরতিভো রিভালদো'কে ইউরোপের বিমানে চড়ান। দেপোরতিভোতে তিনি ছিলেন এককথায় ‘উড়ন্ত'। পালমেইরাসে তিনি দুই মৌসুমে করেছিলেন ২১ গোল আর ইউরোপে এসে প্রথম মৌসুমেই করেন ২১ গোল, সাথে ছিলেন লীগের চতুর্থ সর্বোচ্চ গোলদাতা, দলকে তুলেন লীগের চতুর্থ স্থানে। ফলস্বরূপ, দেপোর্তিভো ধরে রাখতে পারেনি আর, নজরে পড়ে জায়ান্ট বার্সেলোনার, ১৯৯৭ সালে ২৬ মিলিয়ন পাউন্ডে কাতালুনিয়ার ক্লাবটিতে যোগ দেন রিভালদো। 

 

বলা আবশ্যক, করিন্থিয়ান্সে থাকাকালীন'ই ১৯৯৩ সালে ২১ বছর বয়সে ব্রাজিল দলের ডাক আসে রিভালদোর, কিন্তু থিতু হতে পারেননি। এরপরে ১৯৯৬ সালে ব্রাজিলের অলিম্পিক দলে ডাক পান তিনি। কিন্তু সেই অধোরা অলিম্পিক গোল্ড জয়ের মিশনে রীতিমতো দেশব্যাপী ভিলেইন হয়ে যান রিভালদো; আটলান্টা অলিম্পিকে, ব্রাজিল সেমিফাইনালে মুখোমুখি হলো নাইজেরিয়ার, রিভালদোর এক  ভুল পাস থেকে গোল পেয়ে যায় নাইজেরিয়া, দুঃস্বপ্নের ষোলকলা পূর্ণ হয় ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে গোলকিপারকে একা পেয়েও গোল করতে না পারার মধ্য দিয়ে। এসময় দেশব্যাপী তীব্র সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয় তাকে। অনেকে তাকে "অপয়া" "ভিলেন" আখ্যা দিতে থাকেন!

 

বার্সাতে প্রথম সিজনেই ৩৪ ম্যাচে ১৯ গোল করে সেকেন্ড টপ গোলস্কোরার বনে যান তিনি, বার্সা সেই সিজনে লীগ ও কোপা দেল রে জিতে নেয়। ১৯৯৭ কোপা আমেরিকার দলে না থাকলেও রিভালদো জায়গা পান ৯৮’র বিশ্বকাপ দলে, অলস্টার সেই দলে জায়গা করে নিয়ে পুরো টুর্নামেন্টে ৩টি গোল আর দুটি অ্যাসিস্ট করেন রিভালদো। এরপর ১৯৯৯ এ বার্সা আবারো লালীগা জিতেন, ২৪ গোল করে রিভালদো হোন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা। একই সিজনে কোপা আমেরিকায় ৫ গোল করে টুর্নামেন্ট সর্বোচ্চ গোলদাতা হোন, এবং ব্রাজিলকে শিরোপা জিতান রিভালদো। ফলস্বরূপ ফিফা বর্ষসেরা পুরস্কার ও ব্যালন ডি অরের খেতাব জিতেন রিভালদো। ২০০১ সালে আবারো ২৩ গোল করে লীগের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা হোন রিভালদো। রিভালদোর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সফলতম বছর ছিলো এটিই, যার।পরিপূর্ণতা ব্রাজিলকে বিশ্বকাপ জিতানোর মধ্য দিয়ে।

 

ঐ যে রিভালদোর অলিম্পিক ব্যর্থতার কথা মনে আছে?? ১৯৯৬ এর অলিম্পিকের পর থেকে ভিলেন বা অপয়া আখ্যা পাওয়া রিভালদোকে ব্রাজিলিয়ান মিডিয়াও খুব বাজেভাবে উপস্থাপন করা শুরু করে, এমনকি ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপ হারার পর তাকে দোষারোপ করা হয় ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার জন্য, যার দরুণ ঘরের মাঠে ব্রাজিলের ম্যাচ চলাকালীন ব্যু'ও শুনতে হয়েছে রিভালদোকে। রিভালদো তার আসল বীরত্বগাথা রচনা করেন ২০০২ বিশ্বকাপ, গ্রুপপর্ব থেকে শুরু করে কোয়ার্টার ফাইনাল অবধি টানা পাঁচ ম্যাচেই গোল করেন তিনি, রোনালদো-রোনালদিনহোর সাথে গড়ে তুলেন অদম্য নির্ভিক এক আক্রমণভাগ। ফাইনালে অলিভার কান কে পরাস্ত করা রোনালদোর সেই গোলের কথা মনে আছে তো?? ডি-বক্সের বাইরে থেকে জোরালো শট নিলেন রিভালদো, জার্মান গোলরক্ষক অলিভার কান ধরতে পারলেন না, ফিরতি শটে গোল করেন রোনালদো। এর কিছুক্ষণ পর রাইট উইং থেকে আসা সহজ একটি পাসকে রিভালদো পায়ের ফাঁক দিয়ে যেতে দিলেন চকিতে, সামনে থাকা তিন ডিফেন্ডার বুঝেই উঠতে পারেনি, প্রায় ফাঁকায় বল পেয়ে গোল করে ব্রাজিলকে পঞ্চম বিশ্বকাপটি জিতিয়ে দিলেন রোনালদো। চিরায়ত এক ব্রাজিলিয়ান ভিলেনই ব্রাজিলকে এনে দিলেন পঞ্চম বিশ্বকাপ শিরোপা!

 

বিশ্বকাপ জেতার পর রিভালদো যোগ দেন এসি মিলানে। পরিপূর্ণ এক ক্যারিয়ারে বাকি ছিল কেবল চ্যাম্পিয়ন্স লিগ। উক্ত মৌসুমে মিলানের হয়ে অধরা চ্যাম্পিয়ন্স লীগ জেতার পাশাপাশি জেতেন কোপা ইতালিয়া ও ইউরো সুপার কাপ। বয়সের ভারে যখন পারফরম্যান্স টা আর ঠিকঠাক হচ্ছিলো না তখন ইউরোপ ছেড়ে আবারো ব্রাজিলে ফেরেন, ক্রুজিইরো তে। এক সিজন পরেই আবার ফিরে আসেন ইউরোপে, গ্রীসের ওলিম্পিয়াকোসে।সেখানেও টানা ৩ সিজন লীগ জিতেন রিভালদো। এরপর আরো অনেক বছর খেলা চালিয়ে গেলেন বিভিন্ন ক্লাবে; গ্রীসের এথেন্স সহ উজবেকিস্তানের বুন্নোদকোরে, যেখানে টানা ৩ সিজনে ৩ টি লীগ জিতেন রিভালদো, এরপরে ফিরেন শৈশবের মগি মিরিমিতে, এরপরে খেলেন সাও পাওলোতে, খেলেছেন এঙ্গোলার কাবুস্ক্রোপে, আবার ফিরেছেন ব্রাজিলের সাও কেইটানো তে, অবসর নিয়েছেন আবারো মগি মিরিমিতে ফিরে। 

 

হেলাল হাফিজের কবিতায় আমরা এক ফেরিওয়ালা পেয়েছিলাম যিনি কিনা হরেকরকমের কস্ট বিক্রি করেন; শৈশবে ক্ষুধার তাড়নায় ফেরিওয়ালার পেশা বেছে নেওয়া রিভালদো জীবনভরই ছিলেন অন্যপ্রকার এক ফেরিওয়ালা, স্বপ্নের ফেরিওয়ালা, যিনি স্বপ্ন বুনেছেন, স্বপ্ন বিলিয়েছেন! যেই ফেরিওলার জীবনদর্শন কিংবা দারিদ্র্য, দুর্দশা, প্রতিকূলতা সব জয় করে সাফল্যের শিখরে পৌছানোর গল্প কিংবা রেসিফের বস্তি থেকে বিশ্বজয়ী রিভালদোর গল্প প্রেরণা যোগায়, স্বপ্ন দেখায়, স্বপ্নকে ছোঁয়ার তাড়না যোগায়! 

রিভালদো – একজন স্বপ্নের ফেরিওয়ালা