• ফুটবল

মার্সেলো : ভালোবাসা আবার আক্ষেপের এক নাম

পোস্টটি ৪২১ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

মার্সেলো'র খেলোয়াড়ি জীবনের যখন বেড়ে উঠা, তখন পুরো ফুটবল পৃথিবীটা লেফটব্যাক বলতেই একজন বুলেটম্যান রবার্তো কার্লোসের নেশায় বুদ ছিল! সবার ধারণাটা এমন হয়ে গিয়েছিলো যে লেফটব্যাক মানেই শক্তিশালী একজন খেলোয়াড়, ৯০ মাইল বেগে শট, পুরু থাই, অস্বাভাবিক উচ্চতায় লাফ, চিতা'র বেগে দৌড়! আর তা যদি হয় ব্রাজিল কিংবা মাদ্রিদের জন্যে, তাহলে তো তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা!

 

অথচ দেখুন, সেই রবার্তো কার্লোস'ই ছিলেন মার্সেলোর শৈশবের নায়ক, মার্সেলো আইডল! মার্সেলো যখনই তার বন্ধুদের সাথে রাস্তায় অথবা পাড়ার মাঠে খেলতেন, তিনি সব সময়েই লেফট ব্যাক পজিশনটাকেই বেছে নিতেন! মার্সেলো'কে শৈশবে খুব কাছে থেকে পরখ করা একজন একবার বলেছিলেন - তিনি মার্সেলো ও তার খেলার সাথীদের একবার মাঠে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে ওরা বড় হয়ে কি হতে চায়! তাদের অধিকাংশেরই উত্তর ছিলো, কেউ বা পেলে, কেউ বা রিভালদো, কেউ বা রোমারিও হতে চায়! কেবল একজনই ছিলেন, যিনি কিনা রবার্তো কার্লোস'কে মনে প্রাণে ধারণ করেছিলেন, যিনি কিনা রবার্তো কার্লোস কে ভালোবেসেই 'লেফটব্যাক' পজিশনটাকে নিজের আইডিয়াল পজিশন ধরে নিয়ে ফুটবল'টাকে ভালোবাসা শুরু করেন! 

 

স্বপ্ন তো কতজনই দেখেন, আইডল তো কতজনকেই ভাবা যায়, তা সত্যি হয় ক'জনের, স্বপ্নগুলোকে ছোঁয়া হয় কয়জনের!?

 

কিন্তু একজন মার্সেলো ভিয়েরা দ্য সিলভা'র স্বপ্ন ও প্রচেস্টা এতটাই দুর্দান্ত ছিলো যে, সে একদিন সত্যি সত্যি ব্রাজিল জাতীয় দলে এবং রিয়াল মাদ্রিদে তার সেই আইডল রবার্তো কার্লোসের পজিশনেই নিজের জায়গা পাকাপোক্ত করে নেন! একজন কার্লোসের উত্তরসুরী হিসাবে নন, স্বমহিমায় ভাস্বর একজন মার্সেলো হয়েই ইতিহাস গড়েন মাদ্রিদের সাদা জার্সিতে আর নিজেকে নিয়ে যান অনন্য এক উচ্চতায়!

 

রিয়াল মাদ্রিদ মার্সেলো'কে কিনেছিলো রবার্তো কার্লোসের উত্তরসূরি হিসেবে। কিন্তু ঐ যে বললাম, মাদ্রিদবাসী তখন 'লেফটব্যাক' বলতেই কার্লোস নামক এক মায়ার জাদুতে মন্ত্রমুগ্ধ! সেই কার্লোসের জায়গা নেয়াটা, কার্লোসের উত্তরসূরি হওয়ার চাপটা অল্পবয়সী মার্সেলোর জন্যে বেশ কঠিন হয়ে দাড়ালো! ফলাফল, খারাপ পারফর্ম আর বার্নাব্যু দর্শকদের দুয়োধ্বনি! এমন অবস্থায় কোচ কিংবা রবার্তো কার্লোস দুজনকেই পাশে পেয়েছেন মার্সেলো, পেয়েছেন কার্লোসের পরামর্শ! 

 

ছোট থেকেই কার্লোস'কে স্বপ্ন সারথি মেনে যিনি আজ এতদুর আসতে পেরেছেন, সেই কার্লোস'কে এতটা কাছে পাওয়ার পরেও মার্সেলোকে আটকায় কে!? কঠোর পরিশ্রম আর চেস্টার মাঝে মার্সেলো কখনোই হাল ছাড়েননি, যখনই সুযোগ পেয়েছেন তখনই নিজের সেরাটা দিয়েছেন! ধীরে ধীরে নিজের জায়গাটা পাকাপোক্ত করতে থাকেন তিনি। 

 

মাদ্রিদ ক্যারিয়ারে মার্সেলো'র প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাদ্রিদে অনেকেই উঁকি দেয়, কিন্তু বারেবারেই সবাইকে ছাপিয়ে মার্সেলো নিজেকে প্রমাণ করেছেন বারেবার, দেখিয়েছেন মনে স্বপ্ন আর সাহস থাকলে কিভাবে পরিশ্রমের মাধ্যমে সফলতা পাওয়া যায়! গ্যাব্রিয়েল হেইনজ এবং রয়স্টোন ড্রেনথ, রাউল ব্রাভো, মিগুয়েল তোরেস, হেইনজ, কন্ত্রেয়াও'র মত বড় বড় নাম ছিলো মার্সেলোর সাথের প্রতিযোগিতায়; কিন্তু প্রতিবারই জিতে গেছেন মার্সেলো।

 

বার্নাব্যু'র দুয়োধ্বনি তে যার শুরু, সেই মার্সেলো ঝুড়িতেই এখন রিয়ালের হয়ে ২০ খানা ট্রফি! যেখানে ৪ টি উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লীগ, যা কিনা যেকোন খেলোয়াড়ের জন্যে স্বপ্নের মতন! মার্সেলো লালীগা জিতেছেন ৪ টি, ক্লাব বিশ্বকাপ'ও ৪ টি। সুপার কাপ কিংবা কোপা দেল রে সবই পুড়েছেন পকেটে! মার্সেলো ইতিহাসের অন্যতম সেরা লেফটব্যাক হিসেবে নিজেকে কিভাবে প্রমাণ করেছেন কিংবা মার্সেলো তার জায়গায় কতটা শক্তিশালী তার প্রমাণ পাবেন ফিফা বর্ষসেরা একাদশে ৫ বার স্থান পাওয়ার মাঝে, উয়েফার বর্ষসেরা একাদশে ৩ বার স্থান পাওয়ার মাঝে! 

 

মার্সেলো বলেছিলেন, আমার আইডল কার্লোস'কে রিপ্লেস করা কখনোই সম্ভবপর না, আমি এখানে আমার নিজের নামেই ইতিহাস গড়তে চাই! সত্যিই হয়েছে তাই, একজন মার্সেলো নিজেই নিজের ইতিহাস তৈরি করেছেন সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর সবুজ গালিচায়, নিজেকে মাদ্রিদের ইতিহাসে সংযুক্ত করেছেন আপন মহিমায়!

 

মার্সেলো'র জন্ম ব্রাজিলের রিও ডি জিনেইরো তে। বাবা ছিলেন একজন ফায়ারম্যান। খুব বেশি স্বচ্ছল পরিবার ছিলোনা মার্সেলো'র। বিভিন্ন স্বাদ-আল্লাদ পুরণের জন্যে কাঠখড় পোড়াতে হতো মার্সেলো বাবা'কে। মার্সেলোর স্বাদ আল্লাদ বলতে কেবল একটা জিনিসই ছিলো, ফুটবল! দাদা'র আনুকুল্যে এই নেশাটা বাড়তে থাকে মার্সেলো'র। প্রথম শুরুটা ছিলো, ফুটসাল খেলার মাঝ দিয়ে। ৯ বছর বয়স থেকে ফুটসালে হাতেখড়ি মার্সেলো'র। এরপর ১৩ বছর বয়সে ফ্লুমিনেন্সের নজড়ে পড়েন তিনি। ২০০২ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত ক্লাবের যুবদলে খেলেন মার্সেলো। এরই মাঝে মার্সেলো'র খেলায় মুগ্ধ হয়ে সবাই ওকে নেক্সট কার্লোস ডাকা শুরু করেন। পারফরম্যান্স'র ফল স্বরুপ ডাক পেয়ে যান ব্রাজিলের অ-১৭ দলে। এরপর ২০০৭ পর্যন্ত মুল দলে অনিয়মিত খেলার সুযোগ পান মার্সেলো।  আর এই ডাক ছড়ে যায় স্পেন অব্দি। ২০০৭ এর জানুয়ারি ট্রান্সফারে কার্লোসের উত্তরসুরী হিসেবেই এই ব্রাজিলিয়ান'কে দলে ভিড়ায় রিয়াল মাদ্রিদ। একই বছর ব্রাজিল অ-২০ দলের হয়েও ডাক পান মার্সেলো। যদিও মার্সেলো জাতীয় দলের যাত্রাটা শুরু হয় ২০০৬ এই, মাত্র ১৮ বছর বয়সে! ওয়েলসের বিপক্ষের সেই ম্যাচে গোল'ও পেয়েছিলেন এই লেফটব্যাক! কিন্তু দুঙ্গার দলে থিতু হননাই তিনি। এর মাঝে ২০০৮ এর অলিম্পিক দলে জায়গা হয় মার্সেলোর, জিতেন ব্রোঞ্জ পদক! ২০১০ বিশ্বকাপের ৭ রিজার্ভ খেলোয়াড়দের তালিকায় ঠাঁই হয় মার্সেলো'র। এরপর মানেজেসের আমল থেকে ব্রাজিল দলে নিয়মিত হতে থাকেন মার্সেলো। হলুদ জার্সির ঝুড়িতে মার্সেলো'র রয়েছে ২০১৩ সালের কনফেডারেশন্স কাপ!

 

মার্সেলো'র হলুদ জার্সিনামা'র শেষটা করি, আপাতত একটা তথ্য দিয়ে। মাদ্রিদ কোচ হুয়ান্দে রামোস মার্সেলোকে লেফট উইঙ্গার হিসেবে খেলিয়েছিলেন ২০০৮-০৯ এর দিকে! তিনি মনে করেছিলেন, ডিফেন্সের চাইতে মার্সেলোর আক্রমণ করার প্রবণতা এবং দক্ষতা দুটোই বেশি! পরের সিজনে যখন পেলেগ্রিনি কোচ হয়ে আসেন, তখন তিনি তিনি মার্সেলোকে আবারো রক্ষণের দায়িত্ব দেন, কিন্তু মার্সেলো'র সেই সহজাত আক্রমণের মানষিকতা কাটেনি, যা কিনা রয়ে গেছে এখনো। ঐ সিজনে এসিস্টের তালিকায় কাকা রোনালদোর পরের নামটাই ছিলো মার্সেলো'র। মার্সেলোর পুরো ক্যারিয়ারেই একজন রক্ষণের দায়িত্বে যতটা, আক্রমণের মানষিকতা কিংবা ডিফেন্স ছেড়ে উপরে উঠে গিয়ে বল যোগানোতেও ততটাই! মার্সেলো'র এই স্টাইলে মাদ্রিদ যতটা সুফল পেয়েছে, ব্রাজিল জাতীয় দল তার ঠিক উল্টোটাই! তর্ক কিংবা যুক্তি থাকতেই পারে এই ব্যাপারে, কিন্তু সাধারণ একজন সেলেসাও ফ্যানের স্থান থেকে লেখাটা শেষ'টা করব এই বলেই - প্রিয় মার্সেলো, মাদ্রিদ'কে ঠিক যতটা দু'হাত ভরে দিয়েছো, সেলেসাও সমর্থকদের জন্যে ঠিক ততটাই আফসোসের পশরা সাজিয়েছো!!