• ক্রিকেট

পর্দার আড়ালে ১৪ বছর

পোস্টটি ৪৩৫ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

 

২৫. ০৭. ২০০৭ বাংলাদেশ বনাম শ্রীলঙ্কা (৩য় ওডিআই) প্রেমাদাসা স্টেডিয়াম, কলম্বো, শ্রীলঙ্কা।

৩০ নম্বর সিরিয়ালের লাল-সবুজ জার্সি গায়ে নতুন একজন মাঠে নেমেছেন। দলে আশরাফুল, আফতাব, রাজ্জাক ও জাভেদ ওমরের ভীড়ে নতুন করে কাউকে নজরে আনার ফুসরত নেই। নবাগত সাকিব-তামিম আর মুশফিকেই সমর্থকদের আগ্রহ সীমাবদ্ধ। 

তাই, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের অভিষেকে তিনি আড়ালেই ঢাকা পড়লেন। অথচ তামিমের পর দলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান সেদিন তার ব্যাটে। রিয়াদের ৩৬ রান হার এড়াতে পারেনি। বল হাতে দুই উইকেট শিকারেও আলোচনা হয়নি ২১ বছয় বয়সী মাহমুদউল্লাহকে নিয়ে। 

ক্যারিয়ারের প্রথম ম্যাচ থেকেই শুরু আড়ালে থাকার গল্প। সে গল্পের দৈর্ঘ্য বাড়তে বাড়তে ১৪ তে এসে ঠেকেছে। কিন্তু, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ এখনও আড়ালেই রয়ে গেছেন। শেষ ৬ বছর ধরে সম্মুখ সারির একজন হয়েও, এখনও নিয়মিত আড়ালেই তাকে থাকতেই হচ্ছে। এটাই এখন রিয়াদের স্বভাবের সাথে মানানসই। 

রিয়াদের আড়ালে থাকার গল্পটা কেমন ? রিয়াদ দলের ক্রাইসিস ম্যান। সংকটে বুক চিতিয়ে লড়েন। ভঙ্গুর অবস্থা থেকে দলকে টেনে তোলাই রিয়াদের প্রথম কাজ। কিন্তু, রিয়াদের নেই স্বীকৃতি। পারফর্ম করলেও তাকে নিয়ে হয়না হইচই, ঝড় উঠেনা চায়ের কাপের আলোচনাও। তালিকা করলে রিয়াদের ক্যারিয়ারে এমন ঘটনা আছে ভুরিভুরি। যা তাকে আলোয় আনার উপলক্ষ তৈরি করেও আড়ালেই রেখে দিয়েছে।

received_404850490884762

বিশেষ করে — ২০১০ সালে ভারতের বিপক্ষে হোম সিরিজে দুই টেস্টে ৬৯ আর ৯৬* রানের দূর্দান্ত দুই ইনিংসে সুনীল গাভাস্কার তাকে ৮ নম্বর পজিশনের সেরা ব্যাটসম্যান বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। এত নীচে কেন রিয়াদ ব্যাটিং করে সেই প্রশ্নও তুলেছিলেন। বোলিং অল-রাউন্ডার হিসেবে দলে আগমন ঘটায় তাকে নিয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেনি টিম ম্যানেজম্যান্ট। ব্যাটিং পজিশন তলানীতেই পড়েছিলো।

নিজেদের মাঠে অনুষ্ঠিত ২০১১ বিশ্বকাপে চট্টগ্রামে ইংল্যান্ডকে হারানোর ম্যাচে কৃতিত্ব কাকে দেওয়া হয় বেশি ? নিশ্চিতভাবেই শফিউলের নাম উচ্চারিত হবে সবার মুখে। যদিও, ম্যান অব দ্যা ম্যাচ ছিলেন ইমরুল কায়েস। ব্যাটিং বিপর্যয়ে ম্যাচের ভাগ্য গড়ায় শেষ ওভারে। শফিউলের ২৪ বলে ২৪ রানের ইনিংসে জয় সহজ হলেও ৪২ বলে ২১ রান করে অন্যপ্রান্ত আগলে রেখেছিলেন রিয়াদ। কিন্তু, পর্যাপ্ত কৃতিত্ব রিয়াদ কখনোই পাননি, আলোচনায় বরাবরই শফিউলের নাম উঠে এলে আড়ালে পড়ে যান মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ।

পরের বছর এশিয়া কাপ পরাজয়ে রিয়াদকে ভর্ৎসনা দেওয়া হলেও, ফাইনাল নিশ্চিতের ম্যাচে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে নাসিরের সাথে ৭৫ রানের জুটি গড়ে জয় নিয়ে মাঠ ছাড়েন রিয়াদ। অথচ, এই ম্যাচের স্মৃতি স্মরণে এনে রিয়াদকে সম্মান জানানো হয়না।

একইবছর উইন্ডিজের বিপক্ষে হোম সিরিজে ব্যাট ও বল হাতে সমানতালে পারফর্ম করেও স্বীকৃতি মিলেনি। সেবারের স্বীকৃতি না পাওয়াটা রিয়াদের দূর্ভাগ্যও বটে। ৩-২ ব্যবধানে সিরিজ জয়ে রিয়াদের ভূমিকা ছিলো অসামান্য। ব্যাটে হাতে ১৫৯ রান ও বল হাতে ৮ উইকেট। সবার ধারণা অনুযায়ী রিয়াদ ম্যান অব দ্যা সিরিজ হওয়ার কথা হলেও সিরিজে সর্বাধিক রান করে ম্যান অব দ্যা সিরিজের খেতাব যায় মুশফিকের ঘরে।

129801

একই সিরিজে নিশ্চিত মনে আছে খুলনায় অভিষেক টেস্টে দশম উইকেটে ব্যাট করতে নেমে আবুল হাসানের ১১০ বছরের রেকর্ড ভাঙা শতকের গৌরবগাঁথা। দশম উইকেটে এর আগে অভিষেকে সর্বোচ্চ ৫৯ রান ছিলো পাকিস্তানের রশিদ খানের। যেহেতু ম্যাচের বর্ণনা দিয়েই দিলাম, নিশ্চিত সেদিন রিয়াদের অবদান আপনার দৃষ্টিগোচর হয়নি। একপ্রান্ত আগলে রেখে রিয়াদের ৭৬ রানের ইনিংসেই ভরসা পেয়েছিলো আবুল হাসান। অভিজ্ঞ একজন একপ্রান্ত আগলে সাহস যোগানোতেই শতকের দূর্গম পথ অনায়াসেই সেদিন পাড়ি দেন আবুল হাসান। যাই হোক... রিয়াদকে ঘিরে সেদিনও তেমন আলোচনার জন্ম নেয়নি। যত আলোচনা আবুল হাসান রাজুকে ঘিরেই ছিলো।

২০১৫ বিশ্বকাপে অ্যাডিলেড রূপকথার সবচেয়ে বড় নায়ক বা কারিগর তো রিয়াদ, তাতে কারো সন্দেহ করার উপায় নেই। বৈরি পরিবেশে দলের ব্যাটিং বিপর্যয় সামলে রিয়াদের অনবদ্য শতকেই ম্যাচে ফেরত আসে বাংলাদেশ। রিয়াদের পাশাপাশি সৌম্য ও মুশফিকের অবদানও ছিলো অসামান্য। সে ম্যাচে রিয়াদের অবদান স্বীকৃত হলেও কিছুটা আলো কেড়ে নিয়েছিলেন রুবেলও। ম্যাচ জয়ের পর রিয়াদের কৃতিত্বের পাশে নিজের নামটাও লেখান অনায়াসে।

পরের বছর ঘরের মাঠে ইংল্যান্ড সিরিজের দ্বিতীয় ওডিআইতে বাংলাদেশ জিতেছিলো এতটুকু তো সবার মনেই আছে। মাশরাফির ব্যাট ও বল হাতে দূর্দান্ত নৈপুণ্য দলকে এগিয়ে নিয়ে যায় জয়ের দিকে। বল হাতে ৪ উইকেট ও ব্যাট হাতে ২৯ বলে ৪৪ সবারই মনে আছে৷ অথচ, ব্যাটিং বিপর্যয়ের দিনে দলের সর্বোচ্চ ৮৮ বলে ৭৫ রান আসে রিয়াদের ব্যাট থেকেই। এবারও ব্যতিক্রম কিছু ঘটেনি। রিয়াদ যথারীতি পর্দার আড়ালে।

photo_1353496665818-2-0

সাকিব দেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন। সাকিবের সাথে সমান ভূমিকা রেখে দল জেতাতে পারার মাঝেই বিশাল কৃতিত্বের ব্যাপার। ২০১৭ চ্যাম্পিয়ন'স ট্রফিতে সাকিব-রিয়াদের ২২৪ রানের জুটিতেই ব্যাটিংয়ে দলের শুরুর ধকল সামলে জয়ের পথ ধরে। সাকিব যেহেতু দেশের ক্রিকেটের বড় তারকা, তাই সাকিবের পাশে রিয়াদের শতকের অর্জন ম্লান হয়ে যায়। ম্যান অব দ্যা ম্যাচের খেতাব চলে যায় সাকিবের কাছে।

রিয়াদের ক্যারিয়ারের আড়াল হওয়ার গল্পের শুরু কলম্বোর প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে অভিষেকে। সেই  প্রেমাদাসার ফ্লাড লাইটের সকল আলোর নিজের দিকে টেনে নিলেন নিদাহাস ট্রফিতে। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে নাটকীয় সেই ম্যাচে ১ বল হাতে রেখে স্কয়ার লেগে ছয় মেরে পর্দার আড়াল থেকে বেরিয়ে আসেন রিয়াদ। 

২০১৯ বিশ্বকাপ বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য ছিলো অগ্নিপরীক্ষা। রাউন্ড-রবিন পদ্ধতির বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচ জয়ে সাকিব ম্যান অব দ্যা ম্যাচ। সাকিব-মুশফিকের অনবদ্য জুটিতে ভর করে তিনশো'র অধিক পুঁজির স্বপ্ন দেখে টিম বাংলাদেশ। যে স্বপ্ন বাস্তবায়ন হয় শেষদিকে রিয়াদের অপরাজিত ৩৩ বলে ৪৬ রান থেকে যায় ছায়ায়।

 ব্যক্তিজীবন বা পেশাগত জীবন যেটাই হোক না কেন! স্বীকৃতি সবদিকেই মুখ্য। রিয়াদের বেলায় হয়তো ক্রাইসিস ম্যান, বিপদের বন্ধু, ফিনিশার কিংবা সাইলেন্ট কিলার নামের স্বীকৃতিটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। আড়ালে থাকাও অনেকের কাছে উপভোগ্য। রিয়াদ তাদেরই একজন।

FB_IMG_1627139578165

রিয়াদ বাংলাদেশ দলের সামনের সারির একজন কাণ্ডারি। যোদ্ধা বললেও ভুল হবেনা। রিয়াদ আড়ালে থাকেন তবে সর্বদা সমালোচনাকে সঙ্গী করেই চলেন। পান থেকে চুন খসলেই তাকে নিয়ে সমালোচনা হয়, দল থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার দাবি উঠে। কিন্তু, রিয়াদ সবকিছুকে বেশ পরিণত মস্তিষ্কেই সামলে নেন। পরিচয় দেন পরিপক্বতার। 

তাই রিয়াদের কাছে বেশিরভাগ ঘটনাই মামুলি ব্যাপার। খুব একটা ভাবায় না অবদান রেখেও স্বল্প স্বীকৃতি নিয়ে আড়ালে থাকার ঘটনা। রিয়াদ পারফর্ম করতে ভালোবাসেন, তাও আড়ালে। তাই এসবেই রিয়াদ অভ্যস্ত।

নিয়মিত পর্দার আড়ালে থাকার অভ্যস্ততার বয়সও পেরিয়ে গেছে ১৪ বছর।