• ফুটবল

ওয়েস্ট মিডল্যাণ্ডের সিংহদের বীরত্ব গাঁথা

পোস্টটি ৩১০ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।
ইউরোপের একটি ক্লাবের সবচেয়ে বড় এচিভমেন্ট কি? উত্তর টা একদম সোজা। ইউয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ। প্রতি বছর ডোমেস্টিক ও ইউরোপিয়ান অনেক শিরোপা জেতারই সুযোগ থাকে ক্লাবগুলোর সামনে। কিন্তু দিনশেষে সাফল্যের মানদণ্ড চ্যাম্পিয়নস লিগের ওই রূপালী ট্রফিটাই। ওটা দ্বারাই নির্বাচিত হয় কোনো সিজনে ইউরোপের শ্রেষ্ঠতম ক্লাব।

সব ক্লাবই স্বপ্ন দেখে একদিন ওই ট্রফিটা ঘরে তোলার। কারো কারো কাছে সেটা হয়তো অলিক কল্পনার মতো, কারো কারো কাছে অতোটাও কঠিন নয়। সহজ? একদমই না। ইউরোপের অসংখ্য তারাভরা দলগুলোর সবকটিকে পেছনে ফেলে রাজার আসনে অধিষ্ঠিত হওয়া, এটা তো মুখের কথা না!

ইউরোপে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লিগ নিঃসন্দেহে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ। অর্থের ঝনঝনানিতে সেখানকার বেশিরভাগ ক্লাবই প্রতিবছর মাঠে নামে বিশ্বের সেরা সেরা তারকাদের নিয়ে। কিন্তু সে তুলনায় ইউরোপের মঞ্চে তাদের সাফল্য একদমই আহামরি না। ইংল্যান্ডের টপ সিক্স বলে খ্যাত ছয়টি ক্লাবের মধ্যে তিনটিই এখন অবধি ঘরে তুলতে পারেনি ইউরোপীয় শ্রেষ্ঠত্বের স্বারক সেই চ্যাম্পিয়নস লিগ।

কিন্তু ইংল্যান্ডের টপ টিমগুলোর অনেকে না পারলেও এমন কিছু ক্লাব এই ট্রফি টা ঘরে তুলেছে, যা ভাবলেও অবাক হতে হয়। এর মধ্যে কিংবদন্তি একটি নাম নটিংহ্যাম ফরেস্ট, যারা দু-দুবার রূপকথা রচনা করে জিতে নিয়েছিলো এই শিরোপা। তাদের সেই রূপকথার গল্প আজও অনেকের মুখেই উচ্চারিত হয় বিস্ময়ের সাথে।

কিন্তু নটিংহ্যাম ফরেস্ট ছাড়াও বর্তমানের একটি গড়পড়তা ক্লাব আজ হতে ৩৯ বছর আগে ঘরে তুলেছিলো ইউরোপিয়ান কাপ (চ্যাম্পিয়নস লিগের সাবেক নাম), যা হয়তো অনেকেরই অজানা। বার্মিংহামের এক ছোট্ট সুন্দর শহরতলী থেকে উঠে এসে দলটি ইংল্যান্ড শাসন করে আবার যে ইউরোপসেরার আসনেও অধিষ্ঠিত হবে, তা কে জানতো?
 
image_search_1633010553403
 
তখন চলছে ১৯৭৩-৭৪ সিজন। তখনও প্রিমিয়ার লিগ বা চ্যাম্পিয়নস লিগ কোনোটারই জন্ম হয়নি। ইংল্যান্ডের সর্বোচ্চ লিগের নাম তখন ফার্স্ট ডিভিশন। চ্যাম্পিয়নস লিগের নাম ছিলো ইউরোপিয়ান কাপ, যেটি পূর্বেই উল্লেখ করেছি।

সেই সময়টায় অ্যাস্টন ভিলায় চরম টানাপোড়েন চলছে। অ্যাস্টন ভিলা অবনমিত হয়ে গেছে সেকেন্ড ডিভিশনে, লড়াই করছে আবার ফার্স্ট ডিভিশনে ফিরে আসার। কিন্তু সেখানেও আশা ক্ষীণ। সেবার তারা লিগ শেষ করেছে চৌদ্দতম হয়ে। দলের চরম বাজে পারফর্মেন্সে ক্ষুব্ধ হয়ে ম্যানেজার ভিক ক্রোয়ি কে বরখাস্ত করেন ক্লাব প্রেসিডেন্ট ডোগ এলিস। তার জায়গায় নতুন কোচ হিসেবে নিয়োগ দেন রন সাউন্ডার্স কে।

দলের দায়িত্ব নিয়ে প্রথম সিজনেই দারুণ ভাবে ঘুরে দাঁড়ান সাউন্ডার্স। দ্বিতীয় বিভাগে রানার্সআপ হয়ে সেবার সিজন শেষ করে ভিলা। সেই সাথে ফিরে আসে প্রথম বিভাগে। প্রথম বিভাগে এসেও সাউন্ডার্সের চমক অব্যাহত থাকে। প্রথম দফাতেই লিগ কাপের ফাইনালে নরউইচ সিটি কে ১-০ গোলে হারিয়ে শিরোপা ঘরে তোলে ভিলা।
 
image_search_1633010726852
লিগ কাপ জেতায় পরের সিজনে প্রথমবারের মতো ইউরোপের দ্বিতীয় সারির টুর্নামেন্ট ইউয়েফা কাপে (বর্তমান ইউরোপা লিগ) খেলার সুযোগ পায় ভিলা। তবে সেখানে পারফর্মেন্স সন্তোষজনক ছিলোনা, অ্যান্টওয়ার্পের কাছে ৫-১ গোলে হেরে বিদায় নিতে হয় প্রথম রাউন্ডেই। পরের সিজনে তারা লিগ শেষ করে চতুর্থ হয়ে। এরপর ১৯৭৬-৭৭ সিজনে ফাইনালে এভারটন কে ৩-২ গোলে হারিয়ে আবারও জিতে নেয় লিগ কাপ।

১৯৭৭-৭৮ সিজনে ইউয়েফা কাপের কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে যায় ভিলা, যেখান থেকে বার্সেলোনার সাথে এগ্রিগেটে ৪-৩ গোলে হেরে বিদায় নিতে হয়। কিন্তু লিগে সেবার ভিলার পারফর্মেন্স একদমই আশানুরূপ ছিলোনা। ফলে সাউন্ডার্স টিম পুনর্গঠন শুরু করেন।

১৯৭৯ এর গ্রীষ্মে অনেকগুলো নতুন প্লেয়ার দলে নিয়ে আসেন তিনি। ডিফেন্সের জন্য আনেন অ্যালান ইভান্স, কেন ম্যাকনট ও কেনি সয়াইন। মিডফিল্ডে ডেনিস মর্টিমার ও গরডন কোয়ান্সের সাথে যুক্ত করেন দেস ব্রেমনের কে। আর স্ট্রাইকার জুটি হিসেবে সাইন করান টনি মোর্লি ও গ্যারি শ কে। পরের বছর নিউক্যাসল থেকে পিটার উইঠ কে এনে দল পুনর্গঠন সম্পন্ন করেন সাউন্ডার্স।

ফলাফল যাকে বলে একদম হাতেনাতে। ১৯৮০-৮১ সিজনে লিভারপুল ও ইপ্সুইচ টাউন কে পেছনে ফেলে ৭১ বছর পর লিগ শিরোপা ঘরে তোলে অ্যাস্টন ভিলা।
 
image_search_1633010538379
গল্প কি শেষ? একদম না। প্রধান চমক টা তো এখনো বাকি।

পরের সিজনে লীগে ভিলার শুরুটা ভালো ছিলোনা। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে যাত্রা শুরু করে সেবার ক্রিস্টমাসে তাদের অবস্থান হয় টেবিলের মাঝামাঝিতে। কিন্তু নিজেদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ইউরোপিয়ান কাপে যাত্রা তখনও অব্যাহত আছে। প্রথম রাউন্ডের আইসল্যান্ডের ক্লাব ভালুর কে তারা বিধ্বস্ত করে ৭-০ তে। দ্বিতীয় রাউন্ডের তাদের মুখোমুখি হয় পূর্ব জার্মানির ক্লাব বার্লিনার এফসি ডায়নামো। দুই লেগেই উত্তেজনাপূর্ণ দুটি ম্যাচের পর এগ্রিগেটে ফলাফল দাঁড়ায় ২-২। কিন্তু এওয়ে গোলে এগিয়ে থাকায় পরের কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে যায় ভিলা।

ইউরোপিয়ান কাপে অগ্রগতি অব্যাহত থাকলেও লিগে নিজেদের অবস্থান দিন দিন আরও খারাপ হচ্ছিলো। ফেব্রুয়ারি তারা পৌঁছে যায় লিগ টেবিলের ঊনিশ নম্বরে। খারাপ পারফর্মেন্সের দায় নিয়ে অবশেষে পদত্যাগ করেন কোচ রন স্যান্ডার্স। দলের নতুন কোচ হিসেবে দায়িত্ব নেন স্যান্ডার্সের এসিস্ট্যান্ট টনি বারটন।

বারটনের হাত ধরে ইউরোপিয়ান কাপ কোয়ার্টার ফাইনালে ডায়নামো কিয়েভ কে হারায় ভিলা। এই জয় নিয়ে পরবর্তীতে মিডফিল্ডার গরডন কোয়ান্স মন্তব্য করেন, "যখন আমরা ডায়নামো কিয়েভ কে অতিক্রম করলাম, আমরা ভাবতে শুরু করলাম যে পুরো পথটাই আমরা অতিক্রম করতে পারবো।" অবশেষে সেমি ফাইনালে বেলজিয়ান ক্লাব আন্ডারলেখট কে হারিয়ে স্বপ্নের ফাইনালে পৌঁছে যায় অ্যাস্টন ভিলা।

অবশেষে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত দিন। ১৯৮২ সালের ২৬ মে। সেদিন ইউরোপিয়ান কাপ ফাইনালের আসর বসেছিলো নেদারল্যান্ডসের মনোরম শহর রটারডেমের ফেইনুর্দ স্টেডিয়ামে। অ্যাস্টন ভিলা ও বায়ার্ন মিউনিখের মধ্যকার সেই ম্যাচ উপভোগ করতে সেদিন উপস্থিত হয়েছিলো ৩৯,৭৭৬ জন দর্শক।

ম্যাচের শুরুতেই বড়সড় হোঁচট খায় ভিলা। নয় মিনিটের মাথায় কাঁধের ইঞ্জুরি নিয়ে মাঠ ছাড়েন দলের অভিজ্ঞ গোলরক্ষক জিমি রিমার। তার জায়গায় গ্লাভস হাতে মাঠে নামেন ক্লাবের হয়ে পাঁচ বছরে মাত্র একটি ম্যাচ খেলা ২৩ বছর বয়সী তরুণ গোলরক্ষক নাইজেল স্পিংক। ভিলা সমর্থকদের মনে ততক্ষণে ভয় ঢুকে গেছে। এত কাছে এসেও হয়তো এবার ফিরতে হবে খালি হাতে। অনভিজ্ঞ স্পিংক কি পারবে পরাক্রমশালী অভিজ্ঞ বায়ার্ন মিউনিখের আক্রমণ রুখতে?
 
image_search_1633010562704
কিন্তু ভাগ্যদেবতা হয়তো সেদিন আন্ডারডগ অ্যাস্টন ভিলার সহায় হয়েছিলো। স্পিংক সম্ভবত সেদিন তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সেরা পারফর্মেন্স দেখায়। বায়ার্নের শক্তিশালী আক্রমণ সে রুখে দিতে থাকে শক্ত হাতে। এমনকি কিংবদন্তি জার্মান ফরওয়ার্ড কার্ল-হেইঞ্জ রুমেনিগেও ব্যর্থ হয় তার সামনে। টনি মোর্লি, গোরডন কোয়ান্স ও ডেনিস মর্টিমারের পারফর্মেন্সও সেদিন ছিলো অবিশ্বাস্য। অবশেষে ৬৭ মিনিটে লক্ষ্যভেদ করে বায়ার্নের জালে বল ঢুকিয়ে দেয় পিটার উইঠ। অতঃপর এই ১-০ গোলের ব্যবধানেই শেষ হয় ম্যাচ।

আর সেই সাথে ইতিহাস রচনা করে অ্যাস্টন ভিলা। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, লিভারপুল ও নটিংহ্যাম ফরেস্টের পর তৃতীয় ইংলিশ দল হিসেবে হিসেবে ইউরোপ সেরার মুকুট অর্জন করে তারা। ওয়েস্ট মিডল্যান্ডসের ছোট্ট শহরতলীর দল টি তকমা পায় ইউরোপ সেরার।

তবে এ সাফল্য অব্যাহত রাখতে পারেনি ভিলা। ইংলিশ লিগে খারাপ পারফর্মেন্স অব্যাহত থাকে। ইউরোপিয়ান কাপ জয়ের ছয় মাস না যেতেই দেখা যায় ক্লাবের দেনার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে দেড় মিলিয়ন পাউন্ডেরও বেশি। একে একে ক্লাব ছাড়তে থাকে দলের কর্তৃস্থানীয় ব্যক্তিরা। ১৯৮৩ সালের জানুয়ারি তে বার্সেলোনা কে হারিয়ে কোনোরকমে ঘরে তোলে ইউয়েফা সুপার কাপ।

এরপর আরও দুই সিজন ক্লাবের দায়িত্বে থাকেন বারটন। অবশেষে ১৯৮৪ সালে বরখাস্ত হন তিনি। তার জায়গায় একে একে দায়িত্ব নেন সাবেক স্ট্রুসবারি টাউন ম্যানেজার গ্রাহাম টার্নার, ও তারপর বিলি ম্যাকনেইল। কিন্তু ভিলার অধঃপতন রুখতে পারেননি তাদের কেউই। অবশেষে ইউরোপিয়ান কাপ জয়ের মাত্র পাঁচ বছর পরেই দ্বিতীয় বিভাগে অবনমিত হয়ে যায় অ্যাস্টন ভিলা।

তারপর থেকে আজ অবধি আর কখনোই সেভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি তারা। ফার্স্ট ডিভিশন আর সেকেন্ড ডিভিশনে ওঠা নামা করতে করতেই পেরিয়ে গেছে অনেকটা সময়। এতদিনে এসে এখন আবার আস্তে আস্তে নিজেদের এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে ভিলা। কিন্তু ১৯৮১/৮২ সালের সেই রাজত্ব ফিরে পাওয়া এখন তাদের জন্য নিছক দিবাস্বপ্ন।
 
image_search_1633011018385
অ্যাস্টন ভিলার সেই সোনালি প্রজন্ম হারিয়ে গেছে। হয়তো আবার কোনোদিন ভিলা খেলবে চ্যাম্পিয়নস লিগের মঞ্চে, হয়তো আবার কোনোদিন তারা লড়াই করবে শিরোপা জয়ের লক্ষ্যে। তখন পেছন ফিরে তাকালে তাদের সেই সোনালি ইতিহাস সাক্ষী দেবে, অ্যাস্টন ভিলাও পারে অসম্ভব কে সম্ভব করতে! আর সেখান থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে হয়তো নতুন প্রজন্মও লড়বে নতুন আত্মবিশ্বাস নিয়ে, অর্জন করবে সাফল্য।