• ফুটবল

সুদিন, তুমি বাংলাদেশ ফুটবলে আসবে তো?

পোস্টটি ১৯৭ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

ঘন্টা কয়েক আগের কথা। 

দারুণ উত্তেজিত, তৃষ্ণার্ত তীর্থের কাকের মতো একটুকু পানি খুঁজে পাওয়ার নেশায় উজ্জীবিত ছিলাম, বাংলাদেশের খেলা আছে বলে। 

 

বেশিদিন আগের কথা না- একসময় বাংলাদেশ ফুটবলের নাম শুনলেই মানুষ নাক সিটকাতো। এখন যে তা করেনা তা না; এখনো এই ধরণের মানুষের সংখ্যা নেহায়েত কম না। কিন্তু আমার কাছে তো বর্তমান বাংলাদেশ ফুটবল মানে ভিন্ন এক গল্প। 

 

দক্ষিণ এশিয়ার তীব্র ঘনবসতি কিন্তু অনুন্নত এই দেশ'টার জাতীয় খেলা ফুটবল না। বিচিত্র হোক কিংবা কাকতালীয় মনে হোক- ফুটবলের প্রতি এদেশের মানুষের টান যেন আশ্চর্যজনক এক উপাখ্যান। দেশ স্বাধীন হওয়ার পূর্ব থেকে কিংবা স্বাধীনের সময় যুদ্ধবিধ্বস্ত এই দেশটায় মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়েছে ফুটবল। বলাই বাহুল্য, ফুটবলের প্র‍তি এদেশের মানুষের আদিখ্যেতা অত্যন্ত উচ্চপর্যায়ের।

 

১৯৭২ সালের কথা। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন কেবল জন্ম নিয়েছে। এই যুদ্ধাহত দেশের ফুটবলে বিনিয়োগ করার মতো ততোটাও শক্তিশালী হয়ে উঠেনি বাংলাদেশ সরকার। তবু ১৯৭৪ সালে ফিফার সদস্য হওয়া বাংলাদেশের ফুটবলে খানিক হলেও গৌঁরবের গল্প আছে। ১ম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে নেমে থাইল্যান্ডকে ২-২ গোলে রুখে দেয়াটা এক দারুণ বাংলাদেশ ফুটবলের ইশারা দিচ্ছিলো। এইতো কয়েকদিন আগে মালদ্বীপের সাথে হারলাম আমরা। অথচ এই মালদ্বীপের সাথেই ৮-০ গোলের জয়'টা আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে মূল্যবান ম্যাচ। 

 

উজ্জ্বল সেইসব দিনের কথা বলতে গেলে ১৯৯৯ সাউথ এশিয়ান গেমসের কথা বলতে হয়। সেবার সোনার মেডেল গলায় জড়িয়েছিলো বাংলার সোনার ছেলেরা। কি দারুণ সময়! কিংবা ২০০৩ সালের কথা বলা যাক। সেবার আমরা সাফ জয় করে এদেশের ফুটবলে এক বিস্ময়কর বিপ্লবের জন্ম দিয়েছিলাম। সাফ জয় করা আমাদের জন্য তুচ্ছতাচ্ছিল্যর ব্যাপার কখনোই ছিল না। ২০০৩ সালে সে অধরা স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিয়েছিলো কাঞ্চনেরা। ১৯৯৬ সালে ফিফার র‍্যাঙ্কিংয়ে আমাদের অবস্থান ছিল ১১০- এই তথ্যটুকু নিশ্চয় আপনাকে অবাক করে। 

 

সুদিনের, সেসময়ের সোনালী ফুটবলের ইতিহাসের বিপরীতে বাংলাদেশ ফুটবলে হাজারো ব্যর্থতার গল্প আমাদের মুখস্ত। শুরুতেই বলেছিলাম- বাংলাদেশ ফুটবলের নাম শুনলে অনেক মানুষ এখনো নাক সিটকায়; কথাটি আসলে ভুল না। তবে এর বিপরীতে হাজারো লাখো তরুণ তরুণী যে বাংলাদেশ ফুটবলের সুদিনের অপেক্ষায় দিনকে দিন পার কারছে- এ কথাও মিথ্যা না। 

 

বাংলাদেশ ফুটবলে আসলে সমস্যা'টা কোথায়?

 

১৯৯৬ সালের ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে ১১০ তম অবস্থানে থাকা বাংলাদেশ দলের বর্তমান অবস্থান ১৮৯! বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের দায়িত্ব সর্বপ্রথম পেয়েছিলেন শেখ সাহেব আলী। তারপর অন্তত ৪৭ জন কোচ এসেছেন, আবার চলে গেছেন। তন্মধ্যে জার্মানির ওয়ার্নার ব্যাকেনহফট, অটো ফিস্টার- গার্ড স্মিডিট কিংবা ইংলিশ মার্ক হ্যারিসন, এন্ড্রো ওর্ড আর জেমি ডে; ব্রাজিলের দিদো, আর্জেন্টাইন আন্দ্রেস ক্রুসিনি; হাঙ্গেরির জর্জ কোটান কিংবা ইউগোস্লোভিয়ার রবার্ট রুবসিক! দুজন স্পেনিশ কোচও বাংলাদেশ জাতীয় দলের কোচের দায়িত্ব পেয়েছেন- গঞ্জালো মরেনো আর বর্তমানের অস্কার ব্রজোন! 

 

এতোসব হাই প্রোফাইল কোস এসেছেন, ব্যর্থ হয়ে ফিরেও গেছেন। আমার প্রশ্নটা অন্য জায়গায়- এইসব হাই প্রোফাইল কোচ'কে কতদিন সময় দেয়া হয়েছে একটা দেশের জাতীয় দলকে রিভিল্ড করতে? নিজের মতো সাজিয়ে, দলের পটেনশিয়ালিটি বের করতে কতদিন সময় পেয়েছেন তারা? ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে একেকজন কোচ গড়ে সময় পেয়েছেন মাত্র ১ বছর! ১ বছরের কোচিংয়ে একটা দল বদলে দেয়া সম্ভব? নাকি এই দলের সব প্লেয়ারের সাইকোলজি বুঝা সম্ভব? কিছু কোচের আবার পোড়া কপাল- তারা সময় পেয়েছেন কয়েক মাস। গঞ্জালো মরেনো বা ডি ক্রুইয়ের মতো কোচ'দের ফুটবল ফেডারেশন সময় বেঁধে দেয় মাত্র ২-৩ মাস! এরচেয়ে বড় রসিকতা আর কি হতে পারে?

 

এদেশের খ্যাতনামা কোচ সাইফুল বারী টিটু কিংবা মারুফুল হক কতটা সময় পেয়েছেন এই উত্তর সবার জানা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে কোনো বিশেষ ইভেন্ট'কে ঘিরে জাতীয় দলে বিদেশ থেকে কোচ নিয়ে আসা হয়; ইভেন্ট শেষ কোচও বিদায়! এই গল্প আমাদের ফুটবলে হরহামেশাই হয়। ইভেন্টে বরাবরের মতো ব্যর্থ হওয়ার পর কোচকে জবাবদিহি করতে হয় ঠিকই; কিন্তু দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর- বাংলাদেশের ফুটবলে 'ফুটবল ফেডারশন' ভূমিকা আর অবদান কতটুকু সে হিসাব কেউ রাখে না। 

 

ম্যাচ হারার পর প্লেয়ারদের দোষ দেয়া- কোচ'দের দোষ দেয়া এসব নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। তবে কোচ, প্লেয়াররা সব ধরণের আন্তর্জাতিক সাপোর্ট পান কিনা সেটা দেখার কেউ নেই। একটা দেশের জার্সি স্পন্সর থাকে না; ৬ মাস এক কিটে কাটিয়ে দেয় একটা দল; কোনো আন্তর্জাতিক মানের ফিটনেস সেন্টার নেই- নেই অত্যাধুনিক সুইমিংপুল সুবিধা! কতশত না থাকার ভীড়ে ফুটবলারদের কাছে প্রশ্ন শুধু একটাই- ভালো খেলবেন কবে? ফুটবলার'রাও মানুষ। তারা জানে কিভাবে সার্ভাইভ করতে হয়; তারা জানে কিভাবে প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠতে হয়! আবার তারাই জানে কিভাবে নিশ্চুপ থেকে সব অনিয়মের সায় দিয়ে হয়। 

 

ফুটবলের উন্নয়নের নামে বরাদ্দকৃত লাখ লাখ টাকা কোথায় খরচ হয় এই হিসাব বোধহয় এদেশের কোনো ফুটবল ভক্ত কখনোও জানতে পারবে না। ফুটবলের উন্নয়নই যে হয় না। যে দেশের ফুটবলের জাগানিয়া সময়ে আবাহনী মোহামেডানের ম্যাচ দেখতে হাজার হাজার ভক্ত জড়ো হতো- সে দেশের জাতীয় দলের ম্যাচ দেখতে একটা সময় দর্শক বিহীন স্টেডিয়ামে কেবল ফুটবলার থাকে! সেসব পুরনো গল্প থাক। 

 

একটা সময় দেখা গেলো জেমি ডে'র নেতৃত্বে যথেষ্ট ভালো খেলছে বাংলাদেশ। মাঠে দর্শক ফিরতে শুরু করেছে। হারতে যাওয়া ম্যাচেও গ্যালারি ভর্তি দর্শক! এ যেন এক প্রাণের স্পন্দন। দেশের ফুটবলের প্রতি নিখাদ এমন ভালোবাসা সত্যিই প্রসংশার দাবিদার। বাংলাদেশের ফুটবল প্রেমীরা বরাবরই আবেগী। নিশ্চিত হারবে ম্যাচে জেনেশুনেই গলা ফাটায় তরুণ তরুণীরা। একটা জিনিস এখানে বলতে বাধ্য হচ্ছি- বাংলাদেশ ফুটবলে বর্তমানে এক বিপ্লব হয়েছে। 

 

যে বিপ্লবে বাংলাদেশ দলটাই পালটে গেছে। কি দারুণ ফুটবল খেলি আমরা। হারা ম্যাচেও চমৎকার ফুটবল উপহার দেই। কি ডিফেন্স কি এট্যাক; আমাদের সামর্থ্যানুযায়ী সেরা খেলাটাই খেলি। দিনশেষে আমরা হেরে যাই ঠিকই- তবে মাঠে হাল ছেড়ে না দেয়ার একটা মনোভাব অন্তত তৈরি করে ফেলেছি ততোদিনে! মাঝমাঠে জামাল ভূঁইয়ার ম্যাজিক, গোলবারে দূর্দান্ত জিকো আমাদের মাত্রাতিরিক্ত প্রফুল্লতা দান করেন। তপু- ইয়াসিনেরা প্রাণ দিয়ে খেলেন। এখন আর বলার সুযোগ নাই- নাহ, এই ফুটবল দিয়ে কিচ্ছু হবে না! 

 

লেখা শুরু করেছিলাম দারুণ উত্তেজিত থাকার অভিজ্ঞতা দিয়ে। আজ নেপালের সাথে আমরাই জিতবো এ নিয়ে সন্দেহ ছিল না; খেলেছিও দারুণ! আমাদের প্লেয়াররা তাদের সেরা'টাই দিয়েছে। তবে দিনশেষে আমাদের আর জয়'টা হলো না। আজকের ম্যাচ নিয়ে কিচ্ছু বলার নেই- শুধু মাত্রাহীন আফসোস ছাড়া। জয়'টা আমাদের প্রাপ্য ছিল; জয়টা আমাদের খুব প্রয়োজন ছিল! 

 

তবে এখনি হতাশ হয়ে যাচ্ছিনা আমি। হতাশ হতে ইচ্ছে করছে না আমার। আমি জানি এটা কেবল শুরু। আমি এও জানি 'মেঘের পরে রোদ হাসে'। আমাদের ফুটবলের আকাশে এখন মেঘের ঘনঘটা; জানি একদিন এই মেঘ সরে যাবে। সরে যেতে তাকে হবেই- কোটি বাঙ্গালীর আবেগের এই ফুটবলে সুদিন'কে ফিরে আসতে যে হবেই। 

সুদিনের কথা ভাবতে থাকলে এক নবীন কবির দু'লাইন কবিতা আমার ভাবতে ইচ্ছে করে-

প্রতীক্ষার প্রহর গণনায় হাপিয়ে যাচ্ছে জনজীবন;

এইভাবে আর কতদিন! আদৌ কি ধরা দিবে সেই সুমিষ্ট সুদিন? 

- আহমদ আতিকুজ্জামান