• ফুটবল

রাফিনহার অসমাপ্ত গল্প!

পোস্টটি ১১৮৩ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

"যদি আজ তোমরা জিতে যাও, তবে তোমাদের মরতে হবে!"

ফুটবলার হতে চাওয়ার স্বপ্ন বোনার সাথে প্রায় প্রত্যেকেরই স্বপ্ন থাকে একটি একাডমির সাথে যুক্ত হতে পারার, কেনোনা এখানে যেমন প্রফেশোনাল ফুটবলার হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলা যায়, আবার কিছু টাকা উপার্জন করে নিজের পরিবারকে সাহায্যও করা যায়। কিন্তু ঠিক সবার ভাগ্যে একটা ভালো একাডেমি জুটেনা; আর যখন জুটেনা তখন তার ফুটবল ধ্যান জ্ঞান চর্চার জায়গা হয় বালুর মাঠে কিংবা ধুলোবালি মাখা ফাঁকা ময়দানে, যেখানে কারো পায়ে বুট নেই, কারো গায়ে জামাটুকুও নেই, স্নিগ্ধ সকাল কিংবা তপ্ত দূর কিংবা গোধুলী বেলা, সময় অসময় নেই, যে যখন পারছে ফুটবল নিয়ে ছুঁটছে, আর চোখে কেবল একটাই স্বপ্ন - বড় ফুটবলার হওয়ার!
রাফিনহা'র জন্ম আর বেড়ে ওঠা পোর্তো এলেগ্রির রেস্টিংগায়; তবে ছোটবেলার ক্লাব ছিলো ব্রাজিলের শহর সাও পাওলোর একটি অঞ্চলে, নাম ভাহাজেয়া।
একাডেমি ট্রায়ালে সুযোগ না পাওয়া ফুটবলারদের জায়গা হয় ভাহাজেয়া'র লোকাল টুর্নামেন্টগুলোতে। রাফিনহা'র গল্প'ও ঠিক এইটাই! একাডেমি তে সুযোগ না পাওয়ায় ভাহাজেয়ার লোকাল ফুটবলে ঠাঁই, আর সেখানেই প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে হাতেখরি।
ভাহাজেয়া টুর্নামেন্ট আয়োজন করতো লোকাল কমিউনিটি, যার দায়িত্বে থাকতো লোকাল ড্রাগলর্ড কিংবা লোকাল মাফিয়া বস'রা। সেসব টুর্নামেন্টে হত্যার হুমকি থাকতো, মেরে হাত পা ভেঙ্গে ফেলার হুমকিও থাকতো; এমন অসংখ্যবার ঘরের দরজা খুলতেই ভেসে আসত আতংকের সেই সুর "যদি আজ তোমরা জিতে যাও, তবে কাল তোমাদের মরতে হবে!" তবে সত্যি সত্যি হামলা বা মেরে ফেলার মত ঘটনা না ঘটলেও এমব হুমকি ধামকির প্রতিকূল পরিবেশেই বেড়ে উঠতে হয় এখানকার ফুটবলারদের। মাঠে দর্শকসারীতে বন্দুক বহন করা দর্শক, খেলা চলাকালেই ফায়ারওয়ার্কস, ফাঁকা আকাশে গুলি করা, দেখে কারই বা না ভয় লাগে!


"ইউরোপীয়ান ফাইনাল?? ৯০০০০ দর্শক?? ডোন্ট কেয়ার! ভাহাজেয়া'র ভয় আর আতঙ্কের মাঝে তুচ্ছ! যে খেলোয়াড় ভাহাজেয়ায় নার্ভ ধরে রাখতে পারবে, সে পৃথিবীর সবমাঠেই নার্ভ ধরে রাখতে পারবে"!


খাবারের জন্যে একটা সময় রাস্তায় হাত পাতিয়েছেন রাফিনহা!

রেস্টিংগায় বেড়ে ওঠা মানে কেবল নিজের রক্তের মানুষজনই আপনজন নয়, বরং বন্ধু কিংবা পাড়া প্রতিবেশী'ও আপনজন, ঠিক দ্বিতীয় পরিবারের মতো। এখানে সবটা সময় একে অপরকে প্রয়োজন পড়ে। রাফিনহাদের ছিলো ছোট্ট বাসা, বাবা-মা অমানুষিক পরিশ্রম করে কিছু খাবার জুটাইতো। যেদিন খাবার থাকতোনা, সানন্দে প্রতিবেশীরা তাদের সাধ্যমতো খাবার ভাগ করতো। রেস্টিংগা থেকে শহর অনেক দূরে, প্রায়শই ম্যাচ খেলে অনেক সময় পেড়িয়ে যেতো, ক্ষুধা পেটে বাড়িতে ফেরা কষ্টসাধ্য, সেই সময় বন্ধুদের খাবার ভাগ করে খেয়ে নেওয়া, কিংবা রাত হয়ে গেলে বন্ধুর বাসায় রাতে থেকে যাওয়া; রাফিনহা'র ও প্রাত্যহিক গল্প! বাস ভাড়ার টাকা না থাকায় একটা সময় দূরে গিয়ে খেলতে যাওয়া কষ্টসাধ্য হয়ে উঠে রাফিনহা'র ; সেই সময় এক বন্ধুর মা একটি বাসের "ফ্রি-বাস পাস" 'র ব্যবস্থা করে দেন রাফিনহা'কে। একটা সময় ছিলো, রাফিনহা সহ অন্যান্য বন্ধুদের যখন খাবার থাকতোনা, ক্ষুদায় কাতর, কাঁদা মাঠে খেলে কর্দমাক্ত শরীর, কখনো পরণে ছেড়া কাপড়, রাস্তায় মানুষের কাছে হাত পেতে খাবার চেয়েছে, কখনো কখনো তো তাদের ছিনতাইকারী ভেবেও অনেকে ভুল করেছে! রাস্তায় এভাবে হাত পাতা, ইচ্ছার বিরুদ্ধে হলেও প্রচন্ড ক্ষুধার্ত অবস্থায় সেসময়কার সেই কিশোর ফুটবলারদের আর কিইবা করার ছিলো!

আইডল রোনালদিনহো!

রাফিনহা'র বাবার ছোট্ট একটা ব্যান্ড দল ছিলো, বিভিন্ন পার্টিতে গান গাইতে যাওয়ার সুবাদে রোনালদিনহো'র সাথে পরিচয় হয় রাফিনহা' বাবার। রাফিনহা ছোট থেকেই রোনালদিনহো ফ্যান ছিলেন। রাফিনহা'র যখন বয়স ৭, তখন রোনালদিনহো'র সাথে সাক্ষাৎ হয় তার, রোনালদিনহো'র বার্থডে পার্টিতে।

"আমাকে দেখেই মুচকি একটি হাসি দিলেন দিনহো, আপনি ঠিক যেই হাসিতে মানুষটাকে সবসময় দেখেন। আমাকে কোলে তুলে নিয়ে হাটতে লাগলেন! আমি স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে ছিলাম, আমি জানতাম না কি বলতে হয়, কিভাবে রিএক্ট করতে হয়। কিন্তু তার কমনীয়তা, আচার ব্যবহার সবাইকে মুগ্ধ করতে বাধ্য, এমনকি আমার মতো ছোট্ট একটি বাচ্চাকেও! আমি নিশ্চিত, এটিই আমার জীবনের সবচেয়ে দামী বার্থডে পার্টি, সম্ভবত আমার নিজের জন্মদিনের যেকোনো পার্টির চেয়েও!"

রাফিনহা'র আইডল রোনালদিনহো, যাকে কাছ থেকে দেখে বেড়ে উঠেছেন তিনি, যার পায়ের যাদুর মন্ত্রে মুগ্ধ হয়েছেন বারেবার, চেয়েছেন নিজেও ফুটবলার হতে, বল পায়ে মানুষকে আনন্দ দিতে! আরেকজন ছিলেন, যার খেলা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে দেখতেন রাফিনহা, তিনি হলেন থিয়েরি অঁরি!

"আমি আর বাবা নিয়মিতই আর্সেনালের খেলা দেখতাম। অঁরি কে আমার উড়ন্ত পাখি মনে হতো, সেই দৌড়, সেই ফিনিশিং আমি এখনো ভুলতে পারিনা। মাঠের দর্শক, তাদের চ্যান্ট, গান গাওয়া, সবকিছু মারাত্মক প্রভাবিত করতো সেসময় আমায়!"


ড্রাগ মাফিয়াদের কাছ থেকে বেঁচে ফেরা!

রাফিনহা'র বয়স ১৭, তখনো ভাহাজেয়া টুর্নামেন্টেই খেলছেন তিনি। পরিবারের সামর্থ্যের চেয়েও অধিক অর্থের প্রয়োজন ছিলো, ম্যাচ খেলতে, শহর পাড়ি দিতে, খাবার যোগাড় করতে৷ সেসময় অনেক ড্রাগ সেলারদের কাছ থেকে অবৈধ পথের হাতছানি আসলেও রাফিনহা তাতে সারা দেননি।

মায়ের অনুপ্রেরণায় রাফিনহার 'রাফিনহা' হয়ে ওঠা!

রাফিনহার স্বপ্ন ছিলো একাডেমিতে সুযোগ পাওয়া, কিন্তু বারবারই ব্যার্থ হয়েছেন তিনি। ইন্টারন্যাশিওনাল, গ্রামিও, ফ্লামেঙ্গো, যেখানেই ট্রায়াল দিয়েছেন, সেখানেই নানান কারণ দেখিয়ে তাকে বাদ দেওয়া হয়! "সে অনেক খাটো" "সে শারিরীক ভাবে দুর্বল" প্রত্যেকবার ঠিক এসব কারণেই নাম বাদ পড়েছে রাফিনহা'র! সদ্য ১৯'এ পা দিয়েছেন তখন, ২০১৪’র সেসময় দ্বিতীয় বিভাগের দল আভাই ফুটবল ক্লাবে যোগদানের সুযোগ পান রাফিনহা। অ-২০ দলের হয়ে কিছু ম্যাচ খেলাত সুযোগ পেলেও, ইঞ্জুরিতে পড়ে লম্বাসময় মাঠের বাইরে চলে যান তিনি। সেসময় আভাই ফুটবল ক্লাব আর সুযোগ দিতে চাননি তাকে, এমনকি ম্যাচডে স্কোয়াড বা ট্রেনিংয়েও রাখা হতোনা তাকে। সেসময় তিনি মানষিকভাবে ভেঙ্গে পড়েন, ফুটবল ছেড়ে দিতে চান, তিনি ভাহাজেয়ায় ফিরে যেতে চান যেখানে তাকে কেউ "খাটো" ডাকেনা, "আনফিট" বলেনা! কিন্তু মায়ের যোগানো অনুপ্রেরণায় তিনি ধৈর্য ধরেন, প্রফেশনাল ফুটবলার হতে চাওয়ার নিজের স্বপ্নকে লালন করতে থাকেন! রাফিনহা'র মা জীবনযুদ্ধে লড়াই করা একজিনিস মানুষ, যিনি কিনা নিজেকে বিভিন্ন পেশায় জড়িয়েছেন, কখনো পারফিউম বিক্রেতা, কখনো হেয়ারড্রেসার, কখনো প্রসাধনী বিক্রেতা, কখনো হোটেলের ওয়েটার আবার কখনো রেসিপসনিস্ট! কিন্তু তিনি দমে যাননি, জীবনযুদ্ধে লড়াই করেছেন, অর্থ উপার্জন করেছেন, সংসার চালিয়েছেন! রাফিনহার মায়ের এসব গল্প সবসময় অনুপ্রাণিত করেছে রাফিনহা'কে, জীবনযুদ্ধে লড়াই করতে, কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে!

২০১৬ সালে পর্তুগিজ তারকা ডেকো ও তৎকালীন ক্লাব ভিতোরিয়া গুইমারেয়েসের স্কাউট ডেকোর নজরে আসেন রাফিনহা, এরপরেই তিনি পাড়ি জমান পর্তুগালে! এরপরেই বদলাতে থাকে রাফিনহা'র ভাগ্য। ভিতোরিয়া'র হয়ে দারুণ খেলতে থাকেন, রাফিনহা। ১৭-১৮ সিজনে ক্লাবের হয়ে ৪৩ ম্যাচে ১৮ গোল করেন তিনি। এরপরেই ডাক আসে স্পোর্টিং সিপি'র; সেখানে ব্রুনোর ফার্নান্দেসের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় রাফিনহা'র, দুজনের জুটিও জমে বেশ, ব্রুনো'কে তিনি নিজের ভাই বলে সম্মোধন করেন রাফিনহা! এক সিজন পরেই রাফিনহা যোগ দেন ফ্রান্সে রেনে, প্রায় ২১ মিলিয়নে, যা কিনা ক্লাবটির সর্বোচ্চ ট্রান্সফার ফি'র রেকর্ড! উক্ত সিজনে ৮ গোল আর ৭ এসিস্ট পান তিনি! এরপরেই ২০২০ সালের ৫ অক্টোবর ৪ বছরের কন্ট্রাক্টে লিডস ইউনাইটেডে যোগ দেন রাফিনহা! দারুণ পারফর্ম করে খুলে যায় ব্রাজিল জাতীয় দলের দুয়ার, আর অভিষেকের পরেই ব্রাজিলের হটকেক এখন রাফিনহা, যে গল্প আমাদের সবার জানা!

মৃত্যুর হুমকি পাওয়া, ডার্গ মাফিয়া থেকে বাঁচা, ব্যার্থতার চাদর থেকে মা'য়ের অনুপ্রেরণায় ফিরে আসা, খাবারের জন্য রাস্তায় হাত পাতা, যেকোনো এক গল্পেই নামকরণ করা যেতে রাফিনহা'র জীবনের গল্পের! তবে সে রাফিনহা'র সেই গল্পের নাম না হয় তোলা রইলো বাকী সময়ের জন্যে, যেদিন রাফিনহা হয়তো নিজের সফলতার গল্প লিখবেন গর্ব নিয়ে, হয়তো নিজেকে চেনাবেন অনন্য এক উচ্চতায়, স্থান করে নিবেন সবার হৃদয়ের মনিকোঠায়!


"It's very complicated to change the national team when you don't live there, it's not even that you don't feel at ease, but you are not part of it," he said. The Brazilian team has always been my goal, since I was little. Even with dual citizenship, my desire has always been to represent the national team. Even with contact, with conversations I had."

প্রিয় দলের প্রিয় জার্সির প্রতি ছেলেটার এই আবেগ আর ভালোবাসা তাকে আলাদাভাবে চিনিয়েছে! হারতে হারতে জীবনযুদ্ধে জিতে যাওয়া মানুষটা হারিয়ে না যাক, নিজের নামের ভার আরো ভারী করার পাশাপাশি ভারী হয়ে উঠুক রাফিনহা'র প্রিয় জার্সির ভার'ও, সেই প্রত্যাশায় ইতি টানলাম রাফিনহা'র অসমাপ্ত এই গল্প!