• ক্রিকেট

যে বোল্যান্ড অনন্য!

পোস্টটি ৩৯৪ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।
২তম অ্যাশেজ সিরিজ। বক্সিং ডে টেস্ট। মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ড। তৃতীয় দিনের প্রথম সেশন। গৌরবান্বিত ছাই রক্ষার লড়াইয়ে ইনিংস পরাজয়ের লজ্জা এড়াতে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করছে ইংলিশরা। ২৭তম ওভারের প্রথম বল।গুড লেন্থের বলটা অফ-মিডল স্টাম্পের দিকে ধেয়ে আসছিল। আনাড়ি হাতে ফরোয়ার্ড ডিফেন্স করতে গেলেন ইংল্যান্ডের নবম ব্যাটসম্যান মার্ক উড। টাইমিং ঠিকঠাক হলেও বলটা আলতো করে ফিরে গেলো বোলারের দিকে। আরামসে তালুবন্দী করলেন স্কট বোল্যান্ড। এরপর লাল বলটাকে শুন্যে ছুঁড়ে হারিয়ে গেলেন সতীর্থদের মাঝে, চারদিকে অভিনন্দনের ফোয়ারা। চল্লিশ হাজার দর্শকের সম্মিলিত গর্জনে কান পাতা দায়।
অভিষেকেই পাঁচ উইকেট মেলবোর্নের ঘরের ছেলে বোল্যান্ড, এমসিজির বিখ্যাত গ্যালারিতে আনন্দের সাথে মিশে ছিল গর্ব। তবে শুধু মেলবোর্নই নয়, স্কট মাইকেল বোল্যান্ডকে নিয়ে অহংকার করতে পারে পুরো অস্ট্রেলিয়াই। জেসন গিলেস্পির পর তিনিই যে প্রথম টেস্ট খেলা আদিবাসী বংশোদ্ভূত পুরুষ ক্রিকেটার।
 
26Boland-cele1
প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে প্রায় ২০০ উইকেট পেলেও ৩২ বছর বয়সী বোল্যান্ডের এর আগে টেস্ট খেলা হয়নি। টি-টোয়েন্টি ও ওয়ানডে মিলিয়ে গোটা পনের ম্যাচ খেলেছেন, সবই ২০১৬ সালে। মেলবোর্ন টেস্টেও সুযোগ পেয়েছেন জশ হ্যাজলউড ও তাঁর ব্যাকাপ জাই রিচার্ডসনের অনুপস্থিতিতে। পরের টেস্টেই হয়তো একাদশে জায়গা পুনরুদ্ধার করবেন হ্যাজলউড। এক ম্যাচে সুযোগ পেয়েছেন, সেই সুযোগেরই যেন পূর্ণ ব্যবহার করলেন ভিক্টোরিয়ান ক্রিকেটার। দ্বিতীয় ইনিংসে সাত রানে ছয় উইকেটসহ ম্যাচে নিয়েছেন সাত উইকেট, ৫৫ রান খরচ করে। টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে তাঁর চেয়ে কম সময়ে পাঁচ উইকেট নিতে পারেনি আর কেউই (১৯ বল)। রেকর্ডবই ছাপিয়ে বোল্যান্ড আরেক দিক দিয়ে অনন্য। রাগবি ও ফুটবলে আদিবাসী ঐতিহ্যবাহী অ্যাথলেটদের পদচারণা সাধারণ ঘটনা হলেও ক্রিকেটে সেটা বিরল। দেড় শতকের অজি টেস্ট ক্রিকেট ইতিহাস আতিপাতি করে খুঁজলে মাত্র চারটা নাম বেরিয়ে আসবে। নারীদের মধ্যে ফেইথ থমাস, অ্যাশলে গার্ডনার, আর পুরুষদের তালিকায় বোল্যান্ডের আগের নামটা বেশ পরিচিত - জেসন গিলেস্পি। কিন্তু নিজের মধ্যবিশ পর্যন্তও এই ঐতিহ্য সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না বোল্যান্ড পরিবারের। কয়েক বছর আগে জানা গেলো বোল্যান্ডের নানা ছিলেন দত্তক সন্তান। জন্মগতভাবে তিনি ছিলেন ভিক্টোরিয়ার নৃ-তাত্ত্বিকগোষ্ঠী গিল্ডজানের সদস্য।
 
এমন তথ্য অনেককেই হয়তো ভড়কে দিতে পারে, সেখান থেকে জন্ম নিতে পারে সন্দেহ, দ্বিধা কিংবা সংকোচ। কিন্তু বোল্যান্ডরা দমে যাননি। তখন থেকেই নতুন এক সফর শুরু। পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্যকে ধারণ করতে চাইলো তারা, সেই সংস্কৃতিকে উপলব্ধি করার চেষ্টা চললো। বোল্যান্ড কিন্তু আদিবাসী দলের প্রতিনিধিত্ব করে ইংল্যান্ড সফরেও গেছেন, সেই দলে সংগী হয়েছিলেন সহোদর নিকও। পুরোটা জীবন পাদপ্রদীপের আড়ালে থেকে হয়তো চোখ জলসানো আলোতে মানিয়ে নিতে পারছিলেন না। উদযাপনে অপ্রতিভ, ক্যামেরার সামনে গুটিয়ে যান। চিরাচরিত অজি পেস বোলারের আগ্রাসনও অনুপস্থিত বলে আগুন ঝরানো গতি নেই, নেই দৃষ্টিনন্দন বাঁকও। তবুও তাঁর লাইন ও লেন্থের শৃংখলে হাঁসফাঁস করে মরেছে ইংলিশরা। প্রতি উইকেটেই ঘরের মাঠের দর্শকদের গগনবিদারী চিৎকার। এমন অভিবাদন বহুদিন দেখেনি এমসিজি। সেই আশির দশকে মার্ভ হিউজ গ্যালারি থেকে এমন সমর্থন পেতেন। স্নেহের জোয়ারে সিক্ত দীর্ঘদেহী লাজুক লোকটা কী করবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না, শেষমেশ সলজ্জ "থাম্বস আপ"এ জবাব দিলেন। টেস্ট ক্রিকেট খেলতে এসেই ম্যাচসেরা। খেলার পর্ব শেষ হওয়ার পর তাঁর হাতে উঠলো "জনি মালা মেডেল"। এই জনি মালা ভদ্রলোক ছিলেন জার্ডওয়ার্ডজালি গোষ্ঠীর সদস্য, ভিক্টোরিয়ার হয়ে একবার প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট খেলতে নেমেছিলেন। রেকর্ডবইয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো নাম নয়, কিন্তু নতুন জগতের দিশারী মালা ছিলেন এক অনুপ্রেরণার নাম। ১৮৬৮ সালে ইংল্যান্ড সফরের জন্য আদিবাসী খেলোয়াড়দের নিয়ে গড়া দলের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় ছিলেন এই মালা। ৪৭ ম্যাচের সেই দীর্ঘ সফরে ১৬৯৮ রান করেছেন, দশ গড়ে উইকেট শিকার করেছেন ২৪৭ রান। এখানেই শেষ নয়, সুযোগ পেলে উইকেটরক্ষকের গ্লাভসেও হাত গলিয়েছেন। কিন্তু সেই দলের স্বীকৃতি ছিল না, নিয়মিত বৈষম্যের শিকার আদিবাসীদের সফরকে ভালো চোখে দেখা হয়নি। অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট হল অফ ফেমে ঠাঁই মিলতে দেড়শ বছর লেগে গেছে, গত বছরে এসে মেলবোর্ন টেস্টের ম্যাচসেরার পুরষ্কার দেয়া হচ্ছে তাঁর স্মরণে। যদিও মালা নামটাও ঔপনিবেশকদিকদের তথাকথিত উন্নত জিহ্বার সুবিধার্থে দেয়া, তাঁর আসল নাম ছিল উনারিমিন। মহাকালের কোনো এক অজানা মোড়ে দাঁড়িয়ে উত্তরসূরির বীরত্বগাঁথা উনারিমিনকেও ছুঁয়ে গেছে কীনা সেটা জানার উপায় নেই।
FHqHlm1XwAY8BVU
বোল্যান্ড নিজেও চান তাঁকে দেখে আদিবাসী ঐতিহ্যজাত বাচ্চারা ক্রিকেটে আসুক। খেলার মাঠই মানুষকে ধর্ম-জাত-বর্ণের উর্ধ্বে তুলে ধরে। প্রতিভা, যোগ্যতা আর বুকভরা স্বপ্ন পৌঁছে দিতে পারে অসম্ভবের দুয়ারে। বোল্যান্ড সেই বার্তাই দিয়ে গেলেন। সাধারণ হয়ে হাজার বছর জীবন পার করার চেয়ে একদিন মহারাজা হওয়াটাই হয়তো কাম্য। আরেকবার খেলার সুযোগ না পেলেও হয়তো আফসোস থাকবে না। ২৮ ডিসেম্বর, ২০২১ এখন থেকে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটে স্কট বোল্যান্ড দিবস - সেদিন সমাজের চোখে অদৃশ্য মানুষদের সামনে উন্মোচন করেছিলেন অমিত সম্ভাবনার নব দুয়ার!