• ফুটবল

স্বপ্ন ছাড়া মানুষ বাঁচে?

পোস্টটি ৮১১ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।
রেফারি নেস্তর পিতানা বাঁশিতে ফুঁ দিলেন। মারিও মানজুকিচ অত্যুৎসাহী হয়ে হেড করতে এগিয়েছিলেন, কিন্তু লাইন্সম্যান পতাকা জানিয়ে দিলো ইয়ুভেন্তাস ফরোয়ার্ড অফসাইডে ছিলেন। ফ্রান্স অধিনায়ক উগো লরিস গোলকিক নেবার জন্য বল বসানোর আগেই টাচলাইনে কিছুটা চঞ্চলতা কারো চোখ এড়ালো না। ইলেক্ট্রনিক বোর্ড উঁচিয়ে ধরেছেন চতুর্থ রেফারি, তার মানে মাঠের ২২ জনের মধ্যে কারো বিশ্বকাপ অভিযাত্রার এখানেই ইতি। লাল হরফে "১৩" সংখ্যাটা ভেসে উঠলো। গাঢ় নীল জার্সি গায়ে ছোটখাটো মানুষটার মুখের অভিব্যক্তি পড়া যাচ্ছিল না, কিন্তু শরীরী ভাষায় হতাশার ছাপ স্পষ্ট। ৯০ মিনিট পর্যন্ত সমানতালে মাঠে দাপিয়ে বেড়ান যিনি - সেই পরিশ্রমী খেলোয়াড়টাই যেন মাত্র বড্ড হাঁপিয়ে গেছেন, ৫৫ মিনিটের পুরোটা নিজেকে হারিয়ে খুঁজে গেলেন। বদলি হিসেবে স্টিভেন এন'জঞ্জি মাঠে ঢুকবেন, ১৩ নম্বর জার্সি এদিকে মাতুইদির সাথে হাত মেলালেন, দুর্বল তালিতে ৭৮ হাজার দর্শকের অভিবাদনের জবাব দিলেন। এন'গোলো কান্তের মাথায় কী চলছিল তখন? জীবনের সব বড় ম্যাচটাতে ছাপ না ফেলতে পারার আফসোস নিশ্চয়ই। প্যারিসের গলিঘুপচিতে দারিদ্র্যের করালগ্রাস থেকে অস্তিত্বকে বাঁচিয়ে রাখার নিয়ত লড়াইয়ের কথা মনে পড়ছিল তাঁর। বুলোনে, কায়ে হয়ে লেস্টার-চেলসি, বহুদূরের বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে এতোদূর এলেন; কিন্তু একসময় থেমে জেতে হলো, থেমে যেতে হয়। পানিশূন্যতা তাঁকে ফাইনালে মাঠে থাকতে দেয়নি, তবুও কান্তের বিশ্বকাপ মেডেল নিয়ে প্রশ্ন তোলার মানুষ খুঁজে পাবেন না আপনি। স্বপ্নাতুর চোখে পরিশ্রম করে গেলে যে সাফল্যের স্বর্ণসিঁড়িতে আরোহণ সম্ভব সেটার সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন এই ফরাসি মিডফিল্ডার। একজন কান্তে আরো কোটি কান্তেকে স্বপ্ন দেখাতে থাকেন।
 
n-golo-kante-childhood-1-1024x837
 
কান্তে দম্পতি আশির দশকে ভাগ্যান্বেষণে পাড়ি জমিয়েছিলেন ফ্রান্সে। প্রথম সন্তান ছিল ছেলে, বাবা-মা মালির এক প্রাচীন রাজার নামে তাঁর নাম রাখলেন "এন'গোলো"। কিন্তু এন'গোলেদের থাকার জায়গাটা কোনোভাবেই প্রাসাদ বলে চালিয়ে দেয়া যাবে না, প্যারিসের উপকন্ঠে ওদের বাসাটার দেয়ালে কান পাতলে কেবলই শোনা যায় অভাবের দীর্ঘশ্বাস। এন'গোলো একে একে আরো পাঁচ-পাঁচটা ভাইবোন পেলো, পাল্লা দিয়ে বেড়ে চললো অভাব। নিষ্ঠুর দুনিয়ায় পায়ের নিচে শক্ত মাটি খুঁজে পাবার আগেই এন'গোলোর বাবা পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন, পরিবারের বড় সন্তান হিসেবে মায়ের টিকে থাকা লড়াইয়ে একমাত্র সংগী হতে বাধ্য হলো এন'গোলো। মা কাজ নিলেন পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে, আর এন'গোলো বনে গেলো ময়লাকুড়ানি। পূর্ব প্যারিস মাইলের পর মাইল হাঁটতো ছেলেটা, ময়লার স্তূপ দেখলেই ছুট লাগাতো। সারাদিনের সংগ্রহ বিনিময় হতো সন্ধ্যেয়, যে দু'পয়সা মিলতো তাতে দু'বেলা ঠিকমতো আহার জুটতো না। কাজের ফাঁকে সুযোগ পেলেই গোপন অভিসারে নেমে পড়তো এন'গোলো। অভিসারটা ছিল ফুটবলের সাথে, ফাঁকা মাঠ, টুটাফাটা একটা বল, আর জনাদুয়েক সংগী পেলেই হয়েছে - দে ছুট। ফুটবল পায়ে ওকে আটকানো প্রায় অসম্ভব ছিল, কিন্তু গোল করবার চেয়ে অন্যদেরকে গোল বানিয়ে দেবার মাঝেই যেন রাজ্যের আনন্দ খুঁজে পেতো সে। তখন পর্যন্ত ফুটবল খেলাটা হতো নিতান্তই শখের বশে, কিন্তু ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপ চারপাশটা কেমন যেন বদলে দিল। ঘরের মাঠে বিশ্বকাপজয়ের প্রধান নায়ক ছিলেন জিনেদিন জিদান নামক এক ভদ্রলোক। কান্তের মতোই তিনি ছিলেন আফ্রিকান অভিবাসী বাবা-মায়ের সন্তান। কান্তেও সেদিন থেকে স্বপ্ন দেখতে শুরু করলো, একদিন সেও মাথার উপরে তুলে ধরবে সোনালী ট্রফিটা, প্যারিসের সব প্রান্তে কান পাতলেই তার নাম শোনা যাবে। কিন্তু উপায়?
 
73567272aa88ec1ef4a62fb019f5a3c8
 
আট বছর বয়সে জেসি সারেসনের বয়সভিত্তিক দলের হয় কাঠামোবদ্ধ ফুটবলে পা দিলো ছোট্ট কান্তে। তখন থেকেই পুরো মাঠজুড়ে দাপিয়ে বেড়াতো সে, বল নিয়ে ছুটে যেতে একটুও ক্লান্তি নেই। কিন্তু ভালো কোচের সান্নিধ্য পাওয়া হয়নি, তাই হয়তো আজো ফুটবলের টেকনিক্যাল দিকগুলোতে সামান্য ঘাটতি রয়ে গেছে। তবে ময়লা কুড়োনোর ফাঁকে ফাঁকে ১১ বছর ধরে সারাসনের বয়সভিত্তিক দলে খেলে গেলেও বড় ক্লাবের স্কাউটের চোখে পড়েননি কোনোদিন। তবে বয়সভিত্তিক দলে ট্রফি এনে দেয়ার মূল কারিগর ছিলেন তিনি। আকারে ছোট হবার কারণে উদযাপনের সময় ট্রফির নাগাল পেতেন না যদিও। পরার্থে নিজেকে বিলিয়ে দেয়াটা যেন তাঁর রক্তের মধ্যেই ছিল। একটু বড় হবার পরে ক্লাবের ছোট বাচ্চাদেরকে ফুটবলে হাতেখড়ি দিতেন। তবে বোধহয় শারীরিক গড়ন আর খেলায় কারিকুরির অভাবের কারণে কান্তেকে ভালো "প্রোডাক্ট" মনে করেনি বড় দলগুলো। তবে সারেসনের প্রেসিডেন্টের হস্তক্ষেপে দ্বিতীয় বিভাগের দল বোলোনের রিজার্ভ দলে সুযোগ মিললো। ২০১২ সালের ১৮ই মেতে প্রথমবারের মতো পেশাদার ফুটবলে মাঠে নামলেন এন'গোলো কান্তে। স্বপ্নপূরণের পথে প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। পেশাদার ফুটবলের বিবেচনায় অভিষেকটা বেশ দেরিতে। মোনাকোর কাছে ২-১ গোলে পরাজিত হওয়া সেই ম্যাচের আগে কান্তে যে জীবনের একুশটা বসন্ত পার করে ফেলেছেন। পরের মৌসুমে দলে তাঁর অবস্থানটা পুরোপুরি বদলে গেলো, একটি বাদে লীগের প্রত্যেকটা ম্যাচে মাঠে নামলেন। ক্যারিয়ারে নিজের প্রথম গোলটাও পেয়ে গেলেন, ঘরের মাঠে লুযেনাকের বিরুদ্ধে। তখন শীর্ষ পর্যায়ে খেলার স্বপ্নপূরণ হবে না ভেবে খেলা ছেড়ে দেবেন কিনা ভাবছেন।  এরপরই উপরে ওঠার সিঁড়িটা আস্তে আস্তে দৃশ্যমান হতে লাগলো।
 
বিনে পয়সায় কান্তেকে দলে টানলো দ্বিতীয় বিভাগের আরেক দল কায়ে। নতুন দলে এসে মানিয়ে নিয়ে সময় নিলেন না মোটেও, দুর্দান্ত ফিটনেসের কল্যাণে ৩৮ লীগ ম্যাচের প্রত্যেকটিতে মাঠে নামলেন। লীগে তৃতীয় হয়ে কায়ে প্রথমবিভাগে খেলার সুযোগ পেলো। স্বপ্ন তাহলে সত্যি হতে যাচ্ছে! তবে এরপর যা হতে লাগলো কান্তে নিজেও বোধহয় এতোটা আশা করেননি। পরের মৌসুমে লীগে ম্যাচ মিস করলেন মাত্র একবার, সেটাও নিষেধাজ্ঞার খড়্গে পড়ে। কায়ে টেবিলের ত্রয়োদশ স্থানে থেকে লীগ শেষ করলো, ঐ মৌসুমে ইউরোপে সবচেয়ে বেশি বল রিকভারি করেছিলেন এই খর্বকায় মিডফিল্ডার। ফের ডাক চলে এলো, এবার ইংলিশ চ্যানেলের ওপাড় থেকে। আট মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে চব্বিশ বছর বয়সী কান্তেকে দলে ভেড়ালো ক্লদিও রানিয়েরির দল। তবে জেমি ভার্ডি, রিয়াদ মাহরেজদের মতো লুকোনো রত্নদের যিনি খুঁজে বার করেছেন সেই স্টিভ ওয়ালশই মূলত কান্তেকে স্কাউট করেছিলেন। এরপরের গল্পটা সবারই জানা। সম্ভাব্যতার সকল সূত্রকে হার মানিয়ে ১১১ বছর বয়সী লেস্টার সিটি ফুটবল ক্লাব নিজেদের ইতিহাসে প্রথম ইংলিশ লীগ শিরোপা জিতে নিলো। তবে সেই বছর আরেকটি বিশেষ মুহূর্ত এসেছিল। ১৮ই মার্চে আমস্টারডাম অ্যারেনাতে পয়লাবার ফ্রান্সের জাতীয় দলের হয়ে মাঠে নামা। এরপর ৩২ মিলিয়নের বিনিময়ে চেলসিতে আসা, আরেকবার লীগ জেতা, দলের মিডফিল্ডের প্রাণভোমরা হয়ে ওঠা, এফএ কাপ জয় সারির নির্দেশে কিছুটা আক্রমণাত্মক পজিশনে নিজেকে মানিয়ে নেয়া, ইউরোপা লীগ জয় - জীবনটা খুব দ্রুতই বয়ে যায়।
 
37026190_149702312505300_8177063620673273856_n-e1531745910359
 
এতো সাফল্য, অর্থকড়ির মাঝেও ছোটবেলার শিক্ষা ভোলেননি কান্তে। এখনো ভীষণ লাজুক, মুখ ফুটে কিছু চাইতে পারেন না, জৌলুস প্রদর্শনে নেই বিন্দুমাত্র আগ্রহ। ঠোঁটজোড়ায় আঠার মতো লেগে থাকে হাসি। চেলসি-ফ্রান্স সমর্থক তো বটেই, পেয়েছেন ফুটবলের প্রতিটা ভক্তের ভালোবাসা। প্যারিসের কানাগলির মতোই বিশ্বের বিখ্যাত সব মাঠ একাই দাপিয়ে বেড়ান, প্রতিপক্ষের পা থেকে বল কাড়ার ক্ষেত্রে তাঁকে কেউই পেছনে ফেলতে পারবে না। ইউরোপা লীগ ফাইনালে চোট পাওয়ার পর থেকে ধারাবাহিকতায় একটু ওঠানামা করে। কিন্তু থামলে যে চলবে না, এখনো অনেককিছু জেতা বাকি আছে যে! পরিশ্রম করলে যে সাধারণ একজন থেকে বিশেষ হয়ে ওঠা যায় কান্তে আমাদেরকে সে স্বপ্ন দেখান। আমাদের মাঝে থেকেই কেউ হয়তো "কান্তে" হয়ে উঠতে পারবেন, বেশিরভাগের ক্ষেত্রেই হয়তো স্বপ্নটা অপূর্ণ থেকে যাবে। তবে স্বপ্ন দেখতে দোষ কী! স্বপ্ন ছাড়া মানুষ আছে? স্বপ্ন ছাড়া মানুষ বাঁচে?