• ফুটবল

জিনেদিন জিদানঃ এই ভুলটা আপনাকে করতে হলো?

পোস্টটি ৪৯৪ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

হলাসিও এলিজন্দো এক মূহুর্তের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে গেলেন। চোখের সামনে তার কি আশ্চর্যজনক ঘটনা'টাই ঘটে গেলো।

 

৯ জুলাই, ২০০৬। 

বার্লিনের ওলিম্পিয়াস্তাদন স্টেডিয়ামে এর আগেও পাঁচটি ম্যাচ হয়েছে, কিন্তু সবগুলোকে হারিয়ে দেয়ার জন্যই যেন আজকের আয়োজন। রেফারির ভূমিকায় থাকা এলিজন্দো'র প্রতিটা মূহুর্ত কাটছিলো শঙ্কায়। ফাইনাল ম্যাচের প্রেশার, তাও বিশ্বকাপ ফাইনাল; যাচ্ছেতাই ব্যাপার নিশ্চয়ই না। 

 

ম্যাচ শুরুর আগে জার্মান আকাশে-বাতাসে দুই পরাশক্তি ইতালি- ফ্রান্সের জয়ধ্বনি। সত্তর হাজার দর্শক সাক্ষী রেখে ইতিহাস রচনা করতে চায় দুই দল। তবে ইতিমধ্যই ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যাওয়া জিদানের জন্য আজকের ম্যাচটি একটু বেশিই গুরুত্বপূর্ণ। ফ্রান্সের হয়ে তার শেষ ম্যাচ, শেষ বিশ্বকাপ! 

 

টনি- টট্টি, ক্যানেভারো- পিরলো'দের সাথে সমানে সমান লড়াই করবে ফ্রান্স তা সেদিন যেকেউ বলে দিতে পারতো; হেনরি- থুরাম, রিবেরি- জিদান : তারকার ছড়াছড়ি যে ফ্রান্স দলেও ছিলো। প্রমাণ অবশ্য মাঠেই মিললো। সুপারস্টারদের সুপারস্টার জিনেদিন ইয়াজিদ জিদান- বল পায়ে যিনি ছিলেন অতিমানব পেনাল্টি থেকে দলকে এগিয়ে দিলেন মিনিট সাতেক না পেরুতেই! 

 

আমি তখন অনেক ছোট; খেলা দেখছি বাবা- মা ভাইদের সাথে। বিচিত্র একটা কারণে বাবা বরাবরই ইতালির সমর্থক। জিদানের গোলে তাকে বড় বিমর্ষ দেখালো। তবে খানিক পরেই বাবার আনন্দের কারণ হয়ে স্টেডিয়াম রাঙ্গালেন মার্কো মাতারেজ্জি! পিরলোর কর্ণারে মাথা লাগিয়ে বলকে পাঠিয়ে দিলেন ফ্রান্সের জালে। জিদানের পর মাতারেজ্জির গোল গোটা বিশ্বজুড়ে ফুটবল ফ্যানদের এক দারুণ রাত্রের উপহার দিতে যাচ্ছিলো সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ'ই আমার ছিল না।

 

হাফ টাইম শেষে সমতায় দুই দল। স্কোরশিটে দুটি ভিন্ন নাম। ঘন্টা দেড়েক পরে যে দুটি নাম ইতিহাস হতে যাচ্ছে, পরেরদিন সংবাদপত্রের ১ম পাতায় যাদের নাম ছবিসহ ফলাও করে প্রকাশ করবে বিশ্বমিডিয়া- এই বিষয়ে তারা কিছুই জানতো না। ঠিক এখানেই আমি বিভিন্ন মতবাদে নিজেকে জড়িয়ে ফেলি। কোয়ান্টামতত্ত্ব বলছে 'পৃথিবীর সবকিছুই পূর্বপরিকল্পিত', ধর্ম বলছে 'ভাগ্যের লিখন পূর্বেই লিখা হয়ে গেছে'। আমি আসলে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যাই- সৃষ্টিকর্তা কি নিদারুণ কসরতে সবকিছুর সাথে আমাদের জড়িয়ে রেখেছেন। 

 

টান-টান উত্তেজনা ম্যাচে, হেনরি কখনো ভয়ংকর হচ্ছেন ইতালি শিবিরে, তো ক্যানেভারো তখনি ঠান্ডা মাথায় সামাল দিচ্ছেন অবস্থার। তবে বিশ্ববাসীর চোখ জিদানের উপর। কখন কি করে বসেন তার হিসাব নাই। পুরো টুর্নামেন্টেই নিজের নামের প্রতি সুবিচার করে আসছেন জিদান; বলাই বাহুল্যে ফাইনালেও তার প্রতি ফরাসী জাতির অগাধ প্রত্যাশা। 

 

১০৮ তম ম্যাচ। ইতিমধ্যেই নামের পাশে ৩১ গোল, একটি বিশ্বকাপ- ইউরোপিয়ান কাপ, ব্যালন ডিওর! '৯৮ বিশ্বকাপ জয়ী এই দূর্দান্ত ফুটবলার সম্পর্কে যত বেশি বলা হয় ততোই কম হয়ে যায়। সবকিছু ছাপিয়ে জিদান আজ ফ্রান্সের জার্সিটা শেষবারের মতো জড়িয়েছেন; চূড়ান্ত মনোযোগ দিয়ে ফুটবল'টাও খেলে যাচ্ছেন। ১-১ সমতায় থাকা ম্যাচ ২-১ এ জয় করার সব কৌশল আর পূর্বাভিজ্ঞতা নিশ্চয়ই জিদানের আছে। ফরাসী দর্শকরা তাই তার পায়ের দিকে নজর রাখেন। 

 

দ্বিতীয়ার্ধে মাঠের দখল ফ্রান্সের কাছেই বেশি, তাতে ঘাবড়ায় না ইতালি। পিরলো বোধহয় একটু বেশিই ভয়ংকর ছিলেন সেদিন; বারবার বল ছুঁড়ে দিচ্ছিলেন বক্সে- টনি লুকা তো গোলও পেয়ে যাচ্ছিলেন দু'বার। গোলবার আর অফসাইডের বাঁশি দু'বারই হতাশ করলো। ৯০ মিনিট পরেও ১-১ এ সমতায় থাকা ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে গড়ালো; ১ম হাফের একদম শেষদিকে জিদান খানিকের জন্য গোলও পেয়ে গেছিলেন। কিন্তু বাঁধা হয়ে দাঁড়ালেন বুফন- পৃথিবীবাসী পরে যাকে চিনেছে এক কিংবদন্তী হিসেবে! 

 

মিনিট পাঁচেক পরেই যা ঘটলো তার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না কেউই। লেখার শুরুতে বলছিলাম রেফারি এলিজন্দো নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন; মাতেরাজ্জিকে মাঠে শুয়ে থাকতে দেখে তিনি সহসাই অবাক হলেন। ব্যাপারটা কি হলো তিনি দেখতে পেলেন না; বাঁশিতে ফুঁক দিয়ে খেলা থামিয়ে দৌড়ে গেলেন এসিস্ট্যান্টের কাছে, উনিও কিছু বলতে পারলেন না। এলজন্দোকে বাধ্য হয়ে ফোর্স অফিসিয়াল লুইস মেদিনার সাথে হেডসেটে যোগাযোগ করতে হলো; মেদিনা জানালেন ম্যাচ চলাকালীন সময়ে জিনেদিন জিদান মার্কো মাতেরাজ্জির বুকে মাথা দিয়ে সজোরে আঘাত করেছেন! 

 

১১০ তম মিনিট। বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচ। জিদানের শেষ বিশ্বকাপ, শেষ ম্যাচ। কোমরে দুই হাত, মাথা তুলে তাকিয়ে দেখলেন রেফারির উর্ধহাতে লাল কার্ড! নিস্তব্ধ ওলিম্পিয়াস্তাদন, বাঁকরুদ্ধ পুরো ফরাসী জাতি! এ কি করলেন জিদান? একমাত্র ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপ ফাইনালের এক্সট্রা টাইমে লাল কার্ড দেখলেন তিনি, চতুর্থ প্লেয়ার হিসেবে বিশ্বকাপ ফাইনালে লাল কার্ড পেলেন; একমাত্র প্লেয়ার হিসেবে টানা দুই বিশ্বকাপে লাল কার্ড দেখলেন! এইসবের ভীড়ে যে ফ্যাক্টটি এড়িয়ে যাচ্ছে- জিদান শেষ মূতুর্তে এসে বিশ্বকাপটা ইতালিকে দান করে গেলেন! 

 

কিন্তু কেন এই বিপদগামী সিদ্ধান্ত নিতে গেলেন জিদান? কি হয়েছিলো মাতেরাজ্জির সাথে? কেন'ই বা তাকে ঢুষ মারতেই হলো? 

 

ইংলিশ পত্রিকা গার্ডিয়ান খবর ছেপেছিলো মাতেরাজ্জি নাকি জিদানের মা'কে নিয়ে গালি দিয়েছেন; তবে মাতেরাজ্জি নিজেই বলেছেন 'আমি আমার মাকে হারিয়েছি ১৫ বছর বয়সে, আমি কেন তার মাকে নিয়ে খারাপ মন্তব্য করবো'। তবে কাকে গালি দিয়েছেন মার্কো? উত্তরটা নিজেই দিলেন, 'আমি তো বরং তার বোনকে গালি দিয়েছি'। ১৪ বছর পর এক সাক্ষাতকারে মাতেরাজ্জি জানালেন ইতালি কোচ মার্সেলো লিপ্পি তাকে বলেছিলেন জিদানকে মার্ক করে রাখতে, আর তাতে জিদান এতটুক রিএক্ট করে বসবেন তার ধারণাই ছিল না। মার্কিংয়ের একটা পর্যায়ে জিদান মার্কোর জার্সি ধরে টেনেছিলেন কি না; তাতেই মার্কো বলে ফেললেন- তোমার বোনের জন্য নিয়ে যাও! আর সেটা সহ্য হয়ে উঠেনি জিনেদিন জিদানের। 

 

পরের গল্পটা আমাদের সবার জানা। 

ফ্রান্সের সাথে টাইবেকারে ৫-৩ গোলে ব্যবধানে জয়ী হয়ে চতুর্থ বারের মতো বিশ্বকাপ শিরোপা ঘরে তুললো ইতালি। শেষ ম্যাচে নিজের ২য় বিশ্বকাপ জয়ের উল্লাসটা জিদানও করতে পারতেন; হতে পারতো ভিন্ন এক রূপকথা। এতো বছর পরও মানুষটাকে আমি ক্ষমা করতে পারি না, আমার শুধু এটাই জানতে ইচ্ছে করে- জিনেদিন জিদান- এই ভুলটা আপনাকে করতে হলো? 

 

- আহমদ আতিকুজ্জামান।