• ফুটবল

ফুটবলে রেসিজম!!!

পোস্টটি ২৬৭ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

ফুটবল খেলা নিঃসন্দেহে পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। পৃথিবীতে এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে ফুটবলের জনপ্রিয়তা নেই। বিশ্বে উচু-নিচু ধনী-গরীব অসংখ্য দেশ আছে, অসংখ্য জনপদ আছে। এসব বিভিন্ন জনপদে চোখে পড়ে হাজারো বৈচিত্র্য। কিন্তু সবজায়গায় একটা জিনিস কমন, আর সেটা হলো ফুটবল ফ্যানস। আপনি বিশ্বে এমন কোনো জনপদ পাবেন না, যেখানে ফুটবল সমর্থক পাবেন না।

ফুটবল খেলা বিশ্বব্যাপী শান্তির বার্তা বহন করে। বিশ্বের অসংখ্য সংঘর্ষ সংঘাতের অবসান ঘটিয়েছে এই ফুটবল। ফুটবল ভেদাভেদ বোঝেনা। এখানে ধনী-গরীব সাদা-কালো সবাই সমান। ফুটবল সাম্যের গান গায়।

অথচ এই ফুটবল দুনিয়ায় এমন কিছু কুৎসিত নোংরা মানসিকতার মানুষ আছে, যারা ফুটবলে টেনে আনে রেসিজম। যেই রেসিজম সারা বিশ্বব্যাপী নিন্দিত, তারা "দ্য মোস্ট বিউটিফুল গেইম" ফুটবল কে কলঙ্কিত করে রেসিজমের নোংরা থাবায়। ফুটবল দুনিয়া সেই আদি থেকে এখন অবধি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে এ রেসিজমের বিরুদ্ধে, কিন্তু এখনও তার কবল থেকে মুক্তি মেলেনি।

ফুটবলে এখনও প্রতিনিয়ত অহরহ রেসিজম এর ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। রেসিজম সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয় ইউরোপিয়ান ফুটবলে। তবে আপনি যদি মনে করেন রেসিজমের ঘটনা শুধু ইউরোপেই ঘটে, তাহলে আপনি ভুল ভাবছেন। বিশ্বের প্রায় সবখানে খেলোয়াড়দের রেসিজমের শিকার হতে হয়। তবে ইউরোপিয়ান মিডিয়া অন্যান্যদের চেয়ে তৎপর, ফলে ইউরোপিয়ান ফুটবলের রেসিজম অনেক বেশি হাইলাইটেড হয়। সে তুলনায় অন্যান্য স্থানের ঘটনা গুলো তেমন একটা খবরে আসেনা, থেকে যায় আড়ালেই।

image_search_1648750672607
কিছুদিন আগে বিবিসির এক প্রোগ্রামে রেসিজম নিয়ে আলোচনা করছিলেন সাবেক ইংল্যান্ড সতীর্থ অ্যালান শিয়েরার ও ইয়ান রাইট। সেখানে একপর্যায়ে শ্বেতাঙ্গ শিয়েরার কৃষ্ণাঙ্গ রাইট কে জিজ্ঞেস করেন, "তুমি কি বিশ্বাস করো কালো ও সাদা খেলোয়াড়দের সাথে ভিন্নরকম আচরণ করা হয়?" রাইট জবাব দেন, "নিঃসন্দেহে।"

কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড়রা সবখানে বৈষম্যের শিকার হন। স্টেডিয়ামের মতো পাবলিক প্লেসে যেমন ফ্যানরা তাঁদের আক্রমণ করে, তেমনি তাঁরা সোশ্যাল মিডিয়ায় বিভিন্ন অবমাননাকর মেসেজে আক্রান্ত হন। এমনকি অনেক সময় তাঁদের নিজেদের ক্লাবেও তাঁরা পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন।

ফুটবলে রেসিজমের ঘটনা লিখতে গেলে শেষ করা অসম্ভব। তবে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা উল্লেখ করা যায়।

২০২১ সালে অনুষ্ঠিত ইউরো ফাইনালে পেনাল্টি শুটআউটে ইতালির বিপক্ষে পেনাল্টি মিস করেন তিন কৃষ্ণাঙ্গ ইংলিশ ফুটবলার মার্কাস রাশফোর্ড, জাডোন সাঞ্চো ও বুকায়ো সাকা। আর এর পরপরই টুইটারসহ উল্লেখযোগ্য সব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের প্রতি বর্ণবাদী মন্তবের ঝড় ওঠে। অবশেষে এফএ তাদের অফিসিয়াল পেজে এর বিরুদ্ধে স্টেটমেন্ট দেয় ও রেসিস্টদের তীব্র নিন্দা জানায়।

image_search_1648751292031
২০২০-২১ সিজনে পুরোটা সময় ধরে অসংখ্য ইঞ্জুরির কারণে বেশ বাজেভাবেই মৌসুম শেষ করে লিভারপুল। আর এর ফলেই অনলাইনে বর্ণবাদী আচরণের শিকার হন তাদের দুই কৃষ্ণাঙ্গ ফুটবলার ট্রেন্ট আলেক্সান্ডার আর্নোল্ড ও নাবি কেইতা। ইন্সটাগ্রাম ও ফেইসবুকে কিছু লোক তাদেরকে বানরের ইমোজি দিয়ে উপস্থাপন করে। এ ঘটনায় লিভারপুল ব্যাপক বিরক্ত হয় ও কর্তৃপক্ষের প্রতি কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন জানায়।

গত সিজনে চ্যাম্পিয়নশিপে রেকর্ড গড়া ব্রেন্টফোর্ড স্ট্রাইকার ইভান টনিও প্রায় অনুরূপ ঘটনার মুখোমুখি হন। বার্মিংহামের সাথে তাদের ম্যাচ গোলশূন্য ড্র হলে ইনস্টাগ্রামে তাকে প্রাইভেট মেসেজে "মাংকি" বলে সম্বোধন করা হয় ও সেই সাথে বেশ কিছু বানর ও কলার ইমোজি পাঠানো হয়। ব্রেন্টফোর্ড উক্ত ঘটনার তীব্র নিন্দা জানায় ও ইন্সটাগ্রাম কর্তৃপক্ষকে ওই ইউজার কে নিষিদ্ধ করতে আহবান করে।

নিউক্যাসল ইউনাইটেডের সাথে টটেনহ্যাম হটসপার এর ম্যাচ ড্র হওয়ার পর স্পার্স সেন্টার ব্যাক ডেভিনসন সানচেজ বেশ কিছু নোংরা অশালীন মেসেজ পান। তার ইন্সটাগ্রাম স্টোরির রিপ্লাইতেও বেশ কিছু বানরের ইমোজি দেওয়া হয়। স্পার্স কর্তৃপক্ষ এ ঘটনায় তীব্র বিরক্তি প্রকাশ করে। কিন্তু এর কিছুদিন পরেই আরেক স্পার্স প্লেয়ার সন হিউং মিন কে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে পরাজয়ের পর আবার রেসিয়াল অ্যাবিউজের শিকার হয়।

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড এক ম্যাচে রেলিগেটেড সাইড শেফিল্ড ইউনাইটেডের সাথে ২-১ গোলে পরাজিত হয়। আর এর ইফেক্ট পড়ে রেড ডেভিল ফুটবলার অ্যান্টনি মার্শিয়াল ও আক্সেল তুয়ানজেবের ওপর। ম্যাচের পর তাদের ইনস্টাগ্রাম পোস্টে অসংখ্য বানরের ইমোজি দিয়ে কমেন্ট করা হয়।

এছাড়াও আরও অনেকেই রেসিজমের শিকার হন। সার্বিয়ান ক্লাব রেড স্টার বেলগ্রেডের মাঠে খেলতে গিয়ে বর্ণবাদের শিকার হন সুইডিশ ফরওয়ার্ড ইব্রাহিমোভিচ, যারা ফলে ইউয়েফা ইউয়েফা রেড স্টার কে বড় অঙ্কের জরিমানাও করে। স্লাভিয়া প্রাহার বিপক্ষে ইউরোপা লিগ ম্যাচে ম্যাচে প্রাহা খেলোয়াড় ওন্দ্রেজ কুদেলার দ্বারা অ্যাবিউজের শিকার হন রেঞ্জার্স মিডফিল্ডার গ্লেন কামারা। এমন আরও অসংখ্য রেসিজমের ঘটনা ঘটেছে শুধু ২০২১ সালেই।

image_search_1648750525255
এবার কিছু স্ট্যাটিসটিকস এ নজর দেওয়া যাক। ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপের ধারাভাষ্যের ওপর একটা জরিপ করা হয়েছিলো। সেখানে বিবিসি ও আইটিভির ২০ টি ম্যাচের ৩০ ঘন্টার লাইভ কভারেজে ফুটবলারদের প্রশংসাসূচক ১০০৯ টি কমেন্ট অ্যানালাইসিস করা হয়। সেখানে দেখা যায়, সিংহভাগ সময় কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড়দের শারীরিক সক্ষমতা ও ন্যাচারাল অ্যাথলেটিসিজমের প্রশংসা করা হয়েছে। অপরদিকে, শ্বেতাঙ্গদের প্রশংসা করা হয়েছে তাদের বুদ্ধিমত্তা ও চরিত্রের জন্য।

সেসব মন্তব্য গুলোকে যদি আরও ভালোভাবে বিন্যাস করা যায়, তাহলে দেখা যায় কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি ২৮১ টি প্রশংসাসূচক মন্তব্য করা হয়েছে, যার মধ্যে ছিলো শারীরিক সক্ষমতার প্রতি ৬৯.৮%, ন্যাচারাল অ্যাথলেটিসিজমের প্রতি ১০.৭%, শেখনের প্রতি ১০.৩%, চরিত্রের প্রতি ৫% ও বুদ্ধিমত্তার প্রতি ৪%। অপরদিকে শ্বেতাঙ্গদের প্রতি প্রশংসাসূচক মন্তব্য করা হয় ৪৪৮ টি, যার মধ্যে ছিলো শারীরিক সক্ষমতার প্রতি ১৮.৩% চরিত্রের প্রতি ১৩.৮%, বুদ্ধিমত্তার প্রতি ১১.৪% ও ন্যাচারাল অ্যাথলেটিসিজমের প্রতি ৮.৬%।

এই পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, ধারাভাষ্যকারদের মন্তব্যগুলো সবসময় তাঁরা যা দেখছেন তাই বলছেন, এমনটা হয়না। অনেক সময়ই, স্পেশালি কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্যের প্রতি যেমন শক্তিমত্তা বা গতির ক্ষেত্রে প্রায়শই খেলোয়াড়দের জাতি বা বর্ণভেদে ধারাভাষ্যকারদের অজ্ঞাতে বা জ্ঞাতসারেই মন্তব্যগুলো পরিবর্তন হয়।

রেসিজমের শিকার বহু খেলোয়াড় বহুবার এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন। ফিফা অসংখ্যবার অসংখ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, কিন্তু রেসিজম রুখতে পারেনি।

image_search_1648750766658
২০১৮ সালের অক্টোবরে বর্ণবাদের শিকার চেলসি ডিফেন্ডার অ্যান্টনিও রুডিগার কর্তৃপক্ষ কে রেসিজমের বিরুদ্ধে আরও শক্ত অবস্থানে যেতে আহবান করেন।

২০১৯ সালের এপ্রিলে ইউয়েফা প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্দার সেফেরিন বলেন, কোনো ম্যাচে কোনো ধরণের রেসিজমের ঘটনা ঘটলেই রেফারির উচিৎ ম্যাচ বন্ধ করে দেওয়া। ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো রেসিজমের ঘটনায় কঠোর শাস্তির ব্যাবস্থা করার ঘোষণা করেন।

২০১৯ এর এপ্রিলেই রেসিয়াল অ্যাবিউজ এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পিএফএ (প্রোফেশনাল ফুটবলারস অ্যাসোসিয়েশন) একটি সোশ্যাল মিডিয়া ক্যাম্পেইন আয়োজন করে ও রেসিজমের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কর্তৃপক্ষের প্রতি আহবান জানায়।

রেসিজমের নোংরামির বিরুদ্ধে ফুটবলের লড়াই চলছে বহু বছর ধরে। কিন্তু এখনও ফুটবলে রেসিজম প্রাত্যহিক ঘটনা। প্রতিদিনই বলতে গেলে কোথাও না কোথাও রেসিজমের শিকার হচ্ছে ফুটবলাররা।

রেসিজমের সাথে "দ্য বিউটিফুল গেইম" এর এই লড়াই চলতে থাকবে। হয়তো একদিন আসবে একটি সুন্দর দিন, যেদিন ফুটবলে থাকবেনা কোনো রেসিজম, যেদিন ফুটবল হবে নির্মল। এটিই পৃথিবীর কোটি কোটি সৌন্দর্যপ্রিয় ফুটবল সমর্থকদের চাওয়া।