• ফুটবল

বব মার্লে এবং ফুটবল

পোস্টটি ২৪২ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

জীবদ্দশায় ভয়ংকর ঘণ চুল ব্যাতিত মানুষ'টিকে খুব কমই দেখা গিয়েছে, পশ্চিমা বিশ্বে বব মার্লের "চুল"ই ছিলো জ্যামাইকানদের প্রতীকীস্বরুপ! সবুজ, কালো আর সোনালী রঙয়ের জ্যামাইকান পতাকা'কে যিনি বিশ্বব্যাপী চিনিয়েছিলেন বিমোহিতভাবে। মৃত্যুর পর একজন বব মার্লে'কে সমাহিত করা হয়েছিলো তিনটি বস্তুর ছায়ায়, যেসবকে বব নিজের জীবনে গুরুত্ব দিয়েছিলেন সবচেয়ে বেশি; মার্লের লাল রঙয়ের গিবসন গিটার, মারিজুয়ানার কুঁড়ি, এবং ফুটবল! ঠিক যেনো মার্লের ধর্ম, মার্লের সঙ্গীত, আর ফুটবলের মিশেল; বব মার্লের সারাজীবনের অবিচ্ছেদ্য প্রতিচ্ছবি!  

 

বব মার্লে ছিলেন চির-বিদ্রোহী, যাঁর গান ছিল পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়ে ভয়ঙ্কর। বব মার্লের গান মানেই বারুদে আগুন, কখনো তা বর্ণবৈষ্যম্যের বিরুদ্ধে, কখনো সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে, কখনো লিঙ্গ বৈষ্যম্যের বিরুদ্ধে, কখনো ক্ষমতাবান উন্নত দুনিয়ার বিরুদ্ধে, কখনো অভিবাসন নীতির বিরুদ্ধে! নিজের গানকে সম্বল করেই বব আজীবন তার লড়াই চালিয়ে গিয়েছিলেন! বব মার্লে এক আলাদা জীবনদর্শনের নাম, যার পুরোটাই উপভোগ্য! সুর ও সঙ্গীতই ছিলো তার প্রথম ভালোবাসা, যেই সৃষ্টির মাঝেই তাকে পৃথিবী স্মরণে রাখবে; কিন্তু ববের অন্য এক আসক্তি তাকে করেছিলো বাকীদের চেয়ে আলাদা। গিটারে দ্রোহের সুর তোলা কিংবা কলমে বিপ্লবী লিরিক্স লেখার মতই অন্য এক প্রেমে মত্ত ছিলেন বব, আর তা হলো ফুটবল!  

 

আপনি কি ফুটবল নিয়ে ববের পুরানো ছবিগুলো দেখেছেন? দেখবেন, ফুটবল নামের ঐ গোলকধাঁধায় ববের বিচক্ষণ দৃষ্টি আর মুখে দীপ্তিময় হাসি! মাথায় উলের টুপি, পায়ে মোজা, সুঁতি কাপড়ের ট্র‍্যাকসুট, অ্যাডিডাস কোপা মানডিলা ব্রান্ডের বুট, পুরো শরীর আবৃত করে মাঠে নেমে যেতেন তিনি! একজন স্টাইলিশ আইকন বব নিজের পোশাক সচেতন ছিলেন যেমন কনসার্টের মঞ্চে, ঠিক তেমনই ফুটবল মাঠেও! কখনো কখনো তিনি যখন শর্টস পড়েও মাঠে নেমেছেন, একজন ক্ষুরধার সঙ্গীতশিল্পীর পেশীবহুল পা নজরে এসে সবাইকে অবাকই করতো বটে! ক্লাসিক শর্টস আর কম্বো টি–শার্টে মার্লে ফুটবল নিয়ে কারিকুরি দেখাতেন, দ্বিধায় পড়ে যেতে হতো তিনি সঙ্গীত শিল্পী নাকি একজন ফুটবলার! বল নিয়ে ববের মুভমেন্ট সবার মাঝে বিষ্ময়কর প্রশ্নের জন্ম দিতো, বর্ণনাতীত সেই কারিকুরি সবাই একজন ফুটবলারের কাছে প্রত্যাশা করে একজন রকস্টারের কাছে নয়! মনে হতো, ফুটবল শৈলীই যেন তার সহজাত, ঠিক ববের সঙ্গীতের মতোই, অলৌকিক কোন শক্তি দ্বারা উভয়টিতেই সমপারদর্শীতা দেখাতেন তিনি, গানের মঞ্চে কিংবা ফুটবল পায়ে। নিজ দেশের সংস্কৃতি, নিজ জাতী কিংবা কাটাতার ছাঁপিয়ে নিজের গান আর সুর কে যেভাবে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিয়েছিলেন বব, বল পায়েও অবলীলায় ডিফেন্ডারদের পায়ের ফাঁকে কারিকুরি দেখিয়ে দৌড়াতেন তিনি! 

 

মার্লের ব্যক্তিগত আলোচিত্রকর এবং বন্ধু মরিস বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে  বলেছিলেন - "বব'কে ফুটবল খেলতে দেখা আমার কাছে একটা যাদুকরী ব্যাপার মনে হত। তিনি  ফুটবল খেলার সময় আমি কখনই তার ছবি তুলতাম না। কারণ আমি সত্যিই তার খেলা দেখতে চাইতাম, উপভোগ করতে চাইতাম। ফুটবলই ছিলো মার্লের আনন্দ এবং আমি সেই সময়টায় ক্যামেরা নামিয়ে রাখতাম কেবল মার্লের আনন্দ উপভোগ করার জন্য!"

 

ট্রেভর ওয়াট, একজন ব্রিটিশ সাংবাদিক বলেছিলেন - "ববের কাছ থেকে বল কেড়ে নেওয়া প্রায় অসম্ভব ছিলো, আর বব'ও কি যেন এক অলৌকিক শক্তি নিয়ে মাঠে থাকতেন, বল আপনাআপনি কেবল বব'কেই খুঁজে নিতেন। তিনি ছিলেন মিডফিল্ড মায়েস্ত্রো। ব্যাপারটা যেন এমন, বল এক ঐশ্বরিক বলে ববের পায়েই চলে যেত, কিন্তু বল আবার নিয়ন্ত্রণ নেওয়া ছিলো কস্টসাধ্য।"

 

মার্লের একসময়ের বন্ধু নেভিল গ্যারিক ফুটবল ম্যাচে মার্লের প্রভাব কতটুকু, তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন - "বব কখনো বল হারাতে চাইতো না। ওর দৌড়, শক্তিমত্তা অন্য সবার চেয়ে আলাদা ছিলো৷ মিডফিল্ডে তার প্রভাব ছিলো প্রফেশনাল ফুটবলারদের মতোই। সে ছিলো আগ্রাসী মনোভাবের মানুষ। যখন কিক করতো তখন সত্যিকার অর্থেই কঠিনভাবে কিক করতো। মার্লের ক্ষিপ্রগতির কিক আমাদেরকে ভুগাতো। বড় মাঠে মার্লে খুবই আক্রমনাত্মক ফুটবল খেলতো। যখনই সুযোগ পেতো, গোল করার চেষ্টা করতো।"

 

আইল্যান্ড রেকর্ডের ডিস্ট্রিবিউটর ট্রেভর ওয়েট বলেন - "আপনি মার্লের কাছ থেকে বল নিবেন? সেটা আশাতীত ব্যাপার৷"

 

ইন্টারনেটের পাতায় নজর রাখলেই আপনার কাছে পরিস্কার হয়ে যাবে, বব মার্লে কখনোই ফুটবল থেকে দূরে ছিলেন না। কখনো সংগীত চর্চার সময়, কিংবা কোনো স্টুডিও সেশনের মাঝের সময়টায় অথবা মঞ্চে গান গাইতে উঠার আগে কিংবা বন্ধুদের সাথে পার্কে হাঁটতে গিয়ে, যখন সুযোগ পেয়েছে বব ফুটবলের সাথে সময় কাটিয়েছে। ফুটবলের প্রতি মার্লের ঝোকটা এতটাই তীব্র ছিল। এমনকি যাত্রাপথে কার পার্ক করলে, কিংবা পেট্রোল স্টেশনে, কিংবা ফাঁকা কোন সবুজ মাঠ দেখলেই মার্লে তার আইকনিক সাদা কালো বল নিয়ে খেলতে নাম যেতেন। তিনি বল নিয়ে দৌড়াতেন, ফ্রি স্টাইল করতেন কিংবা যাত্রাসঙ্গী কে গোলবারে দাঁড় করিয়ে পেনাল্টি কিক নিতেন। পৃথিবীর যেকোনও জায়গায় লাইভ অনুষ্ঠান করতে যাওয়ার আগে উদ্যোক্তাদের সামনে একটি শর্ত রাখতেন বব, তাঁর ইচ্ছা করলেই ফুটবল খেলার ব্যবস্থা করে দিতে হবে উদ্যোক্তাদের। ফুটবলকে ঠিক এভাবেই ধারণ করতেন বিব মার্লে। 

 

মার্লের পুরো জীবনই যেনো এক পুরাণশাস্ত্র, যেনো পুরাণশাস্ত্রে গাঁথা। মার্লে নামক জীবনদর্শনকে চেনার এবং জানার সর্বোত্তম উপায় কি, একবার এক সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি উত্তর দিয়েছিলেন - আপনি যদি আমাকে জানতে চান, তাহলে আপনাকে আমার এবং উইলার্সের বিপক্ষে ফুটবল খেলতে হবে’ –  অথচ মার্লে কোনো প্রফেশনাল ফুটবলার ছিলেন না, যাকে চেনার জন্য তার বিরুদ্ধে ফুটবল খেলতে হবে। 

 

বৈশ্বিক ফুটবলে জ্যামাইকা কোনো নৈপুণ্যের ছাপ না রাখতে পারলেও, ফুটবল বিশ্বের সাথে মার্লের সম্পর্ক ছিলো সুমধুর!  ফুটবলকে সবসময় তুলনা করতেন মুক্তির সাথে। 'আমি মুক্তি চাই, ফুটবল মানে হলো মুক্তি'- মার্লে সবসময় বলতেন। 

 

জ্যামাইকান ফুটবলার কার্ল ব্রাউন বলেন - "বয়েজ টাউনে আমি মার্লেকে ফুটবল খেলতে দেখতাম। সেই সকাল আটটা থেকে বিকেল তিনটে অব্দি৷ ট্রেঞ্চ টাউনের তরুনদের কাছে বয়েজ টাউনে ফুটবল খেলতে পারা'টা স্বপ্নের মতো। সত্যি কথা বলতে কি, আমি এখনো খুঁজে বের করতে পারিনি মার্লে কোনটা বেশি ভালোবাসতো- ফুটবল নাকি গান?"

 

মার্লে তার ট্যুর ম্যানেজার হিসেবে রাখতেন ফুটবল মাঠের অভিজ্ঞ মানুষজনদের। এমনই একজন মার্লের সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু, যার নাম এলান কোল! এলান কোল, জ্যামাইকান বিখ্যাত ফুটবলার, মাঠে স্ট্রাইকার হিসেবে নর্থ আমেরিকান লীগ, ব্রাজিলিয়ান ডিভিশন এবং হাইতির এক ক্লাবের হয়েও খেলেছিলেন তিনি। পাশাপাশি বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচে জ্যামাইকার জার্সিতে খেলেছেন তিনি। মার্লে প্রায়ই আফসোস করে বলতেন, ইশ, এলান যেভাবে ফুটবল খেলে আমি যদি সেভাবে গান গাইতে পারতাম। কোল ছিলেন সঙ্গীতের ভক্ত, আর মার্লে ফুটবলের। কোলে মার্লের  ট্যুর সঙ্গী ছিলো অনেক ট্যুরে। পরিবর্তীতে কোল বনে যান মার্লেদের ব্যান্ড ম্যানেজার। কোল তাদেরকে ট্রেইনিং দিতেন, একসাথে ফুটবল খেলতেন। 

 

 বব মার্লে ব্রাজিলিয়ান ক্লাব সান্তোস ও ইংল্যান্ডের  টটেনহ্যাম হটস্পার ফ্যান ছিলেন, যার পিছনেও কোলের অবদান ছিলো। মার্লের আইডল ছিলেন পেলে। পেলের ঈশ্বর প্রদত্ত প্রতিভাকে আদর্শ মানতেন মার্লে। পেলের খেলার শৈলীতেই মুগ্ধ হয়ে ফুটবলে প্রাণ মজিয়েছিলেন মার্লে।

 

বব মার্লের ‘গেট আপ, স্ট্যান্ড আপ ফর ইয়োর রাইটস’ শুনেছেন!? যে গানটি বিশ্বের দেশে দেশে বর্ণবিদ্বেষ, পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনের প্রধান হাতিয়ার হয়ে গিয়েছিল! যে গানে বব মার্লে দ্বিধাহীনভাবে বলেছিলেন - "কিছু মানুষকে কিছু সময়ের জন্য বোকা বানানো গেলেও, সব মানুষকে চিরকালের জন্য বোকা বানানো যাবে না। আমরা নিজেরা যদি নিজেদের জীবনের মুল্য বুঝতে পারি তাহলে আশার আলো নিজেরাই দেখতে পাব। জাগো, উঠে দাঁড়াও তোমার অধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য।"

 

‘নো ওম্যান, নো ক্রাই’ গানে বব মার্লে বলেছিলেন - “না নারী, তুমি কেঁদো না। তোমার অশ্রু শুকিয়ে নাও, সুদিন আসছে।”

 

'ব্ল্যাক প্রগ্রেস‘ল' গানে মার্লে বলেছিলেন - "অধিকারের ভাগ না পেলে লড়াই থামাব না।"

 

বিশ্বের দেশে দেশে বিপ্লবের তুফান তুলেছিল যে বব মার্লের গান, সেই বব মার্লেই বলতেন - “ফুটবল হল স্বাধীনতা, ফুটবল হল গোটা একটি বিশ্ব।” 

 

গান মার্লের জীবনে আঠার মত লাগানো ছিলো, আর ফুটবল সেই আঁঠায় আটকানো ছিলো জীবনভর। ফুটবল ছিলো মার্লের মুক্তচিন্তার বাহক, ফুটবলের সুরেই তিনি দ্রোহের মন্ত্র লিখেছেন। তিনি বলতেন, ফুটবল তাকে জীবনীশক্তি দেয়, সতেজতা দেয়, যেই সতেজয়ায় তিনি লিখতেন, তিনি সুর বুনতেন। এই অনিন্দ্য সুন্দর খেলাটি তাকে মাঝে মাঝে সংগীত থেকে সাময়িক মুক্তি দিত, সেই সাথে তার ব্যক্তিত্বকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলত।

 

 

কি হত, যদি দা বিউটিফুল গেইম, ফুটবল তাকে আরো আগে খুঁজে পেতো! বব মার্লের একজন সঙ্গীতশিল্পী মার্লে হয়ে উঠার আগে!? ১৯৮০'র এক ইন্টারভিউয়ে মার্লে বলেন - "আমি গান ভালোবেসেছিলাম, ফুটবলকে ভালোবাসারও আগে। যদি আমি ফুটবলকেই আগে ভালোবাসতাম তবে তা ভয়ংকর হতে পারত। ফুটবল খেলা আবার একই সাথে গান গাওয়া মারাত্মক ব্যাপার হতো। আমি শান্তির গান গাই, ভালোবাসার সুর ছড়াই; কিন্তু ফুটবল এমন এক খেলা যেখানে ডিফেন্ডার ট্যাকেল করলে একটা যুদ্ধ্বের আবেশ ছড়িয়ে দেয়। যুদ্ধ্ব আর শান্তি একই বিন্দুতে চলতে পারেনা!"

 

 

বব মার্লে ছিলেন ‘রাস্তাফারিয়ান’; আফ্রিকা ও ওয়েস্ট ইন্ডিজে প্রচলিত ‘রাস্তাফারি‘ নামে একটি সহজিয়া লোকধর্মে আশ্রয় খুঁজে নিয়েছিলেন বব মার্লে, রাস্তাফারিয়ানরা বিশ্বাস করেন মানুষের মধ্যেই ঈশ্বর আছেন এবং এই পৃথিবীতে সবার সমান অধিকার। রাস্তাফারিয়া ধর্মের অনুসারীদের মতোই বড় বড় জটা ছিলো বব মার্লের চুলে। 

 

১৯৭৭ সাল!  ফুটবল খেলার জন্য সদ্য উপহার পাওয়া বুটটি পড়তে গিয়েছিলেন বব মার্লে। ডান পায়ে বুটের সাথে থাকা তারে ক্ষত বাঁধিয়ে ফেলেন বব, শুরুতে তেমন গুরুত্ব না দিলেও ক্রমশ জায়গাটি বিষিয়ে যেতে শুরু করেছিল। কিছুদিন পরে চিকিৎসক পরীক্ষা করে  জানিয়েছিলেন মানুষটির পায়ে হানা দিয়েছে ‘লেন্টিজিনাস মেলানোমা’ নামে ত্বকের ক্যানসার। বব মার্লেকে চিকিৎসকেরা বার বার অনুরোধ করেছিলেন পায়ের পাতা বাদ দেওয়ার জন্য। কিন্তু ববের ধর্মে শরীর হচ্ছে মন্দির, শরীরের কোনও অংশ বাদ দিলে ঈশ্বরকে অশ্রদ্ধা করা হবে। পায়ের পাতা বাদ দেবেন না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন বব মার্লে। এছাড়াও, তিনি ফুটবল খেলার সুযোগটি হারাতে এবং মঞ্চে অবাধে চলতে চাননি। তিন বছরের মধ্যেই মার্লের পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়েছিল ক্যানসার। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখা হয়েছিল বিভিন্ন কথা, গুলি করে হত্যায় বিফল হওয়ার পর বব মার্লেকে নাকি তেজস্ক্রিয় তামার তার দেওয়া ফুটবল বুট পাঠিয়েছিল সিআইএ, আর সেই বুট পরেই হয়েছিল ক্যানসার। অনেক রাজনৈতিক ভাষ্যকার মনে করেন, সিআইএ’-এর কাছে মার্লে ছিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ। কারণ তাঁর গান ছিল পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়েও শক্তিশালী। যা যুগ যুগ ধরে অত্যাচারিত মানুষের মনে বিদ্রোহের বীজ বপন করে চলে। তাই তাঁকে সুনিপুণ ষড়যন্ত্রে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল পৃথিবী থেকে। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, যেই ফুটবলে মজেছিলেন বব, যেই ফুটবলে মুক্তির পরশ নিতেন, পরোক্ষভাবে সেই ফুটবলেই তাকে হত্যার ফাঁদ পাতানো হলো, তাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া হলো! 

 

জন্মলগ্ন থেকেই বর্ণ বৈষম্যের স্বীকার মার্লে সবসময় বলতেন, আমি সাদাদের দলে নই, আমি কালোদের দলেও নই, আমি ঈশ্বরের দলে। মার্লে অনুভব করতেন তিনি মধ্যমান, এবং তাকে ঘিরে তিনি সকলকে এক কাতারে আনতে পারেন, গান কিংবা ফুটবল দিয়ে। বব'কে হত্যা করা হলেও, সাদা কিংবা কালোদের মাঝে আজও আছেন বব মার্লে। তাঁকে দেখতে পাওয়া যায় না, তাঁকে অনুভব করতে হয়। বব মার্লেদের কণ্ঠ সাময়িকভাবে রোধ করা যায়, কিন্তু বব মার্লেকে চিরতরে হত্যা করা যায় না। কারণ, পৃথিবীর সমস্ত নিপীড়িত শোষিত বঞ্চিত মানুষের রক্তে আজও ছুটে চলেছেন বব মার্লে, বিপ্লবের সন্ধানে, আগুনপাখি হয়ে। জীবিত বব মার্লের চেয়ে মৃত বব মার্লেকেই মানুষ বেশি মনে রেখেছে। শেষ নিঃশ্বাসের পর প্রায় চার যুগ পেরিয়েছে। তবুও বব মার্লে একটুও ম্লান হন নি। বরং আগের চেয়েও অধিকতর উজ্জ্বল দীপশিখার মতো বিশ্বব্যাপি গান প্রেমিদের হৃদয়ে, বিপ্লবী কিংবা মুক্তিকামী মানুষের হৃদয়ের গভীরে আছেন। কীর্তিমানের মৃত্যু নেই, কথা'টা যেন বারবার স্মরণ করিয়ে দেন বলাল গিবসন গিটার, মারিজুয়ানার কুঁড়ি, একখানা বাইবেল আর একটা ফুটবল কে বেঁচে থাকার উপজীব্য বানিয়ে নেওয়া বব মার্লে। 

 

মুক্তি কি জিনিস, বব মার্লের কাছে একবার জানতে চাওয়া হয়েছিলো; তিনি অল্পকথায় জবাব দিয়েছিলেন - 'বন্দী'র ন্যায় জীবনের প্রত্যেকটা দিন কাটানোর চেয়ে মুক্তির জন্য সংগ্রাম করে মৃত্যু শ্রেয়।' আর সারাজীবন বিপ্লবী ভাষায় কথা বলা সেই মানুষটার কাছে মুক্তির আরেক নাম ছিলো, ফুটবল, আমাদের দা বিউটিফুল গেইম!

 

ফুটবল সুন্দর, অনন্য এক সুন্দর খেলা; বব মার্লের নাম যেনো সেই সৌন্দর্যে একটুখানি রঙের প্রলেপ রাঙিয়ে দা বিউটিফুল গেইমের মর্যাদাকে আরো বাড়িয়ে দেয়!