• ফুটবল

কোথায় হারিয়ে গেলো বিশ্বকাপের সে আমেজ?

পোস্টটি ২৮৫ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

সন্ধ্যায় নিয়ম করে পড়তে না বসলে বাবা-মা দারুণ রাগ করবে- এই ভয়'টা যেন চিরাচরিত অধিকাংশ বাঙ্গালী ছেলেমেয়ের। তখন স্মার্টফোনের যুগ না, ঘন্টার পর ঘন্টা ভিডিও গেমে আর সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যস্ত সময় পার করা যায় না। দুষ্টুরা পড়ার ভান করে টেবিলে সময় কাটায়। মেধাবীরা পড়ে, বড় মানুষ হবার যন্ত্রনায়। 

 

ঘুম থেকে উঠে স্কুল, বিকেলে খানিক খেলাধূলা তারপর ইচ্ছের বিপরীতে পড়তে বসা- এইতো একটা কিশোরের প্রানবন্ত জীবন! একটা সময়ে নিয়মেরও মৃত্যু ঘটে, কিশোর যত বড় হয়, তার ভাবনার দোয়ারও তত খোলে, জীবন বদলে যেতে থাকে। ন'টা থেকে পাঁচটার চাকরি জীবন যতটা একঘেয়ে ততটাই নিয়মের বেড়াজালে বন্দী। তবু একটা সময়ে সে হাওয়াও বদলে যেতে থাকে। সময়টা বিশ্বকাপের। 

 

তখন... 

কিশোরের দল দল বেঁধে বিকালে খেলতে গিয়ে তর্কের তুমুল পর্যায়ে পৌঁছায়; সন্ধ্যা হলে মসজিদে নামায শেষে ঐ একই আলাপ, স্কুলে কি বাড়িতে, সে ছোট কি বড়- দোকানি কিংবা রিকশাচালক, মজুরি কিংবা গাড়িচালক, সবার সাথে একটা বিষয়ে কথাবলতেই সাচ্ছন্দ্য- বিশ্বকাপ ফুটবল কে জিতবে? 

 

অফিসের বড় বসও শত ব্যস্ততার পরে তখন কেরানির সঙ্গে গল্প শুরু করে দেন, 'কি সফিক, বিশ্বকাপটা কে নিবে এবার?' খেলা বুঝুক না বুঝুক সফিক হেসে হয়তো নির্বিকার উত্তর দিয়ে দিবে- এইবার বিশ্বকাপ স্যার আর্জেন্টিনা নিবে, ব্রাজিলের এইবার টাইম নাই!' রিক্সায় যেতে যেতে, চায়ের আড্ডায়, ছোটখাটো পথলায়- বন্ধুদের সমারোহে, খাবার টেবিলে কিংবা খেলার ময়দানে- বিশ্বকাপটাই তখন প্রধান আলোচনায়। 

 

বিশ্বকাপ ফুটবলের মাস, এ যে বাঙ্গালী ফুটবল প্রেমিকদের জন্য আরেকবার প্রেমে পড়ার মাস। যে মাসকে ঘিরে বাঙ্গালী ফুটবল ভক্তদের কতশত প্ল্যান। দিন যত ঘনায়, আমোদ আর উন্মাদনা তত বাড়তে থাকে। এ যেন একটা ভাইরাস জ্বর। যে জ্বরে কাঁপে সমস্ত জাতি। সে জ্বরের তীব্রতা কতটুকুই বা হতে পারে? 

 

মধ্যরাতে প্রিয় দলের খেলা। সেদিন, দুষ্টুরাও পড়তে বসে নিয়ম করে; নইলে যে বাবা খেলা দেখতে দিবে না। সকালে অফিসে দেরি হয়ে যাবে, তবু ক্লান্ত চোখে খেলা দেখতে হবে এটা ভেবে মানুষিক প্রস্তুতিও সেরে ফেলেন অনেক বাবা। যুবকের দল বিশ্বকাপ শুরুর আগে বাড়িতে, গ্রামের রাস্তায়, নার্সারি বাগানের বেড়ায়- যেখানে সেখানে প্রিয় দলের পতাকা টানিয়ে দেয়াটা কর্তব্য মনে করছে। কে কত বড় আর কত বেশি সংখ্যক বেশি পতাকা কিংবা ব্যানার টানাতে পারলো তা নিয়ে আলোচনার শেষ নেই। 

 

বিশ্বকাপ মানে যেন বাঙ্গালী জাতির জন্য এক ভিন্ন রকমের উন্মাদনা। বিশ্বকাপ শুরু হলে খবরের পাতায় ফলাও করে প্রচার হবে দরিদ্র কোনো কৃষকের বিশাল বড় পতাকা টানানোর বর্ননা। কিংবা টিভি চ্যানেল ব্যস্ত সময় পার করছে প্রিয় দলের কোনো পাড় ভক্তের অদ্ভুত কোনো কীর্তিকলাপ। ব্রাজিলের পতাকার রংয়ে পুরো বিল্ডিং রং করে বাড়ির নামই ব্রাজিল বাড়ি করে আলোচনায় আসেন এক ব্রাজিল ভক্ত! কিংবা জার্মানির কয়েক মাইল লম্বা সে পতাকা! এরকম কতশত উদাহরনের জন্ম যে দেয় প্রতিটি বিশ্বকাপ। 

 

পাড়ায় মহল্লায়, শহর বন্দরে- দোকানে আর প্রতিষ্টানে প্রিয় দলের পতাকা টানানো এই দেশে খুব স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। যেদেশের সরকারি প্রতিষ্টান থানাতেও আর্জেন্টিনা- ব্রাজিলের সমর্থনে পতাকা/ব্যানার দেখি- কিংবা প্রধানমন্ত্রীর- রাষ্ট্রপতিরও যে একটা সমর্থিত বিশেষ দল আছে তা আবার জাতি জুড়ে জানাজানিও হয় তখন আমার দারুণ লাগে। বিশ্বকাপ এলেই তারকাদের প্রিয় দল কোনটি তা জানতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে মিডিয়া। ক্রিকেটার কি ফুটবলার- সবাই সামিল হয় এই মিছিলে। 

 

মাত্র ২ দশক আগেও সবার ঘরে ঘরে রঙ্গিন টিভি ছিলো না, স্মার্ট টিভি তো বহুদূর। তখন খেলা দেখা হতো একসাথে জড়ো হয়ে কারো ঘরে। দুই দলের সমর্থকদের খুনসুটি লেগে থাকতো পুরোটা সময়। গ্রামাঞ্চলের হিসেব ভিন্ন, পুরো গ্রামে দেখা যেতো মাত্রকয়েক বাড়িতেই ডিশ এন্টেনা আছে। খেলা দেখার জন্য যুবকেরা হাসফাস করতো, কতো বকুনি খেতো কে জানে! 

 

আর এখন! 

কোথায় হারিয়ে গেলো সেইসব উত্তেজনা? কোথায় হারালো আমাদের দারুণ উল্লসিত সে ছেলেবেলা?

 

দিন বদলেছে। রীতি বদলেছে। কিন্তু বড্ড কমে গেছে বিশ্বকাপ আমেজ। বিশ্বকাপ তার জৌলুস কখনো হারায়নি। কিন্তু হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের পুরোনো দিনের সব উন্মাদনা। 

 

এখন সবার ঘরে ঘরে টিভি স্যটেলাইট আর টেলিভিশন। শতশত চ্যানেল, স্ট্রিমিং আরও কতকি! আগে তো কেবল একটা চ্যানেলেই খেলা দেখার জন্য কত দুরন্ত উৎসাহে কাটত সময়। ঝড় বৃষ্টি এই বুঝি এলো এ শঙ্কায় থাকতো মন। টিভির এন্টেনাতে কতবার আনাগোনা, সব যে ঠিক থাকা চাই। 

 

তখন ছেলেমেয়েরা ঘুমিয়ে গেলেও ডেকে তুলতেন বাবা'রা; একসাথে সবাই বসে খেলা দেখতে পারার এই যাপিত স্বর্ণালি স্মৃতি কিবড় হয়ে যাওয়া খোকা'রা আজ মিস করেনা? এখনের হিসেব তো ভিন্ন। ঘরে ঘরে টিভি, হাতে হাতে ফোন। খেলা দেখার জন্যসবাই জড়ো হয় না। তুমুল মেট্রোপলিটন জীবন আমাদের বন্দী করে ফেলেছে স্মার্ট সব ডিভাইসে। গোল হতে দেরি হয়, নোটিফিকেশন পেতে দেরি হয় না।

 

আমার স্পষ্ট মনে আছে ২০০৬ সালের এক বিশ্বকাপ ম্যাচের কথা, ব্রাজিলের খেলা চলে। আমিও দেখছি সবার সাথে বসে। তখন প্রস্রাব করতে গেছি এক মূহুর্তের জন্য, তাতেও গোল দিয়ে ফেলেছে ব্রাজিল। টয়লেট থেকে বের হয়ে আমার কি যে আফসোস! তখন তো আর চাইলেই ইউটিউবে ঢুকে ম্যাচ হাইলাইটস দেখা যেতো না। ২০১০ বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচের আগে প্রচন্ড মাথাব্যথা নিয়ে ঘুমাতে গেছি, মা'কে বলে ঘুমিয়েছে খেলার সময় হলে তুলে দিতে। উনি তুলে দিলেন ঠিকই- তবে ৩৫ মিনিট পরে। আমার সে-কি কান্না! চিৎকার করে বলতে লাগলাম, 'মা জানো, আরেকটা বিশ্বকাপের জন্য এখন আমাকে ৪ বছর অপেক্ষা করতে হবে, ৪ বছর!' মায়ের ম্লানমুখের হাসি আজও আমার চোখে ভাসে। 

 

যাক সেসব কথা। 

২০০২ বিশ্বকাপের পর শিরোপাহীন আমার দল। আশা জাগিয়েও হতাশ করে কাটিয়ে দিয়েছে বিশটি বছর! ভাবতে আজ অবাক লাগে। '০৬ সালের পর ১০, ১৪ তে ভরাডুবি; আশায় বুক বেঁধে '১৮ তে যন্ত্রনা আরোও খানিকটা বাড়িয়ে দেয়া। এতটি বছর কেবল একটা প্রশ্নের পিছনেই দৌড়ে বেড়িয়েছি- বিশ্বকাপটা আসবে কবে পাঞ্জেরি? '২২ এ এসে দলে তারকার ছড়াছড়ি।বিশ্বকাপের আগে ক্লাব ফুটবলে ফুটবলারদের চোখ ধাধানো পারফর্মেন্স তো কিছুটা হলেও শিরোপা এবার তুলে ধরার আশা জাগায়। ভাবতে বড় ভালো লাগে বিশ্বকাপটা ব্রাজিলই জিতবে, আবার সাথে সাথেই অফিসের বড় বসের সাথে আলাপচারিতার সফিকের কথা মনে পড়ে যায়- 'বিশ্বকাপটা এইবার স্যার আর্জেন্টিনাই নিবো, ব্রাজিলের টাইম নাই।'

 

আশা জিনিসটা বড্ড খারাপ। আশায় বুক বেঁধে আশাহত হয়ে ছায়ার অতলে ডুবে যাওয়াটাই কি কঠিন সমাধান! কে জানে কিহবে, তবু আশায় বুক বাঁধতে বাঁধা কিসে? তাইতো জীবন সংসারে আশাবাদী গুণী মানুষেরা বলে গেছেন- 

'সংসার সাগরে দুঃখ তরঙ্গের খেলা, 

আশা তার একমাত্র ভেলা।' 

 

আমি এখন ইউরোপের ফুটবল পাগল একটা দেশে থাকি। কাজ থেকে ফিরছি, সময় বাজে ভোর ৪ টা। বিশ্বকাপের মাসে এইসময়ে দেশে থাকলে হয়তো টিভির সামনে বসে থাকা হতো। ইউরোপের এই দেশের ফুটবল উন্মাদনা ভিন্ন পর্যায়ের বলাই বাহুল্য। এরা স্টেডিয়ামে গিয়ে দল বেঁধে খেলা দেখে, জিতে ফিরে মদ্যপান করে। হারলেও মদ্যপানে তুষ্ট থাকে শুধু এই ভেবে- আবার খেলাযখন হবে, হয়তো জয় আমাদেরই হবে। এভাবেই কাটতে থাকে সময়। 

 

জেনারেশনের পরে জেনারেশন একই ক্লাবের ফুটবল ভক্ত থেকে যায় আকুন্ঠ ভালবাসা নিয়ে। এই যে বিশ্বকাপ আসছে, তাদেরমাতৃভূমি খেলবে- তা যেন শুধু টিভির পর্দাতেই সীমাবদ্ধ। দল ভালো খেললে দেশব্যাপী উল্লাস করবে, হেরে গেলে সমালোচনার ঝড় বইবে হয়তো কেবল মিডিয়াতেই। বিশ্বকাপ জিতে গেলেও ব্যক্তি জীবন যেভাবে আছে সেভাবেই চলতে থাকবে। অথচ আমাদের দেশে আজও শুনা যায়- বিশ্বকাপে প্রিয় দল হারার শোকে আত্মহত্যার পথে পা বাড়িয়েছে যুবক! খেলা জিনিস'টাবাংলাদেশীদের চেয়ে সিরিয়াসভাবে কেউ নিতে পারবে বলে মনে হয় না। 

 

লাখো মাইল দূরের এক দেশের ফুটবল নিয়ে এই আবেগ দেখানো সত্যিই বিষ্ময়কর। তাদের জয়ে আমরা পুলকিত হই, হেরে গেলে মন খারাপ হয়- কষ্ট পাই। তবু দশকের পর দশক ধরে চলে আসা এই রীতি অটুট থাকুক হাজারো বছর। বিশ্বকাপ জ্বরে আবারো কাঁপুক পুরো জাতি। স্মার্টফোন আর স্ট্রিমিংয়ের জগৎ থেকে বেরিয়ে যদি আবারো ফিরে যাওয়া যেতো দু'দশক পিছনে? দারুণ হতো নিশ্চয়ই। সেই সাথে বিশ্বকাপের আমেজে হারিয়ে যেতে পারতাম ছোটবেলার সেই দুরন্তপনায়! আমি যদি সেই বাল্যকালে ফিরে যেতে পারতাম, দিব্যি বলছি- সন্ধ্যায় পড়াশোনায় মন দিতাম; ম্যাচ শুরুর আগে হুড়মুড়িয়ে একসাথে সবার সাথে বসে প্রিয় দলের খেলা দেখতাম। ভাগ্যিস, আমাদের ঘরে নিয়মিত ফুটবল দেখা হয়! 

 

- আহমদ আতিকুজ্জামান।