• ফুটবল

শেষ দিনের দলবদলঃ গুড, ব্যাড আর ওয়ার্সের যত গল্প

পোস্টটি ৭৬২ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।
ক্লাব ফুটবলে এখন অর্থের ঝনঝনানি। মূহুর্তের পাল্টে যায় ড্রেসিংরুম, দিনের পরে রাত পোহালেই অচেনা লাগে ফুটবল দুনিয়া। ক্লাব ফুটবলে দলবদলের একটা নির্দিষ্ট সময় থাকে, শেষ দিনটাকে ডেডলাইন ডে বলে সবাই চিনে। এই ডেডলাইন বা শেষ দিনের ক্লাব দলবদলের অনেক দারুণ গল্পই আমাদের অজানা; চলুন আজ নাহয় কয়েকটা গল্প জানা যাক।
 
আয়াক্সে দারুণ সময় পার করছিলেন উরুগুইয়ান তরুণ তারকা লুইস সুয়ারেজ। ২০০৯/১০ মৌসুমের সর্বোচ্চ গোলদাতা সুয়ারেজ সেবার ক্লাবের কাপ্তানের দায়িত্বটাও পালন করেছিলেন যথাযথভাবে। সে মৌসুমে লীগ শিরোপার স্বাদ এনে দেন নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডাম শহরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা শহরের মানুষকে। তারও ২ বছর আগে ক্লাবে যখন যোগ দিয়েছিলেন ৫ বছরের চুক্তিকে, তিনি নিজেও জানতেন না তার ভাগ্যে কি লেখা আছে।
 
২০১১ সালের ২৮ জানুয়ারি। লিভারপুলের জন্য একটা ঐতিহাসিক দিন তো বটেই। সেদিন ছিলো দলবদলের শেষ দিন। আর সেদিনই আচমকা ক্লাবের সর্বোচ্চ দামি প্লেয়ারের তকমা গায়ে মেখে সবাইকে অবাক করে দেন সুয়ারেজ। আয়াক্স থেকে লিভারপুলের যোগ দেন সাড়ে ছাব্বিশ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে। তবে নাটকের এই যেন শেষ ছিলো না। এর কয়েক ঘন্টা পর লিভারপুর অ্যান্ডি ক্যারলকে ৩৫ মিলিয়নে দলে ভেড়ালে সে হয়ে যায় লিভারপুলের তৎকালীন সর্বোচ্চ দামি প্লেয়ার! আর এই ট্রান্সফার দুটোই সম্পন্ন হয় প্রিমিয়ার লীগ ট্রান্সফার ডেডলাইন ডে'র দিনে!
 
২০০৪ সাল। ওয়েইন রুনি তখনো বিখ্যাত হন নি। খেলতেন এভারটনে। সেবার দলবদলে তাকে নিয়ে বেশ উত্তেজনা দেখা গেলো দুই ইংলিশ ক্লাব চেলসি ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মধ্যে। তরুণ এই ইংরেজ যুবককে তার দলে চাইছিলেন স্যার আলেক্স ফার্গুসন। দরকষাকষি করে তাকে আনলেনও ক্লাবে; তবে দলবদলের একদম শেষ দিনে!
 
আলেক্স ফার্গুসনকে নিয়ে তখন সমালোচনার ঝড় বইলো ব্রিটিশ গনমাধ্যমে। এই যুবক কি আর এতো দামী হতে পারে- প্রশ্ন ছিলো তাদের। অবশ্য নিজের জাত চেনানোর জন্য বেশিদিন সময় নিলেন না রুনি; চ্যাম্পিয়নস লীগের এক ম্যাচে ফ্যানেঙ্কবাখকে উড়িয়ে দিলো ইউনাইটেড, হ্যাট্টিটের পাশাপাশি একটা এসিস্টও এলো রুনির পা থেকে। হেটার'রা চুপসে গেলেন যেন। ওল্ড ট্রাফোর্ড ছাড়ার আগে নামের পাশে ২৫৩ গোল, ১১ টা মেজর ট্রফি আর ক্লাবের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড'টাও নিজের করে নিয়েছিলেন ওয়েন রুনি। বলা হয়ে থাকে এভারটন থেকে রুনিকে নিয়ে আসা'টা স্যার আলেক্স ফার্গুসনের অন্যতম সেরা একটি সাইনিং ছিলো।
 
২০১৮ বিশ্বকাপ ফ্রান্স দলের কাপ্তান হুগো লরিস'কে কে না চিনেন! ৩৪ বছর বয়সী এই গোলকিপারের হাতে এখনো ক্লাব ও জাতীয় দলের ক্যাপ্টেন আর্মব্যান্ড। লরিস তখন ফরাসী ক্লাব লিওনে খেলেন। তরুণ এই গোলকিপারকে তখন ভাবা হচ্ছিলো ভবিষ্যৎ ন্যয়ারের সমতুল্য। দলবদলে খুব একটা গুঞ্জন না থাকলেও ২০১২ সালে মাত্র ৮ মিলিয়ন পাউন্ডে তাকে দলে ভেড়ায় টটেনহ্যাম হটস্পার ক্লাব। সেদিন ছিলো দলবদলের শেষ দিন।
 
টটেনহ্যাম প্রসঙ্গ যখন এলো তখন আরেকটা গল্প বলি।
 
সাউদ্যাম্পটনের ২য় সর্বকনিষ্ঠ প্লেয়ার গ্যারেথ বেল'কে টটেনহ্যাম সাইন করায় মাত্র ৫ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে। বেল তখন পুরোদস্তুর একজন লেফট ব্যাক। দলে তার নিয়মিত জায়গা হয় লেফট ব্যাক হিসেবেই। তবে তার রানিং আর বল কন্ট্রোলিং
দেখে মুগ্ধ হন কোচ হ্যারি রেডন্যাপ। তাকে খেলান উইংগার পজিশনে এবং সেখানে ভালোই ভেল্কি দেখিয়ে বাজিমাত করেন গ্যারেথ বেল। চোখে পড়েন অনেক ইউরোপীয়ান ক্লাবের। দলবদলের হাওয়া তার গায়েও লাগে। অকল্পনীয়ভাবে তৎকালীন সর্বোচ্চ দামি প্লেয়ার হিসেবে তাকে দলে ভেড়ায় রিয়াল মাদ্রিদ! 'হান্ড্রেড মিলিয়ন ম্যান' তকমা লাগিয়ে বার্নাব্যুতে জুটি বাঁধেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো ও কারিম বেঞ্জেমার সাথে। আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সেরা এই জুটিকে 'বিবিসি' নামে চিনতো ফুটবল দুনিয়া। তবে তার শেষটা আর সুখময় হলো না।
 
বারবার ইঞ্জুরি, দলের স্টার্টিং ইলেভেনে চান্স না পাওয়া, দলে ভালো রিপ্লেসম্যান্ট প্লেয়ার থাকা- বিভিন্ন কারণে গ্যারেথ বেলের রিয়াল মাদ্রিদ যাত্রা শেষ পর্যন্ত আর ফুলের মতো সুন্দর রইলো না। সাদা জার্সি খুলে অবশেষে একটা সময় ফুরিয়ে যাওয়া মোমবাতির মতোই ফুটবল থেকে বিদায় জানিয়ে দেন বেল। ও হ্যাঁ, রিয়াল মাদ্রিদে বেলের আসা হয়েছিলো দলবদলের শেষ দিনে।
 
রিয়াল মাদ্রিদ ক্লাবের নাম আসলেই এই জেনারেশন সার্জিও রামোসের খেলায় নস্টালজিক হয়ে যায়। আর হবেই বা না কেন? যার শিরায় শিরায় সাদা রক্ত বইতো, কাপ্তানের আর্মব্যান্ড হাতে পরে যে লড়ে যেতো বীরদর্পে কোনো এক সেনাপতির বেশে- সে সার্জিও রামোসের আগমন ঘটেছিলো ২০০৭ সালের এক সন্ধ্যায়।
 
রামোস তখন সেভিয়ায় খেলেন। ডিফেন্ডার হিসেবে তার প্রতাপশালী আচরণ মাদ্রিদের পছন্দ হয়েছিলো বলাই বাহুল্য। ট্রান্সফার মৌসুম এলেই রিয়াল মাদ্রিদ বরাবর ভালো ব্যবসা করে, সেবারও ব্যতিক্রম হলো না। সেভিয়া থেকে দলবদলের শেষ দিনে তাকে চুক্তিবদ্ধ করে রিয়াল। তারপরের গল্প সবার জানা।
 
দলবদলের শেষ দিনে নতুন ক্লাব পাওয়া প্লেয়ারদের মধ্যে আছে অনেকেই। তবে বিশেষ করে যাদের নাম না বললে হয় না; তারা ফার্নান্দো তোরেস, আবামায়েং, আন্দ্রে শারলে, লুকাস মৌরা, মিকেলেলে, ডেভিড লুইজ, মারিও বালোতেল্লি, ওলিভিয়ের জিরুদ, নিকোলাস আনেলকা।
 
এদের মধ্যে বেশিরভাগই নতুন ক্লাবে গিয়ে উজ্জ্বল ভূমিকা রেখেছেন। এবার তবে উজ্জ্বলতার বিপরীতে শ্রীহীনতা খুঁজে বের করা যাক।
 
২০০৮ সালের কথা। ম্যানচেস্টার সিটি ট্রান্সফার মার্কেটে চমক দেখাতে ৩০ মিলিয়ন পাউন্ড দিয়ে রিয়াল মাদ্রিদ থেকে ব্রাজিলিয়ান তারকা রবিনহো'কে দলে ভেড়ায়। সেটা দলবদলের শেষ দিন। রবিনহো ১ম মৌসুমে ১৪ গোল করে নিজের নামের সুবিচার করলেও পরবর্তী মৌসুমে ১০ ম্যাচ থাকেন গোলশূন্য! এরপর তাকে লোনে ব্রাজিলে পাঠিয়ে দেয় সিটি; ফিরে এলে এসি মিলানের কাছে অনেক কম দামে বিক্রি করে দেয় তাকে।
 
দলবদলের শেষ দিনে ক্লাব পাওয়াদের আলোচিত নাম অ্যান্ডি ক্যারল। ২০১১ সালের ট্রান্সফার ডেডলাইনের দিন নিউক্যাসেল থেকে পাড়ি জমান লিভারপুলে। কিন্তু ইঞ্জুরি প্রবণতা ও ফর্মে না থাকায় দেড় বছরের মাথায় তাকে ওয়েষ্ট হ্যামে লোনে পাঠায় লিভারপুল; পরে অবশ্য পার্মানেন্টলিই হ্যামারদের সাথে থেকে যান ক্যারল। এই ট্রান্সফারে লিভারপুলের ক্ষতি হয় অন্তত ২০ মিলিয়ন পাউন্ড!
 
লিভারপুলের প্রসঙ্গ এলে ফার্নান্দো তোরেসের কথা বলতেই হয়।
 
ক্যারল যেদিন লিভারপুলে আসলেন, ঠিক সেদিনই লিভারপুলকে বিদায় জানান স্পেনিশ তারকা ফার্নান্দো তোরেস। সোনালি চুলের এই তারকাকে পেতে ৫০ মিলিয়ন পাউন্ড খরচ করে চেলসি। কিন্তু বছর তিনেক পরে ১৫৩ ম্যাচ খেলে চেলসির হয়ে তোরেস গোল করেন মাত্র ৪২টি! তোরেসকে আজও প্রিমিয়ারলীগ ডেডলাইন ডে'র ওয়ার্স সাইনিং ধরা হয়।
 
প্রিমিয়ার লীগের আরেকটি লাস্ট মিনিট সাইনিং ছিলো বুরুশিয়া ডর্টমুন্ড টু আর্সেনালের আবামায়েং সাইনিং। ৫৫ মিলিয়ন পাউন্ডে রাতারাতি ক্লাব পাল্টে যায় এই গ্যাবন তারকার। তবে এই সাইনিং থেকে কোনো লাভ ই করতে পারেনি আর্সেনাল, বার্সায় তাকে বিদায় দেয় একদম বিনা পয়সায়!
 
ডেডলাইন ডে'র ফ্লপ সাইনিংয়ের কথা উঠলেই আমার মাথায় আসে আফোন্সো আলভেসের কথা। ২০০৮ সালে হার্নাভেন থেকে তাকে সাইন করায় প্রিমিয়ার লীগের দল মিডলসবারো; ১৪ মিলিয়ন ট্রান্সফার ফি তখনকার জন্য অনেক। ৪৯ ম্যাচে ১৩ গোল করেন এই স্ট্রাইকার; তার মধ্য ১০ টি গোল আসে দেড় বছরে প্রিমিয়ারলীগে, বাকি গোল আসে পরের পুরো মৌসুমে। স্বভাবতই তাকে ক্লাব ছেড়ে দেয়, তার নতুন ঠিকানা হয় কাতারের আল সাদ ক্লাবে। ও হ্যাঁ বলা হয়নি, মিডলসবারো কিন্তু সেবার লিগ থেকেও রেলিগেটেড হয়ে যায়।
 
প্রিমিয়ারলীগের ডেডলাইন দিনে আরেকটি ফ্লপ সাইনিং ছিলো মাইকেল ওয়েনের রিয়াল মাদ্রিদ টু নিউক্যাসেল ট্রান্সফার। ২০০৫ সালের কথা। এলান শেরারের পারফেক্ট পার্টনার হিসেবে বিবেচনা করে ওয়েন'কে কেনা হয় বেশ চড়া বেতন ও ট্রান্সফার ফি'র বিনিময়ে। কিন্তু নিউক্যাসেলে যেন তার ভাগ্যটাই খারাপ ছিলো। বারবার ইঞ্জুরি, ভাঙ্গা পা, ডাবল হার্নিয়া- আরোও অনেক অসুখ বাধিয়ে ফেলেন ওয়েন। ৪ বছরের চুক্তিতে কেনা প্লেয়ার মাত্র ৩০ গোল করেন ম্যাগপাইদের হয়ে, যা গড়ে প্রতি মৌসুমে মাত্র ৮ গোল। চুক্তি শেষ হলে ওয়েন ক্লাব ছাড়েন, পাশাপাশি নিউক্যাসেলও রেলিগেটেড হয়ে যায় সেবার। বেতন ও ট্রান্সফার ফি মিলিয়ে ওয়েনের জন্য প্রায় ৪০ মিলিয়ন পাউন্ড খরচ করেছিলো নিউক্যাসেল, এতে তার একেকটি গোলের মূল্য দাঁড়ায় ১.৩ মিলিয়ন ডলার!
 
প্রিমিয়ার লীগ ২০২২/২৩ মৌসুমের ট্রান্সফার ডেডলাইন শেষ হতে বাকি আছে আরোও বেশ কিছুদিন। এরই মধ্যে এবার ট্রান্সফার উইন্ডো গরম করে দেখেছে লিভারপুল ও চেলসি। সাম্প্রতিক ক্যসেদো'কে নিয়ে চলছে তোলপাড়। মাসের পর মাস তাকে পেতে চাওয়া চেলসি মাত্র ৪৮ ঘন্টার ব্যবধানে তাকে খুইয়ে ফেলেছিলো লিভারপুলের কাছে। মেডিকেল পর্যন্ত গড়িয়েছিলো ব্যাপারটা, তবে বাঁধ সাধলেন ক্যাসেদো নিজেই। তিনি নাকি চেলসিতে যেতে চান। শত মিলিয়নের উপরের প্রস্তাব নাচক হওয়ায় ভ্যাবাচ্যাকা খেয়েছে এফএসজি! এই লেখা পর্যন্ত এখনো অফিসিয়াল কনফার্মেশন আসেনি; দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কার জার্সি গায়ে জড়ান তিনি।
 
প্রিয় পাঠক, আপনার বিবেচনায় ডেডলাইন ডে ট্রান্সফারের সবচেয়ে সেরা ও বাজে সাইনিং কোনটি ছিলো?
 

- আহমদ আতিকুজ্জামান।