• উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ
  • " />

     

    • উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ

    মেসির এক থেকে ছয়শ : একজন থেকে ফুটবলের এক ঈশ্বর

    রোনালদিনহো বলটা উঠিয়ে মেরেছিলেন দুই ডিফেন্ডারের মাথার ওপর দিয়ে। লিওনেল মেসি দৌড়ে ডিবক্সের ভেতর ঢুকে বলের সঙ্গে ছন্দ মেলালেন। এরপর বাম পা  দিয়ে আরও একবার উঠিয়ে দিলেন বল, এবার গোলরক্ষকের মাথার ওপর দিয়ে। এরপর রোনালদিনহো কাঁধে তুলে নিলেন তাকে। ১৭ বছর বয়সী মেসি ওই কাঁধে চড়েই হাসতে হাসতে উদযাপন। আলবাসেতের বিপক্ষে ওই গোলটা ছিল মেসির প্রথম। ১৪ বছর আগে, ২০০৫ সালে। মে মাসের ১ তারিখ, ন্যু ক্যাম্পে।

    ২০১৯, ১ মে। ন্যু ক্যাম্প।

    মেসির সেই লম্বা চুল নেই। মুখ ভর্তি দাঁড়ি। সেই বার্সেলোনার অধিনায়ক এখন তিনি। ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড় কী না সেটা নিয়ে আলোচনা, বিতর্ক হয় প্রতিদিন। মৌসুমের শুরুতে অধিনায়কত্ব পেয়েছিলেন। এরপর ন্যু ক্যাম্পের সামনে বলেছিলেন, লম্বা কানওয়ালা শিরোপাটা এবার ঘরে নিয়ে আসতে চান তিনি। চ্যাম্পিয়নস লিগের কথা বলেছিলেন মেসি। সেটার ফাইনালে উঠতে হলে হারাতে হবে লিভারপুলকে। লুইস সুয়ারেজ এক গোল দিয়ে এগিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু প্রতিপক্ষ লিভারপুল মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে দ্বিতীয়ার্ধে। লিভারপুলকে চমকে দিয়ে কিছুক্ষণ আগেই একবার গোল করেছেন মেসি। তাতে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে ন্যু ক্যাম্পে।

    ৮২ মিনিটে আরেকবার ফ্রি কিক পেলেন। তাকেই ফাউল করা হয়েছিল। বলের সামনে দাঁড়ানো মেসি। ত্রিশ গজ দূরে গোলবার। তার আগে মানবদেয়াল। সেখানে থাকা সবার উচ্চতা তার চেয়ে আধ ফুট বেশি। ৫ জনের দেয়ালে সবচেয়ে খাটো ছিলেন জো গোমেজ। তার মাথার ওপর দিয়ে মারতে হত। সবকিছুর পেছনে অ্যালিসন। বিশ্বসেরা গোলরক্ষকদের একজন। গোল পেতে হলে বামদিকে ক্রসবারের ঠিক নিচের জায়গা দিয়ে বল ঢোকাতে হবে। প্লেসিং নিখুঁত হলেও হবে না শুধু, গতিও থাকতে হবে। মেসি সেই কাজটাই করলেন। বাঁক খাওয়ালেন শট। গোমেজ লাফ দিয়েছিলেন। কিন্তু নাগাল পাননি। বল তার মাথার ওপর দিয়ে তো গেছেই, গেছে পাশ দিয়েও। অ্যালিসন প্রাণপণে ঝাঁপ দিয়েছিলেন। সেকেন্ডের ভগ্নাংশ আগে লাফটা দিলেও হয়ত ফিঙ্গারটিপে বলের গতি পালটে দিতে পারতেন। কিন্তু এসব হিসাব নিকাশ মেসি করে রেখেছিলেন অনেক আগেই। তাই আর সুযোগ পেলেন না কেউই।  

    ন্যু ক্যাম্পের ঠিক ওই প্রান্তেই আরেকটা গোল করলেন। এরপর দৌড়ে গিয়ে বসেই পড়লেন। ন্যু ক্যাম্পের এই জায়গায়টা দুই বছর আগে পিএসজিকে হারানোর পর মেসির একটা ছবি আছে। যীশুর মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন মেসি, নিচে ভক্তরা ছুঁয়ে দেখছেন তাকে। ফটোগ্রাফাররা এবার পেলেন অন্যরকম একটা ছবি। দুই ছড়িয়ে, দুই হাত উঁচিয়ে মাঠে বসে গেছেন মেসি। হাসছেন শিশুর মতো। করছেন গোল উদযাপন। বার্সেলোনার হয়ে ৬০০ তম গোল।

    এই ১৪ বছরে মেসি পার করে এসেছেন অনেক কিছু। প্রথমে শুরু করেছিলেন রোনালদিনহো, ডেকোদের সঙ্গে। ২০০৬ সালে প্রথমবারের মতো জিতলেন চ্যাম্পিয়নস লিগ। সেখানে অবশ্য মেসির অবদান থাকল কমই।

    দুই বছর পর দলটার চেহারা পালটে ফেলেন পেপ গার্দিওলা। জাভি, ইনিয়েস্তাদের সঙ্গে এরপর শুরু নাম্বার টেন মেসির। নতুন অধ্যায়ে পুরোপুরি সফল আর্জেন্টাইন। ইতিহাসের সেরা দলগুলোর কাতারে বার্সার সেই দলটা অনেক আগেই জায়গা করে নিয়েছে। গার্দিওলার অধীনে দুইবার চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতে বার্সা। মেসিও ততোদিনে বিশ্বের সেরা ফুটবলার।

    জাভি ক্লাব ছাড়ার আগে আরও একবার চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতেছিল বার্সা। ছিলেন শুধু ইনিয়েস্তা আর মেসি। এরপর তিন মৌসুম মেসি দেখেছেন তার সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর দাপট। এ মৌসুমের শুরুতে ইনিয়েস্তাও চলে গেলে এরপর বাকি ছিলেন একা মেসিই।

    জাভি-ইনিয়েস্তারা থাকার সময়ের মেসি আর এই 'একাকী' মেসির খেলার ধরনে পার্থক্য অনেক। বার্সার ওই সোনালী প্রজন্ম প্রতিপক্ষকে সুযোগই দিত একটা সময়ে। ম্যাচ শুরুর আগেই ম্যাচের গল্পটাও জানা হয়ে যেত। সময়ের বিবর্তনে খেলার ধরন পালটে ফেলতে হয়েছে বার্সাকে। একচ্ছত্র আধিপত্যটা এখন আর বার্সার সম্পদ নয়।

    অধিনায়কত্ব মেসির জন্য নয়। তিনি ভালো লিডার নন- এসব কথা মেসিকে শুনতে হয় প্রতিনিয়ত। মেসি শুরুতে নেতা ছিলেনও না। তবে জাভি-পুয়োলদের সঙ্গে লম্বা একটা সময় পার করেছেন। যা শিখেছিলেন তার সবকিছু প্রয়োগ করছেন এবার এসে।

    লিভারপুল দ্বিতীয়ার্ধে বার্সাকে বাধ্য করেছিল কাউন্টার অ্যাটাকে খেলতে। প্রতিপক্ষের পায়ে বল থাকা বার্সার জন্য মোটেই স্বস্তির কিছু নয়। কাউন্টার অ্যাটাকে একটা গোল পেলে অবশ্য কাজ অনেকটাই সহজ হয়ে আসত। মেসিও তেমন একটা বল পাচ্ছিলেন না। হুট করে যখন পেলেন, ডিবক্সের সামনে থেকে আর্তুরো ভিদালকে থ্রু পাস দিলেন দুই ডিফেন্ডারের মাঝে দিয়ে। ভিদাল গোলে শট না নিয়ে স্কয়ার করলেন সুয়ারেজকে।

    সুয়ারেজ সেই বল পাননি, তার আগেই বল ক্লিয়ার করে ফেলেছিল লিভারপুল ডিফেন্ডাররা। ভিদালের সিদ্ধান্তটা মেসির পছন্দ হয়নি। মেসিও চটেছেন তাই। ভিদালকে গলা ফাটিয়ে চোখ রাঙিয়ে তাই জানিয়ে দিলেন, "এটা গোলে শট করার বল ছিল"। দুই বছর আগেও মেসির এমন রূপ দেখেনি ফুটবল।

    মেসি এখন আর সেই 'ভদ্র' ছেলেটিও নেই আগের মতো। রেফারির যে কোনো ৫০/৫০ সিদ্ধান্ত দলের বিপক্ষে গেলে সবার আগে রেফারির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যান। মাঝেমধ্যে দুই একটা কথাও শুনিয়ে দেন। তবে নিজের ইমেজের কারণে পার পেয়েও যান মাঝেমধ্যে! জেমস মিলনারের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেলেন প্রথমার্ধে। নেইমারের মতো কয়েকটা ডিগবাজিও খেলেন। এরপর ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে দিলেন এক হাসি। উঠে মিলনারের জন্য কার্ডও চেয়েছেন রেফারির কাছে। ম্যাচ জিততে কুট-বুদ্ধিগুলোও মেসি রপ্ত করেছেন ভালো করেই!

    দুঃসময়ে দলকে নেতৃত্ব দেওয়াই তো অধিনায়কের কাজ। সেই কাজটা এবার মেসির চেয়ে ভালো পালন করেননি কেউ। লন্ডনে গ্রুপপর্বে টটেনহামের সঙ্গেও এক গোলে এগিয়ে থাকা ম্যাচে খেই হারিয়েছিল বার্সা। পরে জোড়া গোলে চাপ সামাল দিয়েছিলেন মেসি। অলিম্পিক লিঁও দ্বিতীয় লেগে দুই লেগে পিছিয়ে পড়েও এক গোল শোধ করে ফেলেছিল। ন্যু ক্যাম্পে কিছুক্ষণের জন্য আরও একবার অস্বস্তি ভর করেছিল তখন। বার্সেলোনাকে গোল করতে হত, কে করলেন? মেসি।

    ন্যু ক্যাম্পে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডও শুরুর কিছুক্ষণ চোখ রাঙালো। সেই মেসির গোলেই দুমড়ে মুচড়ে গেল ইউনাইটেডও। লা লিগায় নিয়মিত যে কাজ করেছেন, সেটা করেছেন এবার চ্যাম্পিয়নস লিগেও। অধিনায়কত্বের এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কি দিতে পারতেন মেসি?  

    লা লিগায় টপস্কোরার, চ্যাম্পিয়নস লিগেও তাই। ইউরোপের সর্বোচ্চ গোলদাতা, অ্যাসিস্টও তার দখলে এবার। এই ১৪ বছরে বার্সা যতবার পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে গেছে প্রতিবার থেকে গেছেন নিজের জায়গায়। এবার যখন নিজেকেই বদলাতে হত, সেখানেও সফল তিনি।

    বড় কানওয়ালা শিরোপা থেকে আর দুই ম্যাচ দূরে আছেন বার্সা অধিনায়ক। কথা রাখেননি এখনও। শেষ পর্যন্ত পারবেন কী না- সেটা সময় বলে দেবে। ফাইনালও এখনও অনিশ্চিত। কিন্তু রোনালদিনহোর কাঁধে চড়ে যে যাত্রাটা শুরু করেছিলেন, ৬০০ গোলের সেই একই রাতে এসে ১৪ বছর পর সেটার একটা চক্র পূরণ করলেন মেসি। ১৯৮৬ তে ডিয়েগো ম্যারাডোনার সেই বিখ্যাত গোলের ধারাভাষ্য দেওয়া মার্টিন টেইলরও তাই ভাষা হারিয়ে বলে ফেলেন, "হি ইজ আ গড অফ দ্যা গেম, হি ইজ দ্যা গড অফ দ্যা গেম।"