X
GO11IPL2020
  • অন্যান্য

লেস্টার সিটি ও জীবন থেকে নেওয়া

পোস্টটি ৫৪৩৭ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

পৃথিবীর সবচেয়ে নৈরাশ্যবাদী লোকটার কথা চিন্তা করুন। এই জগতে সে নিজেকে অপাংক্তেয়, অচ্ছুত ছাড়া আর কিছু ভাবে না। এই দুনিয়াকে দেওয়ার তার আর কিছুই নেই- বিশ্বাসটা তার মনে গেছে আছে বদ্ধমূল। এই নবীন শতাব্দীতে নক্ষত্রের নীচে তার নিজেকে গভীরভাবে অচল একজন মানুষ ছাড়া আর কিছু মনে হয় না।  নৈরাশ্যের সেই চক্রে সে আটকে গেছে, সেখান থেকে বের হওয়ার উপায় তার জানা নেই। জগত সংসারের ওপর তার জন্মে গেছে গভীর বিতৃষ্ণা।

 

এমন একজনকে জীবনের ওপর ভালোবাসা ফিরিয়ে আনতে আপনি কী করবেন?

 

অনেক কিছুই করতে পারেন। একটা সুন্দর কবিতা পড়তে দিতে পারেন। সাগরপাড়ে চাঁদের আলো দেখাতে নিয়ে যেতে পারেন। একটা প্রিয় গান শোনাতে পারেন। একটা ছুঁয়ে যাওয়া চলচ্চিত্র দেখাতে পারেন।

 

তাতেও কাজ হচ্ছে না ?

 

তাহলে তাঁকে একটা লেস্টার সিটির গল্প শোনাতে পারেন। তাঁকে জেমি ভার্ডি, ক্লদিও রানিয়েরির কথা বলতে পারেন। নিশ্চিতভাবেই সে জীবনের ওপর বিশ্বাস ফিরে পাবে ।

 

অসম্ভব বলে কিছু নেই, মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়- এসব অনেকের কাছেই বাঁধাগতের ফাঁপা বুলি মনে হয়। আরে, মুখের কথায় তো আর দুনিয়া চলে না, সেটার জন্য কিছু করে দেখাতে হয়। লেস্টার সেটা যেভাবে করে দেখিয়েছে, তার জন্য এই কথাগুলো শুধু কথার কথা মনে হয় না।

 

জেমি ভার্ডির কথা ধরুন। একটা আনকোরা ছোকরা, চার বছর আগেও যে খেলত আধাপেশাদার লিগে, আজ সে প্রিমিয়ার লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা। একটা সময় সাবানের কারখানায় গতর খাটত, পেশাদার ফুটবলার হওয়ার স্বপ্নটা সে প্রায় ছেড়েই দিয়েছিল। সে-ই আজ গোলের পর গোল করছে, বিশ্বের বড় বড় ক্লাবের কাছে আজ সে মহা প্রার্থিত। সাপ্তাহিক বন্ধে আধা-পেশাদার লিগে ফুটবল খেলে যে ছেলেটা ৫০ ডলার আয় করত, আজ এরকম ডলারের বান্ডিল তার পায়ের তলায় লুটোপুটি খাচ্ছে। ১৬ বছর বয়সে শুধু উচ্চতায় খাটো বলে একটা ক্লাব ফিরিয়ে দিয়েছিল তাঁকে। আর তার উচ্চতায় প্রিমিয়ার লিগ তো দূরে থাক, বিশ্বের খুব কম স্ট্রাইকারই আছে।

 

এই গল্প শোনানোর পরও কেউ কি জীবনের ওপর আস্থা ফিরে পাবেন না ?

 

আচ্ছা, এখানেও কাজ না হলে ক্লদিও রানিয়েরির গল্পটা বলা যাক। এই তো , মাত্র বছরখানেক আগে যখন ইংল্যান্ডে এলেন, সবাই ভুরু কুঁচকে বলেছিল, “এই বুড়ো রানিয়েরি আবার কেন” ? মাত্র গ্রিস থেকে ছাটাইয়ের নোটিশটা পকেটে সঙ্গে করে এনেছেন। তাও আবার ফারো আইল্যান্ডের মতো একটা পুঁচকে দেশের কাছে হারের লজ্জা মেখে। এই ইংল্যান্ডেই একটা সময় চেলসির হয়ে বুক চিতিয়ে শিরোপার জন্য লড়াই করেছেন, সেখানে এসেছিলেন বার্ধক্যের ভারে জীর্ণ নতজানু এক সৈনিকের মতো।

 

সেই রানিয়েরির মুখে আজ যুদ্ধজয়ের স্মিত হাসি। সেই রানিয়েরিই এখন লেস্টারের ম্যাচ শেষে চোখের জলে আপ্লুত হন। লজ্জার নয়, এই কান্না আনন্দের। এই মৌসুমে যখন প্রথম লেস্টারের দায়িত্ব নেন, খেলা শুরুর আগে বলেছিলেন, “আমরা হয়তো দল হিসেবে ছোট, কিন্তু আমি চাই সবাই হৃদয় দিয়ে খেলুক। প্রতিপক্ষ কে, সেটি নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। আমি চাই, তোমরা যেন হারার আগে না হারো। যদি প্রতিপক্ষ আমাদের চেয়ে ভালো হয়, তাহলে ঠিক আছে, আমি অভিনন্দন জানাব। কিন্তু ওদের দেখাতে হবে ওরা আমাদের চেয়ে ভালো।’’

 

এই রানিয়েরিকে দেখেও কি জীবনকে ভালোবাসবেন না ?

 

আচ্ছা, এরপরও মনে হচ্ছে, বেঁচে থাকাটা অর্থহীন ?

 

তাহলে একটু রিয়াদ মাহরেজের গল্পটা শুনুন। এই মৌসুমে যিনি গোলের পর গোল করিয়ে যাচ্ছেন, যাঁর সঙ্গে এখন রিয়াল মাদ্রিদ-বার্সেলোনার মতো দলেরও নাম জড়িয়ে যাচ্ছে, সেই মাহরেজও দুই মৌসুম আগে ফ্রান্সের দ্বিতীয় বিভাগে খেলতেন। বিশ্বসেরা ফুটবলার হবেন- তখন তাঁর কাছে এটা ছিল বামন হয়ে চাঁদ হাত বাড়ানোর মতোই। চিন্তা করুন তো একবার, লেস্টারে নাম লেখানোর আগে ক্লাবটার নামই শোনেননি। ভেবেছিলেন, ওটা কোনো রাগবি দল টল হবে। সেই মাহরেজ এখন কোথায় উঠে গেছেন!

 

ভার্ডি যদি পারেন, রানিয়েরি পারেন, মাহরেজ পারেন আর লেস্টারও যদি পারে- তাহলে আপনিও পারবেন।