• ফুটবল

অ্যাটলেতিকো মাদ্রিদ এবং ডিয়েগো সিমিওনে:প্রথম পর্ব

পোস্টটি ২৬৬২ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

ফুটবলে ‘সেরা’ শব্দটা মনে হয় সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তিকর। কিসের সাপেক্ষে, কিসের ভিত্তিতে, কার বিপক্ষে- এসব নানান কথা ও যুক্তির প্রেক্ষিতে ‘সেরা’ শব্দটা ব্যবহার করতে হয়। মানুষ ভেদে এই সংজ্ঞাটা পরিবর্তনও হতে পারে। আমার এই গল্পটায় ‘সেরা’ বিশেষণটা একটা বড় অংশ জুড়ে থাকবে জন্য সেরাটা কি হতে পারে একটু বলে নিলাম।

এবার আসি মূল কথায়। আচ্ছা বর্তমান সময়ের ইউরোপের ‘সেরা’ ফুটবল ক্লাব কোনগুলো? অবশ্যই সবার প্রথমে আসবে বার্সা, রিয়াল ও বায়ার্নের কথা। কিসের ভিত্তিতে আমি এদের বেছে নিলাম? আমি চিন্তা করছি নিজেদের লীগে এবং ইউরোপিয়ান লীগে(ইউসিএল) ক্লাবগুলোর ধারাবাহিকতা নিয়ে। জুভেন্টাস বা পিএসজি নিজেদের লীগে অপ্রতিরুদ্ধ হলেও ইউসিএলে তাদের পারফর্মেন্স যথেষ্টই অনিয়মিত বলে আমি তাদের এই লিস্ট থেকে বাদ দিয়েছি। আর ইংল্যান্ডের ক্লাবগুলো বেশ কিছুদিন যাবত বাইরে এসে সেভাবে নিজেদের মেলে ধরতে পারছে না। চেলসি কিছুদিন আগেই ইউসিএল জিতলেও তার আগে বা পরে তারা ভয়াবহ অধারাবাহিক। আর এবার সেমিতে খেলা সিটিজেনদের লীগে অবস্থান টিকিয়ে রাখতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। তাই সেরা বলতে আমি আমার গল্পে উপরের তিন দলকেই বেছে নিয়েছি। কারণ একদিকে যেমন তারা নিজেদের লীগে লীগ জেতার জন্য লড়াইয়ে টিকে থাকে অন্যদিকে চ্যাম্পিয়ন্স লীগেও তারা বেশ নিয়মিত পারফর্মার।

এখন যদি আমরা এই দলগুলোর মাঝে মিল খুজতে যাই তবে দেখা যাবে এদের সবার তারকাখ্যাতি সম্পন্ন বিশাল এক স্কোয়াড আছে। প্রতি জায়গায় প্রতিস্থাপনের জন্য সমমানের না হলেও বেশ ভালমত কাজ চালানোর মত খেলোয়াড় আছে। সেই সাথে দলে আছে দুর্দান্ত সব একক প্রতিভা। রিয়ালের বিবিসি কিংবা বার্সার এমএসএন অথবা বায়ার্নের মুলার, ডগ্লাস কস্তা, গোতজে সাথে লিয়ানডস্কি- যে কেউই নিজের দিনে প্রতিপক্ষের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ বাড়িয়ে দিতে পারে। আবার তাদের মাঝমাঠও ভয়াবহ। এই দলগুলোর মাঝমাঠে ঘুরে বেড়ায় এমন কিছু খেলোয়াড় যারা কিনা একটি পাসেই বিপক্ষের ডিফেন্স চূর্ণ বিচূর্ণ করতে পারে আবার সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে গোল করে দলকে জিতিয়ে আনতে পারে। এমন লাইনআপের জন্যই টিমগুলো মনে হয় এতটা ধারাবাহিক। অন্যজনের ব্যর্থতা আরেকজন ঢেকে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। এরকম দুর্দান্ত খেলোয়াড়দের সমন্বিত টিম পাইলে কোচের জন্যও কাজটা কিছুটা সহজই হয়ে যায় বটে।

তো এইসব দলের সাথে নিয়মিত লড়াই করে টিকে আছে কোনদল? এদের মাঝে তো আবার বার্সা রিয়াল এক লীগে খেলে। তাইলে লা লিগা কি শুধু দুই ঘোড়ার দৌড়? যারা নিয়মিত ক্লাব ফুটবলের খবর রাখেন তারা একটা জিনিস ভাল করেই জানেন যে স্পেনে একটা প্রতিপক্ষ বেশ কিছুদিন হল এমনভাবে দাঁড়িয়েছে যেন এই দুই দলের সাথে সমানে সমানে টক্কর দিতে পারে। তারা লীগও জিতেছে ২০১৩-১৪ তে, ২০১২-১৩তে রিয়ালকে হারিয়ে কোপা দেল রে জিতেছে আবার ইউরোপেও বেশ কিছুদিন যাবত ভালই পারফর্ম করছে। বার্সাকে দুইবার ইউসিএল থেকে বাদ দিয়েছে আর রিয়াল তো লীগে তাদের সাথে কিভাবে খেলতে হবে এইটাই বুঝে পায়না! ২০১৩-১৪ ইউসিএল ফাইনালে (৩৬-৯২) এই ৫৬মিনিট পর্যন্ত এগিয়ে থেকে ৯২.৪৮মিনিটে রামসের অসাধারণ একটা হেডে সমতায় ফেরে, পরে যদিও তারা আর ফিরতে পারে নাই ম্যাচে তবুও তাদের পারফর্মেন্স ফুটবল অনুরাগীরা মনে রাখবে। হ্যাঁ, আমি বলছি Club Atletico de Madrid এর কথা, যারা কিনা সাম্প্রতিক সময়ের সেরা দলগুলোর সাথে লড়াই করে মাথা উচু করে টিকে আছে। কিন্তু এই দলের কি সেরকম তারকাখ্যাতি সম্পন্ন একক নৈপুন্যে বিশ্বমাতানো খেলোয়াড় আছে অন্যদের মত কিংবা তাদের স্কোয়াডে কি একই রকম গভীরতা আছে? উত্তরটা ‘না’ই হবে। (এখানে একটা কথা বলে রাখা ভালো এই মৌসুমে তাদের গভীরতা আছে স্কোয়াডে যা বিগত মৌসুমগুলোতে ছিলনা। যেহেতু আমি তাদের নতুন উত্থান নিয়ে বলছি তাই ‘না’ দিয়েই শুরু করছি)। তাইলে দুইটার কোনটাই তাদের নাই। তাইলে কেমনে তারা এত বড় দলগুলোর সাথে লড়াই করে টিকে আছে?

 ATM

 

কিছুটা অতীত থেকে শুরু করলে দেখা যাবে Atletico Madrid বেশ ভাল ইতিহাস সম্পন্ন একদল। ১৯০৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ক্লাবটি ১৯৪৭ পরবর্তী সময়ে বেশ ভাল কিছু সময় কাটিয়েছে। হেলেনিও হেরেরা ১৯৫০ ও ১৯৫১ তে লীগ জিতানোর পর চলে গেলে আস্তে আস্তে জায়গা হারায় Atletico Madrid। ১৯৬০-৭০ এর মাঝে যখন কিনা রিয়ালের রাজত্ব তখন নিয়মিত ২য় স্থানের জন্য তারা বার্সার সাথে লড়াই করত। যদিও খুব বেশি সাফল্যের আর দেখা পাইনি তারা। ১৯৬৯-৭০, ১৯৭২-৭৩, ১৯৭৬-৭৭ তারা লীগ জিতে। তারপর এক দীর্ঘসময় পর ১৯৯৫-৯৬ মৌসুমে তারা ডাবল(লীগ ও কাপ) জিতে। এই টীমের একজন উল্লেখযোগ্য খেলোয়াড় ছিলেন বর্তমানে তাদের কোচ হিসেবে নিয়োজিত ডিয়েগো সিমিওনে। পরের মৌসুমে তার ইন্টার মিলানে চলে যাওয়ার পর দল হিসেবে আর কোন সাফল্য পাইনি Atletico Madrid। ২০০৩সালে ফিরে সিমিওনে আরও দুই মৌসুম কাটালেও আর কিছুই করতে পারেনি Atletico Madrid।

 article-2593994-1CBCBAF600000578-755_634x587

 

সেই ১৯৯৫-৯৬ মৌসুমের পর থেকে আর কখনই মাঠে আগের Atletico Madrid কে দেখা যেত না। মাঠের খেলা দেখে বা লীগে অবস্থান থেকে তাদের যে এমন ইতিহাস আছে তা বোঝার উপায় ছিল না। একদিকে প্রতিদ্বন্দ্বীদের ভয়াবহ উন্নয়ন অন্যদিকে নিজেদের আর্থিক অবস্থার অবনয়ন। সব মিলিয়ে ভয়াবহ একটা সময় পার করেছে তারা। প্রচুর ভাল ভাল খেলোয়াড় তৈরির পরেও আর্থিক সংকটের জন্য তাদের ছেড়ে দিতে হয়েছে। তরেস, মাঞ্জুকিচ, এগুয়েরো, ফ্যালকাও, ডিয়েগো কস্তা সহ বেশ দীর্ঘ একটা লিস্ট আছে।

বর্তমান সময়ে আমরা যে Atletico Madrid এর সাথে পরিচিত, যাদের সাথে মোকাবেলা করতে যে কোন টিমই দ্বিতীয়বার একটু ভাবে, সমীহ করে চলে তাদের উত্থানের শুরু ডিসেম্বর ২০১১ তে। এই সময় কোচ হিসেবে দলের হাল ধরেন খেলোয়াড় হিসেবে শেষ লীগ জিতানো ডিয়েগো পাবলো সিমিওনে। পঞ্চম অবস্থানে থেকে মৌসুম শেষ করে দল এবং ২০১২-১৩ তে লীগ টেবিলের তিনে উঠে আসে তারা। ১৯৯৬-৯৭ এর পর এই প্রথম তারা ইউরোপিয়ান প্রতিযোগিতায় মোটামোটি সাফল্যের দেখা লাভ করা শুরু করে। এর আগে তো তারা বেশির ভাগ সময়ে যোগ্যতাই অর্জনে ব্যর্থ হত যদিওবা যোগ্যতা লাভ করত কিন্তু পারফর্মেন্স ছিল ভয়াবহ বাজে। ২০১৩-১৪ অর্থাৎ পরের মৌসুমেই তারা ইউসিএল ফাইনাল খেলে ফেলে এবং ওই মৌসুমেই লীগ পুনরুদ্ধার করে। খেলোয়াড় হিসেবে শেষ জিতিয়েছিলেন, পরে কোচ হিসেবেও কাজটা করে ফেললেন।

 diego-simeone

 

কিন্তু কি এমন করলেন সিমিওনে? কিভাবে একটা মাঝারি মানের দলকে নিয়ে লীগ জিতালেন রিয়াল বার্সাকে পেছনে ফেলে, কিভাবে এই দলকে নিয়েই প্রায় চ্যাম্পিয়ন্স লীগও জিতিয়ে ফেলেছিলেন! কিভাবে এমন এক দল বানালেন যেটায় কিনা কোন একক নৈপুণ্য নেই, নেই কোন তারকাখ্যাতি, তেমন গভীরতাও নেই স্কোয়াডে, তবুও তাদের সবাই সমীহ করে চলা শুরু করল! তাদের দল হিসেবে গড়ে ওঠা এবং সিমিওনের এই সাফল্যের রহস্য নিয়ে আমি আর একটি পর্বে কথা বলার চেষ্টা করব।