• ফুটবল

ট্র্যাজিক হিরো...

পোস্টটি ৩২৩৮ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

সার্বিয়া মন্টেনেগ্রোর বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের দ্বিতীয় ম্যাচে তখন ৩-০ গোলের লিড আর্জেন্টিনার। আগের ম্যাচেও আইভরি কোস্টের বিপক্ষে পুরো তিন পয়েন্ট পাওয়া আর্জেন্টিনা তখন হেসেখেলেই টানা দ্বিতীয় ম্যাচে জয়ের দিকে এগুচ্ছে। এমন সময় তো দলের তরুণ খেলোয়াড়দের বাজিয়ে দেখাই যায়!

৭৪ মিনিটে পেকারম্যান নামিয়ে দিলেন পাঁচ ফুট সাড়ে ছ ইঞ্চির গাট্টাগোট্টা এক টিনএজারকে। আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপে সবচেয়ে কম বয়সী খেলোয়াড় হয়ে। মাঠেই নেমেই বালক রেকর্ড গড়ে ফেললেন। আকাশি-সাদার আর্জেন্টাইন সমর্থকেরা ততোক্ষণে উঁচিয়ে ধরেছেন ম্যারাডোনার সাথে মেসির ছবিসহ পোস্টার। যেন ‘মেসাইয়ার’ আবির্ভাব! বাকি ষোল মিনিটে গোল করলেন, গোল করালেন। ‘নতুন ম্যারাডোনা’ তো তিনিই হবেন!

জার্মানির বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালের ওই ম্যাচে সাইড বেঞ্চে বসেই দেখলেন দলের বিদায়। হয়ত মাঠে নামতে না পারার আক্ষেপে পুড়েছিলেন সেদিন। কী অদ্ভুত! চিলির দ্বিতীয়বারের মতো টাইব্রেকারে হেরে শিরোপা স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে মেসি ছুটে গেলেন সেই সাইড বেঞ্চের দিকেই। এবার আর পারলেন না। চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া অশ্রুতে শুধু বুক ভিজল না লাল দাঁড়িতে আটকা পড়ে!


মেসি নিজেও আটকে গেলেন, মহাশুণ্যে তখন হাহাকার! এই দলটাকে গত তিন বছরে তিনবার ফাইনালে তুলেছেন তিনি। এবারও ব্যর্থ। একটু আগে টাইব্রেকারে প্রথম শট উড়িয়ে মেরেছেন আকাশে। তাই এবার বোধ হয় নিজের কাঁধেই দোষ চাপালেন। রাগে? না অভিমানে? নাকি হতাশায় জাতীয় দলের সঙ্গে পাট চুকিয়ে ফেললেন!

শিরোপা হাতে টুইটারে টপ ট্রেন্ডিং এ থাকার কথা ছিল যার ম্যাচ শেষেও তিনি থাকলেন সেখানেই। শুধু অন্য কারনে। আর্জেন্টিনার ফুটবলের বরপুত্র একটু আগেই বিদায় বলেছেন ফুটবলকে।

দলের তো বটেই, বিশ্ব ফুটবলেরই সবচেয়ে বড় তারকা তিনি। সর্বকালের সেরা ফুটবলারদের ছোট তালিকাতেও নাম লিখিয়ে ফেলেছেন মাত্র ২৯ বছর বয়সেই। তাঁকে ঘিরে শিরোপা ক্ষরা ঘোচানোর সব আশা আকাঙ্ক্ষা আর্জেন্টাইনদের...

শুরুটা হয়েছিল ‘নতুন ম্যারাডোনা’ নাম নিয়ে। অ্যারিয়েল ওর্তেগা থেকে পাবলো আইমার হয়ে কার্লোস তেভেজ- সবার নামের সাথেই জুটেছে ওই তকমা। বিফলে গেছে সবগুলোই।

২০০৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা দলের ‘নতুন ম্যারাডোনা’ হয়ে দলের সঙ্গে জার্মানি গেলেন মেসি। লা মেসিয়ার ১৮ বছরের মেসিকে নিয়ে তখন নতুন নতুন ফিচার লেখা শুরু করেছে পত্রিকাগুলো। তাতে মেসির রোজারিও থেকে বার্সেলোনায় উঠে আসার গল্প থেকে শুরু করে মেসিই কেন নতুন ম্যারাডোনা সেই বিশ্লেষণ- সবকিছুরই ঠাই হত।

পরের বছর রিকুয়েমের সাথে জুটি গড়ে দলকে নিয়ে গেলেন কোপার ফাইনালে। সেখানেও বাধ সাধলেন ফুটবল বিধাতা। ম্যারাডোনা-মেসির ২০১০ বিশ্বকাপ মিশন শেষ হল লজ্জায়। গায়ে ট্যাগ জড়াল, ‘বার্সেলোনার মেসি’।

পরের বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে ছিলেন দলের অধিনায়ক। লাল-নীল স্ট্রাইপের বার্সেলোনার মেসি ধীরে ধীরে হয়ে উঠলেন আর্জেন্টিনার মেসি। ২০১৪ বিশ্বকাপে দলকে ফাইনালে তুলে ততোদিনে ওই ট্যাগটা বিসর্জন দিতে পেরেছিলেন। আর্জেন্টাইন সমর্থকদের কাছে তিনি “ওহ ক্যাপ্টেন, মাই ক্যাপ্টেন”। এই যে মেসি আর্জেন্টিনারই!

মেসির শিরোপা, মারিও গোটযেরা আদায় করে না নিয়ে গেলে হয়ত পেলে-ম্যারাডোনারাও চাপা পড়ে যেতেন এই লিটল ম্যাজেশিয়ানের কাছে।

পরের বছরই আবার সুযোগ পেয়েছিলেন ‘পাপ মোচনের’। হয়ে হয়নি, ঠিক এবারের মতোই। ২০০৮ এর বেইজিং অল্পম্পিকে পাওয়া গোল্ড মেডেলটাই হয়ে থাকল জাতীয় দলের হয়ে মেসির সবচেয়ে বড় মাইলফলক হিসেবে।

বিশ্বকাপ না জেতালে হয়ত পেলে-ম্যারাডোনার কাতারে নাম ওঠানো দায়। এর নিচেও আবার তিনি বড্ড বেমানান! ফুটবল ইতিহাসে মেসি আসলে নিজের জন্য আলাদা একটা জায়গা রেখে গেলেন। যেখানে তার প্রতিদ্বন্দী কেবল তিনি।

আজকাল আর্জেন্টিনাসহ বাকি সব দেশেও প্রতিভার ঝলকানি দেখলে তার গায়ে ট্যাগ লেগে যায় নতুন মেসির। তিনি এসেছিলেন ‘নতুন ম্যারাডোনা’ হয়ে.... চলে গেলেন মেসি হয়ে। কিছু না জিতেও ম্যারাডোনাকেও ছাপিয়ে গেলেন হয়ত। লিওনেল মেসি হয়ে।