X
GO11IPL2020
  • ক্রিকেট

জুলাইয়ের শেষ দশকের দিনপঞ্জী

পোস্টটি ৯৯০ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

গত কিছুদিন ধরে ক্রিকেটের আদি ও সনাতনী সংস্করণ 'টেস্ট ক্রিকেট' যেন পুনরায় মনে করিয়ে দিল, ক্রিকেটের সৌন্দর্য্য, ক্রিকেটের মাধুর্য্য-মুগ্ধতা, ক্রিকেটের রুপ-রস, প্রাণ তা ঐ শ্বেত ও শুভ্র পোষাকের টেস্ট ক্রিকেটই। ক্রিকেটের সত্যিকার আনন্দ দানে অন্য যে কোন সংস্করণের, এর ধারে-কাছে পৌছতেও লেগে যাবে সহস্র বছর। হয়তো সহস্র বছরেও বুঝি তা সম্ভব নয়।

তাই হয়তো ১৩৯ বছরের টেস্ট ক্রিকেট, শুভ্র পোষাকের টেস্ট ক্রিকেট আশ্চর্য্যকর ভাবে চির নতুন, অনন্ত যৌবনা, ভীষণ রঙিন!

 

শুরুটা হয়েছিল ভারত ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের মধ্যকার টেস্ট দিয়ে। তারপর খেলল পাকিস্তান ও ইংল্যান্ড। জুলাইয়ের এই শেষ দশকের মাঝামাঝি সময়ে শ্রীলংকা-অস্ট্রলিয়াও যোগ দিয়েছিল শুভ্র পোষাকের মহা উৎসবে। ইউরোপ, প্রাচ্য, ক্যারিবীয়ান সর্বত্র যখন চলছে শ্বেত পোষাকের মহা উৎসব, তখন আফ্রিকায় বা পিছিয়ে থাকে কেন! তাই জিম্বাবুয়েতে, জিম্বাবুয়ে ও নিউজিল্যান্ডও মাঠে নামলো মহানন্দের এই ধারায় যুক্ত হতে।

শুরুটা যাদের দিয়ে হয়েছিল, সেই ভারত-ওয়েস্ট ইন্ডিজ জ্যামাইকার স্যাবাইনা পার্কে আজ আবারো মাঠে নেমেছে, বুঝি  জুলাইয়ের এই শেষ দশকের সনাতনী ক্রিকেটের মহা উৎসবের যবনিকা টানতে। সূচনাটা তারাই করেছিল কি না!

 

পিঠেপিঠি দুই টেস্ট

একদিনের ব্যবধানে মাঠে নেমেছিল ভারত-ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও পাকিস্তান-ইংল্যান্ড। ২১ তারিখ ভারত-ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ২২ তারিখ পাকিস্তান-ইংল্যান্ড।

একদিনের ব্যবধানে মাঠে নামলেও, খেলার চিত্র অনেকটা একই ছিল দুটি টেস্টেরই। একই ধরণের সমাপ্তির দিকে হেঁটেছে, অনেকটা একই চিত্রনাট্য অনুসরণ করেই ম্যাচের যবনিকাপাত ঘটেছে। দুটি টেস্টই শেষ হয়েছে ঠিক চারদিনের মাথায়। এক তরফাভাবে আত্নসমর্পণ করেছে একটি দল, অন্য দলটি শাসন করে গেছে কোনরুপ প্রতি আক্রমণের শিকার হওয়া ছাড়াই। তবে পার্থক্য হলো, একদল শাসন করেছে আক্রমণাত্নক ভঙ্গিমায়। আর আরেক দলের শাসন পদ্ধতি ছিল কিছুটা রক্ষণাত্নক গোছের। ফলাফলেও তাই এক দলের জয় যেখানে ইনিংস ব্যবধানে, সেখানে অন্য দল সমালোচিত হয়েছে 'ফলোঅন' না করানোর 'রক্ষণাত্নক' মানসিকতায়। পার্থক্য আছে আরো একটি, এক জায়গায় ছড়ি ঘুরিয়েছে অতিথি দল। বিপরীতে অন্যত্র সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী ছিল, স্বাগতিকেরা।

এন্টিগায় টস জিতে ভারতের ব্যাটিং দিয়ে সূচিত হয়, অদ্ভুত এক আনন্দ সঞ্চারী জুলাইয়ের শেষ দশকের। সেখানে চূড়ান্ত আধিপত্য দেখিয়ে, ভারত ধুমড়ে-মুচড়ে দেয়, স্বাগতিক ক্যারিবীয়ানদের।

কোহলির প্রথম দ্বি-শতকই ম্যাচের গতিপথ নির্ধারণ করে দিয়েছিল অনেকটা। সাথে অশ্বিনের শতকও ছিল, যিনি কি না পরে আবার স্পিনের মায়াবী জালের যন্ত্রণাও  দিয়েছিলেন ক্যারিবীয়ান ব্যাটসম্যানদের। শামি আহমেদ-যাদব- মিশ্রদের সামনে হোল্ডারের দল এত বেশী অসহায় ছিল যে, দুইবারের চেষ্টায়ও ডিঙাতে পারেনি, ভারতীয়দের প্রথম পালার রান-পাহাড়।

 তাই কোহলির 'তরুণ ভারত'-ই জয় পায় ইনিংস ও ৯২ রানে।

একদিন পর শুরু হওয়া পাকিস্তান-ইংল্যান্ড ম্যাচও অনুসরণ করে, ভারত-ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচের চিত্রনাট্য। টস জিতে ব্যাট করতে নামা ইংলিশদের রান পাহাড়ে চাপা পড়ে, অতিথি পাকিস্তানিরা। রুটের দ্বিশতক, কুকের শতক আর পরে ওকস-এন্ডারসনদের বোলিংয়ে দিশেহারা বোধ করে পাকিস্তান। তবে কুক সমালোচিত হন, তাঁর নেতৃত্বগুণে। নতুন বলের বোলারদের ঝরঝরে থাকা এবং ৩৯১ রান এগিয়ে থাকার পরও, ফলোঅন না করিয়ে নিজেরা দ্বিতীয়বার ব্যাট করতে নামাকে 'কাপুরষোচিত' কিংবা 'অতি রক্ষণাত্নক' সিদ্ধান্ত বলে, ইংলিশ-দলপতির সমালোচনায় মুখর হন সমালোচকেরা।

তবে তারপরও ৩৩০ রানের বিশাল জয় পেতে তেমন কোন বেগ পেতে হয়নি, স্বাগতিকদের। এমন কি ম্যাচটাও গড়ায়নি পঞ্চম দিবসে।

 

পাল্লেকেলে-রোমাঞ্চ

শ্রীলংকার পাল্লেকেলেতে জুলাইয়ের শেষ দশকের ঠিক মাঝামাঝি সময়ে(২৬ তারিখ) 'ওয়ার্ন-মুরালী' ট্রফির আধিপত্যের লড়াইয়ে মুখোমুখি হয় অস্ট্রলিয়া ও শ্রীলংকা। যেখানে প্রথম দিনেই হোঁচট খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে শ্রীলংকার প্রথম ইনিংস। মাত্র ১১৭ রানে অলআউট হয়ে 'রেকর্ড-বুকে' একটা লজ্জার পাতা সৃষ্টি করে ম্যাথুসের অনভিজ্ঞ-শ্রীলংকা।

এ্যাডাম ভোজেস পেয়েছিলেন এক দূর্লভ সুযোগ। সুদূর কল্পনায়ও হয়তো তিনি কখনো এমন কিছু ভাবেননি। শতবর্ষী ক্রিকেট ইতিহাসের অবিসংবাদিত 'ব্যাটিং কিংবদন্তী', 'সেরাদেরও সেরা' স্বদেশী 'স্যার ডন ব্র্যাডম্যান' কে ক্ষণিকের জন্য হলেও ছাড়িয়ে যেতে পারতেন, গড় বিবেচনায়। মাঠে নামার সময় দরকার ছিল ৬৩টি রান। এগিয়েও যাচ্ছিলেন সেই লক্ষ্যের দিকে, অবিচল প্রতিজ্ঞায়। কিন্তু কি থেকে কি হয়ে গেল, হঠাৎ বুঝি চিড় ধরেছিল মনসংযোগে। শতগড় থেকে 'ষোলটি' রান দূরে থাকতে তিনি ফিরে গেলেন 'পাল্লকেরের প্যাভিলিয়ন' কক্ষে! তখন তাঁর রান ১৩৮৪, গড় ৯২.২৬! ক্রিকেট ক্যারিয়ারে এমন এক সুযোগ তিনি দ্বিতীয়বার পাবেন কি? সম্ভব?

লক্ষণ সান্দাকান নামের এক 'চায়নাম্যান' মাঠে নামিয়েছিল শ্রীলংকা। সেই তিনি নতুন করে লিখলেন অভিষেকে এক চায়নাম্যানের সেরা বোলিংয়ের রেকর্ড। স্বপ্নের মতো এক বলে পেয়েছেন ক্যারিয়ারের প্রথম উইকট, যাকে বলে  'ড্রীম ডেলিভারী'!

ক্ষণে ক্ষণে রঙ বদলাতে থাকা ম্যাচটার নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি শ্রীলংকার হাতে তুলে দেন, কুশল মেন্ডিস নামক মাত্র ২১ বছরের এক ছোকরা। তাঁর অনবদ্য ১৭৬ রানে, অনেকটাই নিশ্চিত হয়ে যায় প্রথম দুই দিন পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করা অস্ট্রলিয়ার পরাজয়।

এবং শেষ পর্যন্ত ঘটেও তাই। ঘূর্ণি-পিচে, হেরাথদের ঘূর্ণনের কোন ব্যাখ্যা ছিল না, অজি ব্যাটিং লাইন আপের। শেষান্তে এসে নেভিল-ও'কিফি দেখিয়েছেন সেই ক্রিকেটীয় নাটকীয়তা, করেছেন আপ্রাণ প্রতিরোধের নিরন্তর চেষ্টা।

তবু শেষ রক্ষা হয়নি। মাঠ ছেড়েছে অস্ট্রলিয়া, প্রথম টেস্টে ১০৬ রানের পরাজয়ের তিলক মাথায় নিয়ে।

 

ওঁরা চারজন

তাঁরা হলেন সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যাটিং-প্রতিভা। এশিয়ার রাজকুমার বিরাট কোহলি, ইউরোপের যুবরাজ জো রুট, আর তাসমান পাড়ের দুই প্রতিবেশী রাজপুত্র 'কেন উইলিয়ামসন ও স্টীভ স্মিথ'। একেকজন এখন একেক জায়গায় লড়ছেন 'প্রতিপক্ষ-সংহারে'। জুলাইয়ের এই শেষ দশকটাকে আরো বহুগুণে রঙিন করে রাঙিয়ে দিয়েছেন, তাঁরা চারজন। তাদের প্রতিপক্ষ-সংহারে দেখিয়েছেন ব্যাটিং-শিল্পের নান্দনিক কারুকাজ, তাই কুড়িয়েছেন প্রতিপক্ষেরও সশ্রদ্ধ প্রশংসা, বিস্ময়!

ক্যারিবীয়ান বোলিংকে হতাশার বিষে ডুবিয়ে বিরাট কোহলি করেছেন ক্যারিয়ারের প্রথম দ্বিশতক । পাকিস্তানের বাঁহাতি পেসত্রয়ী ও সময়ের সেরা লেগ স্পিনার ইয়াসির শাহকে তাজ্জব করে দিয়ে 'জো রুট' দেখিয়েছেন তাঁর 'ক্লাস', তাঁর ব্যাটসম্যানশিপ, নিঁখুত এক ইনিংসে করেছেন 'ক্যারিয়ার সেরা ২৫৪'। আশ্বস্ত করেছেন স্বদেশী-ম্যানেজমেন্টকে, যেন বার্তা দিয়েছেন 'হ্যাঁ, তিনে-ই সই। আমি মানিয়ে নিয়েছি এখানেও।'

চতুর্দশ শতকটি পেতে পেতেও পেয়ে উঠা হয়নি, কেন উইলিয়ামসনের। আফ্রিকায় তাঁর ব্যাটিং-রাজত্বের জানান দিতে গিয়ে থেমেছেন 'নার্ভাস নাইন্টিজ' এ। সময়টা ভালো না গেলেও, খুব একটা খারাপ যায়নি তাসমান পাড়ের আরেক রাজপুত্র স্টীভ স্মিথের। যদিও করেছেন মাত্র ৫৫ রান, তবে এটিই তাঁর দলের মধ্যে সর্বোচ্চ স্কোর। মেন্ডিসের ‘অবশ্বাস্য ১৭৬’ বাদ দিলে, পুরো ম্যাচের সর্বোচ্চ স্কোর হয়ে যায় ওই পঞ্চান্নই। হেরে গেলেও দেখিয়ে গেছেন স্রোতের বিপরীতে 'হার না মানা' এক লড়াকু মনোভাব।

বিশ্ব ক্রিকেটের এই 'ভবিষ্যত চতুষ্টেয়' তাদের ব্যাটিং-শিল্প রসে, আরো মহিমান্বিত করে তুলেছেন জুলাইয়ের এই শেষ দশকের শুভ্র পোষাকের মহা আনন্দায়ী ক্রিকেট মহা উৎসব।

 

আগামীর তারকাদের আগমনী বার্তা

মাত্র 'একুশ' বছর বয়সে অবিশ্বাস্য পরিণত বোধের প্রমাণ দিয়েছেন কুশল মেন্ডিস। প্রতিকূল পরিবেশে বুক চিতিয়ে লড়াই করে জানান দিয়েছেন শ্রীলংকার 'সাঙ্গা-মাহেলা'র হাহাকার প্রায় শেষের পথে। এসে গেছেন তিনি। স্টার্ক-হ্যাজেলউড, লায়ন-ও'কিফিদের নৈরাশ্যের চাদরে ঢেকে দিয়ে, স্বদেশকে নিয়ে গেছেন এক নিরাপদ চূড়ার দিকে। তাঁর 'ক্লাসিক ১৭৬' তাই অনায়াসে জয় করে নিয়েছে ক্রিকেট-পিয়াসীদের আত্না।

অভিষিক্ত লক্ষণ সান্দাকান যেন জানান দিচ্ছেন বিরল প্রজাতির 'চায়নাম্যান'দের তিনি হারিয়ে যেতে দেবেন না। বাঁহাতি লেগ স্পিনেও বুঝি তিনি দেখাবেন গুগলির ভেলকী!

মেসভাউরের মতো তরুণেরা দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করছেন। যেন বলতে চাইছেন, 'জিম্বাবুয়ে ক্রিকেটকে এত সহজে নিঃশেষ হয়ে যেতে দেবো না।'

ক্রিস ওকস, ব্যাটে-বলে নির্ভরতা দিচ্ছেন ইংলিশ ক্রিকেটকে। বুঝি জানান দিচ্ছেন ইনজুরি-প্রবণ 'বেন স্টোকস' যদি 'ফ্রেডি' হয়ে উঠতে না পারেন, তবে হয়তো 'দুধের সাধ ঘোলে মেটাতে' পারেন তিনি!

 

 

ক্রিকেট আদি-অনন্তের সুর চলছেই। কখনো ক্যারিবীয়ান ক্যালিপসু সুরে, কখনো ইউরোপীয়ান ভায়োলিনে। কখনো বা উপমহাদেশীয় শাস্ত্রীয় রাগ সঙ্গীতে, কিংবা কখনো আধুনিক ধুম ধারাক্কা দ্রুততাল-লয়ে। চলছেই... আদি-অনন্তের, সেই সনাতনী সুর। যে সুরের মূর্ছনায় হারিয়ে যেতে সময় লাগে না, বিরক্তি লাগে না, ক্লান্তি লাগে না। বরং শেষের পরও বুঝি কিসের যেন অতৃপ্তির একটুখানি রেশ থেকেই যায়!

শ্বেত-শুভ্র বস্ত্র পরিধানে, ক্রিকেটীয় শুদ্ধতার যে জয়গান, তার যেন কোন শেষ নেই, সমাপ্তি নেই, ইতি নেই, অন্ত নেই, যবনিকা নেই। ক্রিকেট রুপ-রস পিয়াসীরা আকুল হয়ে সে ক্রিকেট অমৃত-সুধা আহরণ করতে থাকেন, আর ক্রিকেট অকাতরে সে সুধা বিলিয়ে যেতে থাকে।

আবার হয়তো আসবে এমন কোন এক সময়, কোন সপ্তাহ, পক্ষ কিংবা এমনি দিবসের দশক। যখন আমরা মুগ্ধ হয়ে, বিস্মিত হয়ে, বিমোহিত হয়ে, কেবল ক্রিকেট-সুধা পান করেই যাবো... করেই যাবো।

শ্বেত পোষাকের এই ক্রিকেট-ঐশ্বর্য্য, চির-রঙিন ক্রিকেটীয় মাধুর্য্য, ক্ষণে ক্ষণে রঙ বদলানোর ক্রিকেটীয় অনিশ্চয়তার সৌন্দর্য্য বেঁচে থাক অনন্তকাল। বেঁচে থাক টেস্ট ক্রিকেট।

 

____