• ক্রিকেট

সেই টেস্টের স্মৃতিকথা

পোস্টটি ১২৬০ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

সে এক টেস্ট ছিল বটে !

কোন টেস্ট ? দুই হাজার তিন সালের মুলতান টেস্ট ! এরপর নিশ্চয় আর কিছু বলার প্রয়োজন নেই । মুলতান-টেস্ট বলতেই তো ভেসে উঠে, নাদুস-নুদুস ফর্মের জন্য সংগ্রামরত মোটাসোটা এক ভদ্রলোকের অবিশ্বাস্য এক কীর্তি, ফেরার পথে গার্ড অব অনার, আর ফুলেল বৃষ্টি । অন্যদিকে বেঁটে-খাটো, গোলগাল এক লোক ফিরছেন, সবসময় প্যান্টের পেছনে ঝুলিয়ে রাখা সাদা রুমালটায় চোখ মুছতে মুছতে । অথচ ফুলেল বৃষ্টি হতে পারত ক্রন্দনরত সেই লোকের জন্যেও, তাঁর দলের জন্যেও । সে ম্যাচে ফুলের বৃষ্টির সবচেয়ে বড় দাবীদার ছিল সে ও তাঁর দলই । কিন্তু নিয়তি, দূর্ভাগ্য কিংবা কোন অলক্ষ্যে লিখিত হওয়া ক্রিকেট-পরিণতির মারপ্যাঁচে পড়ে সেবার কাঁদল সে, কাঁদল তাঁর  দল, কাঁদল একটা পুরো দেশ । আর তাদের ব্যাথায় ব্যথিত হলো, আরো হাজারো-লাখো ক্রিকেটামোদীরা ।

 

সে এক গল্প বটে !

তবে উত্থান-পতন আর শেষান্তের ট্রাজেডিতে বড় বিরহের গল্প । তিন টেস্টের সেই সিরিজের এক টেস্টে বাংলাদেশ অনায়াসে পেরিয়ে গিয়েছিল দুই উইকেটে তিনশ । সে দলই সাড়ে তিনশ’র পরপর প্যাকেট(অল আউট) হয়ে গিয়েছিল ! দ্বিতীয় ইনিংসের ভয়াবহ ব্যর্থতায়, বরণ করেছিল লজ্জাজনক পরাজয় । প্রথম দুই টেস্টে হেরে গিয়ে, ২-০তে পিছিয়ে থেকে তৃতীয় টেস্টে মুলতানে পাকিস্তানের বিপক্ষে খেলতে নেমেছিল বাংলাদেশ । প্রথম দুই টেস্টের মতোই প্রথমে ব্যাটিংয়ে নেমেছিল সেবারও । লড়াইটাও খারাপ করেনি । তিনশ ছুঁই ছুঁই(২৮১) রান জমা করেছিল স্কোর বোর্ডে । বোলিংয়ে সে কী দাপট ! পাকিস্তানকে থামিয়ে দিয়েছিল ১৭৫ রানেই, লিড পেয়ে গিয়েছিল ১০৬ । তাই দ্বিতীয় দিনের শুরুতে প্রথম ইনিংস শেষ করা বাংলাদেশ, দ্বিতীয় দিনের বিকেল বেলায় আবারো ব্যাটিংয়ে !

 

সে এক পুনরাবৃত্তিরও গল্প বটে !

দ্বিতীয় ইনিংসে সেই চিরচেনা বাংলাদেশ । সেই যে অভিষেক টেস্টের দ্বিতীয় পালায় তাঁরা ৯১ রানে অল আউট হয়েছিল, সেই ভূত যেন কাঁধ থেকে নামেনি তখনো । তাই দেড়শো পেরোতেই শেষ বাংলাদেশের দৌড় । দ্বিতীয় ইনিংসে ১৫৪, আর লিড ১০৬ । সব মিলিয়ে ২৬০ রানের লিড হয়ে, ২৬১ রানের বেশ হৃষ্টপুষ্ট এক টার্গেট দাঁড়ালো পাকিস্তানের সামনে ।

 

সে এক অবিশ্বাস্য, রুপকথা যেন !

উইকেট পড়ছে, চোখে অবিশ্বাস নিয়ে তাকিয়ে দেখছি । টিভি স্ক্রিনটা কেমন যেন লাগছে । মাথা ঘোরার মতো অবস্থা । এও কি হয় নাকি ? সম্ভব কখনো ? একশ পেরোতে না-পেরোতেই, পাকিস্তানের নেই চার-পাঁচ উইকেট । তবে কি অন্যরকম কিছু হবে ? বলা যাচ্ছিল না কিছুই । মাঠে তখন খেলছে কেবল বাংলাদেশ । একটু পরপর উল্লাস হচ্ছে, উইকেট পড়ার উল্লাস । তৃতীয় দিনে খেলা শেষ হতে হতেও হলো না । পাকিস্তানের ছয় উইকেট নেই, লোয়ার অর্ডার নিয়ে, পঞ্চাশ পেরোনো ইনজামাম আছেন কেবল । চার উইকেট হাতে রেখে, শতাধিক রান দূরত্বে দিন শেষ করলো পাকিস্তান । আব্বু বললেন, ‘ইনজিকে ফেলে দেয়া উচিৎ ছিল । এই ব্যাটা কি করে তার ঠিক নাই ।’ আব্বু সবসময় ইনজি’র মহাভক্ত ছিলেন । সেই ‘৯২ বিশ্বকাপে কিউইদের ধ্বংস করে দেয়া সেমিফাইনাল থেকে । মনে হলো, এও বুঝি আব্বুর তেমনি কিছু ! কিন্তু পরের দিনই বুঝলাম, আক্ষরিক অর্থেই বুঝলাম, আব্বুর অভিজ্ঞ দৃষ্টি অশনি-সংকেত দিতে একটুও ভুল করেনি । 

 

সে এক কঠিন সময় !

ইনজামাম একটু একটু করে খেলতে থাকেন । তাঁর সঙ্গী কখনো সাকি, কখনো সাব্বির । আমরা রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষায় । এই মোটাসোটা লোকটা কি আজ আর আউট হবে না ? দিদার ভাইয়া আর আমি সকাল থেকে খেলা দেখছি । আব্বু তখন অফিসে । ছোট মামা জিজ্ঞেস করলেন ভাইয়াকে, ‘কে জিতবে মনে হয় ?’ ভাইয়া বড় দুশ্চিন্তা নিয়ে জবাব দিয়েছিলেন, ‘বলা যাচ্ছে না । যেভাবে খেলা ধরে ফেলেছে...’ কথাটা আর শেষ করেননি ভাইয়া । শেষ করার প্রয়োজনও ছিল না । ইনজিকে সেই সময়ের মতো বিরক্তিকর আর কখনো মনে হয়নি । কোন এক সাক্ষাৎকারে তাঁর ‘আমি অলস নই’ বলা নিয়ে কত হাসাহাসি করেছি । তাঁর ব্যাটিংয়ের আলসে সৌন্দর্য্য কত উপভোগ করেছি । আর সে-ই কি না... বড় অস্থির, বড় কঠিন ছিল সে সময়গুলো ।

 

সে বড় দুঃসহ ব্যাথা !

সাঙ্গ হয়েছিল পালা । রুদ্ধশ্বাস মুহূর্তের ইতিও ঘটেছিলো । কিন্তু রেখে গিয়েছিল দীর্ঘস্থায়ী এক অফুরান জ্বালা, যন্ত্রণা । মাত্র একটি উইকেট, এক উইকেট দূরত্বে থেকে ইনজামাম ম্যাচ বের করে নিয়ে গিয়েছিলেন । খালেদ মাহমুদের মিডল স্ট্যাম্পের বলটিকে লেগ সাইডে ফ্লিক মতো করে মুষ্টিবদ্ধ হাত সামনে পেছনে করে, একটিবারের জন্য করেছিলেন বুনো উল্লাস । তারপর উল্লসিত সতীর্থদের আলিঙ্গনাবদ্ধ হয়ে ড্রেসিংরুমের দিকে যখন হাঁটছিলেন, পেছনে তখন হতাশায় কাতর মাহমুদ-মাসুদ, বাশাররা ! চোখের নোনা জল সাদা রুমালে মুছার চেষ্টা করছেন অধিনায়ক মাহমুদ । হতাশ পুরো বাংলাদেশ দল, থমথমে বাংলাদেশ ড্রেসিংরুম ! গোটা বাংলাদেশ-ক্রিকেট যেন তখন শোকস্তব্ধ ! বড় কষ্টের সে সময়, বড় ব্যাথার সে সময় । কি যে দুঃসহ ব্যাথা, তা ব্যখ্যা করার সে ভাষা আমি তো কোন ছার, কোন মহা পন্ডিতেরও বুঝি নেই ।

 

সে এক স্মৃতি বটে !

আমাদের কৈশোরে প্রথম টেস্ট-রুপকথা ছিল এই মুলতান টেস্ট । পাঁচদিন লড়াই করার লক্ষ্যে খেলতে নামা বাংলাদেশ দলটা হঠাৎ কি এক অবিশ্বাস্য কীর্তি ঘটিয়ে দিয়েছিল সেবার । গোটা পৃথিবীকে চোখ কচলে আবার তাকাতে বাধ্য করেছিল, পুঁচকে এই দলটির দিকে । রশীদ লতিফের প্রতারণা কিংবা রফিকের বদান্যতা, অথবা মাশরাফি নামক মরণপণ লড়াই করা তরুণটির অনুপস্থিতি... এসবই বারবার উঠে এসেছে এই ম্যাচটির এক উইকেটের পরাজয়-কষ্ট ঢেকে রাখার এক দূর্বোধ্য প্রচেষ্টায় ।

পন্টিং, ভেট্টরীও এভাবে ম্যাচ বের করে নিয়ে গেছেন । তবে এটার মতো কষ্ট আর কিছুতে ছিল না । মুলতান তাই আমাদের কাছে দুঃসহ ব্যাথার আরেক নাম ! তীরে পৌছে তরী ভেড়াতে না পারার আক্ষেপের গল্প ! আমাদের টেস্ট ক্রিকেট ইতিহাসের প্রথম রুপকথা, প্রথম মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর গল্পও বটে !