• অন্যান্য

সীমানা পেরিয়েঃ পর্ব ১

পোস্টটি ২২৮৯ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

২০১০ সালের ১৮ জানুয়ারি, হোবার্টের বেলেরিভ ওভালে চলছে অস্ট্রেলিয়া-পাকিস্তান সিরিজের ৩য় এবং শেষ টেস্টের ৫ম দিন। ২৩১ রানে জিতে সফরকারীদের হোয়াইট ওয়াশের লজ্জা দিলো স্বাগতিকরা। হতাশা কাটাতে পাকিস্তান কোচ ওয়াকার ইউনিস এবং দলের অন্যতম সিনিয়র প্লেয়ার শোয়েব মালিক সন্ধ্যায় গেলেন শহরের অন্য প্রান্তে চলতে থাকা অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের ম্যাচ দেখতে। সেখানে, ফ্রান্সের আরাভানে রেজাইয়ের কাছে সরাসরি সেটে হারলেন আরেক এশিয়ান, ভারতের টেনিস সেনসেশন সানিয়া মির্জা। ম্যাচের পর বিমর্ষ সানিয়াকে দেখে এগিয়ে গেলেন মালিক, হতাশা কাটাতে সঙ্গ দিলেন কিছুক্ষণ। এর আগে বার দুয়েক দেখা হলেও কখনো কথা হয়নি তাদের। কি যেন কি হয়ে গেলো কয়েক মিনিটের কথোপকথনে। প্রেমে পড়লেন একে-অপরের।

কথায় বলে, লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট। সানিয়া-মালিকের বেলায় প্রেম হয়েছিল, তৃতীয় দেখায়! 

প্রেমের ফলে খুব একটা ইতিবাচক কিছু হয়নি নিজেদের খেলায়। টেস্টের মত ওয়ানডে সিরিজ আর একমাত্র টি২০ ম্যাচেও জয়শূন্য হয়ে থাকে পাকিস্তান। আর দ্বৈতে মির্জা বাদ পড়েন ৩য় রাউন্ডেই। শেষ আশা ছিল, মিশ্র দ্বৈত; যেটার গেলো আসরের চ্যাম্পিয়ন তিনি। কিন্তু ইনজুরির কারণে ঐ বিভাগে অংশই নেওয়া হল না! 

তবে নতুন প্রেম সেই হতাশাকে কাটাতে দেরী করেনি, কয়েক সপ্তাহ সবাইকে কিছু জানতে না দিয়ে চুটিয়ে প্রেম করতে থাকলেন দুজন। এরপর দুম করে এলো বিয়ের ঘোষণা!

এক ঘোষণাতেই টালমাটাল পুরো বিশ্ব। কেনই বা হবে না? একজন ভারতীয়, আরেকজন পাকিস্তানি; চির প্রতিদ্বন্দ্বী দুই দেশের নাগরিক। ব্রিটিশদের কাছ থেকে ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভ করার লগ্ন থেকেই একে অপরকে টেক্কা দিতে ব্যস্ত সবকিছুতে; রাজনীতি, যুদ্ধ, সংস্কৃতি, ক্রীড়া – কোন ক্ষেত্রই বাদ যায়নি এই বৈরি মানসিকতার প্রদর্শনে। তার উপর ২০০৮ সালে মুম্বাই সন্ত্রাসী হামলায় পাকিস্তানের যোগসাজশ থাকার প্রমাণ পাওয়ার পর থেকে দু'দেশের কূটনীতিক সম্পর্কে চরম শীতলতা বিরাজ করছে। সেসময় দুই দেশের তারকার এরকম সম্পর্ক স্বাভাবিক চিত্তে গ্রহণ করবেন কে?

দু'দেশের রাজনৈতিক মহল থেকে শুরু করে গণমাধ্যমেও চলল ব্যাপক সমালোচনা। এমনকি ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) পক্ষ থেকে সানিয়াকে অনুরোধ করা হয়, সিদ্ধান্ত পুনর্মূল্যায়ন করার। কিন্তু শোয়েব-সানিয়ার তাতে কান দিতে বয়েই গেছে। সবকিছুর নিকুচি করে ২০১০ সালের ১২ এপ্রিল ইসলামিক রীতি মেনে ভারতের হায়দারাবাদের তাজ হোটেলে নিকাহ করেন দুজন। ২ দিন পরে পাকিস্তানের লাহোরে হয় ওয়ালিমা (বিবাহোত্তর সংবর্ধনা)। 

বলিউডের সিনেমাকেও হার মানানো এই বিয়েতে সাংবাদিকদের ভয়ে পেছনের গেট দিয়ে হোটেলে ঢুকতে হয় বর-কনেকে। তারকাদের বিয়ে বলে কথা! বিয়ের দেনমোহরই ছিল প্রায় ৬১ লাখ রুপি!

তবে এই বহুল আলোচিত-সমালোচিত বিয়ের বিতর্কিত হবার পেছনে কারণ ছিল আরও কয়েকটি। ২০০৯ সালে দীর্ঘদিনের পারিবারিক বন্ধু ধনকুবের ব্যবসায়ী সোহরাব মির্জার সাথে বাগদান সম্পন্ন করেন সানিয়া, তবে অস্ট্রেলিয়া থেকে ফেরার মাত্র কয়েকদিন পরেই কোন কারণ না দেখিয়েই সেই সম্পর্ক বিচ্ছেদ করা হয় টেনিস তারকার পক্ষ থেকে। ধারণা করা হয়, ঐ সময়েই শোয়েবের প্রেমে পড়েন সানিয়া। 

শোয়েবও হন দারুণ বিতর্কিত। বিয়ের ঘোষণা দেবার পরেই আয়েশা সিদ্দিকী নামের এক হায়দারাবাদি তরুণী দাবি করে, পাকিস্তানি ক্রিকেটারের সাথে বেশ কয়েক বছর আগেই বিয়ে হয়েছে তাঁর। ইসলামিক রীতি অনুযায়ী, তাকে তালাক দেওয়া না পর্যন্ত সানিয়ার সাথে বিয়ে স্বীকৃত হবে না। তবে মালিকের দাবি ছিল, আয়েশার সাথে বিয়ে হয়েছিল ফোনে, কখনো সামনাসামনি দেখেননি তাকে। যে ছবি পাঠানো হয়েছিল, সেটাও আয়েশার নয়, বরং তাঁর সাথে প্রতারণা করা হয়েছে। এই বিয়ের কোন সত্যতা নেই। বরাবরই ‘আগে কখনো বিয়ে করিনি’ মন্তব্য করে যাওয়া মালিক কয়েক মাস পর গণমাধ্যমের চাপে নতি স্বীকার করে আয়েশাকে তালাক দেন।

তবে অনলাইনে দারুণ সাড়া জাগানো এই বিয়ে সানিয়া মির্জাকে খ্যাতির তুঙ্গে পৌঁছে দেয়। গুগলের হিসেব মতে, ২০১০ সালে সবচেয়ে বেশিবার সার্চ করা মহিলা টেনিস খেলোয়াড় এবং ভারতীয় – দুই তালিকাতেই শীর্ষে ছিলেন তিনি।

মজার ব্যাপার হল, বিয়ের আগে দুজনের ক্যারিয়ার গ্রাফই ছিল পড়তির দিকে। বিয়ের পরেই সেই গ্রাফ ধাবিত হয় উল্টো দিকে। 

দারুণ সম্ভাবনা জাগিয়ে পেশাদার সার্কিটে এলেও ইনজুরি আর ধারাবাহিকতার অভাব মহিলা এককে ভালো কিছু করতে দেয়নি সানিয়াকে। সেরা ত্রিশের ভেতরে এসেছিলেন সেই একবারই – ২০০৭ সালে। বলার মত সাফল্য কেবল এককে ১টি আর দ্বৈতে ৭টি ট্যুর শিরোপা, এশিয়ান গেমসে এক স্বর্ণ সহ ৩ পদক। ক্যারিয়ারের সেরা অর্জন, স্বদেশী মহেশ ভুপাতির সঙ্গী হয়ে ২০০৯ অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের মিশ্র দ্বৈত চ্যাম্পিয়ন হওয়া, সেবার উপমহাদেশের প্রথম নারী হিসেবে স্বাদ নেন গ্র্যান্ডস্ল্যামের। 

ভালোবাসার গল্পে বদলে যান সানিয়া, নতুন উদ্যমে শুরু করেন ক্যারিয়ার। সাফল্য ধরা দেয় দু হাতে। এ পর্যন্ত দ্বৈত বিভাগে জিতেছেন ৩ গ্র্যান্ডস্ল্যাম। ২০১১ ফ্রেঞ্চ ওপেন ফাইনালে এলিনা ভেসনিনাকে সঙ্গী করে হারলেও মার্টিনা হিঙ্গিসের সাথে গত মৌসুম আর চলমান মৌসুম মিলিয়ে জিতেছেন সাথে টানা ৩ গ্র্যান্ডস্ল্যাম; উইম্বলডন (২০১৫), ইউএস ওপেন (২০১৫), অস্ট্রেলিয়ান ওপেন (২০১৬); দ্বৈত র‍্যাঙ্কিং এর বিশ্বসেরাও এখন এই ভারতীয়! 

সর্বকালের অন্যতম সেরা দ্বৈত জুটির সম্মান পাওয়া সান-টিনা জুটি এ বছর ভেঙ্গে যাবার আগে গড়ে টানা ৪১ ম্যাচের উইনিং স্ট্রিক। হিঙ্গিসের সাথে জুটি গড়ে জিতেছেন ৩ গ্র্যান্ডস্ল্যাম সহ মোট ১৩ শিরোপা।

মিশ্র দ্বৈতেও সাফল্য পিছু ছাড়েনি সানিয়ার। আরও ৪ বার উঠেছেন গ্র্যান্ডস্ল্যাম ফাইনালে, ভুপাতির সাথে ফ্রেঞ্চ ওপেন (২০১২) জিতলেও এরপর আর একসাথে খেলা হয়নি তাদের। পরে ভিন্ন ভিন্ন সঙ্গী নিয়ে অস্ট্রেলিয়ান ওপেন আর ফ্রেঞ্চ ওপেনের ফাইনালে এক বার করে হারলেও ২০১৪ সালের ইউএস ওপেন জিতেছেন তিনি।

৬ গ্র্যান্ডস্ল্যামের মালিক সানিয়ার আছে প্রথম এশিয়ান নারী হিসেবে সব গ্র্যান্ডস্ল্যামের শিরোপা জয়ের রেকর্ড। মালিকের সাথে গাটছড়া বাঁধার পর ট্রফি ক্যাবিনেটে যোগ হয়েছে এশিয়ান এবং কমনওয়েলথ গেমসে এক স্বর্ণ সহ মোট ৬টি পদক। রিও অলিম্পিকে একটুর জন্য ব্যর্থ হয়েছেন পদক জিততে। ভূষিত হয়েছেন ভারতের সর্বোচ্চ বেয়ামরিক পদক পদ্মশ্রী এবং পদ্ম ভূষণ, সাথে সর্বোচ্চ ক্রীড়া পদক রাজীব গান্ধী খেলরত্ন পদকে। ২০১৬ সালে টাইম ম্যাগাজিনের করা বিশ্বের সেরা ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের তালিকাতেও আছেন সানিয়া মির্জা।

 

PicMonkey Collage

ফটোগ্রাফঃ 'নাচ বালিয়ে' - রিয়েলিটি শোতে সানিয়া-শোয়েব জুটি  

 

আর মালিক?

পাকিস্তানের হয়ে এশিয়ান কাপ (২০০০) এবং টি২০ বিশ্বকাপ (২০০৯) জেতা জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ফর্মহীনতা আর বিতর্কে দলেই হয়ে পড়েছিলেন ব্রাত্য। সানিয়ার সাথে প্রেমের জিয়ন কাঠির স্পর্শে বদলে যান মালিকও। ঘরোয়া ক্রিকেটে ব্যাটিং-বোলিং-অধিনায়কত্বের মিশেলে ধারাবাহিক নৈপুণ্য ফিরিয়ে দেয় সেই আরাধ্য জায়গা।

পাকিস্তানের ঘরোয়া আসরে পাঞ্জাব প্রদেশ, শিয়ালকোট স্ট্যালিয়ন্স এবং পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্স দলকে একাধারে নেতৃত্ব দেওয়া শোয়েব গত কয়েক বছরে অধিনায়কত্বের মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন সব আসরেই। স্ট্যালিয়ন্সের হয়ে টানা ৫ বার সহ মোট ৮ বার জিতেছেন ঘরোয়া টি২০ লীগ, দলটি বর্তমানে বিশ্ব ক্লাব র‍্যাঙ্কিং-এ ১ নম্বর টি২০ দল।

পাঞ্জাবের হয়ে অর্জনের তালিকায় আছে জাতীয় লীগ, পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সকে জিতিয়েছেন কায়দে আজম ট্রফি। রমজান টি২০ কাপ (২০১৩) আসরে দারুণ পার্ফরমেন্স করেও ফাইনালে সুপার ওভারে হারতে হয় তাকে, তবে ২০৫ রান আর ৬ উইকেট নিয়ে হন বেস্ট অলরাউন্ডার।

বর্তমানে খেলা পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের মধ্যে একদিনের ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি রান (৬৩০৯) এবং ৩য় সর্বোচ্চ উইকেট (১৫১) তাঁর দখলে। ৫ বছর পর ২০১৫ সালে টেস্টে ফিরেই খেলেছেন ক্যারিয়ার সেরা ২৪৫ রানের মহাকাব্যিক ইনিংস! 

ক্রিস গেইল, ব্র্যাড হজের সাথে বিভিন্ন দেশের ঘরোয়া টি২০ লিগে খেলা ফেরিওয়ালা দলের অন্যতম সদস্য শোয়েব মালিক, রয়েছে প্রশংসনীয় পরিসংখ্যানও। ৬২৫৮ রান নিয়ে টি২০ ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি রান সংগ্রাহকের তালিকায় অবস্থান ৮ নম্বরে, সাথে পাকিস্তানকে সার্ভিস দিয়ে যাওয়া মালিক আন্তর্জাতিক টি২০ রানের সেরাদের ভিড়ে ১৪৬৮ রান নিয়ে আছেন ১১ নম্বরে।

ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগে প্রথম দুই আসরেই সর্বোচ্চ রান মালিকের, দ্বিতীয় আসরে দলকে চ্যাম্পিয়ন বানাতে অলরাউন্ড নৈপুণ্য রাখেন তিনি। আইপিএল, বিগ ব্যাশ, বিপিএল, কাউন্টি সব জায়গাই মাতাচ্ছেন মালিক।

দারুণ সুখি হিসেবে পরিচিত এই দম্পতি ২০১২ সাল নিজেদের খেলার সুবিধার জন্য আবাস বানিয়েছেন দুবাইয়ের পাম আইল্যান্ডে। এ বছর দুজনের একসাথে পথচলার গল্পটা পা দিয়েছে ৭ বছরে। সময় পেলেই গ্যালারীতে গিয়ে উপভোগ করেন একে অপরের খেলা, সমর্থন যোগান প্রতিনিয়ত। তবে দেশপ্রেমের প্রশ্নে, দুজনই নিজেদের দেশকে এগিয়ে রাখেন সবসময়। ক্রীড়া দুনিয়ার অন্যতম আলোচিত জুটির ভালোবাসার আদান-প্রদানের দেখা মেলে ফেসবুক-টুইটারেও।

 14383973_1264097833663465_2034163247_n

ফটোগ্রাফঃ পদ্মশ্রী পদক পাওয়ার পর সানিয়া স্তুতিতে টুইটারে শোয়েব মালিক   

 

কিছুদিন আগে পাকিস্তান-ভারতের সংস্কৃতিকে ভিত্তি করে বানানো নেসলের এক টিভি কমার্শিয়ালে অভিনয় করে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছেন শোয়েব-সানিয়া। এঁকে দেখিয়েছেন দু'দেশের ভালোবাসার চিত্র! 

 

 

 

পাশাপাশি দু'দেশ যখন ব্যস্ত বৈরিতায়, সীমানা পেরিয়ে তখন এমনই সব নিদর্শন দেখানো শোয়েব-সানিয়ার গল্পটা বারবার রেখে যাচ্ছে ভালোবাসার পরশ! 

ভালো থাকুন, শোয়েব-সানিয়া।