X
GO11IPL2020
  • ফুটবল

আলিরেজা বিরানভান্দঃ বাড়ি থেকে পালিয়ে বিশ্বকাপ স্বর্গে

পোস্টটি ৩৬০৬ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

কাঁদছেন মাটিতে শুয়ে। বিশ্বকাপ থেকে দল বাদ পড়েছে কিছুক্ষণ আগেই। রিওয়াইন্ড করে মিনিট ত্রিশেক পেছনে যাওয়া যাক! দল পিছিয়ে আছে এক গোলে। মরার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে পেনাল্টি পেয়েছে পর্তুগাল। স্পটকিক নিতে এসেছেন স্বয়ং ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। গোল খেলেই ম্যাচ শেষ! নাহ! আলিরেজাদের দিনে রোনালদোরা একদিনের জন্য আলো হারান। বাঁ দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে পেনাল্টি ঠেকান বিরানভান্দ। কিছুক্ষণ শুয়ে থাকেন বলটা ধরে। স্থিরচিত্র দেখলে মনে হয়, কেমন যেন অদ্ভুত শান্তি জাগানো ইরানি কোন চলচ্চিত্রের দৃশ্য! 

ব্রাজিল বিশ্বকাপে নাইজেরিয়ার সাথে ইরানের ম্যাচের পরেই শিরোনামে এসেছিলেন আলিরেজা হাঘিঘি। আর্জেন্টিনার সাথেও ৯২ মিনিট পর্যন্ত আটকে রেখেছিলেন গোলবার। শেষমুহূর্তে লিওনেল মেসির গোলে ইরানিদের হৃদয় ভাঙলেও সুদর্শন চেহারা আর গোলরক্ষণে মুন্সিয়ানায় লাখ লাখ ফুটবল ভক্তের হৃদয় ছুঁয়েছিলেন হাঘিঘি।

রাশিয়া বিশ্বকাপে ইরানের প্রথম পছন্দের গোলরক্ষক আলিরেজা বিরানভান্দ হাঘিঘির মত সুদর্শন না হতে পারেন, তবে তাঁর জীবনের গল্পটায় অনেক চড়াই-উৎড়াই, অনেক রঙের বাঁক!

 

ইরানের লোরেস্তান প্রদেশের পাহাড়ি অঞ্চল শারাব-ই-ইয়াসের এক যাযাবর পরিবারে জন্ম আলিরেজা বিরানভান্দের; ১৯৯২ এর সেপ্টেম্বরে। মেষপালনের উপর নির্ভর করা পরিবারটি সবুজ ঘাসের সন্ধানে সারাবছরই অস্থায়ী ঘরে থাকতো। অপূর্বর মত ‘বড় ছেলে’ হবার কারণে বাচ্চা বয়স থেকেই পরিবারকে সাহায্য করার কাজে নেমে পড়া বিরানভান্দ মেষপালনের ফাঁকেফাঁকে ফুটবল আর দাল পারানেই ব্যস্ত থাকতেন বন্ধুদের নিয়ে। দাল পারানের খেলার নিয়ম হচ্ছে - যত দূর সম্ভব পাথর ছুড়তে হবে। সেই পাথর নিক্ষেপের পাগলাটে কিশোর একদিন পাথর ছেড়ে নক্ষত্র হবেন ফুটবলের আকাশে!

বয়েসটা যখন ১২ ছুঁইছুঁই, শারাব-ই-ইয়াসে আস্তানা গেড়েছে পরিবার। খেলা শুরু করলেন স্থানীয় এক দলের হয়ে। স্ট্রাইকার পজিশনেই শুরু। একদিন গোলরক্ষক আঘাত পেয়ে মাঠ ছাড়াতে বাধ্য হয়ে দাঁড়ালেন গোলপোস্টের নিচে। দারুণ এক সেভে দলকেও জেতালেন। আর যান কোথায়! দলের সবার কথায় সায় দিয়ে গোলরক্ষক হিসেবেই ক্যারিয়ার গড়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু বেঁকে বসলেন বাবা মোর্তেজা বিরানভান্দ। ফুটবলকে দারুণ অপছন্দ তাঁর। শখের বশে খেলো, তাও মানা যায়, পেশা হিসেবে ফুটবল! অসম্ভব! তারচেয়ে এখন থেকেই বরং কোথাও শিক্ষানবিশ হিসেবে শুরু করে দাও!

 

“বাবা ফুটবল খেলাটা দু’চোখে দেখতেই পারতেন না, আমাকে বললেন ওসব ছেড়েছুড়ে কাজে নেমে পড়তে। খেলতে যেন না পারি, জার্সি আর গ্লাভস ছিড়ে ফেলেছিলেন। খালি হাতেই মাঠে নামতে হয়েছে তাই বেশ ক'বার।”

 

এরকম ঝগড়া চলল, কয়েক মাস। ফুটবলের ভূত মাথায় চাপা আলিরেজা সিদ্ধান্ত নিলেন, বাড়ি থেকে পালিয়ে ঋত্বিক ঘটকের 'কাঞ্চন' হবেন। তেহরানে গিয়ে বড় কোন ক্লাবে সুযোগ করে নেবার চেষ্টা চালাবেন। যে-ই ভাবা সে-ই কাজ! এক আত্নীয়ের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে চড়ে বসলেন তেহরানের বাসে। ভাগ্য আর কাকে বলে! বাসেই ছিলেন হোসেন ফেইজ, তেহরানের এক ক্লাবের কোচ। ফেইজ সব শুনে আমন্ত্রণ জানালেন ক্লাবে, তবে ২ লক্ষ তোমান (৩০ ডলার) লাগবে ট্রেনিংয়ের খরচ বাবদ। কর্পদকহীন আলিরেজার থাকার জায়গাটাই নেই, ওই টাকা আসবে কোত্থেকে!

 

DgknRrqW0AAmKpZ

 


তেহরানে আজাদি টাওয়ারের নিচে থাকা শুরু করলেন উদবাস্তুদের সাথে। এক রাতে তরুণ এক সেলসম্যানের সাথে আলাপ। সেই তরুণ নিজের বাসায় একটা ঘরে থাকার প্রস্তাব দিলেন, রাজিও হলেন আলিরেজা। কিন্তু হঠাৎ করে কী মনে করে মাঝপথ থেকে যেই ক্লাবে ট্রায়াল দিতেন প্রতিদিন সেখানেই ফিরে এলেন। ক্লাবের দরজাতেই ঘুমালেন সেই রাতে। ঘুম ভাঙতেই অবাক হতে হল, পথচারী অনেকে ভিক্ষুক ভেবে পাশে পয়সা ফেলে গেছে। সেই পয়সাতে অনেকদিন পর আরাম করে প্রাতরাশ সারলেন সেই সকালে।

নাছোড়বান্দা আলিরেজার ট্রায়ালে বেশ মুগ্ধ ফেইজ অবশেষে ট্রেনিংয়ের সুযোগ দিলেন মূল দলের সাথে। ক্লাবের এক সতীর্থের বাড়িতে দুই সপ্তাহ থাকলেন বিরানভান্দ। এরপর আরেক ক্লাব সতীর্থের বাবার মালিকানাধীন পোশাকনির্মাণ কারখানায় যোগ দিলেন, যাতে সেখানেই রাতে থাকা যায়।

কিছুদিন পরে কাজ বদলে যোগ দিলেন গাড়ি পরিষ্কার করার গ্যারেজে। ঢ্যাঙা শারীরিক গড়নের জন্য উঁচু সব গাড়ি ধোয়ার কাজে রীতিমত দক্ষ হয়ে গেলেন দ্রুতই। একদিন কাজে যেতেই চমক! কিংবদন্তি ইরানি স্ট্রাইকার আলি দাইয়ি এসেছেন গাড়ি ওয়াশ করাতে। সহকর্মীরা বিরানভান্দকে খুব ধরেছিলো, আলি দাইয়ির সাথে দেখা করে তাঁর স্বপ্নের কথা বলার জন্য। হয়ত ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক গোলের মালিকের এক তুড়িতেই ক্যারিয়ারে নতুন দিগন্ত খুঁজে পেতেন বিরানভান্দ। কিন্তু লজ্জার চোটে নিজের অবস্থার কথা তো দূরে থাক, রীতিমত পালিয়ে বাঁচলেন আলি দাইয়ির কাছ থেকে!

গোলরক্ষক হিসেবে নজর কাড়ছিলেন ভালোই। নাফত-ই-তেহরান কোচের সুনজরে পড়লেন। যোগ দিলেন ক্লাবে। ক্লাব কর্তৃপক্ষ প্রথমে প্রার্থনাকক্ষে থাকার অনুমতি দিলেও কিছুদিন পরে সেটাও আর সম্ভব হল না। থাকার খরচ কুলানোর জন্য কাজ নিলেন এক পিৎজা দোকানে। সেখানেও ঘটলো ভাগ্যের পরিহাস! বিরানভান্দের কাজের ব্যাপারে কিছুই না জানা কোচ পিৎজা কিনতে এসেছিলেন সেই দোকানেই। কোচের মুখোমুখি হতে না চাইলেও দোকান মালিকের জোরাজুরিতে সার্ভ করতে হল লজ্জিত বেইরানভান্দকেই। অপমানিত বোধ করা তরুণ সেই কাজ ছাড়লেন সেদিন রাতেই।

 

“নিজের স্বপ্ন সার্থক করতে গিয়ে বহু রকমের কষ্ট সহ্য করেছি। কোনদিন ভুলে যাবার চেষ্টাও করবো না সেসব দিনের কথা। সেসব দিন আমাকে আজকে আমি যা কিছু, তার জন্য দায়ী”

 

আবার নতুন কাজ খোঁজা রীতিমত দু:সাধ্য হয়ে উঠেছিলো। এবার নিলেন নৈশ পরিচ্ছন্নতা কর্মীর কাজ। সারারাত রাস্তার ময়লা পরিষ্কার করে সকালে ট্রেনিং, বিকেলে খেলা - এই রুটিন মেনে চলা প্রায় অসম্ভব হয়ে যাচ্ছিলো দিনদিন। সেসময় অন্য এক দলের সাথে ট্রেনিং করতে গিয়ে আঘাত পাবায়  নাফত-ই-তেহরান থেকে বিতাড়িত হলেন। যোগ দিলেন হোমাতে, কিন্তু সেখানেও মিলছিল না আরাধ্য 'ব্রেক'। হোমার কোচ স্থায়ী কোন চুক্তিতে সই করাচ্ছিলেন না। ফুটবলার হবার স্বপ্নটা মরে যাচ্ছিলো ঠিকমত শুরু হবার আগেই!

একদিন নাফতের যুবদলের কোচের কল পেলেন, জানলেন যদি অন্য কোন ক্লাবের সাথে চুক্তিবদ্ধ না হয়ে থাকলে নাফতে ফেরার দরজাটা খোলা আছে! ভাগ্যদেবী মুখ তুলে তাকালেন শেষমেষ। চুক্তিবদ্ধ হলেন নাফতের সাথে।

 

“ভাগ্য হয়ত ভালো ছিল বলেই হোমার কোচ আমার সাথে চুক্তিতে যেতে চাননি। যদি ওখানে থেকে যেতাম, হয়ত কোনদিন আজকের জায়গায় পৌছুতে পারতাম না”

 

বিরানভান্দ আলো ছড়ালেন দ্রুত। ইরানের অনূর্ধ্ব - ২৩ স্কোয়াডে সুযোগ মিললো সেই আলোতে, নাফতের মূল দলেও জায়গাটা পাকা করলেন একই বছরে। কিন্তু শৈশবের প্রিয় ‘দাল পারান’ খেলাটাই আনলো ফুটবল বিশ্বের নজরে। পাথর নিক্ষেপের সেই খেলায় সিদ্ধহস্ত আলিরেজা দাল পারানের দক্ষতা প্রয়োগ করলেন ফুটবলে। ইরানিয়ান লিগে ট্রাক্টর সাজির বিপক্ষে ৭০ মিটার থ্রো এসিস্টে ভাইরাল হলেন ইউরোপের মিডিয়াতেও!

 

42965

 



২০১৫ সালে আলিরেজা প্রথমবার জাতীয় দলের জার্সি গায়ে চাপালেন , বাছাইপর্বে ১২ ম্যাচে ক্লিনশিট রেখে ইরানকে প্রথম দল হিসেবে উপহার দিলেন রাশিয়া বিশ্বকাপের টিকেট। দারুণ সময় পার করা ২০১৭ সালে প্রথম ইরানি হিসেবে নমিনেশন পেলেন ফিফা বর্ষসেরা গোলরক্ষকের তালিকাতেও!

বিশ্বকাপে নিজেদের ইতিহাসের সেরা পারফর্ম করা ইরানকে তুলে ধরলেন সবচেয়ে বড় মঞ্চে। তিন ম্যাচ জুড়ে দারুণ সব সেভে আলো কেড়ে নিলেন বাঘা গোলরক্ষকদের কাছ থেকে! পেনাল্টিও ঠেকালেন পাঁচবারের বিশ্বসেরার! তবুও শেষ ষোলোর স্বপ্নটার খুব কাছে গিয়েও পূরণ হলো না! তাতে কী!

বাড়ি থেকে পালিয়ে যে যাত্রাটা শুরু করেছিলেন, বিশ্বকাপের দারুণ নৈপুণ্যেও আদৌ কি শেষ হয়েছে সেই যাত্রা? নাকি কোন ইউরোপিয়ান ক্লাবে ডাক পেয়ে শুরু করবেন নতুন যাত্রা? যাযাবরদের জীবনে যাত্রার শেষ বলে কিছু আছে নাকি! যাযাবর আলিরেজাদের স্বপ্ন সংগ্রামে শেষ বলে কিছু আছে! স্বপ্নের পেছনে দৌড়াতে থাকা গল্পটা বরং আরো সুন্দর করে লিখতে থাকুন বাড়ি পালানো বিরানভান্দ! আমরা সেই গল্পে স্বপ্ন খুঁজতে থাকি বরং!

স্যাল্যুট নেবেন বিরানভান্দ!

 

(দি গার্ডিয়ানে প্রকাশিত বেহনাম জাফরজাদেহ’র লেখা Alireza Beiranvand: from sleeping rough to the World Cup with Iran আর্টিকেল থেকে অনুপ্রাণিত)