• ক্রিকেট

আমাদের ব্র্যাডম্যান

পোস্টটি ৭১৬৭ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

 

এক.

আট-নয় বছর বয়স তখন। দিদার ভাইয়া হঠাৎ একদিন জানালেন, ব্র্যাডম্যান মারা গেছেন। আমি বললাম, সেটা আবার কে ? শুনে দিদার ভাইয়ার এমন অভিব্যক্তি হলো যেন আমার মতো আহাম্মক তিনি জন্মে দেখেননি। আস্তে করে বলেছিলেন, ‘কি বলো, এতদিন খেলা দেখো, আর ব্র্যাডম্যানকে চেন না !’

সেদিন না চিনলেও স্যার ডন ব্র্যাডম্যানকে চিনতে তারপর আর বেশী সময় নিইনি। শৈশবে তাঁর চার রান মিসে, শত গড় না-হওয়ার গল্প ছিল সবচেয়ে প্রিয়। এ্যাশেজ, বডিলাইন, জার্ডিন, ইনভিন্সিবল টিম, উলটো করে একাদশ সাজানো... কত শত গল্প তাকে নিয়ে, কত কীর্তিগাঁথা তাঁর, সবই গিলেছি গোগ্রাসে।

সেসব কথা থাক। এবার আসি আমাদের ব্র্যাডম্যান প্রসঙ্গে। ‘আমাদের ব্র্যাডম্যান’ এই শব্দেগুচ্ছেই লুকিয়ে আছে তাঁর নাম। অবশ্য লুকিয়ে আছে বলছি কেন ? তিনি তো লুকোনো নন, তিনি অবিশ্বাস্য দ্রুততা ও ধারাবাহিকতায় আমাদের ব্র্যাডম্যান বনে গেছেন, প্রকাশ্যে, সগৌরবে ও স্বমহিমায়। চৈত্রের মধ্যদুপুরের তপ্ত সূর্যালোকের মতোই উজ্জ্বল তাঁর কীর্তি, সমুজ্জ্বল তিনি, ভাস্বর তিনি। তাকে ‘লুকোনো’ বলাটা মনে হয় ঠিক হয়নি, না ?

হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন, ‘কিং অব কক্স’ মুমিনুল হকের কথাই হচ্ছে। তিনি ছাড়া ‘আমাদের ব্র্যাডম্যান’ আর হয়েছেন-ই বা কে ? স্যার ডনের সাথে তাঁর ব্যবধান লক্ষ-যোজনেরও বেশী, তবু আমাদের জন্য আমাদের মানদন্ডে তিনিই তো ‘আমাদের ব্র্যাডম্যান’ বনে গেছেন।

এই ‘ব্র্যাডম্যান’ হওয়াটা তাঁর জন্য শাপ হলো নাকি শাপে বর হলো, তা জানাবে সময়। তাই সময়ের হাতে তাকে ছেড়ে দিতেই হচ্ছে আমাদের। সময়ের ভার-বিচার, সময়ের হাতে ছেড়ে দিয়ে, এই পর্যন্ত তাঁর কীর্তিমালা নিয়েই আজকের এই আলেখ্য।

 

দুই.

নিউজিল্যান্ডের রান পাহাড়ে চাপা পড়ে ব্যাথায় কাতরাচ্ছে বাংলাদেশ। প্রায় পৌনে দুইদিন ফিল্ডিং করার ফল হাতে হাতে পেয়েছে বাংলাদেশ। আট রানে দুই উইকেট হারিয়ে ধুঁকছে, দলের ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’ অবস্থায় মধ্যমাঠে প্রবেশ করলেন তিনি। ক্যারিয়ারের মাত্র চতুর্থ টেস্ট, ষষ্ঠ ইনিংসে দেখালেন ছোট কাঁধে পুরো একটা দল, দেশকে বহন করার ক্ষমতা তাঁর আছে। তাঁর ব্যাটে ভর দিয়েই আর কোন বিপদ ছাড়া দল দিন শেষ করতে পেরেছিল। দলীয় সংগ্রহ ১০৩ রানের মধ্যে তাঁরই ছিল ৭৭। পরদিন তাঁর ব্যাট হলো আরো শাণিত, আরো পরিণত। প্রথম দেখা পেলেন তিন অংকের, থামলেন না তাতেই। দলকে মোটামুটি সন্তোষজনক অবস্থানে পৌঁছিয়ে যখন ফিরছেন, নামের পাশে জ্বলজ্বল করছে ১৮১। ক্ল্যাসিক ওয়ান এইটি ওয়ান !

ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরীতেই বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন, সমূহ চাপ সহ্য করার সক্ষমতা তাঁর আছে। ছোটখাটো গড়নের হলেও, তিনি বড় ইনিংস খেলতে জানেন। ভালোভাবেই জানেন। তাই হয়তো পরের তিন সেঞ্চুরীর প্রতিটিই অপরাজিত। কখনো ড্র মেনে নিয়েছে দু’দল, কখনো বা ইনিংস ঘোষণা এসেছে স্ব-দলপতির পক্ষ থেকে।

মাত্র সতেরো টেস্টেই চারটি সেঞ্চুরীর বিপরীতে নয়টি হাফ-সেঞ্চুরী। ধারাবাহিকতা থাকলেও অভিযোগ আছে, অর্ধ-শতক গুলোকে পূর্ণ শতক পর্যন্ত টেনে নিয়ে যেতে না পারার। মুমিনুল সেসব অভিযোগ মাথা পেতে নেন, আর আশ্বাস দেয়ার চেষ্টা করেন, ভবিষ্যতে তিনি সেসব কাটিয়ে উঠবেন। কঠোর পরিশ্রম আর অধ্যাবসায়ের বলে অসম্ভব নয় যে কোনকিছুই।

তিনি পরিশ্রমী, তিনি অধ্যাবসায়ী।

 

তিন.

টেস্ট গড় তাঁর ছাপ্পান। সত্তোরোর্ধ্ব ছিল, হ্রাস পেয়ে পেয়ে ৫৬তে এসে ঠেকেছে। সেটাই স্বাভাবিক। তিনি রক্তমাংসের মানুষ, এই গ্রহেরই একজন, ভিন গ্রহের কেউ নন, এসব জানাতে হ্রাস পাওয়াটাই ছিল স্বাভাবিক। নইলে সাধারণের মাঝে ‘অ-সাধারণ’ বলে তাকে লোকে মানবে কেন ?

শ্বেত পোষাকের এমন ব্র্যাডম্যানীয় কীর্তির পর, পুরো ভিন্ন চিত্রের দেখা মেলে রঙিন বস্ত্রে, তাঁর একদিনের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে। গড় সেখানে মাত্র তেইশ দশমিক ষাট। বড্ড সাদামাটা। তাঁর ব্যাটসম্যানশিপের সাথে যায় না কিছুতেই। কিন্তু পরিসংখ্যান বলে কথা, অস্বীকার করার উপায় নেই তাই।

২৬ ওডিয়াইতে দু’বার ব্যাট করার প্রয়োজন পড়েনি। বাকী ২৪ বারের মধ্যে তিন থেকে নয় নম্বর পজিশনের সবকটাতেই ব্যাট করেছেন, কেবল আট নম্বর ছাড়া। তাঁর এই ছোট্ট ক্যারিয়ারে এটাকে রসিকতা হিসেবেই নিতে পারেন তিনি, সবসময় বড্ড গম্ভীর থাকেন কি না ! তিন নম্বরে ব্যাট করেছেন সবচেয়ে বেশী, পনেরো বার। তাতে আটাশের কিছু বেশী গড়ে করেছেন ৪২১ রান। ক্যারিয়ারের তিনটি ফিফটিই, এই ‘নাম্বার থ্রী’তে। চার ম্যাচের ব্যবধানে তিন ফিফটি যখন করেছিলেন, তখন মোটামুটি নিজেকে গুছিয়ে এনেছিলেন একদিনের ক্রিকেটে। কিন্তু গুছিয়ে থিতু হওয়ার আর সুযোগ পেলেন কই ? তিনি হয়তো ভুলেই গিয়েছিলেন, এদেশে তড়িৎ ফলাফলেরই প্রত্যাশী সবাই। ‘আস্তে ধীরে চিরকেলে হও’ নীতির সুযোগ এখানে নেই। তিনি যদি ক্ল্যাসিক ওয়ান এইটি ওয়ানের মতো কিছু করে ফেলতে পারতেন, তাহলে হয়তো হয়ে যেত। পারেননি, তাই হয়-ও নি।

অনেকেই তাকে বলেন, তিনি টেস্ট-ব্যাটসম্যান। ওয়ানডেতে সুযোগ না পাওয়ায় ভালো। দলটাও এখন ওয়েল ব্যালান্সড। কি দরকার ঝামেলা করার ! হয়তো ঝামেলার দরকার নেই। হয়তো তিনি সাদা পোষাকেই ভাল থাকবেন, তবে তৃপ্ত থাকবেন কি না, কে জানে ! কারো জন্ম হয় ‘একাদশ’ পূরণের জন্য আর কারো জন্ম হয় জায়গা করে নেয়ার জন্য। মুমিনুল হক এর মধ্যে কোন দলে পড়েন তা চাইলে আপনি এখনই ভেবে বের করে নিতে পারেন, নয়তো সময়ের উপড় ছেড়ে দিতে পারেন। তাতেই হয়তো সবচেয়ে সুবিধে। কি বলেন ?

 

চার.

তাঁর সাথে আমার প্রথম পরিচয় সম্ভবত ২০১০ সালে, অনুর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে। আনামুল হক, আবুল হাসান, মাহমুদুল হাসান, অমিত মজুমদার, সাব্বির রহমান, নূর হোসেনদের সাথে মুমিনুলকেও আগামীর সম্ভাব্য তারকা হিসেবে ভেবেছিলাম। সেবার বাংলাদেশ অ-১৯, উইন্ডিজ ও পাকিস্তানের সাথে দুটি ম্যাচে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করে হেরে যায়। মনে হয় প্লেইট চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল।

 পরে ২০১২ বিপিএলে বরিশালের হয়ে দেখি, স্কুপ ও পুলে দারুণ স্বচ্ছন্দ ছিলেন । তারপর তো জাতীয় দলেই চলে এলেন।

তাকে ছাড়া বাংলাদেশ টেস্ট একাদশ ভাবাই যায় না। তবে সংক্ষিপ্ত ক্রিকেটের আঙিনায় তিনি অচ্ছুৎ প্রায় বছর দুয়েক ধরেই। ২০১৪ এর দিকে নিয়মিত ছিলেন, পরে অনিয়মিত হয়ে গেছেন। দলে তাকে নেয়া হলেও কখনো খেলেন নয়ে, কখনো চারে।

যে ফরম্যাটে তাঁর পজিশনের কোন ঠিক নেই। সেখানে তাঁর গড় ঠিক থাকে কি করে ?

এসব নিয়ে আক্ষেপ করতে শোনা যায় না তাকে। নিজের জগৎ নিয়ে আছেন তিনি। মাতৃভক্ত তিনি, মায়ের জন্য, মায়ের মুখের হাসির জন্য শুধু রানের পর রান করে যেতে চান। দলে নিল কি নিল না, কেন নিল না, সেসব নিয়ে ভাবার সময় কই !

বরং তার চেয়ে প্র্যাকটিসে সময় দিলেই আসবে সফলতা, ফুটবে মায়ের মুখে হাসি। তিনি জানেন পরিশ্রমের কোন বিকল্প নেই। নেটে ঘাম ঝরাতে তাই তাঁরও কোন ক্লান্তি নেই।

 

পাঁচ.

সামনে ইংল্যান্ড সিরিজ। দুটি টেস্ট আছে। নিজেকে তৈরী করছেন তিনি। মুমিনুল-ক্ল্যাসিক উপহার দিতে হবে না ! ব্র্যাডম্যানীয় গড়ে সাধারণের মাঝে তাকে ‘অ-সাধারণ’ হতে হবে না ! মায়ের মুখে হাসি ফুটাতে হবে না !

তাই তৈরী হচ্ছেন। নিজেকে ঝালিয়ে নিচ্ছেন, নিজের ব্যাটে দিচ্ছেন শাণ।

চার সেঞ্চুরীর তিনটিই করেছেন, চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে। চার টেস্ট খেলে ১২৫.২৫ গড়ে করেছেন ৫০১ রান। তিনি ‘কিং অব কক্স’, কক্সবাজার তাঁর শহর, তাঁর বাড়িঘর। চট্টগ্রাম তাঁর বিভাগীয় শহর। সেজন্যেই হয়তো এই মাঠের সাথে এক অদ্ভুত টান আছে তাঁর। এই মাঠ তাকে দিয়েছে দু’হাত ভরে।

ইংল্যান্ড সিরিজেও একটি টেস্ট খেলতে এখানখার মাঠে ফিরবেন তিনি। জেডএসিএস কি তাকে এবার ফিরিয়ে দেবে ? নাকি দেবে বরাবরের মতো হৃদয় উছলে ?

 

ছয়.

আজ তাঁর ছাব্বিশতম জন্মদিন। পঁচিশ পূর্ণ করলেন তিনি। আর কি আশ্চর্য্য, এমন একদিনে তাঁর জন্মদিনটা এলো, ভালোভাবে উদযাপনই যে করতে পারবেন না ! দল অন্তঃপ্রাণ তিনি, দল হেরে গেছে গতকাল। তিনি কি ভাল আছেন ? ভাল থাকতে পারেন ?

জন্মদিনে আপনাকে অনেক অনেক শুভেচ্ছা, মুমিনুল হক সৌরভ।

আগামীর সময়গুলো আপনার ব্যাটিং-সৌরভে, কীর্তি-গৌরবে ভরিয়ে দিয়ে রঙিন করে তুলবেন আমাদের ক্রিকেট, জন্মদিনে এই আমাদের কামনা।

 

________

এক রাশিয়ান ঈগলের গল্প
    অন্যান্য
এক রাশিয়ান ঈগলের গল্প
তুমি আসবে বলে.....!
    ক্রিকেট
তুমি আসবে বলে.....!