• ক্রিকেট

সেদিনের সেই ছোকরার পঞ্চাশতম টেস্ট

পোস্টটি ১২৭৪০ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

সেবার বিলেতি গ্রীষ্মের সূচনায় আমন্ত্রণ পেলো বাংলাদেশ। প্রথমবারের মতো একদা শাসকদের দেশে, শাসকদের বিপক্ষে, ক্রিকেটের অভিজাত আঙিনায়, আভিজাত্যের লড়াইয়ে নামার সুযোগ পেলো বাংলাদেশ। ক্রিকেট-তীর্থ লর্ডসে প্রথম টেস্টে খেলতে নেমে বাংলাদেশের ব্যাটিং বিপর্যয়ের সুযোগে, ছয় নাম্বারে একটা ছোট্ট বালক ব্যাট হাতে নেমে পড়ে। দেখে মনে হতে পারে, ছেলেটা স্কুল পালিয়ে ক্রিকেট খেলতে চলে এসেছে। আদতে তা নয়। তাকে রীতিমতো ডেকে এনে নামিয়ে দেয়া হয়েছে ক্রিকেটের সবচেয়ে পুরাতন আঙিনায়, ক্রিকেট-কৌলিণ্যের ধারক-বাহকদের বিপক্ষে।

ম্যাথু হগার্ডের বলে বোল্ড হওয়ার আগ পর্যন্ত ছোকরাটা দাঁতে দাঁত চেপে চেষ্টা করল, দলের বিপর্যয় ঠেকানোর। কিন্তু পারল না, আউট হয়ে গেলো। বিপর্যয় ঠেকাতে না পারলেও নিজেকে ভালোমতোই চিনিয়ে গেলো সে, বুঝিয়ে গেলো নিজের ক্লাস, দেখিয়ে গেলো নিজের ব্যাটসম্যানশিপ!

50729

তাই ঠোঁটকাটা-সমালোচক জিওফ্রে বয়কট, তাকে দেখে সমালোচনার কিছু খুঁজে পান না। উলটো বলে উঠেন, ‘আরে, ছোকরাটার টেকনিক তো দেখি জবরদস্ত।’

হ্যাঁ, ছোকরাটা বাংলাদেশের বিশুদ্ধতম ব্যাটসম্যানদের একজন। যাকে টেকনিক্যালি নিঁখুতই বলা হয়!

 

২০০৭ বিশ্বকাপে খেলতে যাওয়ার আগে টিম-ম্যানেজমেন্ট ঘটিয়ে দিলেন, ভয়ানক এক কান্ড। দলের সবচেয়ে অভিজ্ঞ ও বিশ্বস্ত মানুষটির বদলে, উইকেট রক্ষকের গ্লাভস তুলে দিলেন, অপেক্ষাকৃত নবীন ও তরুণ এক ছোকরার হাতে। যুক্তি দিলেন, ছোকরা ব্যাটিংয়ে বড় ভালো!

আচ্ছা, দেখা যাবে।

বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচ ভারতের বিপক্ষে। শাহরিয়ার নাফিসের প্রথম উইকেট পতনের পর ছোটখাটো গড়নের ছোকরাটি সাবলীল ভঙ্গিমায় মাঠে প্রবেশ করল। আরে, এ কেন? আফতাব কই?

তামিমের উন্মত্ত ব্যাটের অন্যপাশে সংযত-স্থির ব্যাটিংয়ে ছোকরা বুঝিয়ে দিল, সে কেন নেমেছে! কি তাঁর প্রয়োজনীয়তা! সেই যে নামলো, ছোকরা আর আউটই হলো না। মুনাফ প্যাটেলের বলটিকে স্কোয়ার ড্রাইভে পাঠিয়ে দিল, উইনিং রানের জন্য। আশ্চর্য্য সতর্কতায় ঐতিহাসিক এক জয়ের ভিত গড়ার পাশাপাশি দলকে জয়ের বন্দরে পৌছে দিয়ে, গালভর্তি হাসি নিয়ে, তবেই ছোকরা মাঠ ছাড়ল।

 

আচ্ছা, ছোকরাটি কে চিনতে পেরেছেন তো? নাকি এখনো ভ্রু কুঁচকে ভাবছেন, এ আবার কে? নাকি প্রথম থেকে মিটি মিটি হাসি নিয়ে বলছেন, এ আমাদের মুশফিকুর রহিমের কথাই হচ্ছে নিশ্চয়।

 

জেমি সিডন্স তখন বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের কোচ। তিনি হঠাৎ একদিন ঘোষণা দিলেন, ‘মুশফিকুর রহিম, গোল্ডেন বয় অব বাংলাদেশ।’ শুনে হাসি আমাদের আর ধরেই না। বলে কি এই ঠেকো মাথার সিডন্স! প্রতি ম্যাচে যার হাত দিয়ে দু-চারটি বল অনায়াসে গলে যায়, ব্যাটিংয়ে যে এখনো সেই বিশ্বকাপের একটি ম্যাচের সুখ-স্মৃতি হয়ে আছে, সে কি না আমাদের দেশের সোনার বালক! গোল্ডেন বয়! সিডন্সের কি মাথাটাথা খারাপ হয়ে গেলো?

উত্তরোত্তর বুঝতে পারলাম, সিডন্স তাঁর জায়গায় ঠিক ছিলেন। আমরা ভুল ছিলাম। ছেলেটি আসলেই বাংলাদেশের সোনার বালক। ছোটখাটো হলেও বাহুতে তাঁর আশ্চর্য্য জোর। ব্যাটে তাঁর নিশ্চিত নির্ভরতা। গ্লাভসের ভুলগুলি শোধরানো না গেলেও, কঠিন পরিশ্রমে তাঁর ক্লান্তি নেই। তিনি নিজেকে আরো নির্ভুল, আরো ত্রুটিহীন করার জন্য, খাঁটছেন নিয়মিতই।

 

সময়ের ভেলায় চড়ে ছোকরা থেকে হলেন পরিণত যুবক। তাই বাংলাদেশ দলের অধিনায়কত্ব চাপলো, তাঁর ছোট কাঁধে। তিনি জানিয়ে দিলেন নেতৃত্ব দিতে তাঁর কাঁধ যথেষ্ট শক্ত-সমর্থ। দলকে এশিয়াকাপের ফাইনালে তুললেন, পূর্ণ শক্তির ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজ জেতালেন, নিউজিল্যান্ডকে তিন ম্যাচের তিনটিতেই হারিয়ে ধবল ধোলাই করলেন। শ্রীলংকায় গিয়ে টেস্ট ইতিহাসের মাত্র দ্বিতীয় উইকেট রক্ষক-দলনায়ক হিসেবে করলেন দ্বিশতক। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে তিন টেস্টের সিরিজ জিতে সাদা পোষাকেও  পেলেন ধবল ধোলাইয়ের অমৃত স্বাদ।

155296.2

 

অধিনায়ক হিসেবে খুব বাজে সময় কাটিয়েছেন। ফলস্বরুপ, রঙিন পোষাকের অধিনায়কত্ব হারিয়েছেন। স্ট্যাম্পের পেছনে শিশুতোষ ভুলে কঠিন সমালোচনার সম্মুখীনও হয়েছেন। শুধু একটা জায়গায় নির্ভরতা ছিলেন, আছেন। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ব্যাটিং লাইন আপের অন্যতম স্তম্ভ বলা হয় তাকে। শুরুর দিনগুলোর মতো এখনো তিনি, এখানে একদম নিঁখুত।  

তাঁর মতো বিশুদ্ধ ব্যাটসম্যান বাংলাদেশে তো বটেই, আধুনিক ক্রিকেটেও এখন খুঁজে পাওয়া ভার।

 

হাঁটি হাঁটি পা পা করে এগারো বছর কাটিয়ে দিয়েছেন ক্রিকেটের আন্তর্জাতিক আঙিনায়। দলের নির্ভরযোগ্য ব্যাটসম্যান হয়েছেন, সাদা পোষাকে দলের নেতৃত্বও দিচ্ছেন।

লর্ডস থেকে মিরপুর পর্যন্ত অনেক উত্থান-পতন দেখেছেন। অনেকের অনেক মাইলফলক স্পর্শের মুহূর্তের স্বাক্ষীও হয়েছেন। আজ সেই তিনি নিজেই স্পর্শ করলেন একটি মাইলফলক। দেশের ইতিহাসে মাত্র তৃতীয় ক্রিকেটার হিসেবে খেলছেন, পঞ্চাশতম টেস্ট।

ক্রিকেটের বৃহৎ পাতায়, তাঁর পঞ্চাশতম টেস্টে অংশগ্রহন হয়তো তেমন কিছু নয়। কিন্তু বছরে দু-চার, পাঁচটি টেস্ট খেলা একটি দল, যারা তেরো মাস-পনেরো মাস বিরতি দিয়ে নামে সাদা পোষাকের ক্রিকেট খেলতে, সেই তাদের একজন হয়ে অবশ্যই অনন্য এক অর্জন এটি।

 

সেদিনের সেই ছোকরা মুশফিকুর রহিম একদিন আরো বড় হবেন। ক্রিকেটের একজন কিংবদন্তী, মহীরুহও হয়ে উঠবেন। হয়তো একদিন শততম টেস্টও খেলবেন, আর আমরা ক্রিকেটের পাঁড় সমর্থক থেকে শুরু করে সাধারণ দেশবাসী পর্যন্ত সবাই মহা সমারোহে তা পালন করবো, সেই প্রত্যাশাই করছি।

মুশফিকুর রহিম! আপনার জন্য রইলো অনেক অনেক শুভকামনা।

অর্ধশততম টেস্টে আপনি আমাদের অষ্টম টেস্ট জয় এনে দিয়ে, আপনার এই অর্জনকে আরো বর্ণিল, আরো রঙিন করে তুলবেন, এই কামনা কি খুব বাড়াবাড়ি হয়ে যায়? বলুন?  

 

_____