• ফুটবল

আমি বেঁচে ছিলাম ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর সময়ে!!!

পোস্টটি ৭৮৯৬ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

    ২০১৩ সালের নভেম্বর মাস।

হাসপাতালে শুয়ে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছিল পোলিশ কিশোর ডেভিড পাওলাকজিক। সাইক্লিং করতে গিয়ে এক্সিডেন্টে মারাত্মকভাবে আহত হয়ে কোমায় চলে গিয়েছিল সে। আশা ছেড়েই দিয়েছিলেন ডাক্তাররা, কারণ কোমা থেকে ফিরে আসার হার খুবই কম।

কিশোর ডেভিড ছিল এক ফুটবলারের অন্ধভক্ত। সেই ফুটবলারের নাম ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। সৌভাগ্যক্রমে রোনালদো সেদিন পর্তুগালকে বিশ্বকাপে নিয়ে যাওয়ার জন্য লড়ছিলেন প্লে-অফ ম্যাচে, সুইডেনের সাথে।

ডেভিডের বাবা-মা শেষ একটা চেষ্টা করবেন ঠিক করলেন। ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে ছেলের কানে লাগিয়ে দিলেন হেডফোন। পর্তুগাল বনাম সুইডেনের খেলার ধারাভাষ্য হেডফোনের মাধ্যমে পৌঁছে যেতে থাকল ডেভিডের কানে। সেই ম্যাচে হ্যাট্রিক করে সুইডেনকে ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলেছিলেন রোনালদো একাই।

তারপর?

তারপর সবাইকে অবাক করে কোমা থেকে বেরিয়ে এল ডেভিড। এখন ভালো আছে সে। এইতো কদিন আগে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর সাথে দেখাও হয়েছে তার।

কী বলবেন একে?

মিরাকল?

উঁহু, এটা আসলে ম্যাজিক।

ক্রিস্টিয়ানো ম্যাজিক।

1478039158_571910_1478039526_sumario_normal

 

 

২.

 

    ইউরো ফাইনালের ৭৯ মিনিটে রেনাটো সানচেজের বদলি হিসেবে এডার যখন মাঠে নামলেন তখন সাইডলাইন থেকে ইঞ্জুরড ক্যাপ্টেন তার কানে মন্ত্র জপে দিলেন, “তুমিই আজ গোল করবে।”

    বাকিটা তো সবারই জানা।

    সোয়ানসি সিটির হয়ে এডারের আগের ১৩ ম্যাচে গোলের সংখ্যা ছিল ০ । কিন্তু ক্যাপ্টেন ক্রিসের কথা যেন এক তালিসমান, যেন এক সঞ্জিবনী সুধা যা চরম গোলখরায় ভোগা একজন ফুটবলারকেও মুহূর্তের মধ্যে বানিয়ে দিল একজন গোলস্কোরার।

কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন বিষয়টা? ক্রিসের জহুরীর চোখ নাকি ম্যাজিক?

অবশ্যই ম্যাজিক।

ক্রিস্টিয়ানো ম্যাজিক।   

Euro-2016-Final-Portugal-v-France

৩.

   

ইউরো ফাইনালের পর পেপে তার অধিনায়ককে কাপ উৎসর্গ করেছিলেন। বলেছিলেন, “রোনালদোর জন্যই আমাদের জিততে হতো।” পঁচিশ গজের দুর্দান্ত শটে গোল করা এডার বলে ফেলেছেন, “এ রকম ক্যাপ্টেন থাকলে আপনাআপনি চার্জড আপ লাগে।” তবে আসল কাজটা বোধহয় করেছিলেন কোচ ফারনান্দো সান্তোস। তিনি হাফটাইমে শিষ্যদেরকে বলেছিলেন, “চলো, আজ রোনালদোর জন্য শিরোপাটা জিতি।”

সবসময় জেনে এসেছি, ব্যক্তির আগে দল, দলের আগের দেশ। কিন্তু যখন দেশের আগে, দলের আগে একজন নেতার জন্য সতীর্থরা নিজেদের উজাড় করে দেন তখন সেই নেতা সম্পর্কে অনেক কিছুই বলা যায়, আবার কিছু না বললেও হয়।

কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায় একে? ক্রিসের ব্যক্তিত্ব নাকি নেতা ক্রিসের নেতৃত্ব? কীসের প্রভাবে চোখে পানি নিয়ে মাঠ ছাড়া নেতার জন্য শেষপর্যন্ত জান লড়িয়ে দেন নানি, কোয়ারেসমা, পেপেরা?

কে জানে!!! তবে এটুকু জানি, যদি কখনও নেতা হই তবে ক্রিসের মতো নেতা হতে চাই।

ইস্পাত কঠিন মনোবলের এক দুর্ধর্ষ যোদ্ধা। মাঠে না থেকেও একজন দুর্দান্ত নেতা, পিছিয়ে পড়েও হার না মানা মানসিকতার এক অদম্য গ্ল্যাডিয়েটর।

ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো!!!!!!

 

www.usnews.com



৪.

    ২০১৬’র ফেব্রুয়ারি মাসে মালাগার সাথে ড্র করার পরে রিয়াল মাদ্রিদের টেবিল টপারদের সাথে পয়েন্ট ব্যাবধান দাড়িয়েছিল ১০।অত্যন্ত বাজে ফর্মে থাকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর ছবি ছাপিয়ে তখন কাতালান পত্রিকা 'স্পোর্টস' ক্যাপশন দিয়েছিলো দ্য এন্ড।এরপরে রোনালদোর রিয়াল মাদ্রিদ এক পয়েন্টের গ্যাপে সিজন শেষ করে,চ্যাম্পিয়ন্স লীগ জিতে,রোনালদো ইউরো জিতেন এবং উয়েফা প্লেয়ার অফ দ্য সিজন নির্বাচিত হন।

আসলেই দ্য এন্ড।

চ্যাম্পিয়নরা এরকমই হন। যখন সবাই তাঁদের শেষ দেখে ফেলে, লিখে ফেলে ক্যারিয়ারের এপিটাফ ঠিক তখনই তাঁরা জ্বলে ওঠেন।

    অনেকেই প্রশ্ন করেন আমি ক্রিসকে কেন এত পছন্দ করি। প্রধানত, তার খেলার জন্য। কিন্তু আমার সবচেয়ে বেশি পছন্দ তার হাল না ছাড়ার গুণটা। ‘নেভার, নেভার, নেভার গিভ আপ।’ এটাই ক্রিসের জীবনের মূলমন্ত্র। এবং সত্যি কথা হলো, এই গুণটাই আজ তাঁকে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো বানিয়েছে।

নশ্বর মানুষের প্রতীক হয়ে প্রতিনিয়ত লড়ে যান ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো আর আমাদের মনে করিয়ে দেন মানুষের অসাধ্য কিছু নেই।

ক্রিস্টিয়ানো কখনও জানবেও না নিজের অজান্তেই সুদূর বাংলাদেশের এক ছেলে যে কিনা আগে অল্পতেই হাল ছেড়ে দিত সে এখন কোনওভাবেই হাল ছাড়তে চায় না। ক্রিস্টিয়ানো আমাকে শিখিয়েছে শেষমুহূর্ত পর্যন্ত হাল ছেড়োনা।

    বাদ দেন। আসেন জীবনানন্দ দাসের কবিতার দুই লাইন আবৃত্তি করি।

“আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,

আমারে দুদণ্ড শান্তি দিয়েছিলো পর্তুগাল ও রিয়াল মাদ্রিদের ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো সেন।”



৫.

একদিন আমার বয়স হবে।

চামড়া জড়িয়ে যাবে।

হাতে থাকবে লাঠি।

চোখে থাকবে ভারী কাঁচের চশমা।

সেদিনও ফুটবল হবে।

সেদিন কেউ পায়ে রেশমী রুমাল জড়িয়ে চর্মগোলককে দিয়ে বলাবেন নিজের কথা।

সবুজ গালিচায় কেউ বুলিয়ে যাবেন ড্রিবলিঙের মায়াবী আবেশ।

কেউ ডিবক্সের বাইরে থেকে বুলেটগতির শটে গোলকিপারকে করবেন পর্যদুস্ত।

এসব দেখে মুগ্ধ হবো আমি। হয়তো মনেও হবে, ‘আরে এই ছেলেটা ক্রিসের মতো খেলে না?’

তারপরে নিজেই হেসে ফেলব। অনেক আগে দেখা এক সিনেমার কথা মনে পড়ে যাবে আমার। যে সিনেমায় চঞ্চল চৌধুরীর ডায়লগ ছিল, “আয়না একজনই!”

আমি বিড়বিড় করব, ‘ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ছিল একজনই!’

আমার সৌভাগ্য।

আমার পরম সৌভাগ্য।

কারণ আমি বেঁচে ছিলাম ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো’র সময়ে।