X
GO11IPL2020
  • ক্রিকেট

মাশরাফির বচন, মাশরাফির দর্শন

পোস্টটি ১১৭৪৬ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

আমার কাছে মাশরাফি এক অদ্ভুত মুগ্ধতা! কৃষ্ণ গহ্বরের অতল রহস্যের মতো এই মুগ্ধতার যেন শেষ নেই, কোন সীমা-পরিসীমা নেই। শুধু আমার কাছে কেন, এদেশের লক্ষকোটি ক্রিকেটামোদীদের কাছেই তিনি এমন। মনে হয় তাঁর কাছে আশ্চর্য্য এক জাদুর কাঠি আছে, যা দিয়ে তিনি অনায়াসে মানব-হৃদয়ে জায়গা করে নিতে পারেন। দূর্বোধ্য তাঁর ব্যক্তিত্ব, দূর্বোধ্য তাঁর সম্মোহন।
মাশরাফির জীবন-দর্শন, চলন-বলন, বচন-বাঁচন... তাঁর সব-সবকিছু আমাদের ভাল লাগে। তুঙ্গস্পর্শী জনপ্রিয়তা তাঁর। নিপাট-নিস্কলুষ চরিত্র বলে, সর্বজন গ্রহনযোগ্য হয়েছেন। আসন নিয়েছেন আপামর জনতার হৃদয়ের মণিকোঠায়।
মাশরাফি তাই আমাদের কাছে এক উন্মাদনা, মন-প্রাণ উছলে উঠা ভালবাসা।

তাঁর সম্পর্কে এই যে এতকিছু, আমাদের এত উচ্ছ্বাস তা কি বড্ড বাড়াবাড়ি? এর কি আসলেই কোন যৌক্তিকতা আছে? ‘মাশরাফি-রব’ কি বাংলাদেশীদের চিরন্তন হুজুগের কোন একটি?
তাকে নিয়ে বই লেখা হয়েছে, লিখেছেন দেবব্রত মুখোপাধ্যায়। যিনি মাশরাফিকে আখ্যায়িত করেছেন ‘আচার্য্য মাশরাফি, আশ্চর্য্য মাশরাফি’ বলে। মাশরাফি কেন আশ্চর্য্য? কেন আচার্য্য?

ছেলে সম্পর্কে বাবা স্বপন মুর্তজার বক্তব্য এরকম, “ও যেন মানুষের উপকার করলেই স্বস্তি পায়। অর্থকড়ির দিকে ওর মন নেই বললেই চলে। ও যে ব্যাংকে টাকা রাখে, সেখান থেকে সুদ নেয় না। ইসলামে সুদ নিষিদ্ধ বলেই ও ওটা এড়িয়ে যায়। আপনি শুনলে অবাক হবেন, আমার ছেলে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে। শুধু পাঁচ ওয়াক্তই নয়। ও নিয়মিত তাহাজ্জুতের নামাজও পড়ে। শুধু নিজেই পড়ে তা নয়। বন্ধুবান্ধবদেরও নামাজে তাগিদ দেয় সব সময়। একটা ঘটনার কথা বলি, আইসিএলে যখন বাংলাদেশ দলের বিশাল একটা গ্রুপ গেল। মাশরাফির কাছে ১৬ কোটি টাকার অফার এসেছিল। বলেছিল ব্যাংক অ্যাকাউন্টে চলে যাবে টাকা। আমার ছেলে কী বলেছিল শুনবেন। ‘আমি পতাকার জন্য খেলি। টাকার জন্য না’।”


মা হামিদা মুর্তজা বলেছেন, “ওর তো কোনো দিনই কোনো চাহিদা ছিল না। শীতকালে যদি সোয়েটার না থাকত, ও পাঁচ–ছয়টা শার্ট একবারে পরে নিত। লুঙ্গি ছিঁড়ে গেলেও কাউকে কিছু বলত না। বরং মজা করে আমাকে বলত, আম্মা, বলো তো কয়টা শার্ট গায়ে দিয়েছি? আর জানেন, কোনো ম্যাচে জিতলে আমাকে ফোন করে বলবে, আম্মা তুমি খুশি? আর জিততে না পারলে ঘরে বসে থাকবে একা একা। কারও সঙ্গে কথা বলবে না। বউ–বাচ্চার সঙ্গেও কথা বলবে না। ও নিজের কষ্টটা কাউকে জানতে দিতে চায় না। ও কোনো দিন কারও কাছে কিছু চায়নি।”

তাদের না-হয় ছেলে তাই হয়তো অমন বলছেন। আর সবাই কি তাই ভাবে?
ডাঃ ডেভিড ইয়াং। বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্থোপেডিক সার্জন। বাংলাদেশ ক্রিকেটের অকৃত্রিম-বন্ধু, অস্ট্রলিয়া প্রবাসী ‘একরাম বাবু’ জানালেন, সেই ডাঃ ইয়াং-ও মাশরাফিকে ‘অতিমানব’ বলেই রায় দিয়েছেন।
“ডাঃ ডেভিড ইয়াং অনেকবার বলেছেন, ক্রিকেট, ফুটবল, রাগবি, রুলস ফুটবলসহ বিশ্বের অনেক খেলার নামকরা অনেক ক্রীড়াবিদকে উনি দেখেছেন, চিকিৎসা করেছেন। কিন্তু মাশরাফির মত এতটা শক্ত মানসিকতার আর কাউকে দেখেননি। মাশরাফি আসলে একটা অতিমানব।”

সাংবাদিক দেবব্রত মুখোপাধ্যায় একবার সাকিবকে ধরলেন। জিজ্ঞেস করলেন, ‘মাশরাফি তো একটা হাইপ। আসলে কী ক্রিকেটার মাশরাফি অতো বড় কিছু?’
সাকিব আল হাসান জবাবে বলে ঊঠেন, “এই কথার কী উত্তর দিবো! বোলার কৌশিক ভাইয়ের কথা বাদ দেন। ব্যাটসম্যান মাশরাফির কথা ভাবেন শুধু। বাংলাদেশের হয়ে কতো রান করেছেন উনি? হাজার দেড়েক। এই দেড় হাজার রান দিয়ে উনি বাংলাদেশকে যে কয়টা ম্যাচ জিতিয়েছেন, তা আমরা তিন-চার হাজার রান করে করতে পারিনি। ওনার ১৫ রান মানেই ম্যাচে আমরা এগিয়ে গেলাম। শোনেন, একটা কথা বলি। কৌশিক ভাই নিজেকে নিয়ে খামখেয়ালী না করলে সে হতো বিশ্বের সেরা অলরাউন্ডার। কৌশিক ভাই কতো বড় অলরাউন্ডার হতে পারতেন, উনি নিজেও জানে না।"
"মাশরাফি ভাই মিথ নন; রিয়েল।"
অনেকেই সাকিব-মাশরাফির মাঝে কি এক বায়বীয় দ্বন্ধ খুঁজে পান। এরপরও কি তাঁরা কিছু পাবেন?

আচ্ছা সে না-হয় সতীর্থ, তার উপর ‘ক্যাপ্টেন’ তাই হয়তো অমন বলেছেন।
থাক, এসব বাদ দিই। তার চেয়ে আসুন দেখি, মাশরাফির দর্শন, জীবনকে দেখার ভঙ্গী, তাঁর বচন, সেসব কোন ভূমিকা রেখেছে কি না, তাঁর আজকের এই অসাধারণত্বে উত্তোরণের পেছনে।

261112.3

                  উর্ধ্বপানে ওভাবে কি দেখছেন মাশরাফি? নিজের গগনচুম্বী জনপ্রিয়তা?

বিভিন্ন সময়ে মাশরাফির দেয়া সাক্ষাৎকার, কলাম, প্রেস-কনফারেন্স... ইত্যাদিই হচ্ছে এই অংশের উৎস।

জীবন-দর্শনঃ
"জীবনটা যদি, একশতলা একটা ভবন হয়, তাহলে ক্রিকেট হচ্ছে সেই একশতলা ভবনের মাত্র দুটি তলা। অবশ্যই কিছু কিছু প্লেয়ারের কাছে ক্রিকেটই ধ্যানজ্ঞান, ক্রিকেটই সবকিছু। তবুও এর বাইরেও তাদের একটা জীবন আছে, জগৎ আছে। বাবা-মা আছেন, স্ত্রী-সন্তান আছে। সে হিসেবে বলতে গেলে তো ক্রিকেট কিছুই না। তাই জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, প্রতি মুহূর্তে আমাদের বেঁচে থাকা।"

অদম্য মনোবলের উৎসঃ
"বারবার ইনজুরি থেকে ফিরে আসার প্রেরণা পাই সেসব বীর মুক্তিযোদ্ধার কাছ থেকেই। এমনও ম্যাচ গেছে আমি হয়তো চোটের কারণে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছিলাম না। দুই-তিনটা বল করেই বুঝতে পারছিলাম সমস্যা হচ্ছে। তখন তাঁদের স্মরণ করেছি। নিজেকে বলেছি, ‘হাত-পায়ে গুলি লাগার পরও তাঁরা যুদ্ধ করেছিলেন কীভাবে? তোর তো একটা মাত্র লিগামেন্ট নেই! দৌড়া...।’
"দেশের পতাকা হাতে দেশের জন্য দৌড়ানোর গর্ব আর কিছুতেই নেই। পায়ে আরও হাজারটা অস্ত্রোপচার হোক, এই দৌড় থামাতে চাই না আমি।"

এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে না কো তুমিঃ
"আমি তো পৃথিবীর অন্তত ২০–২৫টা দেশ ঘুরেছি। কিন্তু কখনোই আমার মনে হয়নি, আমার দেশটা কোনো দেশের চেয়ে ছোট। আমাকে যদি কেউ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে অন্য দেশে থাকতে বলে, তাহলেও আমি তা নেব না। ফিরে আসব দেশে। এটা দেশপ্রেম কি না জানি না। শোনেন, বিশ্বাস একটা বড় জিনিস। সহজভাবে কত কথাই তো আমরা বলে ফেলি। কিন্তু যে বিশ্বাস করে কিছু বলে, সে–ই বলে সত্য কথা। আমি আমার দেশকে খুব ভালোবাসি।
"শোনেন, একুশে ফেব্রুয়ারি আর মুক্তিযুদ্ধের যে গানগুলো আমাদের আছে, তা হলো বিশ্বসেরা। এ রকম অনুপ্রেরণা দিতে পারে, এমন গান কি আর কারও আছে? আমার কী মনে হয় জানেন? ফিলিংস বা অনুভবটা হলো মূল। ওটা থাকলে দেশের কথাই সবার আগে মনে পড়বে।"

নানা-নানীঃ
আমার ক্রিকেটার হিসেবে পরিচিতির পেছনে সবচেয়ে বড় ভুমিকা ছিল আমার নানীর। নানী না থাকলে আমি কখনোই ক্রিকেটার হতে পারতাম না। অথচ আমার ইন্টারন্যাশনাল ডেব্যুর কিছু দিন আগেই আমার নানী মারা যান। তিনি বেঁচে থাকা অবস্থায় আমাকে ন্যাশনাল টিমের জার্সিতে দেখলে কতই না খুশি হতেন! আবার আমি ছোটবেলা থেকেই অংকে খুব কাঁচা ছিলাম। ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত আমি সব সাবজেক্টেই ৯৫-৯৮ মার্কস পেতাম, কিন্তু অংকের কারণে পিছিয়ে যেতাম, রোল চলে আসতো দশের ঘরে। এরপর নানা আমাকে অংক করাতেন। যেদিন আমি অংকে ১০০ পেলাম, রেজাল্টশিট হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি…নানা রিকশা থেকে নেমেই বমি করা শুরু করলেন। পুরো ঘর ভেসে গেল বমিতে। ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হলো তাঁকে, হার্ট অ্যাটাক করেছিলেন, মারা গেলেন। আমি জন্মের পর থেকে এই দুজন মানুষের কাছে বড় হয়েছি, ঘুমুতামও নানা-নানীর মাঝখানে। আমার দুইটা আনন্দের দিনে কাউকেই পাশে পাইনি, তাঁদের এই প্রাপ্তির কথা জানাতে পারিনি।"

আদর্শ অর্ধাঙ্গঃ
"আমার মেয়ে যখন হয়, আমার ওয়াইফ কিন্তু ক্লিনিক্যালি ডেডই ছিল। ১৩ দিন ছিল আইসিইউ-তে, ২৪ ব্যাগ রক্ত দিতে হয়েছে, প্লাজমা দিতে হয়েছে ৪-৫টা। ও শারীরিকভাবে ওই এক বছর ভীষণ অসুস্থ ছিল। এবং আল্লাহর কুদরত, আমি তখন ইনজুরড ছিলাম। তো অপারেশনের পরে বাসায় নিয়ে আসি দুইজনকেই। সারা রাত আমার স্ত্রীর যেন রেস্ট হয়, আমি আমার বাচ্চাকে কোলে রাখতাম, পায়চারি করতাম। তো সকাল হলে বাচ্চাকে ওর কাছে রেখে একটু ঘুমুতে যেতাম। তারপর ঘুম শেষে যেতাম প্র্যাক্টিসে। এভাবেই কেটেছে দিন। আমি হয়তো আদর্শ স্বামী নই, তবু এই উদাহরণটা দিলাম। কারণ স্ত্রীর প্রতি সাপোর্টিভ না হলে আপনি কেমন স্বামী হলেন? হয়তো একটু কষ্ট হবে, কিন্তু এতটুকু তো করতেই হবে। খেলার মাঠে অনেক চ্যালেঞ্জ উতরাতে হয়। কিন্তু সন্তানদের মানুষ করা- এটাই জীবনের সবচে’ বড় চ্যালেঞ্জ।"

ইঞ্জুরি থেকে ফেরার প্রেরণাঃ
"আমার বিশ্বাস, দলের প্রতিটি খেলোয়াড়ই আমাকে পছন্দ করে। সবাই চায় আমি তাড়াতাড়ি ফিরি, আমাকে সাহস দেয়। এগুলো প্রেরণা যোগায় আমাকে।
"আমার সবচেয়ে বড় ডাক্তার বলেন বা ওষুধ বলেন, সে হলো আমার বন্ধুরা। আমার পুরোপুরি বিশ্বাস, বন্ধুদের জন্যই এত ইনজুরির পরও আমি টিকে আছি, আর কারও জন্য না।"

জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জঃ
মাশরাফিকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো, দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে দলকে জয়ের পথে ফেরানোটা জীবনের অন্যতম চ্যালেঞ্জ ছিলো কি না।
মাশরাফি একটু হাসলেন। একেবারে চমকে দিয়ে বললেন, "ক্রিকেট মাঠে কখনো মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ লুকিয়ে থাকতে পারে না, ‘মানুষের জীবনে প্রত্যেকটি দিনই একটা নতুন চ্যালেঞ্জ। চ্যালেঞ্জ বলতে আমি শুধু বুঝি, আমার একটা ছেলে আছে, একটা মেয়ে আছে; তাদেরকে মানুষের মতো মানুষ করে তোলাই আমার চ্যালেঞ্জ। খেলাধুলা অবশ্যই বড় ব্যাপার। তবে জীবনের চেয়ে বেশী চ্যালেঞ্জিং সেটা হতে পারে না।"

ইচ্ছা-কথা, রাগ-ব্যাথাঃ
"আমার প্রতিটি টিমের সঙ্গেই জেদ লাগে। কারণ, ওরা আমাদের ইচ্ছামতো টেস্ট ম্যাচে হারিয়েছে, ইচ্ছামতো ওয়ানডে ম্যাচে হারিয়েছে। খুব মন চায়, ওদের ইচ্ছামতো পিষতে। পাকিস্তান-ভারত এটা কোনো ব্যাপার না। তবে সবচেয়ে বড় একটা ব্যাপার বলতে পারেন, খারাপ লাগে যখন একজন ধারাভাষ্যকার কোনো বড় দলের খেলোয়াড়ের পক্ষ নেয়। আসলে এখানে তো টাকাটাই বিষয়, শুধু সাজানো কথা ওরা বলে যাচ্ছে। আমি সহানুভূতির কথা বলছি না, কিন্তু যে ভালো খেলছে, তাকে ভালো বলবে না কেন? যেমন সাকিব... সাকিবকে কেন বলবে না ও ভালো খেলোয়াড়? আমরা ছোট দল হতে পারি, সাকিব তো ছোট খেলোয়াড় না! সাকিবকে তো বলতে পারেন যুবরাজ সিংয়ের চেয়ে অনেক ভালো খেলোয়াড়। কিন্তু যুবরাজ আর সাকিব যখন একসঙ্গে যাবে, পাঁচটা ধারাভাষ্যকার যুবরাজের দিকে তাকিয়ে বলবে, ‘হোয়াট এ ক্লাস প্লেয়ার!’ সাকিবকে চিনবেও না। এতে প্রচণ্ড রাগ লাগে।"

প্রিয় বন্ধু রানাঃ
"আমার সবচেয়ে ক্লোজ ফ্রেন্ড ছিল ও। ট্যুরে একসঙ্গে ঘুমাতাম। ও আলো থাকলে ঘুমাতে পারত না। দরজার নিচে যে একটু ফাঁক থাকে, ওখান দিয়ে আলো আসত বলে টাওয়েল গুঁজে দিত। আমি আবার অন্ধকারে ঘুমাতে পারি না। ওকে তাই মারতাম। ও-ই তাই স্যাক্রিফাইস করত। বলত, তুই আগে ঘুমা, আমি পরে ঘুমাব, আমি অন্ধকার ছাড়া ঘুমাতে পারি না।"

বউ-শাশুড়ির সম্পর্কঃ
"আপনি খেয়াল করলে দেখবেন এখন প্রায় প্রত্যেক পরিবারেই শাশুড়ি এবং বউয়ের মাঝে একটা প্রবলেম চলতেই থাকে। আমি বিশ্বাস করি দুই ক্ষেত্রেই যদি একটু স্যাক্রিফাইসিং টেন্ডেন্সি থাকে, তাহলেই আমাদের সমাজটা সুন্দর হবে, সুখের হবে। আমি আমার মেয়েকে সেভাবেই গড়ে তুলতে চাই যেন শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে তার কাছে ফার্স্ট প্রায়োরিটি হোক ওই বাড়িই। আমার মেয়ে যেহেতু বড়, আমি যদি আমার মেয়েকে সেই মূল্যবোধে বড় করতে পারি, তাহলে আমার ছেলেও একইভাবে তার স্ত্রীকে সম্মান দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে বিবেচনা করবে। আমি যদি আমার সন্তানদের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারি, তাহলে সেটার প্রাইস পাব নিশ্চয়ই!"

চোকার্স বলো নাঃ
"আমি জানি না কারো এভাবে কথা বলা ঠিক কি না। আর আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি, কোনো জাতিকে এভাবে আঘাত করা ঠিক না। আমি বিশ্বাস করি, ওরা অনেক বড় দল। এমনকি বিশ্বকাপে যখন যায়, অন্যতম সেরা দল হিসেবেই যায়। সেখানে গিয়ে এমন না ভালো খেলে না। দুর্ভাগ্যজনক ভাবে ওরা এবারও সেমি-ফাইনালে গিয়ে হেরেছে। আসলে এই কথাগুলো সব সময় ব্যবহৃত হয়, তখন আমার কাছে ব্যক্তিগত ভাবে মনে হয় পুরো দেশটাই এতে কষ্ট পায়। মানুষকে, একটা জাতিকে এভাবে কষ্ট দেওয়ার অধিকার কারো নেই।"

তিনটি ইচ্ছেঃ
"আমার যদি সুযোগ থাকতো, তাহলে আমি প্রথমেই আল্লাহকে বলতাম যেন সবাইকে তিনি মাফ করে দেন এবং জান্নাতে যাওয়ার সুযোগ করে দেন। সেকেন্ডলি চাইতাম, আমার বাবা-মা সবসময়ই হাসিখুশি থাকুক, সুস্থ থাকুক। আরেকটা জিনিস চাইতাম, আমার ছেলেমেয়ে যেহেতু বড় হচ্ছে, তারা যেন সম্মানের সাথে মাথা উঁচু করে বাস করতে পারে। অর্থকড়ি লাগবে না।"

সমর্থকদের প্রতি কৃতজ্ঞতাঃ
"আমরা তো বাংলাদেশের মানুষকে তেমন কিছুই দিতে পারিনি। যদি চিন্তা করে দেখেন, আমরা গত ১৫ বছর একঘেয়ে ক্রিকেট খেলে গেছি। কখনো হয়তো জিতেছি। আমি সব সময়ই বলি, বাংলাদেশের ক্রিকেটে প্রতিটি জয়ই খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু বেশির ভাগ সময়ই আমরা খুব বাজে খেলে হেরেছি। তার পরও বাংলাদেশের মানুষ আমাদের দিনের পর দিন সমর্থন করে গেছে। খারাপ খেললে গালি দেবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু দিনের পর দিন আমাদের যেভাবে সমর্থন দিয়েছে, এটা অসাধারণ। না হলে এই খেলাটায় যে এত মধু আছে, এত আনন্দ আছে, এর কিছুই আমরা পেতাম না।
"আমরা তো ক্রিকেট খেলে আমাদের দেশের জনগণকে কিছু দিতে পারিনি। দিনের পর দিন ওঁরা হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। ইদানীং আমরা দেশের মাঠে কিছু জিতছি। বলতে পারেন সমর্থকদের কাছে যে ধার-কর্জ হয়েছিল তার কিছু কিছু করে ফেরত দিচ্ছি। এ বার বিদেশেও ভাল খেলতে হবে।"

সাদামাটা বচন, সহজ-সরল দর্শনঃ
আমি সবসময়ই মনে করি, ক্যারিয়ার বাঁচানোর সামর্থ্য আমার নেই। ক্যারিয়ার গড়ার সামর্থ্য হয়তোবা আছে। ক্যারিয়ারে ভালো কিছু করতে হলে কষ্ট করতে হয়, সেটা আমি করতে পারি। কিন্তু ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যেতে বসলে আমি তা থামাতে পারব না। ওটা আমার নিয়ন্ত্রণে নেই। কাজেই যেটা পারি সেটাই করি। চেষ্টা করে যাই... যেখানে গিয়ে থামবে এমনিতেই থেমে যাবে।"
ইনজুরিতে ক্যারিয়ারটা শেষই হয়ে গেলে ?
“স্ট্রেট নড়াইলে চলে যাব... সবসময়ই চিন্তা করি, জীবনে যা কিছু করব নড়াইলেই করব।
“এই প্রথম এভাবে বললাম... এর আগে চিন্তাও করিনি এসব...। আমার এটুকু বিশ্বাস আছে, ক্যারিয়ার শেষ হবে অবসর নিয়ে। অবসর যদি কালও নেই, আমি নিজে সিদ্ধান্ত নিয়ে নেব। ইনজুরির কাছে হেরে নয়। বাকিটা ওপর ওয়ালার হাতে।”

জয়ের স্রোতে অপেক্ষা পরাজয়েরঃ
জয়ের স্রোতে যখন...
প্রশ্ন ছিলো, ‘ইস লাইফ বিউটিফুল নাউ?’
মাশরাফি এক গাল হেসে বলেছিলেন, ‘না হারা পর্যন্ত সবই বিউটিফুল। আমি হারের সময়টা দেখতে চাই; জীবন তখন কেমন থাকে, সেটাই দেখতে চাই।"
পরাজয় থেকে যখন আবার জয়ের ধারায় ফিরে...
"আমি এই সময়টা দেখতে চেয়েছিলাম। জয়ের সময় তো তো সব সুন্দর থাকে, ছন্দে থাকে। কিন্তু আমি হারের ঘরে ঢুকে গেলে দল কেমন আচরণ করে, সেটা দেখতে চেয়েছি। এই সময়টাই হলো খেলোয়াড়দের ক্যারেক্টার শো করার সময়। আমি জয়ের আনন্দে ভাসতে থাকা এক ঝাক খেলোয়াড়ের চেয়ে, হারের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে জীবন দিতে থাকা এক ঝাক ক্যারেক্টার দেখতে চেয়েছিলাম। আমি খুশী যে, আমার দলের খেলোয়াড়রা সেটা দেখাতে পেরেছে।"

জয় বড়, তবে ক্রিকেটের চেয়ে বড় নয়ঃ
“বিশ্বকাপ থেকে আমরা প্রায় সব ম্যাচই জিতেছি। জিততে জিততে জেতার একটা নেশা তৈরি হয়; এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু নেশাটা অতিরিক্ত হতে হতে একটা সময় মানুষ মূল ব্যাপারটা ভুলে যায়; কিভাবে জয় আসে, সেই প্রসেসটা নিয়ে ভাবে না। শুরু থেকেই আমরা যখন জেতা-জেতা করি। মাঝখান থেকে ক্রিকেট অনেক দূরে সরে যায়।”

লোকে যারে হিরো বলে হিরো সে হয়ঃ
“আমি নিজের মনের কথা বলেছি। আমি মনে করি দিনের শেষে খেলাটা একটা বিনোদন। তাও তো ক্রিকেট হল স্পোর্টসের একটা অংশ। পুরো খেলা নয়। সেখানে এত হিরো ওয়ারশিপের দরকার কী?
“সবচেয়ে বড় হিরো আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা। তাঁদের জন্যই তো আজ স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা রয়েছি। আমি ওদের অসম্ভব সম্মান করি। আমি সম্মান করি বৈজ্ঞানিকদের। ওঁদের এক-একটা আবিষ্কার জাতিকে কত বছর আগে নিয়ে যায়। আমি সম্মান করি ডাক্তারদের। যাঁরা মানুষের জীবন বাঁচান। এর চেয়ে মহৎ কাজ আর কী হতে পারে। আমাদের নিয়ে যত নাচানাচিই হোক, আমরা কি কারও জীবন বাঁচাতে পারছি?”

আমার সোনার বাংলা’র উথাল পাতাল করা সুরঃ
“ভালো-খারাপ পরের বিষয়। আমাদের দেশকে সবাই চিনছে, দেশের পতাকা উড়ছে—এটা আলাদা একটা গর্ব। দেশের পতাকা বয়ে নিয়ে যাওয়া অনেক বড় পাওয়া। খেলার মাঠে যখন জাতীয় সংগীত বাজে, অনেক সময় কান্না চলে আসে। লাল-সবুজ পতাকা উড়ছে, লাউড স্পিকারে বাজছে ‘আমার সোনার বাংলা’...ওই জায়গায় আমরা দাঁড়িয়ে থাকি! না বললে কেউ বুঝবে না বুকের ভেতর কেমন উথালপাতাল ঢেউ ওঠে তখন।”

এজন্যেই তিনি আলাদা, তিনি ভিন্ন, তিনি অন্যরকম, তিনি অসাধারণঃ
“এই যে মানুষের ভালোবাসা, আমি টের পাই প্রবলভাবে। আজকে শপিংয়ে বের হয়েছিলাম, ঝাঁকে ঝাঁকে সবাই এসে বলা শুরু করলো, ‘‘গুরু, সেলফি…!’’ এখন কয়জনের সাথে ছবি তুলব বলেন ? পরে শেষ পর্যন্ত চলে আসতে হলো। আমার খারাপ লাগলো খুব। সবাই কতো আশা নিয়ে আসে ছবি তোলার জন্য! কিন্তু অবাক করা ব্যাপার কী জানেন? অধিকাংশই শুধু সেলফি তুলতে আসেন, তারপর সেলফি তুলেই চলে যান! কেউ জিজ্ঞেসও করেন না, ‘‘ভাই কেমন আছেন?’’ অথচ আমাকে কেউ জিজ্ঞেস করলে আমিও নিশ্চয়ই তার সাথে কুশলাদি বিনিময় করতাম। সবাই কেমন যেন যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছে। আমিই হয়তো ব্যাকডেটেড হয়ে গেছি!”

কেন তিনি অধিনায়কদেরও অধিনায়ক, ক্যাপ্টেন কিং, মানবতা-মনুষত্ব্যের মূর্ত প্রতীক, মহৎ থেকে হয়েছেন মহোত্তর... এইসব বচনই তা প্রমাণ করে। তাই সাকিবের মতোই বলি, মাশরাফি কোন মিথ নন, হতে পারেন না। তিনি চিরন্তন, তিনি শিখা অনির্বাণের মতো জ্বালিয়ে রেখেছেন অনুপ্রেরণা ও মানবতার মহোত্তম দ্বীপশিখা।
তিনি বাংলাদেশ ক্রিকেটের শ্রেষ্ঠ সন্তান। ক্রিকেট-অমৃতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পুত্র।
____

কৃতজ্ঞতায়...
উৎপল শুভ্র
দেবব্রত মুখোপাধ্যায়
আরিফুল ইসলাম রনি
মাসউদুর রহমান
জাহিদ রেজা নূর
গৌতম ভট্টাচার্য্য
তারেক মাহমুদ
মোঃ ইসাম
সিদ্ধার্থ মনগা
মুক্তার ইবনে রফিক
আমিনুল ইসলাম (বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক গোলকিপার)
এবং আরো অনেকে... ।
যাদের সাক্ষাৎকার বা লেখাগুলো পড়ার সুযোগ না হলে একজন মহৎপ্রাণ ক্রিকেটার ও মানুষ সম্পর্কে হয়তো এভাবে জানার সুযোগ হতো না কোনদিন।