X
GO11IPL2020
  • ক্রিকেট

তাঁর শেষদিন

পোস্টটি ১০৬৭৯ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

আস্তে, ধীরে হাঁটছেন তিনি। এই শহর, এই মাঠ, এই মানুষ তাঁর কত চেনা! এদের কাছ থেকে আজ বিদায় নেবেন, ভাবতেই গলায় কেমন যেন দলা পাকানো অনুভূতি হচ্ছে তাঁর।

না, তাঁর শান্ত থাকতে হবে। তিনি জানেন আবেগকে প্রশ্রয় দেয়ার প্রশ্নই উঠে না আজ। তাঁকে সামলাতে হবে নিজেকে, পরিবারকে, সতীর্থদের, সবচেয়ে বড় কথা মানুষদের। যাদের কাছে তিনি শুধু মাত্র একজন রক্ত-মাংসের ক্রিকেটার নন, তাঁর চেয়েও অনেক অনেক বড়। গত ২৪টি বছর ধরে এই মানুষেরা তাঁকে দিয়েছেন সেই স্থান, যা মানুষ কেবল ঈশ্বরকেই দেয়!

171471.3

                                     তাঁর ছোট্ট পৃথিবী, তাঁর পরিবার। 

 

তিনি স্থির থাকতে চাইলেও ভেতরটা কেমন যেন করছে। যেন একটা ঝড় বয়ে যাচ্ছে সেখানে। উথাল-পাতাল করা আবেগের ঝড় চলছে ভেতরে। গত কয়েকটা দিন কিভাবে যে কেটেছে!

 

কত কি মনে পড়ছে তাঁর। সেই কৈশোরে ওয়াকারের চোখে চোখ রেখে ব্যাট দিয়ে কথা বলা, নাক দিয়ে রক্ত ঝরলেও ভয়ডরহীন ব্যাট করে যাওয়া, পরে সেই ওয়াকারকেই পিটিয়ে ছাতু বানিয়ে ফেলা, কত কি! স্মৃতিগুলো যেন একে একে ভিড় করছে তাঁর। এই ওয়েংখেড়েতেই না ধোনী তাঁকে ক্রিকেট ক্যারিয়ারের শ্রেষ্ঠ উপহারটি দিয়েছিল! সেই রাত তাঁর স্মৃতির পাতায় কি উজ্জ্বল হয়েই না জ্বলজ্বল করছে!

171363.4

                                  শেষবারের মতো নামছেন তিনি, দলও নামছে তাঁর নেতৃত্বেই। 

 

সৌরভ, দ্রাবিড়, লক্ষণ, কুম্বলে একে একে চলে গেছেন। তিনি জানতেন তাঁরও চলে যেতে হবে। সবকিছুর শুরু যেমন আছে, শেষও আছে তেমন। তাঁর মতো জীবন-দর্শন তো খুব কম মানুষই পেয়েছেন, তাই তিনি জানতেন এক সময় না, এক সময় সমাপ্তি রেখা তাঁকে টানতেই হবে। তিনি টেনেছেন। কিন্তু তবুও কোথায় যেন, চিনচিনে ব্যথা! অদ্ভুত অসহনীয় এক জ্বালা! বিদায়, বড় কষ্টের যে!

 

তিনি জানেন, তাঁকে স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের সাথে তুলনা করা হয়। তুলনাটা টেনেছিলেন স্বয়ং স্যার ডনই। এক অলস অবসরে টিভিতে তাঁকে দেখতে পেয়ে স্যার ডন নাকি স্ত্রীকে বলে উঠেছিলেন, “দেখো তো ছেলেটা যেন আমার মতোই ব্যাটিং করে!” সে সব কত পুরনো কথা! স্বপ্ন সত্যি হওয়ার মতো, রক্ত-মাংসের সেই স্যার ডনকে কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্যও হয়েছে তাঁর। কথা বলেছেন, ছুঁয়ে দেখেছেন, হয়তো নিজের হাতে চিমটি কেটে নিশ্চিতও হয়েছিলেন, যা ঘটছে তার পুরোটাই সত্যি, বিভ্রম নয়। তিনি তো শুধু স্যার ডনের মতো খেলতেনই না, অনেক ক্ষেত্রে কিভাবে যেন তাঁর সাথে মিলেও গেছে অনেক কিছু। ওভালে যেদিন ব্র্যাডম্যান খেলেছিলেন শেষ টেস্ট, ঠিক তাঁর ৪২ বছর পর, ঠিক সেদিন, ইতিহাসের কনিষ্ঠতম ব্যাটসম্যান হিসেবে ইংল্যান্ডের মাঠে তিনি করেছিলেন ম্যাচ বাঁচানো এক সেঞ্চুরী!

srt-firstton-getty

                                ম্যানচেস্টারে ম্যাচ-বাঁচানো সেঞ্চুরী করে ফিরছেন। 

 

ওভাল টেস্টে যখন শেষ টেস্ট খেলতে নেমেছিলেন স্যার ডন, তাঁরও কি এমন ‘দলা পাকানো’ অনুভূতি হয়েছিল? নরম্যান ইয়ার্ডলির পুরো দলটা যখন তাঁকে টুপিখোলা সম্মান জানাচ্ছিল, থ্রী চিয়ার্স করছিল, তিনিও কি এমন আবেগী হয়ে পড়েছিলেন? জনশ্রুত যে আছে, আবেগে স্যার ডনের চোখে জল এসে পড়েছিল। তাই হলিসের বলটি তিনি দেখতে পাননি! অবশ্য স্যার ডন জানিয়েছিলেন, ইংলিশ ক্রিকেটারদের অভ্যার্থনা তাঁকে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল আঠারো বছর আগে, স্যার জ্যাক হবসের বিদায়ী টেস্টে। তাঁর মনে হয়েছিল যেন সেই দৃশ্যটাই তিনি আবার দেখছেন এখানে! তাঁর মানসিক অবস্থা স্বাভাবিক ছিল না। ফলাফল হলিসের দ্বিতীয় বলটি তাঁকে ‘উপহার’ দিয়েছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত শূণ্য!

209089.4

                                                      'থ্রী চিয়ার্স' ফর স্যার ডন ব্র্যাডম্যান। 

 

নাহ, ব্যাটিংয়ের আধুনিক ডনের ক্ষেত্রে তেমনটা হয়নি। আবেগে তাঁর চোখে জল এসে পড়েনি, মুরালি বিজয়ের আউটের দুঃখের চেয়েও তাঁর নামার আনন্দে (বেদনাও কি ছিল না?), পুরো ওয়েংখেড়ে দাঁড়িয়ে তাঁকে সম্মান জানায়। আম্পায়ার রিচার্ড কেথেলব্রো, নাইজেল লং সহ স্যামির নেতৃত্বে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলটা তাঁকে দেয় গার্ড অব অনার। তবুও তাঁকে একটুও বিচলিত মনে হয়নি। মাঠের বড় পর্দায় ভেসে উঠল, “ডোন্ট ইভেন ব্লিংক!” এত এত হাততালি, হর্ষধ্বনি, শাআআচিইইইন-শাআআচিইইন চিৎকারেও তিনি যেন কেমন নির্বিকার!

171211.4

                                                   শেষবারের মতো এভাবে... 

 

ওপাশের সঙ্গী চেতেশ্বর পূজারা উপভোগ করলেন পুরোটা, সে ম্যাচের সর্বোচ্চ স্কোরারও হলেন তিনি। ঠিক যেমন ৬৫ বছর পূর্বে, স্যার ডনের ওপাশের সঙ্গী আর্থার মরিস হয়েছিলেন সর্বোচ্চ স্কোরার! স্যার ডনের মতো জীবনের শেষ টেস্টে তিনিও পাননি দ্বিতীয়বার ব্যাট করার সুযোগ!

প্রথম দিন শেষে তাঁর ১০১ তম সেঞ্চুরীর প্রতীক্ষায় প্রহর কাটলেও, পূরণ হয়নি তা। দিওনারাইনের একটু লাফিয়ে উঠা বলে লেট কাট করতে চেয়েছিলেন, ঠিকমতো লাগাতে পারলেন না, ব্যাটের উপরের অংশ ছুঁয়ে তা জমা হলো, স্যামির বিশ্বস্ত হাতে। তিনি ফিরলেন ১০১ তম সেঞ্চুরী থেকে ২৬ রান দূরে!

171221.5

                                         আউট হয়ে ফিরছেন, শেষবারের মতো। 

সপ্তাহ দুয়েক পূর্বে, হরিয়ানার বিপক্ষে খেলে ঘরোয়া ক্রিকেটের সাথে চুকিয়ে দিয়েছেন সম্পর্ক। রঙিন ক্রিকেটকে শেষ বলেছেন আরো আগেই, সপ্তাহ দেড়েক আগে আইপিএলকেও বলেছেন, বিদায়। সেখানেও রোহিত শর্মা তাঁকে দিয়েছেন ‘চ্যাম্পিয়ন’ ফেয়ারওয়েল। এই ২২ গজে তিনি যেমন নিজেকে নিংড়ে দিয়েছেন, এই আয়তক্ষেত্রটাও তাঁকে দিয়েছে দু’হাত ভরে। তাই অপ্রাপ্তির গল্প তাঁর তেমন নেই বললেই চলে!

আসলেই কি নেই? না, বোধহয় কিছু আছে। ক্রিকেটের প্রতি নিবেদন, দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা তাঁকে বাবার অন্তিম সময়টাতে থাকতে দেয়নি। এই যে শেষ বলছেন, তাঁর মন কতটা সায় দিচ্ছে? প্রাপ্তির খেরোখাতায় আরো কিছু কি জমা করতে ইচ্ছে হচ্ছে না তাঁর? তিনি জানেন, ইচ্ছে হলেও উপায় নেই। বাস্তবতাকে স্বীকার করতেই হবে। তাই ইচ্ছেটাকে দমিয়ে রেখে বলেছেন, অনেক হয়েছে আর না।

 

করাচীর এক দুপুরে শুরু করেছিলেন যে যাত্রা, ঠিক যেদিন সেই যাত্রার দুই যুগ পূর্তি, সেদিনই তিনি বললেন, শেষ! কি অদ্ভুত, না? একটু বোলিং করলেন, ফিল্ডিং করলেন, প্রায় তিন দশকের সম্পর্কটাকে শেষ করার সময়টাতেও চেষ্টা করলেন যতটা সম্ভব শান্ত থাকার। উথলে উঠা আবেগটাকে চেপে রাখলেন, ঠিক যেমন বোলারের শত প্রলোভন সত্ত্বেও শট খেলার উচ্ছ্বাসটাকে চেপে রাখতেন!

 

শ্যানন গ্যাব্রিয়েল বোল্ড হলেন। ম্যাচের সমাপ্তি ঘটল। সাথে শেষ হলো দুই যুগের এক পথচলাও। অধিনায়ক মাহেন্দ্র সিং ধোনীর নেতৃত্বে তিনি পেলেন, অভিনব এক গার্ড অব অনার। তিনি যখনি ক্রিকেটারদের দুই সারির শেষ মাথায় পৌঁছেন, সাথে সাথে ক্রিকেটাররা সেখান থেকে শুরু করেন, আবার নতুন সারি। বাইশ গজ থেকে সীমানা দড়ি পর্যন্ত চলল, এই অবস্থা।

এমন সম্মানে যেন আর ধরে রাখতে পারলেন না নিজেকে। চিকচিক করে উঠল তাঁর দু’চোখ।

৫ ফুট ৫ ইঞ্চি গড়নের ছোটখাটো মানুষটি চোখ মুছতে মুছতে মাঠ ছাড়লেন!

 

বিদায়ী বক্তব্যে বোঝা গেল, তিনি ব্যাটিংয়ে যেমন সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়ে নামতেন, ঠিক তেমনি এখানেও এসেছেন নিজেকে সর্বোচ্চ প্রস্তুত করে। কৃতজ্ঞতার ডালি সাজিয়ে বিলিয়ে গেলেন যেন! বাদ গেল না কেউই। ১৪১ জন সতীর্থ ক্রিকেটার তো বটেই, ৮৪৮ জন প্রতিপক্ষের ক্রিকেটারকেও যেন বুঝিয়ে দিলেন, কেন তিনি পৌঁছেছেন হিমালয়-সম উচ্চতায়! লক্ষ-কোটি মানুষের কাছে কেন তিনি হয়েছেন পরম পূজণীয় ব্যক্তিত্ব! আকাশ সমান সম্মান কেন তাঁর প্রাপ্য! তাঁর বিদায়ে কেন বাজছে এমন করুণ বিউগল!

171461

                                                 বিদায়ী বক্তব্যে সাজালেন কৃতজ্ঞতার ডালি। 

 

বিনম্র চিত্তে সবাইকে স্মরণে, ধন্যবাদ জ্ঞাপনে ও কৃতজ্ঞতার বহরে, তিনি যেন পরিস্কার বুঝিয়ে দিয়েছেন, কিভাবে তিনি হয়েছেন আজকের শচীন রমেশ টেন্ডুলকার!  

 

ওয়েংখেড়ের গ্যালারী থেকে তখন ভেসে আসছে শাআআচিইইন-শাআআচিইইন সুর, ক্রিকেট মাঠের যা সবচেয়ে বেশী মিস করবেন তিনি!