• ফুটবল

আরেক দিয়েগো!!!

পোস্টটি ৭৪৬৮ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

১.

    ডি-বক্সের বাইরে বল সামনে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি, ফ্রি-কিক নেয়ার অপেক্ষায়। তাঁর সামনে গায়েগায়ে দাঁড়িয়ে জার্মানির খেলোয়াড়রা রচনা করেছে দুর্ভেদ্য মানবদেয়াল। রেফারীর মুখে বাঁশি, সঙ্কেত দিলেই ফ্রি-কিক নেবেন তিনি।

    খেলার তখন অন্তিম মুহূর্ত। নির্ধারিত নব্বই মিনিট শেষ হয়েছে ২-২ এ, এক্সট্রা টাইমে গোল দিয়ে ৩ - ২ এ এগিয়েও গেছে জার্মানি। সেই এক্সট্রা টাইমও শেষ প্রায়। ফ্রি-কিকের বাঁশির সাথে সাথেই ম্যাচশেষের বাঁশিও হয়তো বাজিয়ে দেবেন রেফারী।

    সতর্কাবস্থায় প্রতিপক্ষ, নিঃশ্বাস বন্ধকরে টিভিসেটের দিকে তাকিয়ে আছে দুনিয়াজোড়া লক্ষকোটি দর্শক। শেষমুহূর্তের রোমাঞ্চের অপেক্ষায় আছেন ধারাভাষ্যকাররাও। সেই অবস্থায় তিনি এগিয়ে গিয়ে বলে পা ছোঁয়ালেন।  

    নাহ, হলো না!!!

    মাপা শটের বল বারপোস্টের বাইরের দিকে লেগে চলে গেল অন্যদিকে। সেই বল ধরতে ধরতেই বেজে উঠল রেফারীর বাঁশি। খেলা শেষ। বিশ্বকাপের তৃতীয়স্থান নির্ধারণী খেলায় উরুগুয়েকে হারিয়ে দিল জার্মানি।

    সেমিতে হেরেছিলেন নেদারল্যান্ডের সাথে, আর তারপরের ম্যাচে হারলেন জার্মানির সাথে। পরপর দু’ম্যাচ হেরে দলের ক্ষতি হয়েছিল অবশ্যই, তবে তাঁর কোনও ক্ষতি হয়নি। পুরো টুর্নামেন্টে এমন খেলা দেখিয়েছিলেন, যাতে গোল্ডেন বলটা তাঁর প্রাপ্যই ছিল।

    তাঁর নাম দিয়েগো ফোরলান।



২.

    ফুটবলে আগ্রহ থাকুক অথবা না-ই থাকুক, দিয়েগো ম্যারাডোনার নাম শোনেননি এমন মানুষ বোধহয় পৃথিবী নামক গ্রহে নেই। অবশ্য না শোনার কোনও কারণও নেই। ৮৬’র বিশ্বকাপে তাঁর এমনই পারফরম্যান্স ছিল যে তা নিয়েই এক মহাকাব্য লিখে ফেলা যায়।

    দিয়েগো ফোরলানকে নিয়ে লিখতে বসে দিয়েগো ম্যারাডোনা চলে আসছেন। কী মুশকিল!! ম্যারাডোনার সাথে ফোরলানের কোনও তুলনাই চলে না। তবুও কিছু মিল তো আছেই। দুজনেই দক্ষিণ আমেরিকান, দুজনের নামই দিয়েগো। দুজনেই জিতেছেন বিশ্বকাপের গোল্ডেন বল। মিলটা এখানেই শেষ। দিয়েগো ম্যারাডোনা যেখানে সোনালী ট্রফিতে চুমু  এঁকেছেন, সেখানে আরেক দিয়েগোকে থেমে যেতে হয়েছে সেমিতেই।

   আন্তর্জাতিক ফুটবলে আর্জেন্টিনা আর উরুগুয়ের মধ্যে দা-কুমড়া সম্পর্ক হলেও এমনিতে তাদের মধ্যে অনেক মিল। দুই দেশই স্পেনের অধীনে ছিল, বর্তমানে দুই দেশের রাষ্ট্রভাষাও স্প্যানিশ। দিয়েগো নামটা দুই দেশেই অনেক কমন। স্পেনেও দিয়েগো নামের মানুষ প্রচুর। ব্রাজিলের ক্ষেত্রে এটা আবার হয়ে যায় হোসে, সিলভা আর পেরেইরা। না হয়ে উপায় কী? ব্রাজিল পর্তুগীজ উপনিবেশ ছিল যে!!

৩.

    ফোরলান ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন আর্জেন্টাইন ক্লাব ইন্ডিপেন্ডিয়েন্টের হয়ে। সেটা ১৯৯৭ সালের কথা। সেখানে ৬ বছরে ৭৭ ম্যাচে ৩৭ গোল করার পর নড়েচড়ে বসে ইউরোপিয়ান ক্লাবগুলো। এরকম একজন গোলস্কোরার তো হাতছাড়া করা যায় না। ইংল্যান্ডের ক্লাব মিডলসব্রো তাঁকে কিনেই নিয়েছিল প্রায়। সেসময়ই তাদের মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়ে ফোরলানকে ৬.৯ মিলিয়ন ইউরোতে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে নিয়ে আসেন স্যর অ্যালেক্স ফার্গুসন। সেখানে কাটান ২ বছর, জেতেন ১ প্রিমিয়ারলিগ, ১ এফএ কাপ, ১ কমিউনিটি শিল্ড। কিন্তু ইউনাইটেডের হয়ে ৬৩ ম্যাচে ১৭ গোল জানিয়ে দেয়, প্রিমিয়ারলিগে মানিয়ে নিতে পারছেন না তিনি। ২০০৪ সালে ইংল্যান্ড থেকে তিনি উড়াল দেন স্পেনে, যোগ দেন ‘ইয়েলো সাবমেরিন’ নামে খ্যাত ক্লাব ভিয়ারিয়ালে।

    স্পেনে এসে যে নিজেকে ফিরে পাচ্ছেন তা পরিষ্কার বোঝা গেল যখন ০৪/০৫ মৌসুমে পিচিচি জিতলেন, সাথে থিয়েরি অঁরির সাথে যুগ্মভাবে জিতলেন ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শ্যু। ভিয়ারিয়ালে কাটালেন ৩ বছর, করলেন ১০৬ ম্যাচে ৫৪ গোল। ২০০৭ সালে ভিয়ারিয়াল থেকে তাঁকে কিনে নেয় অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ, লিভারপুলে যাওয়া ফার্নান্দো টরেসের রিপ্লেসমেন্ট হিসেবে। অ্যাটলেটিকোতে এসে জুটি বাঁধেন সার্জিও আগুয়েরোর সাথে। ক্যারিয়ারের তখন তাঁর মধ্যগগনে। ভিয়ারিয়ালে থাকতে নিজে ব্যক্তিগত পুরষ্কার জিতেছেন, কিন্তু জেতেনি তাঁর দল। অ্যাটলেটিকোতে এসে যেন ঠিক করলেন, দলকেও এবার কিছু জেতাবেন। গোল করতে থাকলেন, ০৮/০৯ মৌসুমে আবার পিচিচি জিতলেন, জিতলেন ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শ্যুও, তবে এবার আর যুগ্মভাবে নয়। বিশ্বকাপের আগে অ্যাটলেটিকোকে জেতালেন ইউরোপা লিগ। বিশ্বকাপের পর উয়েফা সুপার কাপে হারালেন সেই মৌসুমে ট্রেবল জেতা হোসে মোরিনহোর ইন্টার মিলানকে। ফোরলান যোগ দেয়ার আগে এর কোনওটিই জেতেনি অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ।

   ২০১১ সালে অ্যাটলেটিকো ছেড়ে যোগ দেন ইন্টার মিলানে। ইন্টারে যোগ দেয়ার পর থেকে তিনি আর তেমন কোথাও থিতু হতে পারেননি। ইন্টার মিলান থেকে নিজের দেশের ইন্টারন্যাশিওনাল, জাপানের সেরেজো ওসাকা থেকে পেনারোল হয়ে এখন তিনি মুম্বাই সিটি এফসিতে।

   বিশ্বকাপের গোল্ডেন বল পাওয়া একজন খেলোয়াড় এখন ইন্ডিয়ান সুপার লিগে খেলেন?

   সময়ের ব্যবধানে আসলেই যে কতকিছু বদলে যায়!!!



৪.

    জাতীয় দলের হয়ে বিশ্বকাপ জেতার সবচেয়ে কাছাকাছি গিয়েছিলেন ২০১০ সালে। সেবার চতুর্থ হয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয় উরুগুয়েকে। তবে একবছর পরেই সুযোগ চলে আসে শাপমোচনের। মঞ্চটা এতো বড় ছিল না, নিজেও তেমন একটা ভূমিকা রাখতে পারেননি। তবুও জাতীয় দলের হয়ে একটা শিরোপা তো বটেই। আর্জেন্টিনার মাটিতে বসা কোপার ৪৩তম আসরে নিজেদের ১৫তম শিরোপা জিতে নেয় সেবার উরুগুয়ে।

৫.

   শুরুতে ফিরে যাই। বলছিলাম, ২০১০ বিশ্বকাপের জার্মানি বনাম উরুগুয়ের ম্যাচের কথা। সেই ম্যাচে উরুগুয়ের হয়ে ২য় গোলটি করেছিলেন ফোরলান। সেই গোলটি পরে মনোনীত হয়, ২০১০ বিশ্বকাপের সেরা গোল হিসেবে।

   গোলটি মনে করিয়ে দেয়, ২০০২ চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে লেভারকুসেনের সাথে করা জিদানের সেই বিখ্যাত গোলটিকে। পার্থক্য একটাই, জিদানেরটা ছিল পিউর ভলি, সেখানে ফোরলানেরটা ওয়ান বাউন্সের পরে গোল।

   আজ ১৯মে ৩৯ বছর পূর্ণ করলেন Cachavacha নিকনেমের দিয়েগো ফোরলান। Cachavacha শব্দের মানে উইচ বা ডাইনী। মাথায় সাদা চুল, সাথে বাঁকানো নাকের কারণে দিয়েগো ফোরলান পরিণত হয়েছেন Cachavacha’তে।

    শুভ জন্মদিন, দিয়েগো।